ভাত ও ভোটের অধিকার আদায়ে গণসংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে

রুহিন হোসেন প্রিন্স

দেশের রাজনীতির আবহাওয়াটা দিন দিন গুমোট হচ্ছে। তার থেকে বেশি গুমোট হয়ে কালো ছায়া ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনে। বিত্তহীন, নিম্নবিত্ত, পরিবার তাদের জীবনের স্বাচ্ছন্দ্যের স্বাদ পাননি। এখন ঐ স্বাচ্ছন্দ্যের চিন্তা পরিত্যাগ করে ‘কম খেয়ে বেঁচে থাকার’ চেষ্টাতে আরও কম খাওয়ার পথ বেছে নিতে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত পরিবার তার জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য বিদায় করে বাজার কাটছাঁট করেও রেহাই পাচ্ছে না। খাদ্যপণ্যেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। বাজার কমিয়ে দিয়ে, সঞ্চয় ভেঙে জীবন যাপন করছেন।

এর মধ্যে চিকিৎসা, ঔষুধ, শিক্ষার খরচে হিমশিম খেয়েও বেঁচে থাকা আর সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তায় ধার-দেনা করে এসব খরচ মেটাতে চেষ্টা করছে দেশের অধিকাংশ মানুষ। সরকারের ‘উন্নয়নের গল্প’ সাধারণ মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনেনি। সরকারের অনেক ‘বড় বড় প্রকল্প’, প্রধানত দেশি-বিদেশি লুটেরা শ্রেণির অভাবিত লুটপাটের উৎসে পরিণত হয়েছে।

সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি, মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে লাগামহীন। শুধু আমদানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নয়, দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত পণ্যে দামও বেড়ে চলেছে। যদিও দেশের প্রকৃত কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না।

সারা বিশ্বে সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, নানা সংকটের মাত্রা বৃদ্ধি করে চলেছে। এরমধ্যে পরিকল্পনা করে দেশের মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার পরিবর্তে সরকারের উল্টো যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। দেশ থেকে পাচারকৃত টাকা ফেরত আনা যায়নি। পাচার অব্যাহত আছে। ঋণ খেলাপীর সংখ্যা ও টাকার অংক বেড়েই চলেছে। বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের ভুলনীতি ও দুর্নীতির খেসারত জনগণকেই দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না পেলেও ক্যাপাসিটি পেমেন্টের নামে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য টাকা দিতে হচ্ছে। আমলা তোষণে সরকারের বরাদ্দ কমছে না। অপচয়, অব্যবস্থাপনা দূর করা যায়নি।

দেশে আসন্ন সংকটের কথা বলে প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষকে কৃচ্ছতাসাধন ও সঞ্চয়ের কথা বললেন। এর মধ্যেই খবর এলো, সরকার মন্ত্রিপরিষদের সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের জন্য সরকারি বাসভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভবন দুটির অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় ব্যয় হবে সোয়া ২ কোটি টাকা। আসবাবপত্র কেনা হবে দেড় কোটি টাকার। প্রতিটি ভবনে ৭টি করে এলইডি টেলিভিশন থাকবে। প্রতিটি ভবনে দুই সেট সুইমিং পুল তৈরি করতে খরচ হবে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমলাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর থেমে নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা চলমান সংকটে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধির আশংকা করলেও সরকারের কর্মকাণ্ডে এর থেকে উত্তরণের ছাপ মিলছে না।

চলমান পরিস্থিতির এসব তো সামান্য খবর। আমরা যে বৈদেশিক রিজার্ভ, রেমিটেন্স, রপ্তানি আয়ের উপর দাঁড়িয়ে উন্নয়নের কথা উচ্চকণ্ঠে প্রচার করতাম, এসব ক্ষেত্রেও ভাটা দেখা দিয়েছে। আর আগামী বছর থেকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের কিস্তিতো বাড়বে বলে তথ্য বলছে।

