ব্রিটিশ শাসকদের তখত কাঁপানো চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহে নারী

মৃণাল চৌধুরী

বিপ্লবী মহানায়ক মাষ্টারদা সূর্যসেনের অধিনায়কত্বে ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল, টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন অফিস ধ্বংস, রিজার্ভ পুলিশ লাইন দখল, ব্রিটিশদের পরাধীনতা থেকে চট্টগ্রামকে স্বাধীন ঘোষণা এবং ২২ এপ্রিল ঐতিহাসিক জালালাবাদ যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর পরাজয়, ৭২ জন ব্রিটিশ সেনাকে হতাহত করার আগে ও পরে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহে নারীদেরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯২১ সালে ধর্মঘটি রেল শ্রমিকদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম শহরের গান্ধী ময়দানে মহাত্মা গান্ধীর উপস্থিতিতে সভায় মামলা পরিচালনার জন্য সর্বপ্রথম হাতের দু’খানা সোনার চুড়ি খুলে দিয়েছিলেন দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের স্ত্রী মিসেস নেলী সেনগুপ্ত। ১৯২৩ সালে দিল্লি কংগ্রেসে যোগ দেয়ার জন্য চট্টগ্রাম থেকে সাত সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধি দলে নিরুপমা দস্তিদার নামে একজন নারীও ছিলেন।

চট্টগ্রামে অগ্নিযুগে নারীদের সংগঠিত করার ব্যাপারে যাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল তিনি হলেন বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদার। অগ্নিযুগের বিপ্লবী এবং পরবর্তী সময়ের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন কমরেড পূর্ণেন্দু দস্তিদার। তাঁর সব ভাইয়েরা বড়দা পূর্ণেন্দু দস্তিদারের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে অনুপ্রাণিত ও উজ্জীবিত হয়েছিল। প্রীতিলতা ছিলেন পূর্ণেন্দু দস্তিদারের পিসতুতো বোন। কমরেড শরবিন্দু দস্তিদারের লেখা থেকে জানা যায়- প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, ও আয়েশা বেগম নামে তিনজন ছাত্রীকে নিয়ে পূর্ণেন্দু দস্তিদার প্রায়শই বৈঠক করতেন। অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা ও বিপ্লবী কল্পনা দত্তের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমরা জানি। জানা যায়, আয়েশা বেগমের বাড়ি ছিল মিরেরসরাই উপজেলায়। অল্প বয়সে তার বিয়ে হয় এবং বিয়ের পর বরের সাথে তিনি বার্মা (মিয়ানমার) চলে যান।

প্রীতিলতার ডাক নাম ছিল রানী। ডা. খাস্তগীর স্কুলে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী থাকা অবস্থায় রানী নিজ বড় ভাইয়ের মুখে শোনা স্বদেশি বিপ্লবীদের রেল কোম্পানির ১৭ হাজার টাকা ডাকাতির কাহিনি, ভিখারির মুখে ক্ষুদিরামের ফাঁসির গান এবং কলেজিয়েট স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র বড়দা পূর্ণেন্দু দস্তিদারের কাছ থেকে গল্পের ছলে বিপ্লবীদের সম্পর্কে শোনা কথা গুলি তাঁর মধ্যে স্বদেশি ভাবের স্ফূরণ হয়। তাছাড়া তার স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ঊষাদিই তাঁকে প্রথম “ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাই” বইটি পড়তে দেন। পুলিশের বেড়াজাল থেকে পালিয়ে হঠাৎ এক ভোরে মাষ্টারদা সূর্যসেন পূর্ণেন্দু দস্তিদারদের চন্দনপুরার বাসায় আত্মগোপন করতে আসেন। তড়িৎ কর্ম বিবেচনা করে পূর্ণেন্দু দস্তিদার তখনই তাঁর কাছে রক্ষিত নিষিদ্ধ বইগুলোর একটি মোড়ক প্রীতিকে দিয়ে আসেন এবং বলেন- ‘সাবধান বইগুলো যাতে কারো হাতে না পড়ে। যতেœর সাথে রেখো’। প্রীতিলতার কৌতুহল বাড়ে। নিজেদের বাড়ির আম, জাম, কাঠাল বাগানে উঁচু মাটির ঢিবিতে বসে সব বইগুলো পড়ে ফেলেন- এবং নিজের মধ্যে আত্মপ্রত্যয় জাগে। ‘নাটোরের রানী, ঝাঁসির রানী যদি পারে তাহলে চট্টগ্রামের রানী পারবে না কেন?

প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাস করার পর প্রীতিলতা ভর্তি হন ঢাকার ইডেন কলেজে। ঢাকায় বিপ্লবী দলের শাখা লীলা নাগ কর্তৃক পরিচালিত ‘দ্বিপালী’ সংঘের সাথে তার সম্পর্ক হয়। তাঁকে দ্বিপালী সংঘের একটি সদস্য ফরম দেয়া হয়। দাদা পূর্ণেন্দু দস্তিদার ফরমটি মাষ্টারদা সূর্যসেনকে দেখান এবং মাষ্টারদাকে বলেন যে, প্রীতি বিপ্লবী দলে কাজ করার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছে। মাষ্টারদা সূর্যসেন বলেন ‘নারীর স্নেহ, ভালবাসা, অশ্রুজল বিপ্লবীদের পেছনে টাঁনতে পারে। এ জন্য আমরা বিপ্লবীরা আজীবন কুমার থাকার ব্রত গ্রহণ করেছি। দাদার অনুরোধে আমাকে বিয়ে করতে হয়েছে বটে, কিন্তু একদিনের জন্যও স্ত্রীর সাথে কথা পর্যন্ত বলিনি। আমার স্ত্রী পূষ্পা সেন টাইফয়েট রোগে দীর্ঘদিন ভোগার পর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে অভিযোগ করে বলেছিল- তাঁকে কেন আমি আদর্শের সাথী করিনি। মাষ্টারদা শেষে বললেন ‘যা হোক আজ থেকে প্রীতিলতাকে বিপ্লবী দলের সদস্য করা হলো। তবে সে কথা তুমি, আমি ও সে ছাড়া আর কেউ জানবে না। গোপন থাকবে’।

১৯২৯ সনে প্রথম বিভাগে আইএ পাস করার পর প্রীতিলতাকে ভর্তি করা হয় কলকাতা বেথুন কলেজে। চট্টগ্রামের চার জন ও অন্যান্য কয়েকজনকে নিয়ে প্রীতিলতা কলেজে একটি নারী বিপ্লবী চক্র গড়ে তোলেন। তাঁর বিপ্লবী চক্রের সদস্যদের মধ্যে কল্পনা দত্ত, সরোজিনী পাল, নলিনী পাল ও কুমুদিনী রক্ষিত চট্টগ্রামেরই ছাত্রী ছিলেন। চট্টগ্রামে আসার সময় তারা প্রত্যেকে ৪ টি করে মোট ২০ টি বোমার খোল লুকিয়ে চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের জন্য নিয়ে আসেন। এসব মেয়েরা বিপ্লবী দলের সাথে যুক্ত থাকার কারণে পরিবারের কাছ থেকে অসহ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নিজেদের পরিবার থেকে স্বর্ণালংকার এনে তাঁরা বিপ্লবী দলের কাছে জমা দিয়েছে।

এ সময়ে বাংলার বিভিন্ন জেলায় নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। মাষ্টারদার শর্ত অনুযায়ী প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত প্রমুখ পূরুষদের বাদ দিয়ে চট্টগ্রামে নারী সম্মেলন করার উদ্যোগ নেন। শহরের একমাত্র মহিলা ডাক্তার সুহাসিনী মুখার্জি ও লেখিকা চারুবালা দাশগুপ্তকে যুগ্ম সম্পাদিকা করে একটি অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করা হয়। নারী সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রী অরবিন্দের আত্মীয়া তৎকালিন কংগ্রেসের বিশিষ্ট নেত্রী মিসেস্ লতিকা বোস। নারী সম্মেলনে পুরুষদের প্রবেশাধিকার না থাকার কারণে অনেক বোরকা পরা মুসলিম নারীরাও এতে যোগদান করেন। সম্মেলনে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেন কুমুদিনী রক্ষিত।

