ব্যবস্থা বদল ছাড়া সংকটের সমাধান হবে না

রুহিন হোসেন প্রিন্স

বাজার থেকে ভোজ্যতেল উধাও! তথ্য বলছে, এপ্রিল মাসের ১ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত ৬টি কোম্পানি আট কোটি লিটার সয়াবিন তেল বাজারজাত করেছে। তারপরও বাজারে তেল নেই! এরপরও তেল উধাও!!

ঈদের আগে বোতলের ভোজ্যতেল না পেয়ে খোলা তেল কিনে কোনোক্রমে ঈদ পার করেছেন অসংখ্য সাধারণ মানুষ। খবর বের হয় বন্দরে তেল আসছে। খালাসও হয়ে গেছে। এইতো দোকানে পাওয়া যাবে ক’দিন পর, পরিশোধনের পর। ঈদের দিন পার হতেই খবর এলো বোতলজাত ভোজ্যতেলের দাম প্রতি লিটারে বাড়ছে ৩৮ টাকা, খোলা তেলের দাম বেড়েছে প্রতি লিটারে ৪৪ টাকা। এখন ব্যবসায়ি আর সরকার মিলে নির্ধারিত দামই প্রতি লিটার ১৯৮ টাকা।

না, আর দেরি নয়। খবর পাওয়া গেল বাজারে তেল এসেছে। দোকানে পাওয়া যাচ্ছে। ৫ লিটার বোতলের গায়ে ৭৬০ টাকা লেখা থাকলেও ক্রেতাকে দিতে হচ্ছে ৯৮৫ টাকা।

একটু পেছনের খবরে ফিরি। ঈদের আগের দিন দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেল না পাওয়া গেলেও অভিযানে তেল পাওয়া গেল ডিলার ও পাইকারী ব্যবসায়ীদের গুদামে। ‘চোর-পুলিশ’ খেলা চললো। এইভাবে পার হলো ঈদ। থলের বিড়াল এখন বেরিয়ে এলো। সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী আর মজুতদাররা জানতো ঈদের পর আনুষ্ঠানিকভাবে দাম বাড়ানো হবে। অতএব গুদামজাত করতে পারলে লাভ আর লাভ। এক মাসে যা হয় হোক। জরিমানা, জেল এসব আর এমন কি।

কার্ল মার্কস তো অনেক আগেই হিসাব করে বলে গেছেন, “১০ শতাংশ নিশ্চিত মুনাফা হবে জানলে যেখানেই বলবে পুঁজি সেখানেই খাটতে যাবে, ২০ শতাংশ লাভের নিশ্চিত আশ্বাসে তার চোখ চকচক করবে, ৫০ শতাংশ লাভে তার ঔদ্ধত্য সীমা ছাড়াবে, ১০০ শতাংশ লাভ হবে জানলে সে ন্যূনতম মানবতাটুকুর গলায় পা দিয়ে দাঁড়াবে। ৩০০ শতাংশ লাভ হবে এই নিশ্চয়তা পেলে হেন অপকর্ম নেই যা সে করবে না, এমন ঝুঁকি নেই যা সে নেবে না, এমনকি পুঁজির মালিকদের ফাঁসি হতে পারে জেনেও পুঁজি ছুটবে লাভের অদম্য লালসায়।”

এ বছর ফেব্রুয়ারিতে সরকারি মহল থেকে ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানানো হয়েছিল, তেলের মজুত পর্যাপ্ত আছে। ঈদে কোনো সংকট হবে না। দাম বাড়বে না। গত ২২ এপ্রিল ২০২২ নওঁগা জেলার মহাদেবপুর গ্রামে গিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেল সয়াবিন আর সরিষার তেলের দাম সমান। ২০০ টাকা কেজি দরে সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এসব সংকটের শুরু থেকেই বলে আসছিল যে, ৬/৭ জন সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী আর মজুতদারদের সাথে দেন দরবার করে এসব সমস্যার সমাধান করা যাবে না। বিশ্ব পরিস্থিতি হিসেবে নিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত বাফার স্টক গড়ে তুলতে হবে। টিসিবির দোকান, গাড়ির সংখ্যা ও পণ্য বাড়াতে হবে। সারাদেশে পর্যাপ্ত ন্যায্যমূল্যের দোকান ও রেশন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। অর্থাৎ চলতি ব্যবস্থা বদলে ফেলতে হবে।

