বিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তির খোঁজে

সুতপা বেদজ্ঞ  

মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। বিস্তৃত হচ্ছে বিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতি। সারাবিশে^র মত বাংলাদেশের মানুষের মধ্যেও আত্মপ্রকাশ করছে বিচ্ছিন্নতার নানা ধরন। বহুবৈচিত্র্য ও মাত্রিকতায় বিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতি আমাদের গ্রাস করছে। শোষণ-বৈষম্য-বিভেদ ও ব্যক্তি স্বার্থবোধের সংস্কৃতি থেকে জন্ম নেওয়া বিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সমার্থক হয়ে উঠেছে। এই বিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তি ছাড়া মানুষের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

কিন্তু বিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতিকে অতিক্রমের লক্ষ্য থেকে পুঁজিবাদের জন্ম হয়েছিল। আত্মপ্রকাশের সময় পুঁজিবাদের সংস্কৃতি মানুষের স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। বুর্জোয়া জাগরণের যুগে উনিশ শতকেই পুঁজিবাদের সংস্কৃতি রূপলাভ করেছিল। মানুষের স্বার্থের সঙ্গে তখন তা ছিল সঙ্গতিপূর্ণ। ভাষা ও সাহিত্যে, সঙ্গতি ও শিল্পকলায়, দর্শন ও বিজ্ঞানে, মানুষে মানুষে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশাল এক পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল। অতঃপর শুরু হয় আধুনিকতার জয়যাত্রা। মনে হতে থাকে মানুষের বুঝিবা মুক্তি আসছে।

অচিরেই পুঁজিবাদী সংস্কৃতি তার রং বদলাতে থাকে। পুঁজিবাদী সংস্কৃতির উর্বর ক্ষেত্র দখল করে নেয় মুনাফা সর্বস্বতা। আদর্শ হারিয়ে যায়। মানুষের পরিবর্তে মুনাফাই হয়ে ওঠে আরাধ্য। সবকিছুই পণ্যে পরিণত হয়। ‘পারিবারিক সম্পর্কও পরিণত হয় আর্থিক সম্পর্কে।’ ভোগবাদই হয়ে ওঠে পুঁজিবাদী সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। দেখা দেয় প্রবল ব্যক্তি স্বার্থবোধ। শুরু হয় আত্মসুখের সন্ধান। পুঁজিবাদী সংস্কৃতি ব্যক্তি মানুষকে বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ করে তোলে। পুঁজিবাদের অবশ্যম্ভাবী অনুসঙ্গ ভোগবাদ অর্থ-বিত্ত আর ক্ষমতার পেছনে ব্যক্তিকে তাড়িয়ে বেড়ায়। মানুষ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সে সুখ খুঁজতে চায়। এই ব্যবস্থার কাছে প্রতিনিয়ত আত্মসমর্পণ করে অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা করার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। নিজের মুক্তি খোঁজে অবৈজ্ঞানিক মায়াবি পথে। সমারসেট মম যেমন বলেছেন, ‘আমরা নিঃসঙ্গভাবে জীবনে ঘুরিফিরি। নিজেদের সঙ্গী-সাথীর সাথে একেবারে পাশাপাশি, কিন্তু তাদের সাথে একত্রে নয়। তাদের না বুঝে আর তারা আমাদের না বুঝে’।

এই বিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ইউরোপে গড়ে রোমান্টিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন। রুশোর নেতৃত্বে নৈরাশ্যবাদী রোমান্টিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন বিচ্ছিন্নতার নিরসন ঘটাতে চাইলো- বাস্তবকে পরিবর্তন করে নয়, কল্পনার শিল্প রাজ্যে অবগাহন করে। আর শেলী-বায়রন-বিটোফেনের নেতৃত্বে বিদ্রোহী রোমান্টিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন গভীর মনবতাবোধের দ্বারা পরিচালিত হয়ে পুঁজিবাদের বিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ালো। কিন্তু তারা বিচ্ছিন্নতার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে পারলেন না। তাই তাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন মুক্তির পথ দেখাতে সক্ষম হলো না।

