ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল, জম্মু- কাশ্মীর দু’টুকরো

ভারতের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের মধ্য দিয়ে এতদিন বিশেষ মর্যাদায় থাকার জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের সাথে ভারতের বাকি অংশের জটিল সম্পর্কের ধরণটি সম্পূর্ণভাবে বদলে দেয়া হয়েছে।

গত সাত দশক ধরে এই ৩৭০ অনুচ্ছেদের সুবাদে এই রাজ্যটি ভারতের অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে বেশি স্বায়ত্বশাসন ভোগ করতো।

অনুচ্ছেদ ৩৭০ ভারতীয় রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরকে নিজেদের সংবিধান ও একটি আলাদা পতাকার স্বাধীনতা দেয়। এছাড়া পররাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয়াদি, প্রতিরক্ষা এবং যোগাযোগ বাদে অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতার নিশ্চয়তাও দেয়।

সোমবার সংসদে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিরোধীদের তুমুল বাধা ও বাগ-বিতণ্ডার মধ্যে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।

কেন্দ্রের এই ঘোষণার তীব্র বিরোধিতা করে সিপিআই (এম), সিপিআই, কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, ডিএমকে, আরজেডি, পিডিপি, ন্যাশনাল কনফারেন্স, এমডিএমকে। বিরোধীরা ওয়েলে নেমে এসে তুমুল বিক্ষোভ দেখান। 

আলোচনার সময়ে কংগ্রেসের পক্ষে গুলাম নবি আজাদ বলেন, আইন দিয়ে মিলন হয় না, হৃদয়ের মিলন হতে হয়। জম্মু-কাশ্মীরের মানুষের বাকি দেশের সঙ্গে মিলনের সব রাস্তা শেষ করে দিল বিজেপি সরকার। পি চিদাম্বরম বলেন, ইতিহাস প্রমাণ করবে আপনারা ভুল করলেন এবং ভবিষ্যত প্রজন্ম বুঝবে আজকের এই কক্ষ কী গভীর ভুল করল। আইনজীবী কপিল সিবাল মূলত পদ্ধতিগত বিষয় তুলে ধরে বলেন, গণতন্ত্র শুধু সংখ্যার জোরে চলবে? কোনও নোটিস, কোনও আগাম তথ্য না দিয়ে বিল পেশ করা হলো সংসদে। সদস্যদের বলা হলো এর উপরে আলোচনা করতে। কিভাবে তাঁরা আলোচনা করবে? আসল বিষয় হলো কোনও আলোচনা বা প্রস্তাব সরকার চায়ই না। এমডিএমকে নেতা ভাইকো সরকারের কড়া সমালোচনা করে বলেন, কাশ্মীরকে কসভো, পূর্ব তিমোর বা দক্ষিণ সুদান বানাবেন না। ভারতের শত্রুরাও এর সুযোগ নেবে বলে তিনি সতর্ক করেন। সিপিআই (এম)’র টিকে রঙ্গরাজন বলেন, বিজেপি সংবিধানকে ধর্ষণ করল। জম্মু-কাশ্মীরের মানুষের সঙ্গে সরকার কোনও আলোচনা করল না। কেন্দ্র সরকার আরো একটা প্যালেস্তাইন বানাতে চলেছে। এই কাজ কেন্দ্র আগামীদিনে অন্য যে কোনও রাজ্যের সঙ্গে করবে। ডিএমকে’র তিরুচি শিবা বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ৩৭০ধারা স্থায়ী অংশ সংবিধানের। সেটাকে এভাবে বাতিল করা যায় না। সিপিআই সাংসদ বিনয় বিশ্বম কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, সংবিধান পরিবর্তন করার জন্য ষড়যন্ত্র করেছে সরকার।

অনুচ্ছেদ ৩৭০ অনুযায়ী এতদিন জম্মু ও কাশ্মীরের নিজস্ব সংবিধান ও একটি আলাদা পতাকার স্বাধীনতা দেয়া ছিল। ভারতের সংসদের উভয় কক্ষ ভবিষ্যতে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। পররাষ্ট্র, অর্থ ও প্রতিরক্ষা বিষয়টি এতদিন কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ছিল। এখনও তাই থাকবে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব এতদিন ছিল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর হাতে। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় রাজ্যটিতে কেন্দ্রের সরাসরি শাসনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে রাজ্যটি পরিচালনা করবেন একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর।

জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্য বিধানসভা গত কয়েক দশক ধরে কেন্দ্রের যেসব আইনের অনুমোদন করেছেন, সেগুলো এখন সরাসরি কার্যকর হবে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তগুলো এখন এই রাজ্যের জন্য সরাসরিভাবে প্রযোজ্য হবে।

