বাজার সিন্ডিকেট ভাঙো, স্থায়ী রেশনিং ব্যবস্থার লড়াই জোরদার কর

মোহাম্মদ শাহ আলম

হঠাৎ করে অস্বাভাবিকভাবে সব জিনিসের দাম বেড়েছে। কিন্তু মানুষের আয় বাড়েনি, কমেছে। আইএলও বলছে, ১০ বছরে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি হারে প্রকৃত নিম্নতম মজুরি কমেছে বাংলাদেশে। চারজনের পরিবারের খাদ্য খরচ দ্বিগুণ হয়েছে। শ্রমিক-মেহনতি মানুষ-নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তের সংসার চলছে না। মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। করোনা মহামারির কারণে সাড়ে তিন কোটি মানুষ দরিদ্র হয়েছে।

নিত্যপণ্যের গড় দাম বেড়েছে অস্বস্তিজনকভাবে। ২০০৯-২০১০ সালে মোটা চাল ছিল ২৫.৭৪ টাকা, এখন ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ৫১-৫২ টাকা, দেশি মশুর ডাল ছিল ১০৯.৮২ টাকা এখন ১২৬ টাকা, ভোজ্যতেল ১০২ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা, চিনি ৫০.৩২ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৮৫ টাকা, লবণ ১৯.২৬ টাকা থেকে বেড়ে ৩২ টাকা, বড় মুরগি ২০৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪০৭ টাকা, গরুর মাংস ২২৬ টাকা থেকে বেড়ে ৫৫৭ টাকা। প্রতি কেজি এবং লিটার প্রতি এই দাম বেড়েছে। বাসাভাড়া, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির দামও বেড়েছে দ্রুত গতিতে। রুটি-পরোটার দাম বেড়েছে, ছোট হয়েছে সিংগারা-সমুচা। শাক-সবজি, ফল-মূলসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। বেড়েছে পরিবহন ভাড়া। চিকিৎসার খরচ সীমাহীন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রচারণার সময় আওয়ামী লীগ বলেছিল ১০ টাকা দরে চাল দেবে তারা ক্ষমতায় গেলে। কিন্তু বর্তমান হাল কি? তা আমরা দেখলাম।

বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য টিসিবির ট্রাকে করে পণ্য বিতরণের আইওয়াশের কাণ্ড দেখছে দেশের জনগণ। টিসিবির ট্রাকের পেছনে হাজার হাজার হাত। “আঙ্গুর বেগমের সঙ্গে কথা বলার সময়ই লাইনে বলাবলি হচ্ছিল, পেঁয়াজ শেষ হয়ে গেছে। বেলা দেড়টার দিকে যখন ট্রাকের সব পণ্য শেষ তখনো দুই লাইনে দাঁড়িয়ে ৪২ জন। তাঁদের একজন একটি বেসরকারি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী রতনা বেগম। তিনি বলেন, দুপুরের খাবার সময়ের ছুটি নিয়ে একটার দিকে এসে লাইনে দাঁড়ান। কিন্তু খালি হাতে ফিরতে হয়েছে তাকে।” (প্রথম আলো-১৭ মার্চ ২০২২)। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মাল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে মানুষ। পণ্যও পেলেন না অন্যদিকে কর্মঘণ্টারও ক্ষতি হচ্ছে মানুষের। মানুষের সাথে এই তামাশা ও ছলচাতুরির কোনো প্রয়োজন আছে কি সরকারের? পাকিস্তান আমল ও বাংলাদেশে সত্তর দশক পর্যন্ত রেশনিং ব্যবস্থা চালু ছিল। রেশন কার্ড ছিল মানুষের কাছে। মানুষ সময় করে সপ্তাহের রেশন তুলতে পারতো। অফিস-আদালত বন্ধের দিনেও রেশনশপ খোলা থাকতো। কিন্তু মার্গারেট থ্যাচার ও রিগ্যানের যুগে অবাধ মুক্তবাজারের ধাক্কায় বাজারে সরকারের উদ্যোগ ও ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। তত্ত্ব আসলো সরকার কেন ব্যবসা করবে, বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে? ব্যবসা করবে ব্যবসায়িরা। বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে ব্যবস্থা। শুরু অবাধ বাজার অর্থনীতির। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রিত হবে। কিন্তু মুক্তবাজার মুক্ত নাই, বাজারে প্রতিযোগিতা নাই। বাজার চলে গেছে সিন্ডিকেটের হাতে। বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে সিন্ডিকেট গোষ্ঠী। এই সিন্ডিকেটের হাতে পড়ে মানুষ তুলোধুনো হচ্ছে। বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও তা ভেঙ্গে পড়েছে। বাজার মনিটরিং করার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী-কর্মকর্তারা বাজার মনিটর করার ক্ষেত্রে ভয় পায়। কারণ সিন্ডিকেটওয়ালাদের হাত অনেক লম্বা। তাদের দখলে পার্লামেন্ট অর্থাৎ জাতীয় সংসদ। প্রশাসন এবং প্রশাসনের বড় আমলাদের সাথে তাদের রয়েছে গাঁটছড়া। এরা বছরকে বছর এই গণবিরোধী বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণের পকেট কেটে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হচ্ছে।

