ভারতে কৃষকদের ‘দিল্লি চলো’ মার্চ, বিপাকে বিজেপি

ভারতে বিজেপি সরকারের কৃষি আইনের বিরুদ্ধে দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভে শামিল হতে কৃষকদের লং মার্চ করে জড়ো হতে থাকেন পঞ্জাব-হরিয়ানা সীমানায়। যদিও রাজধানীতে বিক্ষোভের অনুমতি মেলেনি। কৃষকদের হঠাতে জলকামানও ব্যবহার করেছে পুলিশ। তবে তাতেও দমানো যায়নি বিক্ষুব্ধ কৃষকদের।

‘দিল্লি চলো’ মার্চের অঙ্গ হিসেবে শুক্রবার পঞ্জাব-হরিয়ানা সীমান্তে একের পর এক ব্যারিকেড ভেঙে এগোতে দেখা গিয়েছে তাঁদের। শনিবারও সেই আন্দোলনের তীব্রতা বজায় ছিল।

ভারতীয় কিষান সংঘের মুখপাত্র ধর্মেন্দ্র মালিক জানান, ১৯৮৮ সালে মহেন্দ্র সিং তিকাইতের নেতৃত্বে ৫ লক্ষ কৃষকের সমাবেশ হয়েছিল দিল্লিতে। কেন্দ্রে তখন ছিল রাজীব গান্ধীর সরকার। এ বার মোদী সরকারকেও তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে হবে।

দেশজুড়ে কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে খাটো করার নানা ধরনের ফন্দি ফিকির শুরু হয়ে গিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের ভ্রান্ত কৃষিনীতির বিরুদ্ধে যখন প্রতিবাদে উত্তাল কৃষকরা তখন বিজেপি’র তরফে গোটা বিষয়টি রাজনৈতিক মদতপুষ্ট বলে গুরুত্বহীন করে দেওয়ার জোরদার প্রচেষ্টা শুরু হয়ে গিয়েছে। শুধু তাই নয়, কৃষকদের আন্দোলনের প্রতি প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। এমনকি কৃষকদের বিক্ষোভ আন্দোলন সরকার নির্দিষ্ট স্থানে সরে যাওয়ারও হুঙ্কার দিয়েছেন। ফলে শাহের হুমকির আগেই বিজেপি নেতাদের কৃষকদের ক্ষোভকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উড়িয়ে দেওয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছেন তীব্র বিরোধিতা করেছে আন্দোলনরত কৃষক সংগঠনের যৌথ মঞ্চে।

শনিবার এক বিবৃতিতে ওই ঘৃণ্য প্রবণতার সমালোচনা করে বলা হয়েছে, দলমতের উর্ধ্বে উঠে এবং যে কোনও ধরনের পৃষ্টপোষকতা ছাড়াই বিপুল সংখ্যক কৃষক দিল্লিমুখী হয়েছেন। ‘কৃষি বিল প্রত্যাহার করতে হবে’, এই দাবি আদায় করে নেওয়ার জেদে প্রবল ঠান্ডা উপেক্ষা করে হাজির হয়েছেন হাজার হাজার কৃষক হাজির হয়েছেন দিল্লি এবং আশপাশে। কোনও বাধা, নিপীড়ন, বর্বরতার কাছ হার মানেননি তাঁরা। কৃষকরা স্পষ্টই বলছেন, সরকার আন্দোলন সম্পর্কে গুজব ছড়ানো বন্ধ করে, এড়িয়ে না গিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁদের দাবিদাওয়ার কথা বিবেচনা করুক।

শনিবার রাতে অমিত শাহের হুমকি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কৃষকরা দাবি আদায়ের আন্দোলন চালালেও তাঁর যুক্তি হলো, সরকার তো ৩ ডিসেম্বর কথা বলবেই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে। আর তার আগে কৃষকরা কথা বলতে চাইলে সরকার নির্দিষ্ট স্থানে তাঁদের সরে যেতে হবে। অর্থাৎ দিল্লি থেকে হটে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন শাহ। বলেছেন, কৃষকরা ওখানে সরে গেলে পরেরদিনই কথা বলবে সরকার, তার আগে নয়। এই হুমকি অবশ্য শুনতে নারাজ লড়াইয়ে প্রত্যয়ী কৃষকরা।

