ভারতের সঙ্গে অসম চুক্তি জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি

দেশের রাজনীতি হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পরিবর্তন, ক্যাসিনোবিরোধী-দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, যুবলীগের কিছু মাফিয়া গডফাদারের গ্রেফতার, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর, ভারতের সাথে অসম চুক্তি, বুয়েটে বর্বরভাবে আবরার ফাহাদের হত্যা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত ও মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। ফ্যাসিস্ট কায়দায় ভিন্নমত দমন মানুষকে আরও বেশি বিক্ষুব্ধ করেছে। এটা চলছে বছরের পর বছর।

ব্যাংকে তারল্য সংকট, নগদ টাকার অভাব কিন্তু কোটি কোটি টাকা ঘরের সিন্দুক থেকে উদ্ধার হচ্ছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নৈরাজ্য, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ওয়ান-ইলেভেনের প্রয়োজন নেই-ওয়ান ইলেভেনের কাজ আমি করে দিচ্ছি।

মাদক-সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। সেনাবাহিনী প্রধান বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর অভিযানকে সেনাবাহিনী সমর্থন করে। জাতীয় সরকার-মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথাও জাতীয় ঐক্যফন্ট ও কোনো কোনো মহল তুলেছেন। এগুলি শাসকশ্রেণির সংকটের প্রতিফলন। rearrangement-এর তৎপরতা। এই তৎপরতার মধ্যে জনগণের কোনো স্বার্থ নেই। এটা আমরা বার বার দেখেছি। প্রয়োজন রাজনীতিকে দুর্বৃত্তমুক্ত, বাণিজ্যমুক্ত করার Movement base জনগণের বিকল্প শক্তি গড়ে তোলা।

এ অবস্থায় আমরা দেখছি মানুষের মধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। কি হচ্ছে, কি হবে, প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে কিনা? না মাঝপথে থেমে যাবে? ভারতের সাথে অসম চুক্তি। চুক্তি নিয়ে আবরারের প্রতিক্রিয়া-তার হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও নাজুক ও টালমাটাল করে তুলেছে, রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে ভাতের সাথে সাতটি এমওইউ ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই অসম চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। তিস্তার পানি চুক্তি করতে পারলেন না কিন্তু ফেনী নদী থেকে পানি দেয়ার চুক্তি করলেন। ফেনী নদীর মুহুরী প্রজেক্ট রক্ষিত হবে কিনা, নতুন গড়ে উঠা মিরসরাইয়ের ইপিজেড পানি পাবে কিনা এই হিসাব সরকারের আছে কিনা তা জনগণ জানে না। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে ভারতের অবস্থান পরিবর্তন হয়নি।

এই সমস্যা সমাধানে তারা কোনো আশ্বাসও দেয়নি। আসামের নাগরিক পঞ্জি নিয়ে ভারত বলেছে এটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়, এটা নিয়ে বাংলাদেশের দুঃশ্চিন্তার কারণ নেই। শিশুকে ঘুম পাড়ানোর ন্যায় এই মধুর কথা শুনিয়েছে ভারত। কিন্ত যেকোনো সময় রাজনীতি ও ভূরাজনীতিতে তারা এই কার্ড খেলবে না তার কোনো নিশ্চয়তা আছে কি?

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গত ৫ অক্টোবর যে সাতটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে তার অন্যতম হলো যৌথভাবে একটি ‘কোস্টাল সার্ভেল্যান্স’ বা উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা। জানা গেছে এমওইউ অনুযায়ী বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ভারত ২০টি আধুনিক রাডার সিস্টেম বসাতে সাহায্য করবে। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে ‘মেরিটাইম সিকিউরিটি’ বা সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ কার্যকর হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন চীনকে নজরে রাখতে বাংলাদেশ উপকূলে রাডার বসাবার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ভারত ও চীনের ভূ-রাজনীতির মধ্যে পড়ে গেল কিনা এই প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশের সচেতন মহলে। এই চুক্তির কারণে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীনের উদ্যোগ শিথিল হবে কিনা এই প্রশ্নও আছে। এই চুক্তি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক জটিল আবর্ত সৃষ্টি করবে।

