ভাত ও ভোটের অধিকারের জন্য তৃণমূলে ঝাঁপিয়ে পড়ুন

পর্যবেক্ষক

‘দাম কমাও, জান বাঁচাও’- ভাতের অধিকার ও ভোটের অধিকারের জন্য তৃণমূলে ঝাঁপিয়ে পড়ার দাবিতে বাম গণতান্ত্রিক জোট সম্প্রতি হরতাল কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলো। জনগণও এবার এ দাবিকে নৈতিকভাবে সমর্থন করে বলেছেন, বামের শক্তি যত কমই হোক না কেন তাঁরা জনগণের বেদনা ও বিক্ষোভ বুঝেন। কিন্তু এই ন্যায্য আন্দোলনকে ধারাবাহিকভাবে সামনের দিকে কিভাবে আরো জনসম্পৃক্ত করে এগিয়ে নিতে হবে- এটিই এখন প্রগতিশীলদের সামনে জ্বলন্ত প্রশ্ন। জনগণের সামনে প্রশ্ন- ‘আমরা অতীতে অনেক আন্দেলন তো করেছি- কিন্তু বারবার ডিম পেড়েছে হাঁসে আর শেষে গিয়ে তা ভোগ করেছে বাগডাশে!’

সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সর্বশেষ সভায় এ নিয়ে বিস্তৃত চুলচেরা আলোচনা হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে এই আন্দোলনকে মাঝপথে ছেড়ে দিলে চলবে না। আন্দোলনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। দাবিগুলিকে আরো সহজ, গভীর এবং জনপ্রিয়ভাবে জনগণের সামনে যৌক্তিক ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে হবে।

এর আগে ‘দাম কমাও-জান বাঁচাও’ এর ডাক দিয়ে ১০ থেকে ১৬ মার্চ দেশব্যাপী দাবি সপ্তাহ পালিত হয়েছে। উপরোক্ত শ্লোগানটি জনগণ গ্রহণ করেছেন। ঐ দাবি সপ্তাহের ধারাবাহিকতায় একই দাবিতে বাম গণতান্ত্রিক জোট যে হরতাল ডেকেছিল তা নিয়ে দেশবাসীর মাঝে সিপিবি’র কর্মীরা ছড়িয়ে পড়েছিলেন। সিপিবি সংগঠনের মধ্যে তৃণমূলে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। কোথাও কোথাও হরতালে সরকারি বাহিনীসমূহের সঙ্গে মৃদু সংঘর্ষও ঘটে। পরবর্তীতে হরতালে লাঞ্চিত ও গ্রেপ্তারকৃত কয়েকজনকে সরকার ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। দ্বাদশ কংগ্রেসের পর এটাই ছিল সিপিবির প্রথম পাবলিক প্রোগ্রাম।

এটা ছিল খুবই সময়োচিত একটি প্রোগ্রাম। আমরা জানি করোনাকালে দেশে বিদ্যমান দরিদ্র লোকের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। বেসরকারি জরীপ অনুসারে দারিদ্রের হার বৃদ্ধি পেয়েছে ২০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ যথেষ্ট পরিমাণ পুষ্টি (২২৫০ ক্যালরি) সংগ্রহ করার মত অর্থ নাই এরকম লোকের সংখ্যা ৩ কোটি থেকে বেড়ে ৬ কোটি হয়ে গেছে বলে অনেক বেসরকারি জরিপই দাবি করছে। বলা হচ্ছে দারিদ্রের হার দ্বিগুণ হয়েছে।

এখন মড়ার উপর খাড়ার ঘা হিসাবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের হু-হু করে দাম বৃদ্ধি। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠে যায় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপে। মধ্যবিত্তরাও পথে নেমে আসেন এবং টিসিবি ট্রাকের সামনে স্বল্পমূল্য খাদ্য কেনার জন্য লাইনে দাঁড়াতে তারাও বাধ্য হন।

করোনাকালে সরকার যেসব পরিবারকে নগদ অর্থসাহায্য প্রদান করেছিলেন তার মধ্যে দু-ধরনের ত্রুটি ছিল। যারা যথার্থ দরিদ্র তারা সেই সাহায্য অনেক ক্ষেত্রেই পাননি। একে অর্থনীতির পরিভাষায় বলা হয় বহির্ভুক্তির ত্রুটি (Exclusion error)। আবার দেখা গেছে যারা শাসক দলের বিশেষ অনুগ্রহপুষ্ট তারা দরিদ্র না হয়েও সেই নগদ সাহায্য ভোগ করেছেন। এটা আরেক ধরনের ত্রুটি। একে ভুল অন্তভুর্ক্তি (inclusion error) বলা হয়। যে সব উন্নয়নশীল দেশে গোষ্ঠীতন্ত্র, দলবাজী, দাতা-গ্রহীতা সম্পর্ক রয়েছে বা যেসব অর্থনীতিতে স্বজনতোষণমূলক পুঁজিবাদ চালু রয়েছে সেসব দেশে এই ধরনের সংকট অহরহই দেখা দেয়। অনেকে একে ‘সুশাসনের সংকট’ হিসাবে ভদ্র ভাষায় ব্যক্ত করেন। জনগণ ও বামপন্থীরা এর নাম দিয়েছে লুটেরা পুঁজিবাদ। আমাদের জনগণকে আজ মনে রাখতে হবে যে আমরা একটি গণঅভ্যুত্থান ও সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে দেশটাকে স্বাধীন করেছি। আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জিত হয়নি। রাজনীতিও গণতান্ত্রিক হয়নি, অর্থনীতিও গণতান্ত্রিক হয়নি।