প্রকৃতপক্ষে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সৃষ্টিশীল মানুষ হয়ে ওঠে বুর্জোয়া কারবারি, না হয় মজুরীভোগী শ্রমজীবী। শ্রমিকের শ্রমের মালিক হয়ে যায় পুঁজিপতি। শ্রমিক তার নিজস্ব শ্রম, উৎপাদিত বস্তু ও শ্রমপ্রক্রিয়া থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করে। যেহেতু শ্রমপ্রক্রিয়া ও শ্রম সৃষ্ট বস্তু উভয় থেকেই ব্যক্তি বিচ্ছিন্ন এবং যেহেতু এই বিচ্ছিন্নতার মূলে থাকে একটি পুঁজিপতিরূপী অপর এক ব্যক্তি, সেহেতু পুঁজিপতির সঙ্গে শ্রমিকের বিচ্ছিন্নতার অর্থ দাঁড়ায় কার্যত শ্রমিকরূপী এক ব্যক্তির সঙ্গে পুঁজিপতিরূপী অপর এক ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা। এ থেকেই জন্ম নেয় সমাজজীবনে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতার সম্পর্ক। পুঁজিবাদে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা ও তার অভিঘাত শুধুমাত্র শ্রমিকের ক্ষেত্রেই আজ সত্য নয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে বাস করে পুঁজিবাদের হাত থেকে মুক্ত থাকার কোন উপায় নেই।

এই বিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতি, নিঃসঙ্গতা প্রক্রিয়া ব্যক্তির মধ্যে এক ধরনের আত্মনিঃসঙ্গতার জন্ম দেয়। এর ফলে ব্যক্তি তার মানবিক ‘সারবস্তু’ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মানুষের আত্মিক জগৎ যেসব জটিল বিষয় দ্বারা গঠিত তা ধ্বংস হয়ে যায়। আর নিঃসঙ্গ আত্মিক জগৎ নিজেই নিজের বিরুদ্ধে বদলা নিতে শুরু করে। ব্যক্তি-মানুষ ঢুকে যায় যুক্তিহীন জগতে। মানুষের এই বিচ্ছিন্নতা তার বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তার উপলব্ধিতে জন্ম নেয় নানা বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ ধরন। পুঁজিবাদী সমাজে এভাবে মানুষ তার অনুভূতি, যুক্তি, চাহিদা, ক্ষমতা, প্রতিফলন ও কাজের সামঞ্জস্য হারিয়ে ফেলে। সে নিজেকে খুঁজে পেতে চায়। কিন্তু ভুলভাবে, বিকৃত পথে। পুঁজিবাদের সৃষ্ট নিঃসঙ্গতা মানুষকে এক অসহায়তার জগতে ঠেলে দেয়। মানুষ ভাববাদী হয়ে ওঠে। ভাববাদ নিজেই বিচ্ছিন্নতার অভিব্যক্তি। ভাববাদী চিন্তা দিয়ে বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটানো যায় না।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মানুষে মানুষে, বিভিন্ন শ্রেণি ও জাতির মধ্যে যে বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয় তার প্রতিক্রিয়া শুধু অর্থনৈতিক নয়, তার গভীর সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক ক্ষতিকর দিকও রয়েছে। পাকিস্তানের জাতিগত শোষণ-বৈষম্য-বিভেদের সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হয়ে আমরা সাম্য মৈত্রীল গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী সংস্কৃতি নির্মাণ করতে চেয়েছিলাম। স্বাধীনতার পরে ন্যায় ও সমতার সমাজ গড়ার যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। সমবায়ের বিকাশ, সামাজিক মালিকার সমাজ গড়তে কলকারখানা জাতীয়করণ করে ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ বহুমুখী পদক্ষেপ শুরু হয়েছিল। পুঁজিবাদের সর্বগ্রাসী থাবা সে অবস্থা বিকশিত হতে দেয়নি। মানুষে মানুষে বৈষম্য বেড়েছে। মানুষের মধ্যে অসহায়ত্ব বেড়েছে। যুক্তি-বুদ্ধি-চিন্তা ও সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস, সন্দেহ প্রবণতা, হিংসা, লোভ সমাজে বিস্তার লাভ করেছে।