স্বাধীনতার পর ১৯৪৭–‌এর অক্টোবরে জম্মু–‌কাশ্মীরের ভারতভুক্তির সময় রাজা হরি সিংয়ের সঙ্গে যেমন চুক্তি হয়, তার জেরেই রাজ্যটির জন্য বিশেষ মর্যাদার সংস্থান রাখতে হয় সংবিধানে। ৩৭০ ধারায় দেওয়া হয় সেই মর্যাদা। এতে প্রতিরক্ষা, বিদেশ, যোগাযোগ ছাড়া অন্য বিষয়গুলিতে রাজ্যটিকে স্বাতন্ত্র‌্য দেওয়া হয়। দেওয়া হয় নিজস্ব সংবিধান প্রণয়নের অধিকার। সেইমতো বিশেষ আইনসভা গড়ে সংবিধান প্রস্তুতও করে জম্মু–‌কাশ্মীর। এর মধ্যে এবং পরে জম্মু–‌কাশ্মীর নিয়ে বেশ কয়েকবার রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করা হয়েছে। ১৯৫৪–‌র আদেশনামায় রাজ্যটির সঙ্গে ভারত সরকারের সম্পর্ক নির্দেশিত হয়। আজকের আদেশে তা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। ১৯৫৪–‌র ওই আদেশেই রাজ্যের ‘স্থায়ী বাসিন্দা’ নির্ধারণের অধিকার দেওয়া হয়েছিল জম্মু–‌কাশ্মীর বিধানসভাকে। এবং সেই আদেশবলে জম্মু–‌কাশ্মীরে সম্পত্তির মালিকানা, সরকারি চাকরি বা আর্থিক সুবিধা, স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার ইত্যাদি স্বীকৃত হয়েছে সংবিধানের ৩৫এ ধারায়। রাজ্যের মহিলারা ভিনরাজ্যের কাউকে বিয়ে করলে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন, এমনই বলা হয়েছে এই ধারায়। এই নিয়ে মামলা গড়িয়েছে আদালতে। বিশেষ মর্যাদা ঘুচে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারারও বিলোপ ঘটল। রাজ্যের আলাদা সংবিধান, পতাকা, বিধানসভার ৫ বছরের বদলে ৬ বছরের মেয়াদ ইত্যাদিও উঠে যাচ্ছে। বস্তুত রাজ্যটিই তো আর থাকছে না। লাদাখহীন জম্মু–‌কাশ্মীরকে রাজ্য না করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার পক্ষে সন্ত্রাস পরিস্থিতির যুক্তি দেখানো হয়েছে। লাদাখ বড় এলাকা, কিন্তু জনসংখ্যা কম। তাই বিধানসভা থাকছে না। দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রধান হবেন উপরাজ্যপাল (‌লেফটেন্যান্ট গভর্নর)‌।

অবরুদ্ধ কাশ্মীর

কাশ্মীর উপত্যকা এই মুহূর্তে এক জেলখানা। গ্রেপ্তার হচ্ছেন একের পর এক নেতা। এঁদের মধ্যে আছেন দুই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা এবং মেহবুবা মুফতিও। উল্টো দিকে দেশ জুড়ে গেরুয়া শিবিরে উল্লাস। বিজেপি–‌র ৩৭০ ধারা বাতিলের অনেককালের কর্মসূচি সফল।
গত ক’‌দিন ধরেই ফৌজি বুটের শব্দে উৎকণ্ঠার প্রহর গুনছিল কাশ্মীর। বাড়তি ৩৮ হাজার সেনা পাঠানো হয়েছিল গত কয়েক দিনে। ফেরত পাঠানো হয় অমরনাথ ‌তীর্থযাত্রীদের এবং পর্যটকদের। জঙ্গি হানার আশঙ্কা এবং নিয়ন্ত্রণরেখায় সঙ্ঘাতের যুক্তি দেখানো হচ্ছিল সরকারিভাবে। কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল, এর আড়ালে অন্য কিছু আছে। বড় রকমের কোনও সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে কেন্দ্র। অশান্তির আশঙ্কায় এই আগাম তৎপরতা। চলছিল নানা জল্পনা–কল্পনা। ৩৫এ ধারা বাতিল হতে পারে, এই আশঙ্কা নিয়ে পরশু ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লার দলের নেতাদের নিয়ে গিয়েছিলেন রাজ্যপাল সত্যাপাল মালিকের কাছে। সত্যপাল বলেন, ৩৫এ বাতিলের মতো কোনও খবর তাঁর কাছে নেই। গতকাল পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতির বাড়িতে বসে সর্বদল বৈঠক। মাঝরাতে গৃহবন্দি হন নেতারা। বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট পরিষেবা, এমনকী টিভি সম্প্রচারও। তার আগে কাল জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কর্তা এবং গোয়েন্দাপ্রধানদের নিয়ে বৈঠক করেন অমিত শাহ। রাত পোহাতে দিল্লিতে নজরে আসে আরও তৎপরতা। সাতসকালে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে ছোটেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এসে পৌঁছন অন্য ক্যাবিনেট মন্ত্রীরা। সেখানেই বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফেলে মন্ত্রিসভা। অতঃপর আদেশনামায় সই রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের।