বিলাপে নয়, বিপ্লবে হোক-শেকল ভাঙ্গার পদযাত্রা

“নারী এবার তুমি শেকল ভাঙ্গো” এ প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে পুরুষতান্ত্রিকতার প্রচলিত প্রথা ভেঙ্গে একটা দেশের নাগরিক হিসেবে, মানুষ হিসেবে নারীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার যে অধিকার তার কার্যকরী প্রয়োগ না করার প্রতিবাদে এবং নাগরিক হিসেবে নারীদের নিরাপত্তা রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে না পারার প্রতিবাদে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় একদল প্রতিবাদী নারী “শেকল ভাঙ্গার পদযাত্রা” নামে একটি পদযাত্রার আয়োজন করেছে।

আজ (১৩ অক্টোবর) মঙ্গলবার রাত ১১ টা ৫৯ মিনিটে শেকল ভাঙ্গার এ পদযাত্রা রাজধানীর শাহবাগ থেকে শুরু হবে। পদযাত্রার রুট নির্ধারণ করা হয়েছে শাহবাগ- সিটি কলেজ- কলাবাগান- মানিকমিয়া এভিনিউ। মানিকমিয়া এভিনিউতে পৌঁছে প্রতিবাদী নারীরা প্রতিবাদ সমাবেশ করবে বলে এ আয়োজনের সংগঠকরা একতা টেলিভিশনের প্রদিবেদককে নিশ্চিত করেছেন।

১৩ই অক্টোবর রাত ১১ টা ৫৯ মিনিটে আমাদের পদযাত্রা শুরু হবে। পদযাত্রার আগে আমাদের কিছু প্ল্যাকার্ড লিখার, মশাল বানানোর কাজ আছে, যেগুলো আমরা সবাইকে নিয়েই করতে চাই৷ এজন্য সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকেই আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র এরিয়ায় (টিএসসি) থাকবো। এই কাজে ইচ্ছুক যে কেউ আমাদের সাথে তখন যোগ দিতে পারেন।

এ পদযাত্রার অন্যতম সংগঠক শ্রবণা শফিক দীপ্তি তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, “আমাদের এ পদযাত্রায় অংশ নিতে পারবেন যেকোনো শ্রেণীপেশার, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে যেকোনো ‘নারী’। আমরা অন্য সকল পরিচয় ঝেড়ে ফেলে, শুধুমাত্র লৈঙ্গিক পরিচয় ‘নারী’ হওয়ার কারণে যে বৈষম্য-অত্যাচার-যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছি প্রতিনিয়ত, তার প্রতিবাদে গলা তুলে রাস্তায় হাঁটবো, সদর্পে।”

তিনি আরো বলেন, “আমরা কারা?” – আমরা সবাই। আমরা গার্মেন্টসকর্মী, আমরা চাকরীজীবী, আমরা গৃহকর্মী, আমরা নেত্রী, আমরা গৃহিণী, আমরা শিক্ষার্থী, আমরা জনতা, আমরা সবাই। আমরা মানে আপনি-তুমি-তুই। আমাদের কোনো পরিপুষ্ট রাজনৈতিক মদদ নেই, নেই কোনো কোলাবোরেটেড প্লাটফর্ম। আমরা কয়েকজন নারী, নারী পরিচয়ে আপনাদের সকলের সাথে একাত্ম হতে চাই। আমাদের যুদ্ধ এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। আমাদের সংগ্রাম নারী হওয়ার কারণে প্রতিনিয়ত নিপীড়নের শিকার হওয়ার বিরুদ্ধে। আমাদের লড়াই সকল যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদে। আমরা সুস্পষ্টভাবে ১২ টি দাবী নিয়ে কালকে রাজপথে হাঁটবো, কারণ আমরা স্বাধীন মানুষের মতো বাঁচতে চাই। আমরা আমাদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা চাই। এই আমাদের শেকল ভাঙ্গার ছল।
চলন-বলন-পোষাক রাখো; রাষ্ট্র এবার দায় নাও!
দিনে হোক রাতে হোক; সামলিয়ে রাখো চোখ।
বিলাপে নয়, বিপ্লবে হোক।”

শেকল ভাঙ্গার এ পদযাত্রার দাবীগুলো নিম্নরুপ:

১। সারাদেশে অব্যাহত ধর্ষণ-যৌন সহিংসতার সাথে যুক্তদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক ও ন্যায্য শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
২। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদন্ডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আইনে ও সামাজিকভাবে ধর্ষণের সংজ্ঞায়ন সংস্কার করতে হবে।
৩। পাহাড় ও সমতলের সকল নারীদের ওপর সকল প্রকার যৌন এবং সামাজিক নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে।
৪। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বয়স-লৈঙ্গিক পরিচয় নির্বিশেষে যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে যেকোনোভাবেই ‘ভিক্টিম ব্লেমিং’ (দোষারোপ করা/নিন্দা জানানো) বন্ধ করতে হবে। গ্রামীণ সালিশ/পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ধর্ষণের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
৫। প্রাথমিক লেভেল থেকেই পাঠ্যপুস্তকে যৌন শিক্ষা (গুড টাচ ব্যাড টাচের শিক্ষা, সম্মতি বা কনসেন্ট এর গুরুত্ব, প্রাইভেট পার্টস সম্পর্কে অবহিত করা) যোগ করতে হবে।
৬। ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর ১৫৫(৪) ধারা বিলোপ করতে হবে এবং মামলার ডিএনএ আইনকে সাক্ষ্য প্রমাণের ক্ষেত্রে কার্যকর করতে হবে।
৭। হাইকোর্টের নির্দেশানুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ সরকারি, বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে নারী নির্যাতন বিরোধী সেল কার্যকর ও পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। সিডো সনদে বাংলাদেশকে স্বাক্ষর ও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক সকল আইন ও প্রথা বিলোপ করতে হবে।
৮। মাদ্রাসার শিশুসহ সকল শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হলে ৯০ দিনের মাঝে দ্রুততম ট্রাইব্যুনালে অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা।
৯। জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুমোদিত পাঠ্যপুস্তকে নারী অবমাননাকর বার্তা প্রকাশ ও প্রচার করা নিষিদ্ধ করতে হবে।
১০। রাস্তাঘাটে নারীদের অযথা পুলিশি ও অন্যান্য হয়রানি বন্ধ করতে হবে। গণপরিবহনে নারীদের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে।
১১। ধর্মীয় বক্তব্যের নামে অনলাইনে ও অফলাইনে নারী অবমাননাকর বক্তব্য প্রচার বন্ধ করতে হবে।
১২। যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের সুবিধার্থে হটলাইনের ব্যবস্থা চালু করতে হবে।