এসব সংকটে ক্ষমতাসীনরা সাধারণ মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ না করলেও ক্ষমতার আসন স্থায়ী করতে নানা ফন্দি অব্যাহত রেখেছে। ‘উন্নয়ন’ প্রচারে অঢেল টাকা দেওয়া হচ্ছে। সারাদেশে ভয়ের রাজত্ব, ত্রাস সৃষ্টি অব্যাহত আছে। প্রচার মাধ্যমে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনার খবর সামনে আনলেও সেখানে নিয়ন্ত্রণ, ‘অটো সেন্সরশিপ আরোপ’ অব্যাহত রয়েছে। লোভ ও ভয়ের রাজত্ব দিয়ে নানা মহলকে পক্ষে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়া, এর জন্য যানবাহন বন্ধ করে দেওয়ার মত ‘নিকৃষ্ট’ পন্থা নেওয়া হচ্ছে।

আগামী ভোটকে সামনে রেখে কারসাজির নতুন নতুন মাত্রা তৈরির প্রচেষ্টা করে চলেছে সরকার। সাধারণ মানুষের সামনে ‘সাফল্য’ ও ‘গণতন্ত্রের’ গল্প প্রচার করে এসব গিলাতে নানা মাধ্যম ব্যবহার করা হচ্ছে।

সম্প্রতি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অবসর দেওয়াসহ নানা ঘটনা, নতুন করে ভীতি সঞ্চার অস্থিরতাকে আরো বাড়িয়ে তুলছে।

সম্প্রতি গাইবান্ধা উপ-নির্বাচন ও জেলা পরিষদ নির্বাচন- এই সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে কী হতে পারে তার প্রতিচ্ছবি দেখা গেল।

এসব নির্বাচন ছিল মূলতঃ একতরফা। আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ বা তাদের জোট সঙ্গী। এসব নির্বাচনে আচরণবিধি লংঘন, ভয়-ভীতি প্রদর্শনী, টাকা দিয়ে ভোট কেনা, ভোট না দিলে ফাঁসিয়ে দেওয়া, ভোটকেন্দ্র দখল, আর অনেক স্থানে নির্বাচনে নিয়োজিত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা বলে দেয় ৩০০ আসনে একসাথে হওয়া নির্বাচন কেমন হবে। ইভাএম বাতিলের দাবিকে উপেক্ষা করে ১৫০ আসনে ইভিএম এর জন্য ৯০০০ কোটি টাকার বাজেট অব্যাহত রাখা হয়েছে। এর প্রচারে নাকি ২০০ কোটি টাকা খরচের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

এই সংকটে ক্ষমতাশ্রয়ী শাসকশ্রেণির অপর অংশ যেনতেন প্রকারে শুধুমাত্র ক্ষমতায় যেতে উঠে পড়ে লেগেছে। অন্ধকারের সাম্প্রদায়িক অপশক্তি, অরাজনৈতিক অপশক্তিসহ নানা মহল এসময় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিদেশের নানা শক্তির তৎপরতা বেড়ে চলেছে। এই সুযোগে এ অঞ্চলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় উঠেপড়ে লেগেছে এসব শক্তি। ক্ষমতাসীনরা ব্যস্ত এদের আনুকূল্য পেয়ে ক্ষমতায় থাকতে। আর শাসক শ্রেণির অপর অংশ জনগণের সরকার বিরোধী অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ও এসব বিদেশি শক্তির উপর ভর করে ক্ষমতায় যেতে তৎপরতা বাড়িয়েছে।

