বিপ্লবী নায়ক কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

কমরেড ফরহাদকে প্রথম দেখেছিলাম ১৯৬৫ সালে। ‘কবীর ভাই’ নামে তাঁকে জানতাম। পরে জেনেছিলাম, এই ‘কবীর ভাই’ই হলেন পার্টির আন্ডারগ্রাউন্ড নেতা কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ। ডাকনাম বাদল।

কমরেড ফরহাদের সঙ্গে দুই দশকের বেশি সময় একসঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পথ চলেছি। সভা-সমাবেশ-মিছিল-বৈঠকে, আত্মগোপন অবস্থায় গোপন ‘ডেনে’, যুদ্ধক্ষেত্রে গেরিলা ক্যাম্পে, বিদেশে, মাসের পর মাস জেলখানায় পাশাপাশি চৌকিতে থেকেছি। কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সংস্থাতেও তাঁর মৃত্যুর আগপর্যন্ত একসঙ্গে কাজ করেছি।

জনসভায় তিনি যুক্তি দিয়ে বক্তৃতা করতেন। ফরহাদের বক্তৃতায় অ্যাজিটেশন থাকত কম। রাজনীতির গূঢ় কথা যারা শুনতে আগ্রহী, তারা গভীর মনোযোগের সঙ্গে তাঁর কথা শুনত এবং তাঁর বক্তব্য যে বোঝা গেছে, এ বিষয়ে সন্তুষ্টি নিয়ে সে ধরনের সব মানুষ ফিরত।

কমরেড ফরহাদ অসাধারণ কোনো তাত্ত্বিক ছিলেন না। প্রায়োগিক অবস্থান থেকে তিনি তত্ত্বের দিকে হাত বাড়াতেন। বাস্তব প্রয়োজনে যেসব তত্ত্ব খুব গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক, সেসবের ওপর ফরহাদের দখল ছিল ভালো। বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনি বাস্তব জ্ঞানের সঙ্গে তত্ত্বকে যুক্ত করে কাজ করতেন। কমরেড ফরহাদের কাজে প্রয়োগের দিকটি প্রাধান্য পেত। এর কারণ হলো, তাঁর দৈনন্দিন রাজনৈতিক কাজগুলো এত বহুমাত্রিক, বিস্তৃত ও প্রসারিত ছিল যে তত্ত্বচর্চায় আরও মনোযোগ দেওয়ার মতো সময় তিনি পেয়ে উঠতেন না।

কমরেড ফরহাদ ছিলেন একধরনের সুনির্দিষ্টবাদী ‘পার্টিকুলারিস্ট’ এবং একই সঙ্গে বিশুদ্ধবাদী বা ‘পারফেকশনিস্ট’ ধাঁচের মানুষ। কাজকর্ম সম্পর্কে কর্মীদের ব্রিফিং করার সময় তিনি ডিটেইলসে চলে যেতেন। কাজের প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ নিখুঁত হতে হবে, কর্মীদের প্রতি তাঁর সব সময় এরূপ প্রত্যাশা থাকত। কর্মীরা এ কারণে তাঁর প্রতি একটা ভয়মিশ্রিত সম্মানবোধ অনুভব করত।

ছোট-বড় কোনো ঘটনা, সেটা রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বা অন্য যা কিছুই হোক না কেন, তা সাজিয়ে–গুছিয়ে সুন্দরভাবে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অতুলনীয় প্রতিভাসম্পন্ন একজন সংগঠক। তিনি প্রথমে একটি নিখুঁত পরিকল্পনার ছক নিজের মনে এঁকে নিয়ে কাজটির বিভিন্ন অংশ সম্পাদনের জন্য উপযুক্ত কর্মীদের দায়িত্ব দিতেন। কাজের জন্য একটি কর্মী টিম গড়ে তুলে সেই টিমকে উদ্বুদ্ধ করে কাজে নামিয়ে দিতে পারতেন।

রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণে ফরহাদ ছিলেন অসাধারণ ধীসম্পন্ন। রাজনৈতিক ট্যাকটিশিয়ান হিসেবেও তিনি ছিলেন অনন্য প্রতিভার অধিকারী। রাজনৈতিক, সাংগঠনিক সব বিষয়কে তিনি যেমন তাৎক্ষণিকতার মাপকাঠিতে বিচার করতেন, তেমনি সময়ের আরও বিস্তৃত ক্যানভাসে বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারতেন। কাজের কৌশল তিনি এমনভাবে গ্রহণ করতেন, যাতে নির্ধারিত দূরবর্তী লক্ষ্যাভিমুখে কাজের একটি সচল গতিমুখীনতা থাকে। সেই গতিমুখীনতার স্টিয়ারিংটি ধরা থাকত তাঁর নিজের হাতে। এভাবে তিনি হয়ে উঠতেন সমগ্র কর্মপ্রক্রিয়ার একটি প্রধান নির্ধারক শক্তি, তার অপরিহার্য কেন্দ্রীয় উপাদান।

গণ-আন্দোলনের গতিধারা সম্পর্কে ফরহাদের অসাধারণ প্রায়োগিক জ্ঞান ছিল। আন্দোলনের গতি সম্পর্কে তিনি খুব ভালো হিসাব করার ক্ষমতা রাখতেন। কখন এগোতে হবে আর কখন পেছাতে হবে, কিংবা কখন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে আর কখন সর্বশক্তি নিয়ে আক্রমণ পরিচালনা করতে হবে—এসব বিষয়ে তাঁর প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞান ছিল অসাধারণ। ষাটের দশকের আইয়ুব শাহির বিরুদ্ধে সংগ্রামসহ বিভিন্ন পর্যায়ের গণ-আন্দোলনের প্রক্রিয়াকে পরিচালনার ক্ষেত্রে অনন্যসাধারণ দক্ষতার প্রমাণ তিনি রাখতে পেরেছিলেন। কমরেড ফরহাদকে তাই বাষট্টির ছাত্র আন্দোলনের মস্তিষ্ক, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের নেপথ্যের স্থপতি, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের কন্ট্রোল রুমের নায়করূপে ভূষিত করা হয়ে থাকে।

কমরেড ফরহাদ মুক্তিযুদ্ধের একজন শীর্ষ সংগঠক ছিলেন। পার্টির শক্তিকে সশস্ত্র যুদ্ধের কাজে সুশৃঙ্খলভাবে নিয়োজিত করা, ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সামরিক সংগঠন পরিচালনাসহ মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি বিশেষ বিচক্ষণতার পরিচয় দেন।

তিনি একজন বিশাল ক্যারিশমাসম্পন্ন জননেতা না হয়েও জাতীয় রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় অবস্থানে চলে যেতে পেরেছিলেন। তিনি ছিলেন নেতাদের ‘নেতা’। নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, নিয়মিত খোঁজখবর, পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাৎ, সলাপরামর্শ—এগুলো দিয়ে ভরে থাকত তাঁর ‘দৈনিক রুটিন’। অনেকেই তাঁর কাছে বুদ্ধি নেওয়ার জন্য আসত এবং সবাই তাঁর পরামর্শকে মূল্য দিত।

কমরেড ফরহাদ ভেতরে-ভেতরে খুবই রোমান্টিক মনের মানুষ ছিলেন। ছিলেন অনুভূতিপ্রবণ ও গভীরভাবে সংবেদনশীল। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে তিনি ভালোবাসতেন। জমিয়ে আড্ডা মারতে, মন খুলে হাসি-ঠাট্টা করতে পছন্দ করতেন তিনি।

কমরেড ফরহাদ স্বপ্ন দেখতেন বিপ্লবের। সময় যেন তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। সমাজবিপ্লবের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রাণান্তকর প্রয়াসে তিনি তাঁর সর্বসত্তা নিবেদন করেছিলেন। তিনি ঘটনাবলিকে ইচ্ছাশক্তি দিয়ে ত্বরিতগতিতে প্রবাহিত করার নানা প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন। ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ নয় এমন কিছু কৌশলী পদক্ষেপও তিনি গ্রহণ করতেন।

শেষনিশ্বাস পর্যন্ত তিনি ছিলেন সর্বাংশে একজন কমিউনিস্ট। সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ ও মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের আদর্শের প্রতি তিনি ছিলেন একনিষ্ঠভাবে আত্মনিবেদিত। তাঁর সমস্ত জীবন, সত্তা ছিল সর্বতোভাবে পার্টির জন্য নিবেদিত। কমরেড ফরহাদ ও কমিউনিস্ট পার্টি ছিল এক নাড়িতে বাঁধা, অভিন্ন সত্তা। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন জাতীয় নেতা।

চিরঞ্জীব কমরেড ফরহাদ, লাল সালাম!

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ৯ অক্টোবর ২০২০। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.