বিজয় দিবস: সুবর্ণজয়ন্তীর ভাবনা মুক্তিযুদ্ধকে চিরঞ্জীব করুন

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম  

একাত্তরে জাতি যে কালজয়ী বিজয় অর্জন করেছিল তার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর অতিক্রান্ত হলো। এ বিজয় আমাদের এক অনন্য গৌরবের অর্জন। যে লাখো শহীদদের আত্মদানের বিনিময়ে সেদিনের সেই বিজয় সম্ভব হয়েছিল তাদের স্মরণে ‘সালাম সালাম, হাজার সালাম’।

বাঙালি বীরের জাতি। বাইরের কোনো শক্তি তাকে কখনো বেশিদিন দাবিয়ে রাখতে পারেনি। বিদেশি ও বিজাতীয় আধিপত্যকে সে বারংবার রুখে দাঁড়িয়েছে। বুকের রক্ত ঢেলে সে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। কিন্তু বাঙালির দুর্ভাগ্য – যে বিজয়কে সে রক্ত দিয়ে ছিনিয়ে আনতে জানে, সেই বিজয়কে সে ধরে রাখতে পারে না। বিজয় লাভ করেও বারবার সে পরাজিত হয়। পরাজিত হয়ে পুনর্বার তাকে নতুন করে বিজয় অর্জন করতে হয়।

দুই যুগের ধারাবাহিক সংগ্রাম ও নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমপর্ণের মধ্য দিয়ে আমরা এক অমর বিজয় গাঁথা রচনা করতে সক্ষম হয়েছিলাম। কিন্তু বিজয়ের সেই অমূল্য কীর্তিকে আমরা রক্ষা করতে পারিনি। যাত্রার শুরুতেই সঙ্গ নিয়েছিল পিছুটান। শুরু হয়েছিল আত্মস্বার্থ ও দলীয় স্বার্থের টানে পদস্খলনের পালা। সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা ও প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে উল্টোমুখী যাত্রা শুরু হয়েছিল। ‘গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা-জাতীয়তাবাদ-সমাজতন্ত্র’, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে রাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়ে দেশে স্বৈরাচার, ধর্মীয় ও জাতিগত সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ নির্ভরতা ও ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির’ অবাধ শোষণের ধারা ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। ফিরিয়ে আনা হয়েছিল ‘পাকিস্তানি ধারার’ প্রেতাত্মা।

একইসাথে দেশ নিপতিত হয়েছিল সামরিক স্বৈরশাসনের কবলে। দেড় দশক ধরে চলেছিল সেনা-শাসন অথবা বেসামরিক লেবাসে সামরিক স্বৈরশাসন। এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনরোষ পুঞ্জিভূত হতে হতে তা ১৯৯০ সালে

গণবিস্ফোরণের রূপ নিয়েছিল। পতন ঘটেছিল সামরিক স্বৈরশাসনের। শুরু হয়েছিল নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের অধ্যায়। তারপর পার হয়েছে ৩১ টি বছর। স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামের অগণিত শহীদদের মধ্যে একজন ছিলেন বুকে ও পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’, ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগান লিখে রাজপথে স্বৈরাচারবিরোধী মিছিলে নামা শহীদ নূর হোসেন। কিন্তু আজও স্বৈরাচারী ব্যবস্থার নিপাত ঘটেনি। গণতন্ত্র মুক্তি পায়নি। যদিও, এই সময়কালে বিএনপির নেতৃত্বে দুবার ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে চারবার সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। তাছাড়া, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বছর দেশ শাসন করেছে। এই ৩১ বছরে হারিয়ে গেছে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণবিস্ফোরণের বিজয় সম্ভার। হারিয়ে গেছে তিন জোটের রূপরেখায় প্রদত্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা, প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সব কালাকানুনের অবসান ইত্যাদি সম্পর্কে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য অর্জনগুলোর মতো, নব্বইয়ের বিজয়েরও প্রায় সবটা আজ হাতছাড়া!

