বুদ্ধিজীবী হত্যা: চিন্তার স্বাধীনতা ও প্রাসঙ্গিক কথা

আকমল হোসেন

বুদ্ধিজীবীরা জাতির বিবেক- যারা দেশ, জাতি ও মানুষের পক্ষে দাঁড়ান। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তি সংগ্রামের পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি শাসক ও তাদের এদেশের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসরা ১৪ ডিসেম্বর এ জাতির সেরা সন্তান, শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী ও সাংবাদিকদের হত্যা করেছিল। এর আগেও এমন হত্যাকাণ্ড হয়েছিল এবং এখনও পৃথিবীর দেশে দেশে ঘটছে। বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ এই সন্তানদের স্বরণে প্রতিবছরই পালিত হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজকের এ লেখাাটি।

একই মায়ের উদর থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়া সকল শিশুই সহোদর। পারস্পারিক সম্পর্ক রক্তের। একের স্বার্থই অন্যের সার্থ। সেটাকে ভিত্তি করেই হয়তো কবি শব্দের গাঁথুনিতে সাজিয়েছেন, ‘‘সকলের তবে সকলে মোরা/প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’’। প্রাণিকুলেও তার অনেক নজির পাওয়া যাবে। এক বানরের মৃত্যুর প্রতিশোধ চাইতে অসংখ্য বানরের থানা ঘেরাও, তারই উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এ গেল একই প্রজাতির প্রাণির মধ্যে পরস্পরের সাথে সমভাগী হওয়ার কথা। সুন্দরবনে বাঘের শিকার থেকে হরিণকে রক্ষা করতে বানরের সতর্ক বাণী ঘোষণা যেন আরো এক কবির কবিতা স্মরণ করিয়ে দেয়, “জীবে প্রেম করে যেই জন/সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’’।

তবে ক্ষেত্র বিশেষে এ নিয়মের কিছু ব্যতিক্রম দেখা যায় প্রাণিকুলেও। সাপ-বেজি ও কুকুর-বিড়াল এদের মধ্যে সব সময়ই পরস্পর-পরস্পরকে আক্রমণের চেষ্টা, যেন জন্ম থেকেই এরা প্রতিশোধ পরায়নতা নিয়েই ভূমিষ্ট হয়েছে। ভূমিষ্ট হওয়ার পর যা দেখেছে তাই শিখেছে। মানুষের মত জ্ঞানচর্চার পরিবেশ পায়নি, সেই কারণেই হয়তো এমনটা হয়েছে। কারণ পরিবেশের বাইরে কেউ থাকতে পারে না। প্রাণিকুলের পরিবেশে ইতিবাচক কিছু শেখার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ওয়াজ নসিহতের কোনও সুযোগ নেই, সেই কারণেই হয়তো তারা পরহিত ব্রতে নিজেদেরকে সমৃক্ত করতে পারেনি। কিন্তু জ্ঞানের জন্য প্রাণিকুল থেকে উন্নততর এবং ভিন্নতর, সেই আদম সন্তান অথবা জ্ঞানী প্রাণী অথবা প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি সেই মানুষই কি সেটা করতে পেরেছে? পেরেছে, তবে সবাই পারেনি। এই না পারার সংখ্যা হয়তো কম, তবে তাদের ঘৃণিত কাজ কিন্তু কম নয়।

পৃথিবী এবং সভ্যতা বিকশিত হয় দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে। দর্শনে সেটাকে চিত্রায়িত করা হয়েছে, থিসিস-এন্টি থিসিস-সিন থিসিন আকারে, সকল দর্শন এবং ভাল কাজের সূত্রপাতও নাকি ভুল থেকেই। বাঙালির প্রবাদেও তার স্বীকৃতি মিলেছে, “কোথায় শিখি যেথায় ঠেকি”।