আমাদের ৭২’র সংবিধানে খাদ্যকে ধরা হয়েছিল জনগণের মৌলিক অধিকার। ঐ ধারাটি এখনো বদলানো হয় নি। কিন্তু রাষ্ট্রকে এই মৌলিক অধিকার পূরণে বাধ্য করার মত কোনো গণতান্ত্রিক আইন এখনো সংসদে পাশ হয়নি। তাছাড়া তৃণমূলেও এবার ভোটে যারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পদে বিজয়ী হয়েছেন তারাও অনেকসময়ই ‘মানি-মাসল-ম্যানিপুলেশন’ বা ‘টাকা পেশিশক্তি ও কৌশল’ খাটিয়ে জয়ী হয়েছেন। ফলে ভোটার বা জনগণের প্রতি নির্বাচিত সংস্থাগুলির কোন

গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার সৃষ্টি হয়নি। এর মধ্যেও যখন বিপদে-আপদে যেটুকু জরুরি ত্রাণ ও খাদ্য সাহায্য তৃণমূলে পাঠানো হয় তা ঠিকমত প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে কখনোই পৌঁছায় না। অথচ দরিদ্রদের লিস্ট করে তার মোবাইলের নম্বর নিয়ে তাকে পৌঁছানো বর্তমানে কঠিন কোনো ব্যাপার নয়। এ ছাড়া জনগণকে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ডেকে আত্মনির্বাচনের (self selection) পদ্ধতিতে প্রকৃত দরিদ্রদের নির্বাচিত করে তাদের কার্ড প্রদান করা বর্তমানে খুবই সম্ভব একটি বিষয়।

আমাদের দেশে না হলেও অন্য অনেক দেশেই দরিদ্রদের নিয়মিত খাদ্য-পণ্য (চাল-ডাল-তেল-লবণ) ১৫ দিন পরপর রেশন হিসাবে স্বল্পমূল্যে প্রদানের বিধান বা আইন আছে। এমন কি যে কোনো দরিদ্র লোক যদি তার এই খাদ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় তাহলে তার অধিকার রয়েছে আদালতের কাছে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার। রাষ্ট্রকে তখন সেই খাদ্য দিতে হয় এবং শুধু নৈতিক সংবিধানিক অধিকার নয়, খাদ্য অধিকার তখন আইনী অধিকারে পরিণত হয়। আমাদের পাশের দেশ ভারতে এই ধরনের গণতান্ত্রিক আইনী খাদ্য অধিকার এখনই বিদ্যমান আছে।

ইতিমধ্যেই এ ধরনের একটি খসড়া আইন প্রগতিশীল আইনজীবিরা বাংলাদেশে নাগরিক আন্দোলনের পক্ষ থেকে তৈরি করেছেন। কিন্তু সরকার তা গ্রহণ করছেন না। কারণ তারা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভাঙতে ভয় পায়। কিন্তু আমরা জানি বর্তমান সংসদ যে প্রহসনের নির্বাচন দ্বারা নির্বাচিত হয়েছে তা সংসদকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ না করে অসৎ আমলা ও অসৎ লুটেরাদের সিন্ডিকেটের পকেটে বন্দী করে ফেলেছে। গণতান্ত্রিক সংসদ কায়েমের জন্য ‘আমার ভোট আমি দিব যাকে খুশী তাকে দিব’- এই অধিকার সবার আগে কায়েম করতে হবে। তাই আজ নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে ভোটের অধিকার আর ভাতের অধিকার এই দুই আন্দোলন আজ যুগপৎ একসূত্রে গাঁথা হয়ে গেছে।

বর্তমান শাসক শ্রেণির কাছে তাই খাদ্য বা ভোটের জন্য অনুনয়-বিনয় করে কোনো লাভ হবে না। সার্বজনীন খাদ্য অধিকার ও জোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণকে গ্রামে-গঞ্জে শহরে-বন্দরে দরিদ্র-নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্য বিত্তদের ঐক্যবদ্ধ করে তীব্র সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। এমনকি যারা ক্ষুধামুক্ত আপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল নাগরিক তাদেরকেও আজ খাদ্যের সার্বজীন অধিকার কায়েমের জন্য নতুন এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সামিল হতে হবে। সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটি আজ সেই ধারাবাহিক আন্দোলনের আহ্বানই জানিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.