‘সাম্রাজ্যবাদনির্ভর লুটেরা পুঁজিবাদী’ ধারায় তথাকথিত ‘মুক্তবাজারের অর্থনীতির’ ধারায় দেশ চলছে। যার অনিবার্য পরিণতি এ সংকটের জন্ম দিয়েছে। তাই ব্যবস্থা বদল ছাড়া সংকট সমাধান করা যাবে না।

নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির এ সংকটে পুরো মাস কাজ করেও পুরো মাসের বেতন পেলেন না শ্রমজীবী গার্মেন্টসহ অনেক প্রতিষ্ঠানে কাজ করা শ্রমিক-কর্মচারীরা। সরকারই বৈঠকে ১৫ দিনের বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত দিল। হাওর অঞ্চলে বন্যার পানিতে বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যাওয়া ধান আর আকস্মিক ঝড়ে দেশের অনেক অঞ্চলে ধানের ক্ষতি কৃষক-ক্ষেতমজুরের ঈদকে নিরানন্দ করে তুলেছিল। আর করোনার সময় কাজ না থাকা, আয় কমে যাওয়া মানুষের বোবা কান্না তো থেকেই গেল। ঈদের ছুটি শেষ হতেই এ নিরানন্দ আরো বাড়িয়ে তুলছে। আগামীদিনের দুশ্চিন্তা দিয়ে শুরু হচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষের পথচলা।

এসব সংকট নতুন নয়। সিপিবি’র দ্বাদশ কংগ্রেস দলিলে এসব বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, “লুটপাটের ধারার অর্থনীতি, রাজনীতিতে চরম অবক্ষয়ের ধারা তৈরি করেছে। রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব রাখা এখন এই লুটপাটের প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে। এই গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষাকারী দলগুলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার গঠন করলেও তারা কেউ মানুষের সংকট দূর করে দেশবাসীর অবস্থার কোনো গুণগত মৌলিক পরিবর্তন করতে সক্ষম হয় নি। বর্তমান সরকার এখন অগণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা দখল করে রেখেছে। এর আগে শাসকশ্রেণির আরেকটি দল ক্ষমতায় থাকলেও তারাও জনগণের স্বার্থকে তোয়াক্কা না করে লুটেরা ধনিকদের স্বার্থরক্ষা করেছে। এই দলগুলোর নিজেদের মধ্যে গলাকাটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও তাদের শ্রেণিগত চরিত্র মূলগতভাবে একই। লুটেরা শাসকশ্রেণি এই দুই দলের মাধ্যমেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে চলেছে। লুটেরা শাসকশ্রেণিকে পরাভূত না করে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তসহ ব্যাপক জনগণের অনুকূলে রাষ্ট্রক্ষমতার বদল না হলে এবং অর্থনৈতিক-সামাজিক নীতি-দর্শনের প্রগতিমুখীন মৌলিক পরিবর্তন না ঘটলে, সংকটের চেহারা রূপ ও পরিমাপের ক্ষেত্রে কিছু হেরফের ঘটলেও সংকটের মূলগত উৎস স্থায়ীভাবে নিরসন হবে না। দেশের বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো লাখো শহীদের আত্মদানের মাধ্যমে পাওয়া ‘মুক্তিযুদ্ধের অর্জন’কে আজ ভুলুণ্ঠিত করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ধারায় দেশকে এগিয়ে নেওয়ার কর্তব্য সম্পাদনে দেশের কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদেরই এখন অগ্রসর ভূমিকা পালন করতে হবে।”

এসব কর্তব্যকে সামনে রেখে সিপিবি দ্বাদশ কংগ্রেস শেষে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে, শ্রমজীবী মানুষের দাবি আদায়সহ গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার আদায়ের দাবিতে রাজপথে আছে। দাবি পক্ষ, হরতাল, গণ-অবস্থান, বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে সংগঠনকে আরো সক্রিয় করতে ইতোমধ্যে অধিকাংশ বিভাগে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপস্থিতিতে সভা সম্পন্ন করেছে।

এসব সভায় বিভিন্ন জেলায় কাজের খবরাখবর, স্থানীয়, জাতীয় আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রতিটি শাখাকে আরো সক্রিয় করতে করণীয় বিষয়ে আলোচিত হয়েছে।