এরকম এক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) তার দ্বাদশ কংগ্রেসের গৃহীত সিদ্ধান্তকে সামনে নিয়ে ‘চলমান দুঃশাসন হটানো, ব্যবস্থা বদল ও বিকল্প গড়ে তোলা’র সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। বাম গণতান্ত্রিক জোটের সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলন ও ঘোষিত কর্মসূচিতে এই ধারাকে এগিয়ে নিতে দৃঢ় অবস্থায় নেওয়া হয়েছে। এটা আজ সচেতন মহলের কাছে পরিস্কার যে, চলমান সংকট থেকে উত্তরণের শর্টকাট কোনো পথ নেই। এর জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ঠিক করে। জনগণকে সচেতন ও সংগঠিত করে গণআন্দোলন, গণসংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। এর মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে নীতিনিষ্ঠ বিকল্প শক্তি সমাবেশ। এই ধারাকে এগিয়ে নিয়েই ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সম্প্রতি ব্রিটেনের স্বল্প মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস এর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংকট আরো সামনে চলে এসেছে। সংকট সমাধানে যে মুক্তবাজারের দর্শন পথ দেখাতে পারছে না তা স্পষ্ট দেখা গেল। বিশ্বের পুঁজিবাদী দেশে এসব সংকটের আরো তীব্রতা আমরা দেখছি।

আমাদের দেশ ও দেশের মানুষের সংকটের সমাধান করতে গেলে এই পথ থেকে সরে আসতে হবে। যে পথকে বোধগম্য ভাষায় বলা হচ্ছে চলতি ‘ব্যবস্থার বদল’। এই ধারাকে অগ্রসর করতে সম্প্রতি বাম গণতান্ত্রিক জোটের সংবাদ সম্মেলন ও প্রচারপত্রে বলা হয়েছে, …‘বাংলাদেশকে রক্ষায় এই ফ্যাসিবাদী সরকারের উচ্ছেদ ও শোষণমূলক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তন করে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। এই লক্ষ্যে সকল বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার সংগ্রাম বেগবান করার আজ বিশেষভাবে জরুরি হয়ে পড়েছে।” সংবাদ সম্মেলনে, এই লক্ষ্য অর্জনে দেশের সকল বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ও সকল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন শক্তি ও ব্যক্তিবর্গ এবং দেশবাসীকে ভোট ও ভাতের অধিকার আদায়ে নিজস্ব দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণসংগ্রাম ও গণআন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।

এসব দাবির মধ্যে সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তদারকি সরকারের অধীনে টাকা, পেশিশক্তি, সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত ও প্রশাসনের কারসাজি মুক্ত পরিবেশে নির্বাচন, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, ‘না’ ভোট, প্রতিনিধি প্রত্যাহারসহ নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারসহ শ্রেণিপেশার মানুষের দাবি রয়েছে। জাতীয় সম্পদের উপর জনগণের মালিকানায়, দুর্নীতি-লুটপাটকারীদের শাস্তি, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধসহ বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পাদিত চুক্তি প্রকাশ ও দেশবিরোধী সকল অসম চুক্তি বাতিলেরও দাবি জানানো হয়েছে।

এসব দাবিকে জনপ্রিয় করে তুলে মানুষকে আন্দোলনে সমবেত করতে ২২ অক্টোবর ঢাকাসহ দেশব্যাপী গণপদযাত্রা করা হচ্ছে। আগামীতে জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায়ে এই ধারা বেগবান করতে হবে। এজন্য স্থানীয় মানুষের দাবিকেও যুক্ত করতে হবে।

এই লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন এলাকায় নিজের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে গণসংগ্রাম কমিটি গড়ে তোলার ধারায় অগ্রসর হতে হবে।

মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করে বিকল্প শক্তি সমাবেশ গড়ে তুলতে না পারলে আবার ঐ দ্বি-দলীয় ধারায় বন্দি হয়ে থাকতে হবে। শাসকশ্রেণি আমাদের ঐ দ্বি-দলীয় ধারায় বন্দি রাখতে প্রচলিত ব্যবস্থায় সংকট সমাধানের বটিকা গিলাতে চায়। কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের তাই আজ নবতর ধারা তৈরির চ্যালেঞ্জ নিয়ে মানুষের মাঝে যাওয়ার কাজটিকেই গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। সিপিবি, বামজোট, অন্যান্য বাম গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল দল, সংগঠন, ব্যক্তিবর্গকে সাথে নিয়ে ভাত ও ভোটের অধিকার আদায়ে গণসংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। এটিই এখন সময়ের দাবি।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published.