মহাকাশে মহাঅভিযানে সব দেশকে চীন-রাশিয়ার আমন্ত্রণ

বিপ্লব রঞ্জন সাহা 

যখন সারা বিশ্বে চলছে করোনা প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধে ব‍্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সত্ত্বেও, করোনা নামক মারণঘাতি ভাইরাসের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, মানব জাতি একাধিক কার্যকর ভ‍্যাক্সিন আবিষ্কারের মাধ‍্যমে আপাত স্থিতিশীলতা অর্জনে সফল, তখন প্রচার মাধ‍্যমগুলো বিশেষত পশ্চিমা প্রচার মাধ‍্যমগুলো মুনাফাকেন্দ্রিক ব‍্যবসায়িক স্বার্থে অধিকতর ভীতি সঞ্চার ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে ফেরি করতে মহাব‍্যস্ত।

চারদিকে শুধুই মৃত‍্যুর বীভৎস সব সচিত্র সংবাদ প্রচার করে মানুষের মনোবলকে ভঙ্গুর করে তুলছে। আমেরিকা, ব্রাজিল, স্পেন, ইতালি, ইংল‍্যান্ড, এবং সর্বশেষ ভারতের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে প্রচারণা যে সামগ্রিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থতাড়িত তা ইতোমধ‍্যে আংশিক প্রমাণিত এবং ভবিষ‍্যৎ নিশ্চয়ই সবকিছু আরো উন্মোচিত করে তুলবে।

যদিও বিস্মৃতপরায়ণ ও পূর্বসিদ্ধান্ততাড়িত মানসিকতার প্রভাবে মানুষকে তারা নতুন কোন ছেলেভুলানো গল্প দিয়ে তাড়িয়ে নিবে অন‍্য কোন খাতে বা ধারায়। তারই ধারাবাহিকতায় ভ‍্যাক্সিন বাণিজ‍্যেও লক্ষণীয় প্রচারণা হলো পশ্চিমা বিশ্বের আবিষ্কৃত ভ‍্যাক্সিন অ্যাস্ট্রোজেনেকা, ফাইজার ও মডার্নার ভ‍্যাক্সিন নিয়ে একচেটিয়া প্রচারণা এবং এগুলোর বিপরীতে রাশিয়ার আবিষ্কৃত ‘স্পুটনিক ভি’ এবং চীনের আবিষ্কৃত ‘সিনোভ‍্যাক’ নিয়ে বিষোদগার বা এদের সাফল‍্যকে ধামাচাপা দেওয়ার হীন অপচেষ্টা।

অথচ সারা বিশ্বে এই দু’দেশের ভ‍্যাক্সিন কার্যকারিতার বিচারে অধিক সফলতর, দাম বিচারে সস্তা ও প্রাপ‍্যতা বিচারে সহজলভ‍্য। যেখানে পশ্চিমা বিশ্বের ভ‍্যাক্সিনগুলো লাভজনক বাণিজ‍্যপণ‍্য, সেখানে চীনের ভ‍্যাক্সিনকে চীনা রাষ্টের পক্ষ থেকে বিশ্ববাসীর জন‍্য ‘গণপণ‍্য’ (people’s product) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

মানবজাতির প্রতি এই ধরণের মানবিক প্রয়াসকে ধামাচাপা দেওয়ার মতো সংকীর্ণ তৎপরতা সদা লক্ষণীয়। যাহোক, করোনা এক মহাতঙ্ক থেকে আজ যথেষ্ট নির্বিষ, কারণ সংখ‍্যার বিচারে সংক্রমণ কমেছে আর তার বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনাকে ঘিরে একচেটিয়া ব‍্যবসা করার যে দিবাস্বপ্নে একসময় বিভোর ছিলো কোন কোন বহুজাতিক গোষ্ঠী, তাদের সেই রঙিন স্বপ্ন, সাদাকালো বাস্তবতায় নেমে আসায় আবার চোখ ফেরাতে হচ্ছে দেশে-দেশে, জাতিতে-জাতিতে বাঁধিয়ে রাখা পুরানো যুদ্ধ ও সন্ত্রাস বাণিজ‍্যে।

