বামপন্থিদের আন্দোলনে সরকারের জলকামান

মোহাম্মদ আলতাফ হোসাইন

চাল, ডাল, তেল, আটা, শাক-সবজি, মাছ, মাংস, ডিম, দুধসহ সকল ভোগ্যপণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

এরইমধ্যে বছর ঘুরে এসেছে মুসলমানদের পবিত্র সিয়াম সাধনার রমজান মাস। সারাদিন রোজা রেখে সূর্যাস্তের পর ইফতার ও রাতের সেহেরি খাওয়ার সময় মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটু ভালো ও মানসম্পন্ন খাদ্য গ্রহণের চেষ্টা থাকে। পরবর্তীতে মাস শেষে ঈদের দিনে ছেলে-মেয়ে ও আত্মীয়-স্বজন নিয়ে একটু ভালো খাওয়া-পরার প্রত্যাশা থাকে। আর এই সুযোগের অপেক্ষায় যেন থাকে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও সিন্ডিকেট চক্র। কথা নেই বার্তা নেই হুটহাট নানা অনৈতিক অজুহাতে একটার পর একটা খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে সংসারের প্রয়োজনীয় অন্যান্য দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি করে পিচাশের মত সাধারণ মানুষের জীবনের শেষ রক্তটুকু চুষে নিতে এক প্রচণ্ড রকমের উন্মাদনায় মেতে ওঠে।

আমাদের দেশে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কথা বললেই হাটে-বাজারে এক ধরনের ক্ষুদ্র দোকানদার কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। কিন্তু ঘটনার মূল নায়ক যে তারা নয়- এ কথা আবার তাদের নতুন করে বুঝিয়ে দিতে হয়।

আমাদের দেশে চালু করা হয়েছে “মুক্তবাজার অর্থনীতি”। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। কেনো না “মুক্তবাজার অর্থনীতি” দেশের কোনো মৌলিক নীতি নয়। মুক্তবাজার অর্থনীতির বেড়াজাল ডিঙিয়ে আমরা যখন দেশটাকে স্বাধীন করলাম তখন আবার নতুন করে পুরানো কাসুন্দি ঘাঁটার আর কোনো নতুন সুযোগ আছে বলে কেউ মনে করে না। কারণ, স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে সেই পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটার আর কোনো সুযোগ ও সময় নেই। আর তাই স্বাধীন দেশের স্বাধীন সংবিধানে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই রাষ্ট্রীয় মৌল নীতি হিসাবে যে চার নীতিমালা সংযুক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে একটি অন্যতম মৌলিক নীতি হলো সমাজতন্ত্র। বহু লড়াই আর সংগ্রামের অর্জন হলো সমাজতন্ত্র। সুতরাং দেশ পরিচালিত হবে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। এটাই এদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও দাবি। কিন্তু দেশের বুর্জোয়া ধারার রাজনৈতিক দলগুলির অসৎ, অবিশ্বস্ত ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য দেশ আজ সেই পথে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিগত পঞ্চাশ বছরে এই বুর্জোয়া ধারার রাজনৈতিক দলগুলির সম্পূর্ণ অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে চাপিয়ে দেয়া “মুক্তবাজার অর্থনীতি”র চর্চা ক্রমাগতভাবে দেশকে এক গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে।

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মত মৌলিক অধিকারগুলিকে পাশ কাটিয়ে বর্তমানে ক্ষমতাসীনদের সরকার স্রফে পদ্মা সেতু, উড়াল রেল, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে ক্যানেল, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইত্যাদি কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে প্রতিনিয়ত বগল বাজ্জাচ্ছে। একটি দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য এইসব অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও মানুষের জীবনের মৌলিক সমস্যার সমাধান করতে যে ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চেতনাগত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দরকার তার পাশ না মাড়িয়ে কেবলমাত্র অবকাঠামোগত দুই একটি ফিরিস্তির ডমকা বাজিয়ে বাহবা নিতে ক্ষমতার নায়করা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