২২ এপ্রিল ১৯৩০ জালালাবাদ যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাদের উপর্যুপরি গোলা বর্ষণের মুখে মাষ্টারদা জীবিত বিপ্লবীদের নিয়ে পশ্চাদপসরনের সিদ্ধান্ত নেন। অন্যতম প্রধান নেতা অম্বিকা চক্রবর্তী, অর্দ্ধেন্দু দস্তিদার ও মতি কানুনগোকে মৃত মনে করে গভীর শ্রদ্ধায় স্যালুট দিয়ে পাহাড় থেকে নেমে যান। তখনো কিন্তু বিপ্লবী অম্বিকা চক্রবর্তী ও অর্দ্ধেন্দু দস্তিদার মারা যাননি। অম্বিকা চক্রবর্তী আত্মরক্ষার শেষ চেষ্টা হিসাবে পাহাড় থেকে নিজেকে গড়িয়ে দেন। আহতবস্থায় দুইদিন দুইরাত তিনি ফতেয়াবাদ বড়দিঘীর পাড়ে বিধবা বৃদ্ধা ফয়েজুন্নেসার সেবা যতেœ ছিলেন। বৃদ্ধার ১৬/১৭ বৎসরের ছেলে ফজল আহামদ জালালাবাদ পাহাড় থেকে একটি ওয়েবলি রিভলবার কুড়িয়ে এনে অম্বিকা চক্রবর্তীকে দেন। এর প্রতিদান হিসাবে অম্বিকা চক্রবর্তী কিছু টাকা গরিব বৃদ্ধার হাতে দিতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টাকার প্রয়োজন নাই, এ অস্ত্র দিয়ে একজন ইংরেজ সাহেবকে মারলেই খুশি হবো বাবা’।

চট্টগ্রামের বিপ্লবী মনোরঞ্জন রায়ের বিধবা পিষিমার বাসা ছিল কলকাতার শাখারীটোলা লেনে। বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদার সে বাসায় আত্মগোপনে থাকতেন। পিষিমার কলেজে অধ্যায়নরত তিন মেয়ের মধ্যে আশালতা ব্যানার্জি প্রত্যক্ষভাবে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন। বিপ্লবী অনন্ত সিং, প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত এই গোপন আস্তানায় আসা যাওয়া করতেন। জালালাবাদ যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী প্রথম পরাজয়ের পর মাষ্টারদার নির্দেশে কলকাতায় পিসিমার বাসায় ইস্তেহার ছাপানোর জন্য সাইক্লোস্টাইল মেশিন বসানোর হয়। তিন রাত হাতল চালিয়ে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত কয়েক হাজার ইস্তেহার বের করেন। এক সাথে ইস্তেহার বিলি ও বিপ্লবী দলের জন্য অর্থ ও স্বর্ণালংকার সংগ্রহ করা হত। এ সময়ে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত প্রত্যক্ষ ভাবে বিপ্লবী দলে যোগদানের জন্য অস্থির হয়ে উঠেন। বোমা বানানোর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো গান পাউডার। কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতা ঔষধ তৈরীর কারখানা থেকে রাসায়নিক দ্রব্য সংগ্রহ করে অত্যন্ত উন্নতমানের গান পাউডার তৈরি করে গোপনে চট্টগ্রামে বিপ্লবী দলের কাছে পাঠাতেন।

ফাঁসির আসারি চট্টগ্রামের বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাস যখন আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন তখন প্রীতিলতা রামকৃষ্ণের বোনের পরিচয়ে কয়েকবার তার সাথে সাক্ষাত করেন। প্রীতিলতা নিজেই বলেছেন এই সাক্ষাতকারের ফলে তার মধ্যে বিপ্লবের আদর্শিক শক্তি দশ গুন ব্রিদ্ধি পায়। অনিচ্ছা ও সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় বি এ, পরীক্ষা দিয়ে প্রীতিলতা ডিস্টিংকশানসহ বিএ পাস করেন। মাষ্টারদার সাথে সাক্ষাত ও প্রত্যক্ষ কাজে অংশ নেয়ার জন্য প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। কল্পনা দত্ত চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন এবং প্রীতিলতা নন্দনকাননস্থ অপর্ণাচরণ বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর অবশেষে ধলঘাটে এক গোপন ঘাঁটি দরিদ্র বিধবা সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে ১৯৩২ সালের ১৩ জুন মাষ্টারদার সাথে প্রীতিলতার সাক্ষাতের ব্যবস্থা হয়। মাষ্টারদা সূর্যসেন ছাড়াও সেখানে উপস্থিত ছিলেন অন্যতম বিপ্লবী নির্মল সেন, অপূর্ব সেন (ভোলা), সাবিত্রি দেবীর ছেলে রামকৃষ্ণ ও মেয়ে আশালতা। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ক্যাপ্টেন ক্যামেরুনের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী সাবিত্রী দেবীর বাড়িটি ঘিরে ফেলে। সাবিত্রি দেবী পুলিশকে আটকানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ক্যাপ্টেন ক্যামেরুন দোতলার সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময়ে বিপ্লবী নির্মল সেনের রিভলবারের গুলিতে লুটিয়ে পড়ে। প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত অপূর্ব সেন (ভোলা) পেছন দিক দিয়ে পালানোর সময় গুলিবিদ্ধ হন। নির্মল সেন নিজের রিভলবারের শেষ গুলি পর্যন্ত লড়তে লড়তে শহীদ হন। মাষ্টারদা ও প্রীতিলতা পানা ভরা পুকুরে ভোর পর্যন্ত নাকটা উঁচিয়ে নিজেদের ডুবিয়ে আত্মরক্ষা করেন। সাবিত্রী দেবী, তার ছেলে রামকৃষ্ণ ও মেয়ে স্নেহলতাকে গ্রেফতার করা হয়। জেল খানাতেই ছেলে রামকৃষ্ণের মৃত্যু হয়। মেয়ে স্নেহলতাকে মুক্তি দেয়া হলেও সাবিত্রী দেবীর চার বছরের জেল হয়।