মানবজাতির কোন সাফল‍্যের গল্পই তাদের হাতে নেই। কারণ তারা এখনও যুদ্ধ করছে অস্তিত্ব রক্ষার এবং বিনিয়োগ অনুপাতে মুনাফা ঘরে তুলতে পারার অনিশ্চয়তা কাটানোর শংকার। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানব জাতির বিকাশের ইতিহাস, তার সামনে মনুষ‍্যসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার পাহাড় হয়ে দাঁড়ানো সকল চ‍্যালেঞ্জ মোকাবেলার ইতিহাস। সব চ‍্যালেঞ্জই অতিক্রম করে মানুষ এগিয়ে গেছে তার নতুন চ‍্যালেঞ্জ নিয়ে।

বর্তমান সময়ও এর ব‍্যতিক্রম নয়। যখন চারদিকে শুধুই হতাশার দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় তখনও রয়েছে মানুষের ব‍্যাপক অগ্রগতির মহাকাব‍্যিক গল্পের। এ গল্পের মহানায়ক যারা তারা এক মানবিক সমাজ বিনির্মাণের যোদ্ধা। ব‍্যাক্তিগত লাভ-ক্ষতির বিচারের উর্ধ্বে উঠে তারা অহর্নিশি কাজ করে যাচ্ছে সভত‍্যার অগ্রাভিযানের। তাই আজ দেখা যাচ্ছে মহাকাশ মহাবিজয়ের নতুন উপাখ‍্যান। চাঁদে প্রমোদালয় বানানোর বদলে এক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের শুভ উদ্যোগ বা কৃত্রিম সূর্য তৈরি করে মানুষকে আসন্ন শক্তি সংস্থানের বিকল্প আবিষ্কারের অভিনব প্রয়াস।

প্রতিবেদনটির উপজীব্য মানব জাতির সাফল‍্যের তিনটি নতুন দিককে জনসমক্ষে তুলে আনা যা হয়তো আমাদেরকে উজ্জীবিত করে তুলবে, বাঁচার সাহস যোগাবে। এই করোনা মহামারির সময়ে চায়নিজ মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র (সিএসএসএ)-এর পক্ষ থেকে মঙ্গল গ্রহে তাদের মহাকাশযানের সফল অবতরণ এবং তাদের মাদার ভেসেলটি ঠিকঠিক ফিরে আসার পরও অনেকের মধ‍্যেই এর সাফল্যের বিপরীতে নানাবিধ শংকা পরিলক্ষিত হয়েছিলো।

মহাকাশ গবেষণাকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত একচেটিয়া করে রাখার অপচেষ্টার বিপরীতে একসময় তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিকল্প প্রয়াস ও আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (নাসা)-র তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে যাওয়ার প্রত‍্যক্ষ সাক্ষী এই পৃথিবীর মানুষ। আমেরিকা দীর্ঘদিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক উদ্যোগে গৃহীত মহাকাশ গবেষণায় চীনের অংশগ্রহণে বাধা হয়ে থাকলেও পূর্বের মতো ব‍্যর্থই শুধু হয়নি, বরং চীনের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়েও পড়েছে।

তার স্পষ্ট প্রমাণ হলো মহাকাশে আমেরিকার নিজস্ব একক কোন গবেষণা স‍্যাটেলাইট না থাকলেও আজ চীন এককভাবে সেই গর্বিত সাফল‍্যের দাবীদার। চীনের গবেষণার স‍্যাটেলাইট মানব জাতির ভবিষ‍্যৎ মহাকাশ অভিযানে স্বকীয় অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখবে। তবে এক্ষেত্রে চীনের সাথে রাশিয়ার গড়ে উঠা বন্ধুত্ব সম্ভাবনার দুয়ারকে আরো উন্মোচিত করে দিয়েছে। চীন রাশিয়ার বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড়ো যে প্রাপ্তি মানব জাতির জন‍্য আশু সুফল বয়ে আনবে তা হলো, আজ মহাকাশ গবেষণা কোন একচেটিয়া মুনাফাভিত্তিক প্রকল্প নয় বরং তা আজ সবার জন‍্য উন্মুক্ত ও মানব জাতির কল্যাণে নিয়োজিত।