মনে পড়ে পাকিস্তান আমলের আইয়ুব শাহীর কথা। রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্টের রমরমা জৌলুস দিয়ে জনগণের দৃষ্টিশক্তিকে কিছু সময়ের জন্য চমকিত করে দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা কি বলে সেই সাময়িক ধাঁধা তার ক্ষমতার মসনদকে বেশি দিন টেকসই দিতে পারে নাই। সুতরাং ইতিহাসের এই শিক্ষা থেকেও ক্ষমতার মসনদে যারা আসীন হন তাদের অনেক কিছুই শেখার আছে। মানুষের জীবনের মৌলিক অধিকারগুলিকে পাশ কাটিয়ে কেবলমাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফিরিস্তি ক্ষমতার মসনদকে পাকাপোক্ত করতে পারে না।

দেশে বর্তমানে আঠারো কোটি লোকের বাস। মতান্তরে এই সংখ্যা বিশ কোটি। সারা বিশ্বে করোনার ভয়াবহ তাণ্ডব মানুষ স্বচক্ষে দেখেছে। করোনা যে বিশ্ব থেকে চিরবিদায় নিয়েছে তাও নয়। সুতরাং করোনার ভয়াবহ তা-বের কথা মানুষকে এখনও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। করোনা-উত্তর পরিস্থিতিতেও প্রতিনিয়ত মানুষের হঠাৎ হঠাৎ মৃত্যুসংবাদ মানুষের নীরব নিচতরঙ্গ মনকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে যাচ্ছে। জানিনা হঠাৎ এইসব মৃত্যুসংবাদ কী কারণে। অনেক বিজ্ঞজনের অভিমত, এইসব করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতির ফলাফল। যা ক্ষতি করার তা করোনা আগেই করে দিয়ে গেছে। পরিস্থিতির শিকার এইসব হতভাগ্যরা হয়তো তা পূর্বে অনুমান করতেই পারেননি। আমারও বিশ্বাস হয়তোবা পরিস্থিতিটা তা-ই।

করোনা-পূর্ব পরিস্থিতিতে দেশে এমনিতেই হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল আড়াই থেকে তিন কোটি। তার সাথে যুক্ত হয়েছে করোনা সংঘাতে জীবনের মূল জীবিকা থেকে বঞ্চিত আরও প্রায় তিন কোটি মানুষ। সুতরাং সব মিলিয়ে এখন সুনির্দিষ্টভাবে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় ছয় কোটি। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ। এই যখন দেশের একটি সার্বিক পরিস্থিতি তখন স্বাভাবিক কারণে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত একটি সরকারের দায়িত্ব হলো দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে একটি সঠিক পরিসংখ্যান তৈরি করা এবং সেই পরিসংখ্যানের আলোকে একটি সঠিক ও বাস্তব কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা। যাতে অসহায় মানুষগুলি আঘাত সামাল দিয়ে নিজের পায়ের ওপরে ভর করে উঠে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সরকার সেই দায়িত্ব¡বোধের পরিচয় না দিয়ে একটা গড্ডালিকা প্রবাহের ওপরে গা ভাসিয়ে আপন সুখে বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা করছে।

দেশের বামধারার রাজনৈতিক দলগুলির আন্দোলন লড়াই আর কিছু বিবেকসম্পন্ন মানুষের আলোচনা ও সমালোচনার মুখে পড়ে এইসব হতদরিদ্র মানুষগুলির জন্য যদিওবা কিঞ্চিত কিছু প্রণোদনামূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার, তাও এক ছেলে ভোলানো দৃশ্যমাত্র। যেখানে সংকটগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ সেখানে এক কোটি মানুষের জন্য কিঞ্চিত প্রণোদনামূলক তৎপরতা একটি বালখিল্য রসিকতা বৈ আর কিছু নয়। তারপরেও কথা আছে সরকারের এই যে কিঞ্চিৎ তৎপরতা তার মধ্যেই বা কতটুকু স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বালাই আছে তা নিয়েও আছে নানা সন্দেহ, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। সরকারের ঘোষিত নীতিমালা সেই সব কর্মকাণ্ড পরিচালনায় কতটুকু সুফল বয়ে আনতে পারেবে তা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন আছে। কারণ মানুষের পূর্ব অভিজ্ঞতা অনেক তিক্ত।