‘শ্রমিক আন্দোলন, ট্রেড ইউনিয়ন ছাড়া জেলা কমিটি থাকবে না’-এই চেতনাকে ধারণ করে শ্রমিক আন্দোলন, ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সকল কমরেডদের পার্টির নিয়মনীতি, শৃংখলা মেনে চলতে সচেতন করার কথাও পুনরায় মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান সরকারের দুঃশাসনের অবসান ঘটানো ও ব্যবস্থা বদলের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম অগ্রসর করতে নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম এর হিসাব রেখে বিশেষ সহায়তা ফান্ড তৈরি এবং নীতিনিষ্ঠ অবস্থানে থেকে দৃঢ়তার সাথে গণসংগ্রাম, গণআন্দোলন, শ্রেণিসংগ্রাম গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এজন্য অপরাপর বাম গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তি, সংগঠন, ব্যক্তিবর্গের সাথে যোগাযোগ বাড়ানো এবং মানুষের মাঝে লেগে পড়ে থেকে সংগ্রাম পরিচালনার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াকেও গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর করার কথা বলা হয়েছে।

ঈদের ছুটির রেশ না কাটতেই ভোজ্যতেল নিয়ে কারসাজি ও মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভও করছে সিপিবি। রাজপথে সিপিবি’র এই নীতিনিষ্ঠ অবস্থান চলছে। অন্যদিকে দেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার মসনদ রক্ষা করতে স্বৈরাচারী, ফ্যাসিস্ট প্রবণতা বৃদ্ধি, আগামী নির্বাচনে পদ ও ক্ষমতার লোভ জিইয়ে কাজ করছে ক্ষমতাসীন শাসকরা। অন্যদিকে ক্ষমতার বাইরে থাকা শাসকশ্রেণির অপর শক্তি ‘তাদের সাথে থাকলেই ভবিষ্যতে পদ ও ক্ষমতার লোভ দেখাচ্ছে।’ আর এই সময়ে আরো সক্রিয় হয়ে উঠেছে দেশি-বিদেশি নানা চক্র। সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিক এসব গালগল্পের মধ্যে ঢুকিয়ে রাজপথের সংগ্রাম থেকে দূরে রাখতে অপচেষ্টা চলছে।

এ অবস্থায় নিজেদের নীতিনিষ্ঠ অবস্থান ধরে রেখে মানুষের মাঝে গিয়ে বিকল্প শক্তি সমাবেশ গড়ে তোলার কাজকে আরও দৃঢ়তার সাথে অগ্রসর করতে হবে। এসময় নানা শক্তি গোষ্ঠী হতাশ হয়ে নানা পথের সন্ধানের চেষ্টা করতে পারে। যার মধ্যে দেশবাসীর মুক্তির কথা মুখে থাকলেও বাস্তবে তা হবে একই ধারার নব সংস্করণ। অতীতের অভিজ্ঞতা তা-ই বলে।

এ কথা মনে রাখতে হবে যে, দেশের জনগণের সামনে প্রধান বিপদগুলো হলো- গণতন্ত্রহীনতা, লুটপাটতন্ত্র, পুঁজিবাদী নিষ্ঠুর শোষণ-অপশাসন, সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ। এরা একে অপরের পরিপূরক। বিচ্ছিন্নভাবে এদের মোকাবিলা সম্ভব নয়। এজন্য এসব শত্রুর বিরুদ্ধে আমাদের একসাথে লড়াই করতে হবে। বর্তমান আওয়ামী দুঃশাসনের অবসান ঘটাতে হবে। ব্যবস্থা বদলাতে হবে। এজন্য সমাজ ও রাজনীতিতে নীতিনিষ্ঠ বাম গণতান্ত্রিক শক্তির দৃশ্যমান ও কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করাতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এটিই সময়ের দাবি।

শাসকশ্রেণির রাজনীতির নানা ডামাডোলের মধ্যে এ ধারাকে এগিয়ে নিয়ে জনগণের ঐক্য গড়ে তুলতে নিরলস সংগ্রাম অব্যাহত রেখেই ইতিহাস নির্ধারিত দায়িত্ব আমাদেরই, নীতিনিষ্ঠ বাম গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল দল, ব্যক্তিকেই পালন করতে হবে।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published.