সরকার খাদ্যপণ্যের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহারের কথা বলছে এবং কিছু কিছু পণ্যের উপর ইতিমধ্যে ভ্যাট প্রত্যাহার করেছে। এক কোটি কার্ড দেবার কথা বলছে পণ্য কেনার জন্য। কিন্তু এই কার্ড পাওয়ার পদ্ধতি কী? কারা পাবে এই কার্ড? কারাইবা বিতরণ করবে? এইটা নিয়ে দলবাজী হবে কিনা? ভোটের খেলায় এটার প্রভাব পড়বে কিনা? এরকম নানা প্রশ্ন মানুষের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। কেন এই কলা-কৌশল-ফেরববাজী। মানুষকে জিম্মি করার অপচেষ্টা। দামের তারতম্য রেখে অইঈউ ক্যাটাগরি করে গ্রাম-শহরে সর্বজনীন স্থায়ী রেশনিং ব্যবস্থা ছাড়া বাজার নৈরাজ্যের হাত থেকে মানুষকে মুক্ত করা কি সম্ভব? অবশ্যই নয়। কিন্তু সরকার মুক্তবাজার নীতি নিয়েই চলছে। সেই শ্রেণির স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে এই সরকার, তাই এই নীতি থেকে সরকার সরছে না। সরকার-রাষ্ট্র মুক্তবাজারপন্থিদের দখলে।

কিছু মানুষ আছে যারা রেশনিং ব্যবস্থার বিরোধিতা করে। তারা উচ্চবিত্ত ৫ ভাগ মানুষ। সমাজের উচ্চবিত্ত মানুষদের ঘরে রান্না হয় না তারা ঈষঁন ও হোটেলে খায় অথবা দামি রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার ঘরে নিয়ে যায়। দেশে দুইটি অর্থনীতি চলছে। একদিকে ৫ ভাগ মানুষের অর্থনীতি, অন্যদিকে ৯৫ ভাগ মানুষের অর্থনীতি। সমাজের ৫ ভাগ মানুষের খাওয়া, চিকিৎসা, বাসস্থান, শিক্ষার স্থান আলাদা ও যাতায়াত-পরিবহন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ৫ ভাগ মানুষের শান-শওকতের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। সরকার এরা, এরাই সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে। খাদ্য নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা, শিক্ষা, পরিবহন, জ্বালানি, পানি, মূল শিল্প, ভারী শিল্প সরকারের হাতে না থাকলে সরকার অকেজো। এরকম সরকার জনগণের কল্যাণ করতে পারে না। এরকম সরকার জনগণের সরকার নয়।

উল্লেখিত সব কিছুই ব্যবসায়ীদের ও লুটেরা ব্যবসায়ী, মজুতদার, মুনাফাখোরদের হাতে। বর্তমান সরকার এই শ্রেণির সরকার–তাই এই শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করা তার দায়, জনগণের স্বার্থরক্ষা করা নয়।

তাই জনগণকে আজ আন্দোলন-লড়াই গড়ে তুলতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা জন্য, গণবণ্টন ব্যবস্থা, রেশনিং ব্যবস্থা, ন্যায্য মূল্যের দোকান, উৎপাদন ও ক্রেতা সমবায় গড়ে তোলা। গণমুখী চিকিৎসা, সবার জন্য স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা, সার্বজনীন শিক্ষা ও গণপরিবহন ব্যবস্থাসহ লড়াই করতে হবে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পানি পাওয়ার জন্য। এসব প্রতিষ্ঠান ও সেবাকে রাষ্ট্রীয় খাতে রেখে দুর্নীতিমুক্তভাবে দেশের ও নিজেদের কাজে লাগানো।

তার জন্য লুটেরা শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে শ্রেণি আন্দোলন ও গণআন্দোলন একসাথে গড়ে তুলতে হবে। সরকার ও লুটেরা শ্রেণির অপশাসনের বিরুদ্ধে ভাতের-ভোটের গণতন্ত্রের লড়াই জোরদার করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে লুটেরা ও তার সহযোগী ৫ ভাগ গণবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে ৯৫ ভাগ মানুষের বিকল্প শক্তি সমাবেশ। জনগণের সামাজিক মুক্তির জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published.