পৃথিবী ও সভ্যতা বিকাশের নিয়ম যদি এটাই হয়, তবে সেখানে স্বাধীন চিন্তার, স্বাধীন মতপ্রকাশের চর্চা ও অধিকার থাকা শুধু জরুরিই নয়, অতি জরুরি। শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান এবং উন্নত সভ্যতার দিকে তাকালে সেটারই প্রমাণ মেলে। কিন্তু দুঃখজনক হলে সত্য, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর প্রধান অন্তরায় ধর্মভিত্তিক মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ এবং বিভিন্ন সময়ের শাসক ও শোষক মহল। কেউ ধর্মের নাম ভাঙিয়ে কেউ আবার আইনের দোহাই দিয়ে এসব কাজের শিকড় পুঁতে রেখেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যার ভেতর দিয়ে সেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। ৭১-এর মহান মুক্তি সংগ্রামে শারীরিকভাবে বুদ্ধিজীবী নিধন করা হয়েছিল, কিন্তু তার আগেই এ ভূখণ্ডে বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীন চিন্তার বিরুদ্ধে চিন্তার বন্দিত্ব সৃষ্টি করা হয়েছিল, সেটি স্বাধীন দেশে এখনও অব্যাহত আছে।

নিজের ভালো পগলেও বুঝে, অন্যের ভালো নিয়ে কে চিন্তা করে? অন্যের ভালো নিয়ে চিন্তামগ্ন মানুষেরাই বুদ্ধিজীবী। যারা নিজের ভাল-মন্দের সাথে সাথে অন্যের ভাল-মন্দ নিয়েও চিন্তা করেন এবং প্রয়োগের জন্য ভূমিকা রাখেন। এহেন কাজের কারণে তারা শত্রুতে পরিণত হোন, যারা মানুষের স্বার্থ এবং অধিকারকে হরণ করে নিজের সুবিধা ভোগ করে তাদের কাছে। নিজের ভোগ-বিলাসে কম হলেও বিত্তসম্পদে এরা অনেক এগিয়ে। ভোগ-বিলাস আর স্বার্থ রক্ষা করতে এরা আশ্রয় নিয়েছে মৌলবাদী তকমার, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা এবং সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেয়ার সংস্কৃতির।

এই কাজগুলি করতে তারা ব্যবহার করছে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে, এবং রাজনীতিকে করেছে হুন্ডা গুন্ডা হেলমেট বাহিনী মাস্তান, কালো টাকা নির্ভর ব্যবসায়ী প্রশাসনিক ও সামরিক আমলা সর্বশেষ মিডিয়াকে, ফলে তাদের বিশাল সিন্ডিকেট ও নেটওয়ার্ক এখন শুধু বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয়নি, তাদের সমালোচনাকারী সাধারণ জনতাকেও রাজনৈতিভাবে সন্ত্রাসের দ্বারা জিম্মি করে ফেলেছে। দেশ, জাতির উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাধীনতা এবং খোলামেলা আলোচনা সেই সাথে জনবান্ধব রাজনীতিই শেষ এবং একমাত্র ভরসা।

দেশ-জাতির কমন স্বার্থে রাজনীতি এবং রাজনীতিকদের সহাবস্থান এবং ঐক্যমত যেমন জরুরি তেমনই স্বচ্ছ্বতা এবং জবাবদিহিতাও জরুরি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের বাস্তবতায় তার অনুপস্থিতি লক্ষ্যযোগ্য। সেবার রাজনীতি আজ ব্যক্তি ও দলের বৈষয়িক লাভ-লোকসানের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়েছে। সৎ, যোগ্য এবং দেশপ্রেমিক মানুষ রাজনীতির বিপথগামী স্রোতধারার কারণে ছিটকে পড়েছে। হুন্ডা-গুন্ডা মাস্তান প্রশাসনিক সামরিক আমলার ও ব্যবসায়ীদের হাতে রাজনীতির কলকাঠি।