বিচ্ছিন্নতা ধীরে ধীরে বর্তমান ব্যবস্থার সমার্থক হয়ে উঠেছে। মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা এ দেশের ব্যক্তি মানুষকে ক্রমেই আত্মনিঃসঙ্গ করে চলেছে। মানবিক গুনাবলী, বিবেকবোধ, যুক্তি-বুদ্ধি, ভালোবাসা-সহমর্মিতা হারিয়ে মানুষ এক হতাশার জগতে প্রবেশ করছে। সর্বগ্রাসি বিকৃত জীবনবোধ তাকে অক্টোপাশের মতে ঘিরে ধরেছে। বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী ২০১৯ সালে সারাদেশে ১০ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছে। একটি বেসরকারি সংস্থার হিসেব বলছে- ২০২০-২০২১ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনিস্টিটিউট ও হাসপাতাল কর্তৃক পরিচালিত ‘প্যাটার্ন অব সাইকিয়াট্রিক ডিজঅর্ডার অ্যামং ফেসিং দ্য কনসিকোয়েন্সেস অব কোভিড-১৯’ জরিপের প্রতিবেদনে দেখা গেছে-রোগীদের ২৭ শতাংশ আর্থিক সংকট বা চাকরি হারানোর কারণে ক্ষতিগ্রস্থ। উদ্বেগ ও বিষন্নজনিত অসুস্থতায় ভোগা ব্যক্তির হার ১১ শতাংশ। প্রিভিলেন্স অব এনজাইটি এ্যান্ড ডিপ্রেশন ইন এশিয়া ডিউরিং কোভিড-১৯’ আ সিস্টেমেটিক রিভিউ অ্যান্ড মেটা অ্যানালাইসিস প্রতিবেদন অনুযায়ী দুশ্চিন্তা ও হতাশার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ শীর্ষে। প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের ৫২.৩ শতাংশ মানুষ দুশ্চিন্তা এবং ৪৮.২ শতাংশ মানুষ হতাশায় ভুগছে। বিচ্ছিন্নতা থেকে জন্ম নেয়া নিঃসঙ্গতা এক ভয়ানক মনোসামাজিক ব্যধি। নিঃসঙ্গ মানুষ পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোন অর্থ খুঁজে পায় না। জীবন যাপন এক সময় দুঃসহ হয়ে ওঠে। তাই কেন মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে, পরিত্রাণের পথ কী, তা গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।

এই বিচ্ছিন্নতা প্রক্রিয়া চিরতরে বিলুপ্তির জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে মহান মুক্তিযুদ্ধের সাম্য-মৈত্রীর শোষণ-বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক-মানবতাবাদী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির কাছে। মনোনিবেশ করতে হবে বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির ইতিবাচক ও মানবিক চর্চায়। গ্রাম-গঞ্জের মেহনতি মানুষের ফসল নির্ভর, নদী নির্ভর অনুষ্ঠান নবান্ন ও নৌকা বাইচের আনন্দ ফিরিয়ে আনতে হবে কর্পোরেট পুঁজির হাত থেকে। বাংলার মানুষের লোক-সংস্কৃতি, উৎসব-পার্বণ, কীর্তন, যাত্রাপালা, রয়ানী, কবিগান, মারফতি, ভাটিয়ালি, লালনগীতির উত্তরসাধক হিসেবে তাকে সামনে অগ্রসর করে আমাদের জীবনের অংশে পরিণত করতে হবে। মানুষ যত সামাজিক হবে, পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব ও ভালবাসার সংস্কৃতি ততই স্বাভাবিকতা পাবে। বিচ্ছিন্নতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি হবে। মানুষ নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি পাবে।

লেখক: সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, খুলনা জেলা কমিটি, সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.