বিচারকের মন্তব্যে নাগরিক বিবৃতি

রেইন্ট্রি আবাসিক হোটেলে ধর্ষণ মামলার রায়ের বিচারক তার পর্যবেক্ষণে যে মন্তব্য করেছেন তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক বলেছেন এই রায় একপেশে ও দায়িত্বজ্ঞানহীন, এতে করে নারীর প্রতি সহিংসতা আরও বাড়বে।

বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ মনে করে মামলার রায়ের বিচারক রায়ের পর্যবেক্ষণে এমন কিছু বিষয়ের উল্লেখ করেছেন যা তাঁর এখতিয়ার বহির্ভূত এবং নারীর সাংবিধানিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক।

রবিবার (১৪ নভেম্বর) দেশের ৮০ জন বিশিষ্ট নাগরিক এক যৌথ বিবৃতিতে এই আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেন।

বিবৃতিতে তারা বলেন, নারীর প্রতি চলমান সহিংসতার বিচার নিশ্চিত করা যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ সংবেদনশীল হওয়া কাম্য। বিদ্যমান সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ নারী আইনের আশ্রয় নেওয়ারই সুযোগ পান না। মামলা হলেও নারী নির্যাতনের মামলায় অপরাধীর সাজা প্রায় হয় না বললেই চলে। সম্প্রতি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এ রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণ মামলার রায় হয়েছে। রায়ে আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাতসহ ৫ জন আসামিকেই খালাস দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, এ মামলার শুরু থেকেই অত্যন্ত প্রভাবশালী আসামিদের পক্ষ থেকে প্রচুর চাপ এবং ভুক্তভোগীদের ‘ভিক্টিম ব্লেমিং’সহ নানাভাবে হয়রানির বিষয় মিডিয়াতে এসেছে।

রায়ে ভুক্তভোগীদের আগের যৌন সম্পর্কের অভিজ্ঞতা থাকার কারণে তারা ‘বিশ্বাসযোগ্য’ নন বলে বিচারকের পর্যবেক্ষণ ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের শামিল। যা হাইকোর্টের নির্দেশনার সরাসরি ব্যত্যয়। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মানতে ট্রাইব্যুনাল বাধ্য। আদালতের এ পর্যবেক্ষণের ফলে জনমনে ভুল ধারণা হতে পারে যে, আগে যৌন সম্পর্কের অভিজ্ঞতা থাকা কোনও নারী ধর্ষণের বিচার আশা করতে পারেন না। এর ফলে দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়বে এবং বিচারপ্রাপ্তির সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়বে বলে আমরা মনে করি। বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা বলেন, ‘আমরা মনে করি আদালত নারীর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের মতো অপরাধকে স্বাভাবিকীকরণ করে জনমনে এই বিভ্রান্তিকর ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছেন যে, ধর্ষণের জন্য নারী নিজেই দায়ী। এ রায় নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়াবে বলে আমরা মনে করি।’

ধর্ষণের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মামলা করার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা বা ডাক্তারি প্রত্যয়নপত্র ছাড়া ধর্ষণ মামলা না নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার কোনও এখতিয়ারই এই ট্রাইব্যুনালের নেই। ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধে ৭২ ঘণ্টা নয় বরং ৭২ বছর পরও মামলা করতে পারার অধিকার ভুক্তভোগীর আছে। অথচ বিচারকের এই পরামর্শের কারণে ধর্ষণের শিকার নারীর নিরাপত্তা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। যার দায় উল্লিখিত ট্রাইব্যুনালের বিচারকের।

উল্লিখিত মামলার ক্ষেত্রে প্রভাবশালী আসামিপক্ষের খালাস পাওয়ার কারণ হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষের মামলার জন্য যথাযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন না করতে পারার দায় বাদীদের হতে পারে না। অথচ সকল দোষই দুই ভুক্তভোগীর ওপর চাপানো হয়েছে। উপরন্তু, ভুক্তভোগীদের চরিত্র সম্পর্কে বিচারকের মতামত অত্যন্ত দৃষ্টিকটু এবং যেকোনও নাগরিকের জন্য অসম্মানজনক।

নাগরিকরা তাদের বিবৃতিতে এই মামলার বিচারবিভাগীয় তদন্ত চেয়েছেন। সেইসঙ্গে বিচারকদের সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ ও সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারার বিলুপ্তি দাবি করেছেন তারা।

