ভোট লুটের রাজনীতি রাজপথে প্রতিহত করতে হবে

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন

কার কথা বিশ্বাস করবে মানুষ, প্রধানমন্ত্রীর না আইনমন্ত্রীর? নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইন প্রণয়ন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী ২ জানুয়ারি সাংবাদিকদের বললেন- এত অল্প সময়ে আইন করা সম্ভব না। কিন্তু ২৩ জানুয়ারি সংসদে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইন উত্থাপনের পর প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘…অনেক দিন থেকে মোটামুটি প্রস্তুত করে রেখেছিলাম।’ ২৭ জানুয়ারি আইনটি সংসদে অনুমোদিত হয়। তার আগে নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে গত বছরের ২০ ডিসেম্বর থেকে ৩২টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সাথে রাষ্ট্রপতি সংলাপ শুরু করেন। রাষ্ট্রপতির অফিস কি নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইন সম্পর্কে অবহিত ছিল না। তাহলে সংলাপের নামে এ ধরণের একটি অপ্রয়োজনীয় কাজে রাষ্ট্রপতির মূল্যবান সময় কেন অপচয় করা হলো?

রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রদত্ত সংলাপের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে রাষ্ট্রপতিকে পাঠানো ১ জানুয়ারির চিঠিতে সিপিবি লিখেছিল- “অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করার জন্য সংবিধানসম্মতভাবে একটা নির্বাচন কমিশন মনোনীত করা জরুরি বিধায়, আপনার কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ, আপনি জাতীয় সংসদকে জরুরি বার্তা পাঠিয়ে আগামী একমাসের ভেতরে ‘নির্বাচন কমিশন আইন’ প্রণয়ন করে তা স্বাক্ষরের জন্য আপনার কাছে পাঠাতে বলুন। তাহলে নির্বাচন কমিশন মনোনয়নের আগে সে বিষয়ে পরামর্শ নেয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আপনার বৈঠকের প্রয়োজন পড়বে না।”

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলি-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’ সংবিধানের এমন সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও গত ৫০ বছর এ আইন প্রণীত হয়নি। এবার নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতি সংলাপ শুরু করলে বাম গণতান্ত্রিক জোটভুক্ত তিনটি নিবন্ধিত দল সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কাস পার্র্টি সংলাপে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং নির্বাচন কমিশন গঠন আইন প্রণয়নের জন্য রাষ্ট্রপতিকে আহ্বান জানায়। বাম গণতান্ত্রিক জোট সংবাদ সম্মেলনসহ সভা-সমাবেশের মাধ্যমে ‘ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে আলোচনা ও মতৈক্যের ভিত্তিতে’ আইন প্রণয়নের দাবি জানায়।

কিন্তু ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর দিনের ভোট রাতে করার মাধ্যমে গঠিত অবৈধ সরকার জনমতের চাপে গত ১৭ জানুয়ারি অতি সংগোপনে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইনের খসড়া মন্ত্রীপরিষদে অনুমোদন করে। এর আগে এ আইন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার কোনো প্রয়োজন বোধ করেনি। আবার সংসদে উত্থাপনের পরও প্রায় কোনো আলোচনা ছাড়াই পাশ করিয়ে নেয়া হয়। এই আইনে কমিশনে নিয়োগের লক্ষ্যে সঠিক ব্যক্তিদের বাছাইয়ের জন্য একটি ‘সার্চ বা অনুসন্ধান কমিটি’ গঠনের বিষয়টিকেই আইনী পোশাক পরানোর কাজটি করা হয়েছে। কিন্তু যে ছয় সদস্য বিশিষ্ট অনুসন্ধান কমিটি গঠনের বিধান করা হয়েছে তাদের ন্যূনতম পাঁচ ব্যক্তিকে সরকারি দল ও প্রধানমন্ত্রীর পছন্দ অনুযায়ি করা সম্ভব। ‘এই আইনে সরকারের অনুগত নির্বাচন কমিশনই গঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী যেভাবে চাইবেন সেভাবেই হবে’- এটিই হচ্ছে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মত দেশের আপামর জনগণের ভাবনা।

