বেগম মুশতারী শফি–বাংলার মুক্তির রণাঙ্গিনী

শীলা দাশগুপ্তা  

একটি নক্ষত্র, মুক্তিযোদ্ধা বেগম মুশতারী শফি। যে নামের সামনে জুড়ে দিতে হয় শহীদ জায়া, শহীদ ভগিনী, নারী নেত্রী, সংগঠক এরকম আরও অভিধা। তেমনই এক ধ্রুবতারা বেগম মুশতারী শফী। আমাদের দেশের বাতিঘর। নারীমুক্তির দিশারী। অপশক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে শুধু ত্যাগের মহিমায় নিজেকে করেছেন মহিয়ষী। একটি সংগ্রামী চেতনা, আপসহীন বিদ্রোহী সত্তার অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব।

নিভে গেল সেই বাতিঘরের বাতি। একে একে অন্ধকার নিমজ্জিত হচ্ছে এক একটি নক্ষত্র। মুশতারী শফি চলে গেলেও রেখে গেছেন অনেক ইতিহাস ও একটি স্বাধীন দেশ। বহু ত্যাগের বিনিময় রেখে যাওয়া স্বপ্নের সোনার দেশে চেয়েছিলো সাম্য, একতা, অসাম্প্রদায়িকতা, সততা আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। কিন্তু তা তিনি পাননি।

তাঁর জীবন সংগ্রামের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি ডায়েরিতে। ‘স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন’ মর্মস্পর্শী অপ্রিয় সত্য কথন। তারই দেওয়া আমার শ্রেষ্ঠ উপহার ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে লেখা চিঠি’ দুঃসাহসী এক সত্য কথন।

১৯৫৫ সালে মাত্র ১৫ বছরে ডা. শফীর সাথে বিয়ে হওয়া প্রাণচঞ্চল মেয়েটি শ্রদ্ধেয় ডা. শফীর অনুপ্রেরণায়, সহযোগিতায় গড়ে তুলেছিলেন নিজেকে একজন লেখক ও শিল্পী হিসেবে। মাত্র ১১ বছর বয়সে দৈনিক আজাদী পত্রিকায় ছোটদের আসরে ‘মুুকুলের মাহফিল’। এ ছোট গল্প লেখার মধ্যে দিয়ে সাহিত্যের হাতে খড়ি। ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রামে নারীমুক্তি আন্দোলনের লক্ষ্যে তাঁর উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত করেন ‘বান্ধবী সংঘ’। এটা ছিল চট্টগ্রামের নারীদের প্রথম কোন সংগঠন। ৬৯ সালে গড়ে তোলেন ‘মেয়েদের প্রেস’ নামে একটি পরিপূর্ণ ছাপাখানা। সেই প্রেসে কাজ করতেন কেবল নারীরাই।

১৯৭০ সালের ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’ গঠন এবং প্রয়াত উম্মেতুল ফজলের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে ১১ই মার্চ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে যে সমাবেশ হয়েছিল তাঁতে মুশতারী শফীর বক্তৃতা সেই সময়ে নারীদের জেগে উঠার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল। নারীদের সমঅধিকারের জন্য তিনি সেই সময় থেকে কাজ করে গেছেন।

১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা হয় তাঁর বাড়ি “মুশতারী লজে”। সেই ইতিহাস বড়ো করুন। চট্টগ্রামে এনায়েত বাজারস্থ মুশতারী লজ ছিল মুক্তিবাহিনীর গোলাবারুদ রাখার নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ৭ এপ্রিল তাঁদের জন্য যা কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ৩০ মার্চ কালুরঘাটস্থ বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রে পাকিস্তানী বাহিনীর বিমান হামলার আগ পর্যন্ত এই মুশতারী লজে তিনি গভীর রাত পর্যন্ত জেগে স্বামী ডা. এম শফী ও ছোট ভাই এহসানুল হক আনসারীকে মুক্তিযুদ্ধের বুলেটিন লেখা ও সংবাদ তৈরিতে সাহায্য করতেন।

’৭১ এর ৭ এপ্রিল পাকিস্তানী বাহিনীর অভিযানে তাঁর বাড়ি থেকে বহু গোলাবারুদ ও অস্ত্র পাওয়া যায়। ডা. শফিকে দিয়ে তাঁদের সেই চার তলা বাড়ি থেকে সেগুলো নিচে নামানো হয় এবং ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তার ছোট ভাই এহসানকেও। আর ফিরে আসেনি তারা।

সেই থেকে শুরু হয় মুশতারী শফির জীবন সংগ্রাম। ৭ সন্তানকে নিয়ে পাড়ি জমান ওপার বাংলায়। ‘উম্মে কুলসুম’ ছদ্মনাম ছিল তাঁর। এই ছদ্মনামে তিনি লিখতেন উর্দু নাটিকা এবং তিনি অভিনয়ও করতেন। যেমন “জল্লাদের দরবার” তাঁর বিখ্যাত নাটিকা পাঠ ও অভিনয়। পুরো যুদ্ধের সময় তিনি ‘শব্দ সৈনিক’ হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা রেখে গেছেন। সারা দেশে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ও নাগরিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। দেশের বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে বিবেকের প্রতীক হিসেবে তিনি রাজপথে সর্বাগ্রে হেঁটেছেন।