ফারাক্কার পানিতে উত্তরবঙ্গে আবার বন্যা হয়েছে। শুকনা মৌসুমে পানিশূন্যতা, বর্ষায় বন্যা– দুইভাবে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বছরের পর বছর। ফারাক্কার কারণে এইবার ভারতের বিহার রাজ্য বন্যায় ডুবেছে, ৫০-এরও অধিক মানুষ মারা গেছেন। বিজেপি’র মন্ত্রী বলেছে, ফারাক্কার কোনো প্রয়োজন নেই, ফারাক্কা ভেঙে দাও। যতই চুক্তি হোক এবাঁধ বাংলাদেশের জন্য মরণ ফাঁদ। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরের সময় ফারাক্কার কারণে বন্যা নিয়ে একটি কথাও বললেন না। আমরা জানি আন্তর্জাতিক নদী আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী চলবে, প্রত্যেক দেশের এই নিয়ম মানা উচিত।

বাংলাদেশ এলএনজি রপ্তানি করবে ভারতের সেভেন সিস্টারে, সরকার বলছে আমদানি করে রপ্তানি করবে। কিন্তু ২০১৯ সালের পিএসসি চুক্তিতে সমুদ্রের তরল গ্যাস রপ্তানির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মানুষের মনে সন্দেহ এই গ্যাসওতো যেতে পারে।

আমাদের দেশের শাসকশ্রেণির দলগুলির ভারত নির্ভরতা, নতজানু নীতি অন্যদিকে অন্ধ ভারত বিরোধিতার দেউলিয়া রাজনীতির সুযোগ নিচ্ছে ভারত। ভারত নিয়ে আমাদের দেশের ও জাতির ঐক্যবদ্ধ কোনো নীতিমালা নেই। শাসকশ্রেণির পরস্পরবিরোধী সাংঘর্ষিক ক্ষমতাকেন্দ্রিক দেউলিয়া রাজনীতি ভারতসহ বিদেশি শক্তির খেলার সুযোগ তৈরি করে রেখেছে। এই সাংঘর্ষিক দেউলিয়া রাজনীতি একটি স্বাধীন জাতির আত্মমর্যাদা রক্ষা করার ক্ষেত্রে অন্তরায়। যাক যে কথা বলছিলাম, ভারতে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় অসম ৭টি চুক্তি মানুষ মেনে নিতে পারেনি। মানুষ বলছে সরকার দেশের আত্মমর্যাদা রক্ষা করে কেন জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না? সরকারের জনবিচ্ছিন্নতার এবং তাদের উপর নির্ভরতার সুযোগ তারা নিচ্ছে কিনা?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে বলতে পেরেছিলেন “আমাদের মুক্তি সংগ্রামে আপনাদের সহযোগিতা-সহায়তার ঋণ আমরা কোনো দিন শোধ করতে পারব না। কিন্তু মিসেস ইন্দিরা গান্ধী আপনার সেনাবাহিনী আমার দেশ থেকে কখন নেবেন। বঙ্গবন্ধুর এই সাহসী বক্তব্যের পর ভারত কিছুদিনের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে তার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নিয়ে যায়।” বঙ্গবন্ধু এই কথা বলতে পেরেছিলেন কারণ বঙ্গবন্ধু পায়ের তলায় মাটি ছিল। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারে জনসমর্থনপুষ্ট দেশপ্রেমিক সরকার, দল ও নেতৃত্ব।

আমাদের দেশের রাজনীতি, অর্থনীতির উদ্যোগ ও নিয়ন্ত্রণ আজ তিনটি জায়গায় আবদ্ধ হয়ে গেছে বলে মনে হয়, প্রতিবেশী দেশ, রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র ও লুটেরা ধনিক শ্রেণির হাতে। রাজনীতি জনগণ ও প্রকৃত রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। জাতীয় স্বার্থবিরোধী ও গণবিরোধী দেশি-বিদেশি সিন্ডিকেট কব্জা করেছে। তারই এখন আমাদের অর্থনীতি-রাজনীতি নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। এখানে সরকারকে অসহায় মনে হয়। বিশেষ করে ভারতের সাথে সাম্প্রতিক অসম চুক্তিতে তা ফুটে উঠেছে।

শ্রেণি ও গণআন্দোলন নির্ভর দেশপ্রেমিক জনগণের বিকল্প শক্তির উত্থান ছাড়া জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, জাতি ও জনগণকে মুক্ত করার অন্য কোনো সহজ বা বিকল্প পথ খোলা আছে বলে মনে হয় না। তার জন্য প্রয়োজন বহুমাত্রিক আন্দোলন ও আত্মত্যাগ।

লেখক: কমরেড মো: শাহ আলম, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)

Leave a Reply

Your email address will not be published.