এদিকে গোটা ইউরোপজুড়ে চলছে এক মহা দুর্যোগের তা-বলীলা। ঘটনার সূত্রপাত রাশিয়া ও তার পার্শ্ববর্তী দেশ ইউক্রেন ঘিরে তৈরি হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের তড়িৎ দৌড়ঝাঁপের কারণে এবং তথাকথিত ন্যাটো জোটের শরিক দেশগুলির ঘুম হারাম করা এক নাটকীয় তৎপরতার কারণে তা ক্রমাগতভাবে একটি বৈশ্বিক রূপ নিতে চলেছে। একদিকে অস্ত্রের ঝনঝনানি অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের অর্থনৈতিক অবরোধ ও রাজনৈতিক বিধিনিষেধের হাঁটি হাঁটি পা পা অশুভ তৎপরতা। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগাম সংকেত বলে অনেকে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নানা গণমাধ্যমে এরইমধ্যেই আভাস ইঙ্গিত দিতে শুরু করে দিয়েছেন। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আসন্ন কি না, তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও যদি বা দৈবাৎ তেমনটাই শুরু হয়ে যায় তাহলে এবারের বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার থেকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলি যে কেউ বিরত থাকবে এমনটা হলফ করে বলার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেন না। সুতরাং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে একটি কথা স্পষ্ট করে বলাই যায় যে, পরিস্থিতির নাজুকতা খুবই ভয়াবহ। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এরইমধ্যেই সারা বিশ্বে নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। জ্বালানি তেলের বাজারে ইতোমধ্যেই তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে, গ্যাসের বাজারেও একই হাল পরিলক্ষিত হচ্ছে। নিত্যপণ্যের বাজারের হাল হকিকতের বর্ণনা তো পূর্বেই উল্লেখ করেছি। সবটা মিলে বিশ্ব পরিস্থিতি যে একটা নৈরাজ্যকর অবস্থার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে, তা চোখ-কান একটু খোলা রাখলেই ধারণা পাওয়া যায়।

বিশ্ব আজকের দিনে একটি গ্লোবাল ভিলেজ। এক কোণায় একটা সামান্য চিড় ধরলেই তার ধাক্কা সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে সময় বেশি লাগে না। সুতরাং এটা ভাবতে অসুবিধা নেই যে আমরা সবাই একটা মহা দুর্যোগের তা-বলীলার ওপরে দাঁড়িয়ে আছি। সুতরাং নিজ নিজ অবস্থান ও অধিকার সম্পর্কে সবার সজাগ ও সচেতন হওয়া আজকের দিনে একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয়।

শুরু করেছিলাম চাল, ডাল, তেল, আটা, শাক-সবজি, মাছ, মাংসের দামের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কথা দিয়ে। সার্বিক বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বিষয়টা এখন কেমন লাগছে। অশনিসংকেত। সুতরাং সরকার যদি সময় থাকতে এইসব বিষয় বিবেচনায় না নেয় গোটা পরিস্থিতি যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বুঝে উঠা মুশকিল। গত ২৮ মার্চ ২০২২ তারিখে বামপন্থি দলগুলির ডাকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে সারাদেশব্যাপী সকাল ছয়টা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত অর্ধদিবস হরতাল পালিত হলো। বামেদের শক্তি সীমিত। কিন্তু বিষয়ের গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত জরুরি। সরকার তাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। যদি জনগণ হুড়মুড়িয়ে বামদের কর্মসূচিতে নেমে পড়ে। সর্বনাশ। তাই সরকার আর অপেক্ষা করেনি। লাঠির পরিবর্তে তাই এবার বামদের হরতাল ঠেকাতে মাঠে নেমে পড়েছিল জল কামান নিয়ে। কি লজ্জা, কি লজ্জা। কোথায় বলে- “পুজোর ঘরে কে রে —আমি কলা খাই না”। তাই সময় থাকতে সরকারকে সতর্ক করে বলতে চাই–সাধু সাবধান। সময়ের এক ফোঁড় আর অসময়ের দশ ফোঁড়েও কাজ হবে না।

লেখক: সদস্য, সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.