বিশ্ব পরিবেশ দিবস

মানুষ প্রকৃতির অংশ। পরিবেশের ওপর নির্ভর করে মানুষ, অন্যান্য উদ্ভিদ ও প্রাণী-জীবনের বিকাশ ঘটে। তাই পরিবেশ ও মানুষের মধ্যে রয়েছে এক নিবিড় যোগসূত্র। কিন্তু নানা কারণে পরিবেশদূষণ সমস্যা প্রকট হওয়ায় মানবসভ্যতা আজ চরম হুমকির সম্মুখীন।

আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন পরিবেশ-প্রকৃতি। কিন্তু প্রতিনিয়ত এ পরিবেশকে আমরা নানাভাবে দূষিত করছি। বিশ্বজুড়ে এখন পরিবেশদূষণের মাত্রা ভয়াবহ। পরিবেশদূষণের উল্লেখযোগ্য কারণের মধ্যে রয়েছে অত্যাধিক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও বনভূমি উজাড়, প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার, দ্রুত শিল্পায়ন, সার ও কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, শিল্প-কলকারখানার বর্জ্য, গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া, ওজোন স্তরের ক্ষয়, অ্যাসিড বৃষ্টি, অপরিকল্পিত গৃহনির্মাণ, দারিদ্র্য, প্রসাধনসামগ্রী ও প্লাস্টিক দ্রব্যের ব্যবহার ইত্যাদি। ভয়াবহ পরিবেশদূষণের কবলে পড়ে আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। অপেক্ষা করছে এক মহাধ্বংস।

প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয়। এবার বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য “বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার”। সারা বিশ্বের মানবজাতির ওপর করোনা ভাইরাস অভিশাপ হয়ে এসেছে। কিন্তু তা আশীর্বাদের কাজ করছে প্রকৃতিতে। লকডাউনের ফলে বাতাসের দূষণ কমেছে। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ গত ২ বছর লকডাউনের মধ্যে থাকায় গাড়ি সেভাবে রাস্তায় নামেনি, কলকারখানাও ছিল বন্ধ। ফলে কার্বন নির্গমন ও দূষণের মাত্রা কমেছে। তবে মাস্ক, গ্লাভস ব্যবহারের ফলে করোনোকালে প্রকৃতির চিন্তা বাড়িয়েছে দূষণ।

বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা মানুষের জন্য যথেষ্ট উপকার বহন করে। এর অর্থ কোটি কোটি হেক্টর জমি তৈরি করা। যেখানে খাদ্য, বাসস্থানের ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি পাহাড় অথবা সমুদ্রতল থেকে উদ্ভিদ এবং প্রাণীজগতকে রক্ষা করা। এছাড়া গাছপালা বাড়ানো, শহরগুলিকে সবুজায়ন করা, সর্বোপরি ব্যাপক হারে বাগান করা।

বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয় পুঁজিবাদের সৃষ্ট, যা দূষণ, বর্জ্য এবং কার্বন-চালিত শক্তির ব্যবস্থাকে তীব্র করে তোলে। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে আর্কটিক মহাসাগর বরফমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা বাস্তুতন্ত্র এবং সমুদ্র ¯্রােত উভয়েরই ক্ষতিসাধন করবে। এতে সমুদ্রের মাছের চেয়ে প্লাাস্টিকের উপস্থিতি বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিবেশদূষণের জন্য পৃথিবীতে ৮০ শতাংশ নিত্যনতুন রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। পরিবেশদূষণের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে পানিতে পরিণত হচ্ছে। বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরের আয়তন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ফলে সূর্যের মারাত্মক অতিবেগুনি রশ্মি প্রাণিজগৎকে স্পর্শ করবে। দূষণের ফলে উদ্ভিদ ও জীবজগৎ আজ বিপন্ন। সমুদ্রে-নদীতে-জলাশয়ে মাছের সংখ্যা দিন দিন কমছে। মাছের শরীরে নানা রোগ দেখা দিচ্ছে। নদী ও অন্যান্য মিঠা পানির মধ্যে শিল্প বর্জ্য ফেলার ফলে বিভিন্ন রোগে প্রতি বছর কমপক্ষে ১.৪ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।

বিশ্বের প্রতিটি দেশকে কার্বন-ভিত্তিক শক্তির ওপর নির্ভরতা থেকে পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। এজন্য উন্নত দেশগুলিকে অবশ্যই দুটি মূল জরুরি পদক্ষেপের জন্য দায়বদ্ধ হতে হবে। এর একটি হলো ক্ষতিকারক নির্গমন কমাতে হবে। উন্নত দেশগুলিকে জরুরিভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ৭০০-৮০% এর নির্গমন কমিয়ে আনতে হবে। আরেকটি হলো উন্নত দেশগুলিকে অবশ্যই জ্বালানি উৎসগুলির জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর করবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলি কমানোর জন্য অর্থ সরবরাহের মাধ্যমে অনুন্নয়নশীল দেশগুলিকে সহায়তা করতে হবে।

বর্তমানে মার্কিন সামরিক বাহিনী হল গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির একক বৃহত্তম প্রাতিষ্ঠানিক নির্গমনকারী। মার্কিন সামরিক বাহিনীর গ্রিনহাউস নির্গমন কমিয়ে আনতে হবে। এছাড়া অনুন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য জলবায়ু ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। উন্নত দেশগুলির জলবায়ু নিঃসরণের ফলে যে ক্ষতি সেই ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। যেসব দেশ জল, মাটি এবং বায়ুকে বিষাক্ত এবং বিপজ্জনক পারমাণবিক বর্জ্যসহ দূষিত করেছে তারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যয় বহন করবে।

পরিবেশ রক্ষায় সব দেশকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রকৃতি না বাঁচলে আমরা বাঁচবো না। আসুন পরিবেশকে ধ্বংস না করে প্রাণ-প্রকৃতিকে রক্ষা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.