যেখানে আমেরিকা বাণিজ‍্যের উদ্দেশ‍্যে মহাশূন্যে ফাইভ স্টার মানের এক বিনোদন কেন্দ্র স্থাপনের বিনিয়োগ উদ্যোগে সচেষ্ট, তখন অতি সম্প্রতি চীন-রাশিয়া যৌথ উদ্যোগে প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদে একটি গবেষণা কমপ্লেক্স গঠনের প্রকল্প হাতে নিয়ে তাতে সকল দেশকে যোগদানের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছে। যদিও তাদের এই মহতী উদ্যোগকে কটাক্ষ করে ‘আমেরিকাকে বাদ দেওয়ার হীন প্রয়াস’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিরোধ উষ্কে দেওয়ার অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকেনি পশ্চিমা প্রচার মাধ‍্যম। অথচ বর্তমান সময় হলো এই ছোট্ট গ্রহের বাইরে বিশাল মহাকাশকে উন্মোচিত করে তাকে জয় করার স্বর্ণালী সময়।

এ কথা করো অজানা নয় যে, আজকের বিশ্ব ফসিল ফুয়েলের অতিব‍্যবহারজনিত সংকট, দূষণজনিত জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিজনিত বহুবিধ সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিকল্প শক্তির উৎস সন্ধানে সদাতৎপর। এই কর্মযজ্ঞেরও প্রধান প্রতিবন্ধক তারাই যারা তেলের একচেটিয়া বাণিজ‍্য ধরে রাখার স্বার্থে মধ‍্যপ্রাচ‍্যসহ তেলের উৎসসমূহে তাদের আধিপত‍্য বজায় রেখেছে বছরের পর পর ধরে। এই তেল বাণিজ‍্যের মুনাফা দিয়েই যাদের আরাম-আয়েশ, সুখ-ভোগ চলে তারা বিকল্পের কথা ভাববেই বা কেন? বরং তাদের প্রয়োজন ব্যক্তি মুনাফা লুটার একচেটিয়াত্বের বিপরীতে মানব জাতির সব কল্যাণমূলক শুভ উদ্যোগের সামনে হাজারো প্রতিবন্ধকতা দাঁড় করিয়ে দেওয়া।

তবুও মানুষ থেমে নেই। চলছেই বিকল্পের সন্ধান। এর এক জ্বলজ‍্যান্ত উদাহরণ চীনের সাম্প্রতিক ‘কৃত্রিম সূর্য’ প্রকল্প। চীনের বিজ্ঞানীরা এটা সম্ভব করে দেখিয়েছে যে, মাত্র এক লিটার সামুদ্রিক পানি থেকে আহরিত ঘণীভূত বা কনসেন্ট্রেটেড বস্তুকণা দিয়ে ৩০০ লিটার পেট্রোলিয়ামের সমপরিমাণ শক্তি উৎপাদন সম্ভব! যা পরিবেশ বান্ধব, ফসিল ফুয়েল সংরক্ষণ করে পরিবেশের ভারসাম‍্য রক্ষায় সহায়ক, কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনে অনুকূল, সবুজ পৃথিবী বিনির্মাণ উপযোগী পদক্ষেপ এবং সাশ্রয়ী।

এতোসব ইতিবাচক দিক বিবেচনায় এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন আজ সকলের প্রত‍্যাশা হোক। এই বিশ্ব হয়ে উঠুক সবার জন‍্য নিরাপদ আবাস।

সূত্র: চায়না গ্লোবাল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক; রাশান বার্তা সংস্থা তাস; রাপটলি টেলিভিশন।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ।

ইমেইল: bipi1963@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published.