বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এগিয়ে নিতে হবে শ্রেণি-পেশার সংগ্রাম

কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন

করোনায় বিশ্বব্যাপী তাণ্ডব চলছেই। প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে করোনা। সারা দুনিয়া স্থবিরতার মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতি বিরাজমান সত্ত্বেও পৃথিবীর দেশে দেশে লুটেরা বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠীর শাসন, শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চনা অব্যাহত রয়েছে। আমাদের দেশও এর বাইরে না। দেশে এখন ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন চলছে। মানুষের কণ্ঠরোধ করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান শাসক গোষ্ঠীর আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে লুটপাট দুর্নীতির মহোৎসবে মেতে উঠেছে এক শ্রেণির মানুষ।

শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের জীবন আজ দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ জীবন জীবিকা রক্ষা করতে পারছে না। ফলে শহর থেকে গ্রামে ফিরছে। সরকারের পক্ষ থেকে লুটেরা ধনীক গোষ্ঠীর স্বার্থে আর্থিক প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষ সেখানেও বঞ্চিত হচ্ছে। যারা দেশ শাসন করছে তাদের জনগণের প্রতি কোনো দায়-দায়িত্ব নেই বলেও প্রতীয়মান হচ্ছে। লুটেরা ধনীক শ্রেণি, আমলাতন্ত্র, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিদেশি শক্তির উপর নির্ভর করে বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনা করছে। দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে কথা বললেই কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। জেল জুলুম বাড়ছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে নির্মমভাবে শ্রমিক হত্যা করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।

সম্প্রতি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি বিশেষভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম দুর্নীতি লুটপাটের খবর সারাদেশের মানুষ জানে কিন্তু এই লুটপাটকারীরা দুর্নীতিবাজরা বহাল তবিয়তে আছে। করোনা ভ্যাকসিন নিয়েও চরম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে ভূ-রাজনীতির নোংরা খেলায় বাংলাদেশ জড়িয়ে পড়েছে। ভারতের সাথে চুক্তি মোতাবেক টিকা না পাওয়া, চীনের কাছ থেকে টিকা কেনা, আমেরিকা ও রাশিয়ার কাছ থেকে টিকা কেনার চেষ্টা, ভারতের বিরোধিতা বাংলাদেশকে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ক্রমাগত বেড়ে চলছে। সিন্ডিকেট তৈরি করে এক শ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ীরা প্রচুর মুনাফা লুটে নিচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বড় বড় প্রকল্প নেয়া হচ্ছে সেখানেও চলছে বড় বড় লুটপাট। সরকার নির্বিকার। আমলাতন্ত্র এতোটা শক্তিশালী যে সরকার তাদের কাছে মাথা নত করে আছে।

আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। খুন, ধর্ষণ, নিপীড়ণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আইন আদালতও আজকে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। ধনীর পক্ষে আইন গরিবের পক্ষে আইন নেই– এই নীতিতে দেশ চলছে। শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ হতাশা ক্রমশ বেড়েই চলছে। কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের দাম পাচ্ছে না, ক্ষেতমজুরের জন্য পল্লী রেশনিং ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি বর্তমান সরকার দিলেও তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না বরং গ্রামাঞ্চলে এনজিও ঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ হচ্ছে না। পাটকল ও চিনিকল বন্ধ করা হয়েছে এবং লুটেরা ধনীদের কাছে লিজ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বড় বড় ভারী শিল্পগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সার্বিকভাবে বলা যায় বর্তমান সরকারের নীতিহীন শাসনের ফলে দেশ সংকটের মুখে পড়েছে। এই সংকটকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার মত কোনো শক্তিই এই মুহূর্তে প্রতীয়মান হচ্ছে না। বুর্জোয়া রাজনীতির ন্যূনতম নীতি নৈতিকতাও আজ ভুলুণ্ঠিত। রাজনীতিতে চলছে শূন্যতা। এই শূন্যতা কীভাবে পূরণ হবে? এই প্রশ্নও আজ উঠেছে। লুটেরা বুর্জোয়া রাজনীতির বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের শক্তিশালী রাজনীতিই এই শূন্যতা পূরণ করতে পারে। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের এই রাজনীতিকে অগ্রসর করার জন্য কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদেরই এগিয়ে আসতে হবে। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও আন্দোলনকে বেগবান করতে হবে।