বস্তুত, সরকারের তরফে কৃষকদের আন্দোলন নিয়ে দু’ধরনের প্রচার চালানো হচ্ছে। হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহর খাট্টারের মতো কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, কেন্দ্রের কৃষি বিলের বিরুদ্ধে গোটা আন্দোলনই রাজনৈতিক মদতপুষ্ট। এই আন্দোলনে হরিয়ানার কৃষকরা নেই, আছে পাঞ্জাবের কৃষকরা। আর সেই কৃষকদের মদত জোগাচ্ছেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিং। তবে অমরিন্দর স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছেন তিনি তখনই খাট্টারের সঙ্গে কথা বলবেন যখন কৃষকদের সম্পর্কে মনোভাব বদলাবেন হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী। এরই সঙ্গে আরেকটি প্রচার চালানো হয়েছে যে, এই আন্দোলনে একমাত্র পাঞ্জাবের কৃষক এবং ফড়েরাই আছে তাঁদের কায়েমী স্বার্থ পূরণের তাগিদে। পুরোটাই পাঞ্জাবকেন্দ্রিক।

কেন্দ্রীয় সরকারও ৩ ডিসেম্বর কৃষি বিল নিয়ে আলোচনায় ডেকেছে পাঞ্জাবের কৃষক সংগঠনগুলিকেই।

শনিবার সারা ভারত কিষান সংঘর্ষ সমন্বয় কমিটির বিবৃতিতে একথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সরকার এমন ভান করছে যেন এই কৃষি বিল নিয়ে একমাত্র পাঞ্জাবের কৃষকদেরই কিছু অসন্তোষ আছে। দেশের অন্য প্রান্তের কৃষকরা এই বিল সম্পর্কে যারপরনাই খুশি। কিন্তু এখন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষকরা তাঁদের ক্ষোভের কথা জানাতে দিল্লিমুখো হয়েছেন। শুধু পাঞ্জাব নয়, হরিয়ানা, উত্তরাখণ্ড, উত্তর প্রদেশ এবং মধ্য প্রদেশের কৃষকরাও আছেন সেই বিক্ষোভ আন্দোলনে।

সংবাদমাধ্যমগুলি কৃষকদের ক্ষোভ, আন্দোলনের কথা প্রচারে উপেক্ষা করলেও লড়াই চলছে সারা দেশেই। ওডিশা, তামিলনাডু, পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্র প্রদেশ, ঝাড়খণ্ড— সর্বত্রই চলছে কৃষক আন্দোলন। উত্তর প্রদেশ সরকার বর্বর আচরণ করেছে কৃষকদের সঙ্গে। উত্তরাখণ্ডের প্রতিবাদীরাও রয়েছেন উত্তরা প্রদেশে।

কৃষক নেতারা অভিযোগ করেছেন, কৃষকদের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। সরকারের ফাঁকা বুলি আর বিবৃতি বিশ্বাস করছেন না কৃষকরা। সরকার দাবি করছে, কৃষকদের স্বার্থেই এই বিল। এর সপক্ষে কোনও গঠনমূলক ব্যাখ্যা দিতে পারছে না। সেজন্যই কৃষকরা কেন্দ্রের নয়া বিল প্রত্যাহার করার দাবিতে অনড়।

এই একই কারণে এআইকেএসসিসি, আরকেএমএস, বিকেইউ (রাজেওয়াল), বিকেইউ (চাদুনি) সহ অন্যান্য কৃষক সংগঠনের যৌথ আন্দোলন অবিলম্বে নয়া কৃষি বিল প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে কেন্দ্রের কাছে। এড়িয়ে না গিয়ে কৃষকদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করুক আন্তরিকতার সঙ্গে। কৃষকরা মোটেই দিল্লি বেড়াতে বা ঘুরতে আসেননি। দৃঢ়তার সঙ্গে লড়াই করে দাবি আদায়ের পর তাঁরা ফিরে যাবেন নিজেদের রাজ্যে। ফলে সরকার কোনওভাবেই যেন মূল বিষয়টি এড়িয়ে না যায়।