বিজয়ের ৫০ বছর

১৬ ডিসেম্বর ২০২১ সাল বিজয়ের ৫০তম বার্ষিকী। বিজয় মানেই আনন্দ। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বরে বিজয়ের আনন্দ অন্যরকম অনুভূতি জাগায়। কারণ, এই বিজয় সহসা অর্জিত হয়নি। হাজার বছরের বাঙালির লালিত স্বপ্ন, পাকিস্তান আমলের প্রায় সিকি শতকের গণসংগ্রাম, সর্বোপরি ১৯৭১ সালের নয় মাসের সশস্ত্র লড়াইয়ের ফসল হচ্ছে আমাদের এই বিজয় নিশান। শ্যামল সবুজ বাংলার জমিনে লাখো শহীদ বুকের রক্ত ঢেলে এনেছে রক্তিম সূর্য। তাই এই বিজয়ের অনুভূতি হৃদয়ে জাগায় অন্য এক ব্যঞ্জনা।

সবুজের বুকে লাল রক্তিম বৃত্ত মিশে আছে সব শ্রেণির, সব ধর্মের বাঙালির রক্ত। এই বিজয়ের পটভূমি রচিত হয়েছে ১৯৪৮, ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৮-৬৯ সালের জনগণের সংগ্রামে। প্রতিটি সংগ্রামেই রক্ত দিয়েছে মধ্যবিত্ত ও কৃষকের সন্তান, ছাত্রসমাজ, শ্রমিক তথা সাধারণ মানুষ। প্রতিটি সংগ্রামের গতিমুখ ছিল বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা, স্বায়ত্তশাসন, স্বাধিকার- যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপ নেয় এবং বাঙালি জাতি এই সংগ্রামে বিজয় অর্জন করে। এই দীর্ঘ ধারাবাহিক সংগ্রাম কখনো বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষার প্রশ্নে, কখনো শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে, কখনো বা স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে গড়ে ওঠে। এই পথ সহজ সরল নয়- ছিল পতন অভ্যূদয় বন্ধুর পথ। কোনো সময় এই খণ্ডযুদ্ধে আমরা বিজয় লাভ করেছি, আবার কোনো সময় পিছু হটে আরো শক্তি সমাবেশ ঘটিয়ে অগ্রসর হয়েছি।

১৯৬৬ সালে ৬ দফা দাবিতে গড়ে ওঠা সংগ্রাম এক সময় পড়ে গিয়েছিল, আবার যখন ৬ দফাকে দুই দফার মধ্যে রেখে ছাত্র, শ্রমিক, কৃষকের দাবি এমনকি পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্ন যুক্ত করে ১১ দফা প্রণয়ন করা হয়, সেই এগারো দফার ভিত্তিতেই আসে গণঅভ্যূত্থান। তারই পথ ধরে এশিয়ার লৌহমানব খ্যাত কথিত পাক সেনাশাসক কিন্তু মার্শাল আয়ূব খানের পতন হয়। এই পথ ধরেই অনুষ্ঠিত হয় সত্তরের নির্বাচন এবং এই নির্বাচনী ফলাফল বাস্তবায়ন করতে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল নানা শ্রেণির সম্মিলিত একটি জাতীয় সংগ্রাম। এই জাতীয় ঐক্যের যেমন বিরাট সবলতার দিক রয়েছে, ঠিক তেমনই এর ভেতরে নানা ¯্রােতের সংঘাত অন্তঃশলীলা প্রবাহের মত ক্রিয়াশীলও ছিল। শব্দ যেখানে ভয়ংকর সেখানে এই সংঘাতের দিকটা ছিল গৌণ, জাতীয় ঐক্যের দিকটাই ছিল প্রধান। কিন্তু বিজয় লাভের পরপরই বিভিন্ন শ্রেণি যখন যার যার পাতে ঝোল নিতে শুরু করল, বাঙালি পেটিবুর্জোয়া যখন পেটি কেটে বুর্জোয়া হওয়ার উগ্র বাসনা নিয়ে নানা তৎপরতা শুরু করল, মধ্যবিত্তের একাংশ যখন লুটপাটের মধ্যদিয়ে আখের গুছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, তখনই বিজয় তার জাতীয় রূপ হারিয়ে ফেলতে শুরু করল। শ্রমিক-কৃষক-দেশপ্রেমিক মধ্যবিত্ত, যারা বিজয় অর্জনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল, তারা এই বিজয়ের মধ্যে তাদের বিজয় খুঁজে পেল না।

পাকিস্তান আমলের উপনিবেশিক ধরনের শাসন-শোষণের অমানিশার অন্ধকার ভেদ করে ১৯৭১ সালেল ১৬ ডিসেম্বর যে প্রত্যাশায় উদিত হয়েছিল নতুন সূর্য, স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে নানা স্বার্থের টানাপোড়েনে সে প্রত্যাশা হতাশার কালো পর্দায় আবৃত হতে শুরু করে। বিজয়ের ৫০ বছরে যদি আমি একজন শ্রমিক অথবা কৃষকের দৃষ্টি নিয়ে হিসাব মিলাতে বসি তখনই বলতে হয়, হিসাবের খাতা যখনই নিয়েছি হাতে দেখেছি শুধু রক্ত খরচ তাতে। বলাই বাহুল্য, এরাই ব্যাপক সংখ্যাগুরু, তারাই স্বাধীনতার জন্য বেশি ত্যাগ করেছে, আত্মবলিদান করেছে বেশি। অথচ তাদের ঘরে এখনও বিজয়ের আনন্দ পৌঁছেনি। এই কাজ সমধা করতে না পারলে বিজয় অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

এই অসম্পূর্ণ বিজয় সম্পূর্ণ করতে হলে- অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ সমাপ্ত করতে হবে। এই যুদ্ধে ’৭১ সালের মত হয়ত শ্রেণিবিন্যাস ঘটবে না। নতুন করে শক্তির ভারসাম্য সৃষ্টি করে শাসক শ্রেণির তীব্র সংগ্রামের ভেতর দিয়ে সে লড়াই শুরু করতে হবে। সে লড়াই যতই জোরদার হবে ততই দুর্বল হবে জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ, ততই উন্মুক্ত হবে সবার স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণের দ্বার।

Leave a Reply

Your email address will not be published.