মুক্তিযুদ্ধ ছিল ইতিহাসে বাঙালির শ্রেষ্ঠতম অর্জন। সে অর্জনের শ্রেষ্ঠত্ব কেবল ভৌগলিকভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সে অর্জনের তাৎপর্য ছিল আরো অনেক গভীর। পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে একাত্তরের সশস্ত্র সংগ্রাম ‘পাকিস্তানকে দু’টুকরো করার’ জন্য কোনো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ লড়াই ছিল না। তা ছিল ‘জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের’ ধারায় পরিচালিত একটি লড়াই। তা ছিল পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ পরিচালিত জাতিগত শোষণের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার লড়াই। পাশাপাশি এই লড়াই ছিল শ্রেণিগত শোষণ ও শ্রেণি বৈষম্যের হাত থেকে পরিত্রাণের জন্য গণমানুষের লড়াই। এটি ছিল একটি জনযুদ্ধ।

পাকিস্তানের একটি খণ্ডিত নবসংস্করণ প্রতিষ্ঠা করা মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল না। ‘ধর্মের ভিত্তিতে জাতি গঠিত হয়’ – এই মতবাদকে ভিত্তি করে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছিল। এ বিষয়ে গৃহীত ‘লাহোর প্রস্তাবে’ পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে ‘একাধিক’ রাষ্ট্রের সমন্বয়ে পাকিস্তান গঠনের পরিকল্পনা হাজির করা হয়েছিল। জিন্নাহ সাহেব পরে কারসাজি করে বহুবচনবোধক ‘একাধিক’ শব্দটি পরিবর্তন করে অখণ্ড একক ও এককেন্দ্রীক পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণা চাপিয়ে দেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে অনেকে ‘লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন’ হিসেবে রূপায়িত করার চেষ্টা চালিয়েছেন। তাদের কথা অনুসারে, ধর্মের ভিত্তিতে জাতি গঠিত হয় এবং মুসলমানরা পৃথক জাতি – এই তত্ত্ব মেনে নিয়ে সেই ভিত্তিতে বঞ্চিত ‘বাঙালি মুসলমানদের’ স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের মতবাদ দ্বারা মুক্তিযুদ্ধের চরিত্রকে চিত্রায়িত করার চেষ্টা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধকে বাঙালি মুসলমানদের জন্য ‘পাকিস্তানের’ অনুরূপে একটি স্বাধীন ‘বাংলাস্থান’ বা ‘মুসলিম বাংলা’ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বলে দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু এ সবই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণীকে আড়াল করে তার ওপর ‘পাকিস্তানি ভূত’ চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াস মাত্র। এই প্রয়াস সফল হয়নি।

দীর্ঘকালীন গণসংগ্রামের ধারা, এবং বিশেষত নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধকালে মেহনতি মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও তার স্বপক্ষে প্রগতিশীল বিশ্বের সমর্থনমূলক মেরুকরণ, লড়াইকে প্রকৃত জাতীয় মুক্তি ও প্রগতির ধারায় সুদৃঢ়ভাবে উত্তোরিত করেছিল।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানের ‘মানচিত্র’ ও ‘মতবাদ’ উভয় বিষয়কে নেতিকরণের (negation) জন্য একটি আন্দোলন-লড়াই। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে বেরিয়ে এসে নতুন একটি রাষ্ট্রীয় বাস্তবতাকে রূপ দেয়ার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তানের কৃত্রিম ও প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শ ও ব্যবস্থা নাকচ করে ভিন্ন ধরনের চরিত্রসম্পন্ন একটি রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল। পাকিস্তানি ভাবাদর্শগত ও ব্যবস্থাগত বৈশিষ্ট্যের সাথে ‘ছেদ’ ঘটিয়ে জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশ। এবং সূচিত হয়েছিল তার নতুন পথে যাত্রা করার এক অমূল্য সম্ভাবনা।