রাজনীতি আজ রাজনীতিকদের হাত ছাড়া। রাজনীতি ব্যবসায়ী এবং আমলাদের কবজায়, ফলে ব্যবসায়ী মুনাফা লাভের মত রাজনীতি আজ ব্যবহার হচ্ছে। নীতি আদর্শ সেখানে দর্শন নয়, দর্শন অর্থ-বিত্ত আর সম্পদ অর্জন, তাইতো একই ব্যক্তি সুবিধা বুঝে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে শামিল হয়।

রাজনীতির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও সংস্কৃতির প্রয়োজন। সেদিক থেকে রাজনীতিকদের রাজনীতিচর্চাও সুবিধাজনক নয়। বিশাল অঙ্কের জনসংখ্যা বেষ্টিত সামন্তবাদী চীনকে জনগণের চীনে পরিণত করতে কমরেড মাওসেতুং এর নেতৃত্বে যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা ঘটেছিল, তার পেছনে প্রথম ও প্রাথমিক কাজ ছিল সাংস্কৃতিক বিপ্লব।

কৃষিপ্রধান একটি দেশকে ১৫০ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সংস্থান করা পৃথিবীর ৫ম শক্তির ১টিতে পরিণত করার পেছনে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিপ্লবকে মূলমন্ত্র হিসেবে ভাবছে সে দেশের জনগণ। এ রকম একটি সমাজ দাঁড় করাতে স্বাধীন ও মুক্তচিন্তার চর্চা জরুরি। কিন্তু এই ভূখণ্ডে সেটার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। না ব্রিটিশ আমলে, না পাকিস্তানে, বর্তমানেও নয়।

ব্রিটিশ আমলে স্বাধীন চিন্তা এবং জনগণের পক্ষে কথা বলায় কাজী নজরুলকে যেমন জেল খাটতে হয়েছে, কমিউনিস্টদের রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছিল, সেই সাথে ১৯৫০ সালে রাজশাহী জেলার খাপড়া ওয়ার্ডে ৭ জন কমিউনিস্ট কর্মীকে হত্যা ও ৩২ জনকে আহত করা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত নামক দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল। ভারতে স্বাধীন চিন্তার সুযোগ যতটা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে সেটা ছিল না। ফলে অনেক স্বাধীন চিন্তার মানুষ এ অঞ্চল থেকে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। ধর্মের নামে রাজনৈতিক সংস্কৃতি মানুষের স্বাধীন চিন্তার সুযোগ দেয়নি। এই চিন্তার অনেককে পাকিস্তানের কারাগারে থাকতে হয়েছিল।

বুদ্ধিজীবীরা যুগে যুগে দেশে দেশে স্বাধীন ও মুক্তচিন্তার চর্চা করেছেন। এই মুক্তচিন্তা মানুষের চেতনা সৃষ্টি করেছে, ভাল-মন্দ যাচাই করতে শিখিয়েছে। সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে। স্বাধীন ও মুক্তচিন্তার কারণে ধনিক, বণিক ও শোষক এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অবাধ শোষণ যখন হুমকির মুখে পড়েছে তখন তারাই মুক্তচিন্তার মানুষের ওপর হামলা করেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীক রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে গড়ে উঠা শাসক গির্জার অধিপতিরা  কপারনিকাসকে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছিল’ পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে বলার কারণে। সত্য বলার কারণে গ্যালিলিও, ভলটেয়ার আর সক্রেটিসদের বিরুদ্ধে গির্জা কেন্দ্রিক শাসকদের নির্মম আরচণ ঘটেছে। ‘পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে’- এই তত্ত্বের সাথে শাসকের বড় বিরোধ হওয়ার কথা নয়, কারণ এর দ্বারা শাসকের ক্ষমতা খর্ব হওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই, কিন্তু শাসক বুঝেছিল এ ধরণের বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা বৃদ্ধি পেলে তাদের জবরদস্তি শাসনও একদিন হুমকির মুখে পড়বে। সেই দূরদৃষ্টি থেকেই হয়তো শাসকমহল স্বাধীন চিন্তার মানুষগুলিকে হত্যার শিকারে পরিণত করেছিল। আজকের শাসক মহলের ক্ষেত্রেও সে নিয়মের ব্যতিক্রম নেই। তার ধরণ শুধু পরিবর্তন হয়েছে, এটাই যা।