প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত দুজনকে প্রত্যক্ষ বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার পূর্বে হাই কমান্ডের পক্ষ থেকে তাদের আত্মগোপনের যাবার নির্দেশ দেওয়া হয়। সমস্যা হল শিক্ষিত নারী বিপ্লবীরা দুখানা কাপড়ে দেহ ঢেকে মুসলিম পরিবারে আত্মগোপনে থাকা সম্ভব ছিল না। ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ সাল পূরুষের ছদ্মবেশে আত্মগোপনে যাওয়ার সময় কল্পনা দত্ত ধরা পড়েন এবং জামিনে তাঁর মুক্তি হয়। বিপ্লবী হাইকমান্ড প্রথমেই কল্পনা দত্তকে চট্টগ্রামের ইংরেজ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে পাহাড়ের উপরে তার বাড়িতে তাকে গুলি করে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু পাহাড়াদার সৈন্যারা নিয়মিত ‘রকেট কার্টিজ’ ছোঁড়ার কারণে যেহেতু আকাশ আলোকিত হয়ে সব কিছু দেখা যাচ্ছিল কল্পনা দত্তকে এ্যাক্শন না করেই ফিরে আসতে হয়। ব্যর্থতা থেকে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্তের মধ্যে আত্মদানের আগ্রহ আরো বেড়ে যায়।

চট্টগ্রামসহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন শহরে ইংরেজদের আমোদ প্রমোদের জন্য নৈশক্লাব ছিল। ক্লাবের সাইন বোর্ডে লেখা থাকতো ‘কুকুর ও ভারতীয়দের জন্য প্রবেশ নিষিদ্ধ’। পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবটি আক্রমণের জন্য মাষ্টারদা বিপ্লবী শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর নেতৃত্বে কয়েকজন বিপ্লবীকে প্রথমে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে শৈলেশ্বর চক্রবর্তী অপমানে দগ্ধ হয়ে কাট্টলী সাগরের উপকূলে নিজ রিভলবারের গুলিতে আত্মহত্যা করেন। মাষ্টারদা সূর্যসেন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবটি পুনরায় আক্রমণ করা হবে এবং আট সদস্য বিশিষ্ট্য আক্রমণকারী দলের নেতৃত্ব দেবেন প্রীতিলতা ওয়াদ্বাদার। কয়েকদিন সাগর পাড়ে অস্ত্রশিক্ষার পর খাঁকি সামরিক পোষাকে সজ্জিত প্রীতিলতার কোমরে চামড়ার কটিবন্ধে গুলিভরা রিভলবার, খাপে ভরা গোর্খা ভোজালি, পায়ের ক্যানভাসের রাবার সোলের জুতো, মাথার দীর্ঘ কেশরাশিকে সুসংবদ্ধ করে তার উপরে বাঁধা হয়েছে সামরিক কায়দায় পাগড়ি। বাবুর্চির টর্চের সংকেত পেয়ে আক্রমণ করা হলো। উদ্দাম বল নৃত্যের মধ্যে নেমে এলো মৃত্যুর হাহাকার। সর্বমোট ৫৩ জন ইংরেজ নরনারী এ আক্রমণে হতাহত হয়েছে। বিজয়নীর গর্বে প্রীতিলতা সাথীদের ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে যখন সামরিক নিয়ম অনুযায়ী পেছন পেছন আসতেছিলেন তখনি নালায় লুকিয়ে থাকা কারো একটি গুলি তার বুকে লাগে এবং তিনি লুটিয়ে পড়লেন। ধরা পড়ার সম্ভাবনা দেখে বিপ্লবী কমান্ডের নির্দেশ মোতাবেক পটাশিয়াম সাইয়োনেটের মোড়ক খুলে মুখের মধ্যে ফেলে দিলেন। বিপ্লবী প্রীতিলতার মৃত্যুর পরে তাঁর দেহ তল্লাশি করে যে চিঠি পাওয়া যায় তাতে লেখা ছিল ‘নারীরা আজ কঠোর সংকল্প নিয়েছে যে, আমার দেশের ভগিনীরা আজ নিজেদের দুর্বল মনে করিবেন না। সহস্র ভারতীয় নারী সহস্র বিপদ ও বাধাকে চুর্ণ করিয়া এই বিদ্রোহ ও সশস্ত্র আন্দোলনে যোগদান করিবেন এবং তাহার জন্য নিজেকে তৈয়ার করিবেন। এই আশা লইয়াই আমি আজ আত্মদানে অগ্রসর হইলাম’।