বিবৃতিতে অনলাইনে স্বাক্ষরদাতা নাগরিকরা হলেন—

ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মেঘনা গুহঠাকুরতা, সাবেক সদস্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, নারী আন্দোলন কর্মী শিরীন হক। মালেকা বেগম, অধ্যাপক ও লেখক, নারী আন্দোলন অ্যাক্টিভিস্ট। আসিফ নজরুল, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আইনজীবী। আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। হামিদা হোসেন, মানবাধিকারকর্মী। শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক (এএলআরডি)। শহিদুল আলম, আলোকচিত্রী। গীতিআরা নাসরিন, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সুব্রত চৌধুরী, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। ড. নাসরিন খন্দকার, শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, বার এট ল, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি। ফিরদৌস আজিম, অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ড. শাহনাজ হুদা, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। হানা শামস আহমেদ, পিএইচডি গবেষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা। স্বপন আদনান, প্রফেসরিয়াল রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, স্কুল অফ অরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন, যুক্তরাজ্য। খুশী কবির, মানবাধিকারকর্মী। বীণা ডি কস্টা, অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া। নোভা আহমেদ, শিক্ষক, ইলেক্ট্রিকাল ও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়। রোজীনা বেগম, শিক্ষার্থী, ইনস্টিটিউট অব হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস স্টাডিজ, মাহিডন বিশ্ববিদ্যালয়, থাইল্যান্ড। মাইদুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। মুক্তাশ্রী চাকমা, গবেষক ও অধিকারকর্মী। ড. আকমল হোসেন (অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা    বিশ্ববিদ্যালয়। অরূপ রাহী, লেখক, সঙ্গীতশিল্পী। রোবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ডা. নায়লা জামান খান, অধ্যাপক, ঢাকা শিশু হাসপাতালের পেডিয়্যাট্রিক নিউরোসায়েন্স। সাদাফ সাজ, লেখক। ড. ফস্টিনা পেরেরা, মানবাধিকারকর্মী। পারউইন হাসান, উপাচার্য, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি। অ্যাডভোকেট সালমা আলী, প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি (বিএনডব্লিউএলএ)। নূর খান লিটন, মানবাধিকারকর্মী। সায়দিয়া গুলরুখ, সাংবাদিক। মির্জা তাসলিমা সুলতানা, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পার্সা সাঞ্জানা সাজিদ, লেখক, গবেষক। বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। ফরিদা আখতার, নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা। তবারক হোসেইন, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। ফাতেমা সুলতানা শুভ্রা, শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। সালমা আবেদীন পৃথী, আলোকচিত্রী। তাঞ্জিম ওয়াহাব, আর্ট কিউরেটর ও শিক্ষক, পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া      ইন্সটিটিউট। খন্দকার তানভীর মুরাদ, শিক্ষক, আলোকচিত্র বিভাগ, পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইন্সটিটিউট। কামরুন নাহার, নারী অধিকার কর্মী। শম্পা বসু, সাধারণ সম্পাদক, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম। জায়মা ইসলাম, প্রতিবেদক, দ্য ডেইলি স্টার। সাঈদ ফেরদৌস, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ড. সাদাফ নূর, শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। সায়েমা খাতুন, শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। নাহিদা আশরাফী, লেখক ও প্রকাশক। মাসউদ ইমরান, অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ‍ওমর তারেক চৌধুরী, লেখক-অনুবাদক। নাসরিন সিরাজ, নৃবিজ্ঞানী ও চলচ্চিত্রকার। মেহজাবীন রহমান, অ্যাক্টিভিস্ট ও শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি। ঋতু সাত্তার, থিয়েটার ও পারফরমেন্স শিল্পী। মুনেম ওয়াসিফ, শিল্পী। আবদুল্লাহ আল নোমান, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। সামিনা লুৎফা নিত্রা, শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। মাহমুদুল সুমন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। নাজনীন শিফা, পিএইচডি গবেষক, জেএনইউ, ভারত। সুস্মিতা পৃথা, সাংবাদিক। জান্নাতুল মাওয়া, আলোকচিত্রী। পারভীন জলী, শিক্ষক, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। শাহীন আনাম, মানবাধিকারকর্মী। ফারাহ কবীর, উন্নয়নকর্মী। জলি তালুকদার, সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি। বীথি ঘোষ, শিল্পী ও সংগঠক। সাদিয়া মরিয়ম রুপা, আলোকচিত্রী। অমল আকাশ, শিল্পী ও সংগঠক। দীনা সিদ্দিকী, অধ্যাপক, ফ্যাকাল্টি অফ লিবারেল স্টাডিজ, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি। আনমনা প্রিয়দর্শিনী, পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অফ পিটসবার্গ, যুক্তরাষ্ট্র। শাশ্বতী মজুমদার, শিক্ষক, চারুকলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। দিলশানা পারুল, ডেপুটি ডিরেক্টর (মনিটরিং), ব্লাস্ট। মোশাহিদা সুলতানা, শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ডা. মনীষা চক্রবর্তী, সদস্য সচিব, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ। তাসলিমা আখতার, শ্রমিক ও নারী অধিকারকর্মী এবং আলোকচিত্রী। নাসিমুল খবির, শিক্ষক, ভাস্কর্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। রুশদ ফরীদি, শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রেহনুমা আহমেদ, লেখক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.