৯০ এ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিকে ব্যাপক আকারে গড়ে তুলেছিলেন বেগম মুশতারী শফি। তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের আহ্বায়ক। তার এই শক্তিকে সাথে নিয়ে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ এর সৈনিকেরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধের নরপিশাচদের ও স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচারের দাবিতে।

বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা, ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য তিনি গত এক যুগ ধরে উদীচী চট্টগ্রামের সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে গেছেন। সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যরক্ষা, নারী জাগরণ ও স্বাধীনতা রক্ষা আন্দোলনে তিনি চির উজ্জ্বল নক্ষত্র। অন্যায়ের কাছে কখনো তার মাথা হয় নি। তাঁর মুক্তবুদ্ধির চর্চা তাঁর মাতৃস্নেহ, তাঁর দৃঢ় মনোবল, তাঁর আদর্শ আমাদের প্রেরণার উৎস। এক যুগেরও বেশি সময় তাঁর স্নেহধন্য হয়ে শিখেছি–সততা, নিষ্ঠা, দৃঢ়তা ও একতাই সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠার মূলমন্ত্র। সংগঠন এর রীতিনীতি আদর্শ শেখার জন্য নারীনেত্রী ও সংগঠক বেগম মুশতারী শফির জীবনাদর্শই একটি গঠনতন্ত্র।

উদীচী চট্টগ্রামের সভাপতি হিসেবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সাংগঠনিক নিয়ম পালন করেছেন নিষ্ঠার সাথে। বটবৃক্ষ হয়ে নিয়ম পালনে অনুমতি নিয়েছেন সংগঠনের কনিষ্ঠ পদটির কাছে। এতে তিনি ছোট হননি, তাকে দেখে শিখেছে সকলে। তাঁর মন ছিল শিশুদের মত কোমল। তিনি বাংলার মুক্তি রনাঙ্গিনী একজন নির্লোভ নারী। তাঁর জীবদ্দশায় কখনো কোন অনুদান গ্রহণ করেন নি, গ্রহণ করেছেন শুধু সম্মাননা। ফেলোশিপ, প্রথমা পুরস্কার, বেগম রোকেয়া পুরস্কারসহ বহু সম্মান তিনি পেয়েছেন। নিজেকে খুব সুন্দরভাবে গুছিয়ে সাজ করতে তিনি খুব ভালোবাসতেন। খালাম্মা নামে ডেকেছি তবে তিনি ছিলেন শুধু মা। সাদা শাড়ি, গায়ে একটি ঝোলানো চাদর, ঠোঁটে হালকা রং এর প্রলেপ আমার চোখে অপূর্ব সুন্দরী বাংলার মুক্তির রণাঙ্গিনী।

সবাইকে নিয়ে আনন্দে মেতে থাকা ছিল তার স্বভাবের একটি বিশেষ দিক। দুর্বল শরীরেও তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ৬ নভেম্বর ২০২১ চট্টগ্রামের মহাসমাবেশে সভাপতি বক্তৃতা দিয়েছেন ‘সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সমাবেশে’। তিনি থাকবেন আমাদের বিশ্বাসে, চেতনায়, ভাবনায়।

তাঁর কন্যা রুমানা শফির কাছ থেকে জানা– বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর দিন ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ যখন তার জীবনের বাতি একটু একটু করে নিভে যাচ্ছিল তখনও তার অন্তরের চেতনায় ছিলেন ‘বঙ্গবন্ধু’। তিনি শেষবার সেইদিনও একটি শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন অস্পষ্ট স্বরে- ‘বঙ্গবন্ধু’। তাঁর স্বপ্ন ছিল চট্টগ্রামের সকল বধ্যভূমি সংরক্ষণের জন্য কাজ করা, আর একটি মুক্তিযুদ্ধের যাদুঘর গড়ে তোলার।

মুক্তিযোদ্ধা বেগম মুশতারী শফীর দেওয়া শপথ–‘এখন প্রতিবাদ চাই, প্রতিরোধ চাই। চাই রাজনৈতিক আদর্শিক সংগ্রাম।’ অতীতের সব ত্রুটি-বিচ্যুতি ঝেড়ে ফেলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠিত হোক।’

চেতনার বাতিঘর, আপসহীন নারীনেত্রী, মুক্তিযোদ্ধা বেগম মুশতারী শফী, আমাদের খালাম্মা–আপনি থাকবেন ধ্রুবতারা হয়ে উত্তর আকাশে।

লেখক: অধ্যাপক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.