বেতিয়ারা শহীদ দিবস: ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনীর বীরত্বগাঁথা

১৯৭১ সালে বাঙালির গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে শত্রুসেনার সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনীর নয় সূর্যসন্তান।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া এ নয় বীর যোদ্ধা হলেন- মোঃ সিরাজুম মুনীর জাহাঙ্গীর, বশিরুল ইসলাম মাস্টার, নিজাম উদ্দিন আজাদ, শহীদুল্লাহ সাউদ, আওলাদ হোসেন, দুদু মিয়া, আবদুল কাইয়ুম, আবদুল কাদের ও মোহাম্মদ শফিউল্লাহ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনীর উদ্যোগে ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-যুব-মেহনতি মানুষসহ সমাজের সর্বস্তরের সচেতন নাগরিক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। দেশপ্রেমের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ মুক্তিপাগল জনগণ সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ ও পরবর্তীতে শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে অবস্থানরত অন্যান্যদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষে প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ভারত সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করে।

ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের একটি গেরিলা দল ভারতের বাইকোয়া বেইজ ক্যাম্প থেকে ১০ নভেম্বর রাত ৮টায় চৌদ্দগ্রাম সীমান্তবর্তী ভৈরবনগর সাব-ক্যাম্পে (চৌত্তাখোলা ক্যাম্পের শাখা) পৌঁছায়। ক্যাম্পের দুই জন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের বিএসসি ও সামসুল আলম ১১ নভেম্বর রাতেই গেরিলা বাহিনীর ওই দলটির বাংলাদেশে প্রবেশের নকশা প্রণয়ন করেন। নকশা অনুযায়ী সাব ক্যাম্পের ৩৮ জন গেরিলাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে বেতিয়ারা চৌধুরী বাড়ির দু’পাশে অ্যামবুশ পাতা হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক শত্রুমুক্ত কিনা পরীক্ষা করার জন্য স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কাদের ও আবদুল মন্নানকে ওই সড়কে পঠানো হয়। এ গেরিলারা ছিলেন একাত্তরের ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমান্ডে গড়ে তোলা বিশেষ গেরিলা বাহিনীর দ্বিতীয় ব্যাচে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সদস্যদের একাংশ। পুরো দলটিকে দু’টি গ্রুপে বিভক্ত করে ওই দিন রাতের আগে-পরে ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম রোড’ পারাপারের সিদ্ধান্ত হয়। জগন্নাথ দিঘি ইউনিয়নের ‘বেতিয়ারা’ নামক স্থানে ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রাংকরোডে (মহাসড়ক) পাক-বাহিনীর নজরদারি ছিল বেশি। চৌদ্দগ্রামের এ এলাকায় তাদের একটি শক্তিশালী ক্যাম্পও ছিল। গেরিলাদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সোর্স আব্দুল কাদেরের পর্যবেক্ষণে সড়ক পারাপার নিরাপদ নিশ্চিত ভেবে শহীদ নিজাম উদ্দিন আজাদের নেতৃত্বাধীন ৩৮ জন মুক্তিযোদ্ধার প্রথম দলটি ভারী আগ্নেয়াস্ত্রসহ ঢাকা-চট্টগ্রাম রোড অতিক্রমের জন্য এগিয়ে আসেন। এ সময় সড়কের উত্তর পার্শ্বের গাছের আড়ালে স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী ওৎ পেতে থাকা পাক হানাদার বাহিনী হামলা চালায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাক হায়নাদের ব্রাশ ফায়ার চলতে থাকে। ওই সম্মুখ সমরে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেনি নিজামউদ্দিনের দল। তাদের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ থাকলেও সেগুলো ছিল বাক্সবন্দি। সোর্সের সিগনাল ভুল থাকায় শত্রুদের পাতা ফাঁদে পড়ে ৭৮ জনের মধ্যে শহীদ হন ৯ জন, বাকি ৬৯ জন সাহসী যোদ্ধা লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে প্রাণে বেঁচেছিলেন।

এ বীর শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে ২০১৪ সালে বেতিয়ারায় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়।