বিপ্লবী নেতা মাষ্টারদা সূর্যসেনকে ধরার জন্য গোয়েন্দারা হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি করছে। মাষ্টারদা তখন গৈরলা গ্রামে গরিব বিধবা ক্ষীরোদ প্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে গোপন আশ্রয়ে ছিলেন। ১৯৩৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মাষ্টারদার গোপন আশ্রয় কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছেন বিপ্লবী কল্পনা দত্ত, শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত ও সুশীল দাশগুপ্ত। ঐ বাড়িতে গ্রামের তরুণ বিপ্লবী ব্রজেন সেনেরও যাতায়াত ছিল। ব্রজেন সেনের জেষ্ঠ্যভ্রাতা নেত্র সেন। মাষ্টারদাকে ধরিয়ে দিতে পারলে ১৫ হাজার টাকা পুরস্কারের লোভ গরিব বিধবা ক্ষিরোদ প্রভা বিশ্বাস সামলাতে পারলেও বিশ্বাসঘাতক নেত্রসেন পারল না। পুলিশ এসে বিশ্বাস বাড়ি ঘিরে ফেলল। শান্তি চক্রবর্তী ও সুশীল দাশ গুপ্ত একদিকে পালিয়ে যেতে পারলেন। কল্পনা দত্ত ও মণি দত্ত কিছুক্ষণ পুকুরে ডুবে থেকে পরে পালিয়ে গেলেন। মাষ্টার দা সূর্যসেনও কিছুদূর চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু বড় গাছের আড়ালে থাকা এক সিপাহী তাঁকে ঝাপটে ধরে ফেলেন। যদিও সিপাহীটিও জানতো না যে, সে ব্রিটিশ শাসকদের ত্রাস সূর্যসেনকেই ধরেছে।

চট্টগ্রাম শহর থেকে ২৫ মাইল দূরে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে আনোয়ারা থানার গহিরা গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন বিপ্লবী তারেকশ্বর দস্তিদার, কল্পনা দত্ত, মনোরঞ্জন দাস ও মনোরঞ্জন দে। আশ্রয়দাতাকে বলা হয়েছিল যে, বিপ্লবীদের আশ্রয় দিলে তাদেরও বিপদ হতে পারে। তারা দুই ভাই- পুর্ণ তালুকদার ও নিশি তালুকদার। ধর্মপ্রাণ আশ্রয়দাতারা বলেছিলেন অতিথি নারায়ন। অতিথি ফেরালে পাপ হয়। ১৯৩৩ সনের ১৯ মে। পরদিনই আশ্রয়স্থল পরিবর্তন করার কথা। গভীর রাতে সৈন্যরা আশ্রয়স্থল ঘেরাও করে। তারেকস্বর দস্তিদার ও কল্পনা দত্ত দুজনেরই হাতে দুুটি মাত্র রিভলবার। গুলিও ছয় রাউন্ড করে মাত্র ১২ রাউন্ড। রাইফেলের বিরুদ্ধে বিপ্লবীদের ১২ রাউন্ড গুলি বেশিক্ষণ টিকল না। হঠাৎ একটি গুলি এসে লাগল আশ্রয়দাতা বড় ভাই পূর্ণ তালুকদারের বুকে। দাদাকে ধরতে গিয়ে দ্বিতীয় গুলি এসে বিদ্ধ করল ছোট ভাই নিশি তালুকদারকে। বিপ্লবী কল্পনা দত্ত সামনে। বিপ্লবীরা দিনের আলোয় বের হয়ে আসলেন। সুবেদার রেগে কল্পনা দত্তকে জোরে থাপ্পর দিল। মাটিতে পড়ে গেলেন তিনি। সৈন্যরা এসে এর প্রতিবাদ জানায় এবং অভয় দেয় যে ‘তারা থাকতে কেউ বিপ্লবীদের গায়ে হাত দিতে পারবে না’ সৈন্যরা বলল- তারা অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে মাত্র। বিপ্লবীদের দেখে তাদের জীবনও ধন্য। এক বছর পর বিপ্লবী কল্পনা দত্ত যখন হিজলি মেয়েদের জেলে বন্দি তখন গহিরা গ্রামের সৈন্যদের কয়েকজন মেদিনীপুরে বদলি হয়েছেন। তারা হিজলি জেলে পাঠিয়েছিল বিপ্লবী কল্পনা দত্তের জন্য একটি ফুলের তোড়া। কল্পনা দত্ত অবিভূত। সাধারণ সৈন্য যাদের কোন পদ পদবী নেই, তাদের মধ্যেও লুকায়িত রয়েছে স্বদেশ প্রেম।