স্বাধীন বাংলাদেশে যেভাবে মৌলবাদীদের হাতে স্বাধীন ও মুক্তচিন্তার লেখক, প্রকাশক ও ব্লগাররা হত্যার শিকার হচ্ছে তা পূর্বের ঘটনা থেকে ভিন্ন কিছু নয়। প্রখ্যাত লেখক হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর ১১ বছর অতিক্রম হলেও, আজও তার বিচার হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে কবি দাউদ হায়দার, নারীবাদী লেখক ও চিকিৎসক তসলিমা নাসরিনকে নির্বাসিত হতে হয়েছে, আর মহান মুক্তি সংগ্রামের বিরোধীতাকারী, বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী জামাত-শিবির এখনও এদেশে রাজনীতি করে চলেছে। বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায় ও প্রকাশক দীপনরা হত্যার শিকার হয়েছে। তবে এরা কেউই কারো মাথায় লাঠি মারেনি, এরা তাদের মতামত লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করেছে। এরা দেশের প্রচলিত নিয়মের কোনও বিঘ্ন ঘটায়নি। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯(১) ধারায় চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে, ৩৯(২) ধারায় প্রত্যেক ব্যক্তির চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। উপরোক্ত বিধানের আলোকে তাদের অপারাধ কী? সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় ব্লগারদের লেখালেখির বিষয়ে সতর্ক করা হয়, কিন্তু হত্যাকারীদের বিচার করা হয় না। এ আচরণের কারণ কী? শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু অথবা শত্রুর ঘাড়ে বন্দুক রেখে অপর শত্রুকে ঘায়েল করার পরিকল্পনা কিনা?

যে সমাজে দেহের মৃত্যুর হিসাব রাখা হয় কিন্তু মনের মৃত্যুর হিসাব করা হয় না, সে সমাজে স্বাধীন মুক্তচিন্তার মানুষদের হত্যার শিকার হওয়া ছাড়া বিকল্প পথ কোথায়? কপারনিকাসকে হত্যা করা ভুল ছিল- গির্জার অধিপতিরা দুইশত বছর পর সেটা স্বীকার করেছে। ভুল স্বীকার মহত্বের লক্ষণ, কিন্তু দুইশ বছর পরে ভুল স্বীকার করলেও ক্ষতি যা হবার, তাতো অনেক আগেই হয়ে যায়।

তবে এই শিক্ষা থেকে যদি শোষক-শাসক, মৌলবাদী এবং জঙ্গিবাদী চক্র ভালো কিছু নিয়ে থাকে, তবে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও ভাল হতে পারে। তবে স্বাধীন মত প্রকাশকারীদের বিরুদ্ধে জেলজুলুম হুলিয়া আর চাপাতি ব্যবহার বন্ধ করে কলমের জবাব কলম দিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি অনুসরণ করবেন, সেটাই প্রত্যাশা। তাহলে মানুষ এগোবে, জাতি এগোবে, দেশ এগোবে। মানুষ মেরে ধর্ম যেমন রক্ষা হবে না তেমনি রাজ্য রক্ষাও হবে না। যেখানে মানুষ নেই, সেখানে কোনও সভ্যতাও নেই, সেখানে কারো অস্তিত্বও নেই। আশা করি শোষক-শাসক আর চাপাতি মার্কা মৌলবাদী এবং আগুন সন্ত্রাসীরা বিষয়টি উপলদ্ধি করবেন।

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, বাকবিশিস, কেন্দ্রীয় কমিটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.