বায়ুদূষণ বাড়ছেই

ঢাকার বাতাস এখন ভয়াবহ দূষণের শিকার। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের শিকার দেশগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে আছে বাংলাদেশ। শীর্ষে রয়েছে ভারতের দিল্লি। ঢাকার পরেই রয়েছে পাকিস্তানের করাচি ও চীনের বেইজিং।

ঢাকা শহরের বায়ুমান সবচেয়ে খারাপ থাকে সন্ধ্যার পর থেকে সকাল পর্যন্ত। এই সময়ে বাতাসের মান অস্বাস্থ্যকর থেকে বিপদজনক পর্যায়ে ওঠানামা করে। বাংলাদেশে মহামারিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহর ঢাকায় ইতোমধ্যে সোয়া লাখের বেশি মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, যা দেশের মোট সংক্রমণের এক-চতুর্থাংশের বেশি। বয়স্ক ও কো-মরবিডিটি যাদের রয়েছে, দূষণের এই সময়ে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হলে তাদের মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যাবে।

বায়ুদূষণের কারণে ঢাকা শহরে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে শিশুদের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস বিঘিœত হওয়ার পাশাপাশি নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। বায়ুদূষণের অবস্থা একদিকে দিন দিন খারাপ হচ্ছে, অন্যদিকে বায়ুদূষণের উৎস দিন দিন বাড়ছে। বায়ুদূষণের ফলে অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে এবং নানান রোগে ভুগছে। করোনার প্রথম দিকে দূষণের মাত্রা কিছুটা কমছিল। কিন্তু আবারও অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকার বাতাস।

বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস হচ্ছে ধুলোবালি। এর মধ্য দিয়ে করোনা ভাইরাসের জীবাণু সহজে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ধূলিকণায় করোনার জীবাণু মিশে হাতসহ নানা মাধ্যমে মানুষের নাক-মুখ-চোখ দিয়ে শরীরে ঢুকে পড়ছে।

বায়ুদূষণের ফলে একদিকে পরিবেশ যেমন বিনষ্ট হয় তেমনই প্রতিটি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ে। বায়ুদূষণ থেকে রক্ষার জন্য অনেকেই মাস্ক ব্যবহার করে থাকেন। যদিও করোনাকালে এই মাস্ক ব্যবহারের সংখ্যা অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু এটাই একমাত্র সমাধান নয়।

মূলত বায়ুদূষণ রোধ করতে হবে। বায়ুদূষণের ফলে মানবদেহে জন্ম নেয় অনিরাময়যোগ্য নানা রোগ। যানবাহনের কালো ধোঁয়া, মিল-কল-কারখানা-ইটভাটার কালো ধোঁয়া, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি নির্মাণকাজ বায়ুদূষণের প্রধান নিয়ামক।

কীভাবে এই দূষণের পরিমাণ কমিয়ে আনা যায় এবং মানুষ কীভাবে মুক্তবায়ুতে নিঃশ্বাস নিতে পারে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। অনেক সময় ধুলো নোংরা আবর্জনাও বায়ুদূষণের জন্য দায়ী।

মূলত কয়লা ও জৈব জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর কণার সৃষ্টি হয়। ইটভাটা, শিল্পকারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের ধোঁয়া এবং সড়ক ও ভবন নির্মাণসামগ্রী থেকে তৈরি ধুলোয় এগুলো সৃষ্টি হয়। ঢাকাসহ সারা দেশে যে নির্মাণকাজ হচ্ছে, তাতে প্রচুর ধুলো ও ধোঁয়ার সৃষ্টি হচ্ছে।

শুষ্ক মৌসুমে বাতাসে ওই ক্ষুদ্র কণাগুলো এমনিতেই বেশি পরিমাণে পরিবাহিত হয়। আর এই সময়ে বেশি নির্মাণকাজ হওয়ায় এবং সব কটি ইটভাটা চালু থাকায় দূষণের পরিমাণও বছরের অন্য সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায়।

বায়ুদূষণের আর একটি কারণ হল ঘনবসতি। ঘনবসতির জন্যই এসব অঞ্চলের মানুষজন শ্বাসনালীর রোগে বেশি ভুগে। দেখা দেয় হাঁপানি ও শ্বাসকষ্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর ধূমপান, সড়ক দুর্ঘটনা ও ডায়াবেটিসে যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার চেয়ে বেশি মানুষ শ্বাসনালীর রোগে আক্রান্ত মারা যায়।

উন্নয়নের নামে বাতাস, ভূ-প্রকৃতি ও পরিবেশ সরাসরি ক্ষতি হতে পারে এমন কর্মকাণ্ড থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। যখন-তখন রাস্তা খুঁড়ে মাসের পর মাস ফেলে রাখা চলবে না। স্থাপনা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, সিমেন্ট কারখানা, ইস্পাত কারখানা, রি-রোলিং মিল, যানবাহন ও ইটভাটা থেকে যাতে ক্ষতিকর বস্তুকণা নির্গত হতে না পারে, সেজন্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা জরুরি।

ঢাকাতে বিশুদ্ধ বাতাস বছরের খুব কম সময়েই পাওয়া যায়। বাতাসের মান সবচেয়ে বেশি খারাপ থাকে শীতকালে। তখন বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড, সিসা, নাইট্রোজেন-অক্সাইড, ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড ও সালফার অক্সাইড বিরাজ করে। ক্ষতিকর এসব বস্তুকণার উপস্থিতির কারণে বাতাসের মান খুব বেশি খারাপ পর্যায়ে পৌঁছায়।

পরিবেশ সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র যদি এদিকে বিশেষ মনোযোগী না হয় তাহলে জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। একুশ শতকে বায়ুদূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য বিরাট এক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই যদি যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের বিপদ হিসেবে দেখা দেবে। সুতরাং সময় থাকতেই সাবধান হওয়া সমীচীন।