যে কোনো রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় সব সময়ই ‘ছেদ (discontinuity) ও সাথে সাথে ‘অ-ছেদ’ (continuty)-র প্রক্রিয়া পাশাপাশি বিরাজ করে। গুণগত রূপান্তরের সময় তার মৌলিক উপাদানগুলোতে ‘ছেদ’-এর থাকে প্রাধান্য। কিন্তু সংস্কারমূলক বিবর্তনের সময় ‘অ-ছেদ’-এর ধারাই হয় প্রধান। বাংলাদেশের জন্ম চরিত্রগতভাবে ছিল পাকিস্তান থেকে ‘ছেদ’-এর একটি বিপ্লবী প্রক্রিয়া। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের সময় সেই ‘ছেদ’-এর বিষয়টি সবক্ষেত্রে প্রাধান্য না পেয়ে ‘অ-ছেদ’-এর ধারা প্রাধান্য লাভ করেছিল। আইন-কানুন, প্রশাসন-আমলাতন্ত্র, বিধি-ব্যবস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে বহাল রাখা হয়েছিল পরিত্যক্ত পাকিস্তানি ব্যবস্থা (যার একটি প্রধান অংশ আবার ছিল ব্রিটিশ শাসনকালের ধারাবাহিকতা হিসেবে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত)। অথচ ’৭২ সালে দেশের সংবিধান রচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রগতিমুখীন চেতনা ও ধারার ভিত্তিতে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পরবর্তীকালের পদস্খলনের প্রধান উৎস হলো এই ‘ছেদ’ ও ‘অ-ছেদ’-এর মধ্যে উপযুক্ত ভারসাম্য স্থাপনে ত্রুটি। ‘ছেদ’-এর চেয়ে ‘অ-ছেদ’-কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল বেশি। ফলে শুরু থেকেই পুরনো ব্যবস্থা ও ভাবাদর্শ ক্রমেই প্রাধান্য বিস্তার করতে শুরু করে। পুরনো ব্যবস্থা ও ভাবধারার সুবিধা হলো এখানেই যে সে ‘চলতি হাওয়ার’ সুবিধা পায়। সেই সুবিধাকে নাকচ করে নতুনের আবাহন নিশ্চিত করতে তাই প্রয়োজন হয় ‘ছেদ’-এর ধারায় শক্তিশালী ধারাবাহিক ও সুদৃঢ় সচেতন প্রয়াস। কিন্তু স্বাধীন দেশে সেসব প্রাতিষ্ঠানিক, আইনগত, ব্যবস্থাগত, সাংস্কৃতিক-সামাজিক-চেতনাগত প্রয়াস গ্রহণ করা হয়নি।

এভাবে সুদূরপ্রসারী ও গভীরতাসম্পন্ন চিন্তা ও কর্ম সম্পাদনের জন্য মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল অক্ষম। শ্রেণিগত দুর্বলতার কারণেই এটি তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। অর্থনৈতিক-সামাজিক মুক্তির পথে দেশকে এগিয়ে নিতে মধ্যস্তরের নেতৃত্বে পরিচালিত আওয়ামী লীগ দল সক্ষম হয়নি। তার নানা সীমাবদ্ধতা, ত্রুটি-বিচ্যুতির সুযোগ নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ষড়যন্ত্র চালাতে ও আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছিল। দেশকে তারা উল্টোমুখী পথে নিয়ে যেতে পেরেছিল। খুনি মোশতাকের পর বিএনপি ও জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় বসে সেই পথকে স্থায়িত্ব দেয়ার চেষ্টা করেছে।

আওয়ামী লীগ দু’দফায় ৪ মেয়াদকাল ক্ষমতায় থাকতে পারলেও সে আজও দেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় পরিপূর্ণভাবে ফিরিয়ে আনেনি। সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ফিরিয়ে আনলেও এরশাদের ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ ও জিয়াউর রহমানের ‘বিসমিল্লাহ…’ বহাল রেখেছে (যা কিনা আবার কখনো কোনভাবে পরিবর্তন করা যাবে না বলে সংবিধানের অন্য এক ধারা দ্বারা চিরস্থায়ী করে দিয়েছে)। সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্র’ লিখে রাখলেও সে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির পথ ধরেই পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন, খোলাবাজার, পুঁজিবাদী নয়া- উদারবাদ, বিনিয়ন্ত্রণ, উদারিকরণ ইত্যাদি নীতি অনুসরণ করে দেশ চালাচ্ছে। ফলে শোষণ-বৈষম্য বাড়ছে। গরিব মানুষের জীবনে অসহায়ত্ব ও দুর্গতি বাড়ছে। ‘জাতীয়তাবাদ’ লিখে রাখা সত্ত্বেও নানা চুক্তি স্বাক্ষর করে দেশকে স্থায়ীভাবে সাম্রাজ্যবাদের শিকলে বেঁধে ফেলে জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে ভুলুণ্ঠিত করেছে। ‘গণতন্ত্র’-এর কথা বললেও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ, এমনকি তাদের ভোটাধিকারের হরণ করেছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে, ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব, পরিবারতন্ত্র, দলতন্ত্র, গোষ্ঠীতন্ত্র ও আমলাতন্ত্রের থাবার নিচে গণতন্ত্রকে পিষ্ট করে চলেছে। জনসমর্থন না থাকায় সে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রসহ ‘রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর’ ওপর নির্ভর করে গদি দখল করে রাখার ব্যবস্থা করেছে। ফলশ্রুতিতে সরকার ও রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ফ্যাসিস্ট প্রবণতার প্রসার ঘটছে।