এখানে আরো একজন বিপ্লবী নারীর কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। তিনি হলেন সুহাসিনী গাঙ্গুলি (পুটু দি)। বিপ্লবী গনেশ ঘোষ, অনন্ত সিং, লোকনাথ বল সহ চার পাঁচজন বিপ্লবীদের গোপনে থাকার জন্য চন্দন নগরে ঘর ভাড়া নিতে হবে। ঘর ভাড়া নেওয়া হল রেলের টিকেট পরীক্ষক শ্রী শশধর আচার্য্যের নামে। তাঁর স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য দায়িত্ব প্রদান করা হলো কলকাতা বিপ্লবী দালের সাথে যুক্ত বাল্য বিধবা শিক্ষিকা সুহাসিনী গাঙ্গুলিকে। রিতিমত শাখা-সিঁদুর পরে সুহাসিনী গাঙ্গুলি সুহাসিনী আচার্য্য হয়ে গিয়েছিলেন। গোপন আশ্রয় কেন্দ্রে চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের সাথে বন্দুক যুদ্ধের পর বিপ্লবীরা সহ ধরা পড়ার পর ও তিনি শশধর আচার্য্যের স্ত্রীর পরিচয়ই দিয়েছিলেন। এমন কি আলীপুর কোর্টে দাঁড়িয়েও গভীর দেশপ্রেমে উদ্ধোদ্ধ হয়ে মিথ্যা পরিচয়ই দিয়েছেন।

অগ্নিযুগে চট্টগ্রামের বিপ্লবী নারীদের প্রত্যক্ষ লড়াইয়ে ইতিহাস যেমন আছে, তেমনই রয়েছে সাধারণ ঘরের মেয়েদের বহু অসাধারণ অবদান। তাঁরা বিপ্লবীদের শীতের রাতে বিছানা দিয়েছে, নিজেরা না খাইয়ে বিপ্লবীদের খাইয়েছে। এমনকি লোকচক্ষুর আড়ালে রাখার জন্য বিপ্লবীদের পায়খানা প্র¯্রাব পর্যন্ত পরিষ্কার করেছে। নির্যাতিত তো হয়েছেনই, এমনকি কেউ কেউ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলেও শোনা যায়। সাধারণের মনে বিপ্লবীদের জন্য কি পরিমাণ শ্রদ্ধাবোধ ছিল একটি উদহারণ দিয়েই শেষ করব। জালালাবাদ যুদ্ধে মারাত্মকভাবে আহত বিপ্লবী অর্দ্ধেন্দু দস্তিদার সৈন্যদের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর মারা যান। অভয়মিত্র স্মশানে তার অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে মাত্র ৪ জন নিকট আত্মীয় থাকার অনুমতি ছিল। সারা শহরে চলছে তখন সান্দ্য আইন। শহরে মিলিটারি ও পুলিশের করা পাহাড়া। হঠাৎ একটি ঘোড়ার গাড়ি থামল শ্মশান গেইটে। গাড়ি থেকে নামলেন চারজন বীরঙ্গনা। শাড়ির অন্তরাল থেকে বের করল কয়েকটি দুধের বোতল। তাঁরা দেবতা দেখতে এসেছেন। দুধ দিয়ে দেবতাকে স্নান করিয়ে শেষ যাত্রায় বিপ্লবী অর্দ্ধেন্দু দস্তিদারের গলায় পরিয়ে দিলেন ফুলের মালা।

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.