বামপন্থি রাজনীতিরও সংকট চলছে এটাকেও অস্বীকার করা যাবে না। কৃষক-শ্রমিক-ক্ষেতমজুর-বস্তিবাসী-রিকশা ভ্যান-হকার অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকসহ সমাজের নানা শ্রেণি পেশার আন্দোলনে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। পরিকল্পিত ধারাবাহিকভাবে এই শ্রেণির মধ্যে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের প্রতিটিমুহূর্তে শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করেই অগ্রসর হতে হবে। অন্যথায় রাজনীতির ক্ষেত্রে ভুলের সম্ভাবনা থেকে যায়। একদিকে যেমন শ্রেণির লড়াই তীব্র করতে হবে পাশাপাশি জাতীয় জীবনের সংকট মোচনের লক্ষ্যে আন্দোলনও গড়ে তুলতে হবে। কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের শুধুমাত্র দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না তৃণমূল থেকে নানা ধরনের সংগ্রাম গড়ে তোলা ছাড়া এই লুটেরা বুর্জোয়া শাসন শোষণ থেকে দেশ, জাতিকে মুক্ত করা যাবে না। তবে এটাও লক্ষ্য রাখতে হবে বামপন্থি আন্দোলন ততো সহজে গড়ে উঠবে না। লুটেরা ধনীক শ্রেণি প্রতিটি মুহূর্তে এই সংগ্রামে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে সামাজিক, শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিকসহ নানাভাবে প্রচার প্রচারণার মাধ্যমে কমিউনিস্ট বামপন্থি আন্দোলনের কর্মী সমর্থকদের বিভ্রান্ত করবে। কেননা আমরা বামপন্থিরা লড়াই করছি গণতন্ত্রহীনতা, লুটেরা ধনীক গোষ্ঠী, সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। এরা খুবই শক্তিশালী।  এরা তাদের শাসন শোষণ টিকিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন বামপন্থি দলের মধ্যে নিষ্ক্রিয়তা, দলাদলি, আর্থিক প্রলোভন, শ্রমজীবী, মেহনতি মানুষের সংগ্রাম থেকে কমিউনিস্ট ও বামপন্থি নেতাকর্মীদের দূরে রাখা, সুবিধাবাদী মানুষের রাজনৈতিক ধারাকে মদদ দেয়া, তত্ত্ব ও তথ্যকে বিকৃত করা, রাজনীতির প্রতি অনীহা তৈরি করা তথা বিরাজনীতিকরণসহ নানা ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। এই ক্ষেত্রে প্রত্যেক কমিউনিস্ট বামপন্থি নেতা কর্মীদেরও সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের বামপন্থি কর্মীদের অনেকের ধারণা আছে যে আমরা ছোট শক্তি আমাদেরকে আঘাত করবে কেন? এই ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন আমাদের শত্রুপক্ষ এটা ভাবে না। কেননা তারা মনে করে শত্রু-শত্রুই একে কোনোভাবেই ছাড় দেয়া যায় না। এদেরকে মোকাবেলা করার জন্য শ্রেণি-পেশার সংগ্রামকে তীব্রতর করতে হবে।

এই সংগ্রামকে জাতীয় সংকটের লড়াইয়ের সাথে যুক্ত করে অগ্রসর হতে পারলেই বামপন্থি কমিউনিস্টদের বিজয়ী হওয়া সম্ভব। এই কঠিন সংগ্রামে জয়ী হতে হলে রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে আন্তরিকতার সাথে সকল প্রকার সুবিধাবাদ, ষড়যন্ত্রকারীদের মোকাবেলা করতে হবে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থায় প্রেক্ষাপটে প্রত্যেক কমিউনিস্ট ও বামপন্থি কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে যাওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

লেখক: সহসাধারণ সম্পাদক, সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.