এ আইন কেন জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে? এ আইন প্রণয়নের আগে ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের সাথে কোনো আলোচনা করা হয়নি। সার্চ কমিটিতে জনপ্রতিনিধিদের রাখা হয়নি। সার্চ কমিটির ছয় সদস্যের অন্ততঃ পাঁচ জনকে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর পছন্দ অনুযায়ী নিয়োগ করা সম্ভব। সে কারণে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছানুযায়ী একটি নির্বাচন কমিশন মনোনয়নের জন্য পুরো ‘এক্সারসাইজটি’ করানো সম্ভব। ড. শাহদীন মালিক এ আইনকে ‘আগামী নির্বাচনে কাঙ্খিত ফলাফল নিশ্চিতকরণ আইন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সিপিবি এ আইনকে ‘কালো আইন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছে- এ আইন শুধু বর্তমান ক্ষমতাসীন ফ্যাসিবাদী সরকারকেই কেবল সুবিধা দিবে না ভবিষ্যতের স্বৈরাচারীরাও এ থেকে সুবিধা নিবে।

১৯৭১-এর ১ মার্চ পাকিস্তানিরা ’৭০-এর নির্বাচনের রায় কার্যকর হতে না দিয়ে আহূত সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেছিল, সেই ভোটের রায় কার্যকর করার প্রয়োজনেই বাংলাদেশকে স্বাধীন করার আবশ্যিকতা সৃষ্টি হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদান ও যৌন সহিংসতার শিকার ২ লক্ষ নারীর আত্মত্যাগের  বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করেও আমরা অবাধ ভোটাধিকার অর্জন করতে পারিনি। ’৭৫-এর পরে প্রায় দেড় দশক ধরে এই দেশে সামরিক শাসন জারি রেখে ‘ম্যানুপুলেটেড’ নির্বাচনের ধারা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে জনগণকে রক্তঝরা সংগ্রাম করতে হয়েছে। জনগণ আশা করেছিল যে, স্বৈরাচারী ব্যবস্থার উৎখাতের ভেতর দিয়ে মানুষের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু এখনো সে প্রত্যাশা অর্জিত হয়নি। বরং কীভাবে জনসম্মতি ছাড়াই জোর করে ক্ষমতা ধরে রাখা যায় গত ৩০ বছর ধরে তার প্রদর্শন চলছে। গত ৫০ বছর দেশ শাসন করেছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি। এরশাদ স্বৈরাচার পরবর্তী গত ৩০ বছর আওয়ামী ও বিএনপি জোট যখন যে দল ক্ষমতাসীন হয়েছে তখন সে দল মানুষের ভোটাধিকার ম্যানুপুলেট করে ক্ষমতাসীন থাকতে চেয়েছে। বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়িয়ে দিয়ে পছন্দের বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার অপচেষ্টা করে বিএনপি ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনের সামরিক শাসনকে ডেকে এনেছিল। আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি ও ২০১৮ সালে ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে সামরিক-বেসামরিক বাহিনী ও আমলাতন্ত্রকে ব্যবহার করে চূড়ান্তভাবে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। ভোট প্রহসনে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনের সকল রাস্তা আওয়ামী লীগ বন্ধ করে দিয়েছে। চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পরিণত হয়েছে নৌকা আওয়ামী লীগ বনাম বিদ্রোহী আওয়ামী লীগের নির্বাচনী লড়াইয়ে। ‘নির্বাচনী এক দলীয় ব্যবস্থা’ সৃষ্টি করেছে আওয়ামী লীগ। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার সকল ইউনিয়নের সকল চেয়ারম্যান, সকল মেম্বার, সকল সংরক্ষিত নারী মেম্বার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন বলে পত্রিকায় বেরিয়েছে।

‘নির্বাচনী ব্যবস্থাকে’ আইনী প্রক্রিয়াসহ বিভিন্নভাবে দখলে নিয়ে ক্ষমতাসীন থাকার পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ লুটেরা ধনিকগোষ্ঠীর স্বার্থে লুটপাটতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখা। লুটপাটতন্ত্রী রাজনৈতিক দলগুলো লুটেরা ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে লুটেরা ধনিকদের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘ভোট লুটের রাজনীতি’ প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিনিয়ত মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভোটাধিকার কেড়ে নিচ্ছে। সরকারি দলের ফরমায়েশ মাফিক গঠিত নির্বাচন কমিশন তাই সরকারের নির্দেশের বাইরে যেতে পারবে না। নতুন যে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে তার পরিণতি ‘রকিব কমিশন’, ‘হুদা কমিশনে’র মতই হবে। যে আইনের মাধ্যমে গঠিত নির্বাচন কমিশন মানুষের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে পারবে না সে আইন প্রত্যাখ্যান করে রাজপথে লড়াইয়ের মাধ্যমে তা প্রতিহত করতে হবে। জনআকাঙ্ক্ষার আইন প্রণয়নের জন্য মাঠে নেমে বামপন্থিদের লড়াই গড়ে তুলতে হবে।

লেখক: প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.