জামায়াতে ইসলামী প্রমুখ স্বাধীনতাবিরোধী উগ্র সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট দল ও শক্তি দেশকে পুরোপুরি ‘নয়া পাকিস্তানে’ পরিণত করার জন্য সক্রিয় রয়েছে। বিএনপি তাদের সাথে ‘ঐক্য’ করেছে। আওয়ামী লীগও প্রতিযোগিতা করে সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সাথে ‘কৌশলগত ঐক্য’ করেছে। এভাবে উভয়পক্ষের মদত পেয়ে তারা আজ বিপদজনক শক্তি হয়ে উঠেছে। বিজয়ের শেষ চিহ্নগুলোকেও ছিনিয়ে নিতে তারা মরিয়া তৎপরতা চালাচ্ছে।

সুবর্ণজয়ন্তীতে তাই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন- একাত্তরের বিজয় সম্ভার আজ কোথায়? সবই তো আজ হাতছাড়া হয়ে গেছে। তাই, আজ জাতির সামনে প্রধান কর্তব্য হলো একাত্তরের বিজয় পুনরুদ্ধার করা। মুক্তিযুদ্ধ আজও শেষ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের নতুন অধ্যায় রচনার ডাকই হল ‘বিজয় দিবসের’ সুবর্ণজয়ন্তীর’ মূল আহ্বান।

বিজয় আনতে পারলেই যে সে বিজয় রক্ষা করা যাবে তা নিশ্চিত হয়ে যায় না। একাত্তরে বিজয় আনতে যে দল ও শ্রেণি নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের পক্ষে তা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। সে বিজয় পুনরুদ্ধার করাও তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের ৫০ বছরের ঘটনাবলি সেই অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা তুলে ধরে। বিজয় অর্জন, এবং একইসঙ্গে তার সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হলে ভিন্ন ধরনের দল ও শ্রেণির নেতৃত্ব প্রয়োজন। এবার বিজয় অর্জন করার পাশাপাশি সে বিজয় ধরে রাখার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। দেশের বামপন্থি শক্তি ও শ্রমজীবী মানুষ দায়িত্ব নিলেই কেবল সেটি সম্ভব হতে পারে।

বুর্জোয়ারা ‘সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতা’-র বাণী নিয়ে ঐতিহাসিক ‘ফরাসি বিপ্লব’ সংগঠিত করেছিল। কিন্তু বুর্জোয়ারা অচিরেই ‘ফরাসি বিপ্লবের’ সেই ঝান্ডা পরিত্যাগ ও ভূলুণ্ঠিত করেছিল। কমিউনিস্টরা সেই ভূলুণ্ঠিত পতাকা হাতে তুলে নিয়ে বলেছিল, “বুর্জোয়াদের দ্বারা পরিত্যাক্ত ‘বিপ্লবের পতাকা’ ও ‘সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতা’-র বাণী পরিত্যাক্ত ও নিষ্ফল হতে দেয়া হবে না। এখন শ্রমিক শ্রেণিকেই তা প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব নিতে হবে। কমিউনিস্টদের সেই কাজে নেতৃত্ব দিতে হবে।”

মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পতাকা আওয়ামী লীগ পরিত্যাগ করেছে। সেই পতাকা, সেই স্বপ্ন, সেই ‘ভিশন’- বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ এবং কমিউনিস্ট-বামপন্থীদেরই কাঁধে তুলে নিতে হবে। এটিই আজ ইতিহাসের দাবি।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.