বাইডেন-পুতিন শীর্ষ বৈঠক

বিপ্লব রঞ্জন সাহা 

স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিগত দশ বছরে সবচেয়ে সংকটপূর্ণ সম্পর্কের এক পর্যায়ে যখন দুই দেশের মধ‍্যে সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকেছে, তখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মধ‍্যেকার গত ১৬ জুন ২০২১ বুধবারের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটিকে সর্বস্তরের বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ‘সর্বনিম্ন বিন্দু’র বলে একমত পোষণ করেছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যখন বলছেন, ‘আমি যা করতে এসেছি, আমি তা করেছি’, তখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলছেন, ‘জেনেভার বৈঠক গঠনমূলক এবং বৈরিতামুক্ত’।

জেনেভার পার্ক ডি লা গ্র‍্যাঞ্জের মধ‍্যস্থলে একটি লেকের আড়াআড়ি অবস্থিত অষ্টাদশ শতকের এক সুইস ভিলায় দুই প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ভ্লাদিমির পুতিন মুখোমুখি এক আলোচনায় বসেছেন। বৈঠকটি নিয়ে সারা বিশ্বের মানুষের মধ‍্যে বহু জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটলো। অনুষ্ঠানের আয়োজক সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি গুই পারমেলিন ‘লা গ্র‍্যাঞ্জ ভিলা’র বাইরে দুই দেশের রাষ্ট্রপতিকে সকলের সামনে উপস্থাপন করে বিদায় নিলে তারা পরস্পরকে করমর্দন করে বৈঠক কক্ষে প্রবেশ করেন। যদিও আলোচনা সভাটি পাঁচ ঘন্টা স্থায়ী হবে বলে অনুমান করা হয়েছিলো, কিন্তু বাস্তবে তা তিন ঘন্টা স্থায়ী হয়। ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে পুতিন প্রথমেই শুরু করেন এ কথা বলে যে, ‘এই আলোচনা হবে ফলপ্রসূ’ এবং একই সাথে তিনি প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে এই আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার জন‍্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

এর আগে পুতিনকে একজন ‘খুনী’ এবং তার চোখ দেখে বলা যায় যে তার ভেতরে কোন ‘আত্মা’ নেই বলে অভিহিত করা জো বাইডেন এবার রাশিয়ার এই নেতাকে একজন ‘উজ্জ্বল’ ও ‘দৃঢ়চিত্ত’ ব‍্যক্তিত্ব এবং অপরপক্ষে পুতিনও বাইডেনকে একজন অত‍্যন্ত ‘ভারসাম‍্যপূর্ণ ও পেশাদার’ মানুষ বলে অভিহিত করেন। অথচ সাংবাদিকরা যখন ঘুরেফিরে পুতিনের কাছে তাকে ‘খুনী’ বলে আখ‍্যায়িত করার প্রতিক্রিয়া জানতে চায় তখন তিনি এমন কথা তার মনে পড়ছে না বলে উল্লেখ করলেও তাদেরকে একথা জানিয়ে দেন যে, দেশের স্বার্থে কাজ করায় তিনি এ ধরণের কথা শুনে অভ‍্যস্ত এবং এটাকে যার যার নিজস্ব রুচি-সংস্কৃতি বলেও উড়িয়ে দেন।

বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বাইডেন বলেন যে, পুতিনের সাথে তার এই বৈঠক বিশ্বাসের প্রশ্নে নয় বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের স্বার্থের প্রশ্নে সংঘটিত হচ্ছে। আর তিনি যেকোন ভাবেই একটি ঐকমত্যের জায়গা খুঁজে বের করবেন।

কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, ‘পুডিংয়ের মান যাচাই করা যায় খাওয়ার মাধ‍্যমেই।’

অপরপক্ষে একই প্রশ্নের জবাবে পুতিন বলেন যে, জো বাইডেন একজন দক্ষ প্রশাসক, অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং পরিপক্ক মানুষ। তার কাছ থেকে তিনি দায়িত্বশীল আচরণই প্রত‍্যাশা করেন।

বৈঠকের সাফল‍্য ও প্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বাইডেন বলেন, তিনি এই বৈঠকে অনেক অনেক প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। বিশেষত মানবাধিকার প্রসঙ্গ যেটা আমেরিকার বুননের মধ‍্যে বিদ‍্যমান এবং এসব প্রসঙ্গ তিনি উল্লেখ করতেই থাকবেন। কিন্তু তাতে যে প্রতিপক্ষের আচরণে কোন পরিবর্তন আনতে পেরেছেন বা পারবেন তা তিনি মনে করেন না। তবে মুখোমুখি বসতে পারাটাই এক সাফল‍্য বলে তিনি মনে করেন। বাইডেন এ প্রসঙ্গে আরো বলেন, কোন হুমকি নয় বরং শুধু কিছু বিষয় সরলভাবে এই বৈঠকে আমার পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়েছে। ‘আমি শুধু আমার অবস্থানটাই তার কাছে ব‍্যক্ত করেছি এবং জানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি, আমরা একসাথে কি কি কাজ করতে পারি এরং করা উচিত।’

সাইবার অ্যাটাক সম্পর্কে বলতে গিয়ে বাইডেন বলেন, তারা ষাটটির বেশি অভিযোগ তুলে ধরেছেন যেখানে রাশিয়ার সম্পৃক্ততা স্পষ্ট। তবে তারা একমত পোষণ করেছেন যে এই ব‍্যাপারে কোন কোন ক্ষেত্র নাগালের বাইরে তা তারা খতিয়ে দেখবেন এবং সুনির্দিষ্ট কিছু কিছু ক্ষেত্রে নজরদারি করার ব‍্যাপারে উভয় দেশের কুশলীদেরকে কাজে লাগাবেন। এই প্রসঙ্গে পুতিন ইদানিং কালে রাশিয়ার হ‍্যাকারদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ব‍্যাপার পুরোপুরি অস্বীকার করেন। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা ভিন্ন ধরণের ইঙ্গিত করেছে। অপরদিকে পুতিন বলেছেন যে, তার প্রতিপক্ষ অনেক অনেক অভিযোগ উত্থাপন করেছে যার একটি প্রমাণও হাজির করেনি। যদি সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে কোন অভিযোগ থাকে, তবে তারা নিজেরা সে বিষয়ে সমাধান না করলে, আমেরিকা সেইসব প্রমাণপত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার চাইতে পারে। কিন্তু অহেতুক অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ না করাই শ্রেয় এবং তিনি সাংবাদিকদের অবহিত করেন যে, এমন অসংখ‍্য অভিযোগ রাশিয়া প্রমাণসহ আমেরিকার বিরুদ্ধে করে রেখেছে।

মধ‍্যপ্রাচ‍্য প্রসঙ্গে কথা বলতে পুতিন এবং বাইডেন উভয়েই আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা সদস‍্য প্রত‍্যাহারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। আরো বলেন যে নিজেদের স্বার্থেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে সমর্থ না করে তোলার ব‍্যাপার একমত পোষণ করেন। অথচ পুতিন তার সংবাদ সম্মেলনে ইরান প্রশ্নে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আনীত পারমাণবিক অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগকে বানোয়াট বলে উল্লেখ করেন।

এছাড়া সিরিয়ার সরকারকে সমর্থন করার বিষয়ে পুতিনের স্পষ্ট ভাষ‍্য, আমেরিকা চায় সেখানে আমেরিকা সমর্থিত একটি সরকার থাকুক। এটাই কি তাহলে সমাধান, বলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন।

বাইডেন তার একক সংবাদ সম্মেলনে এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সফল বলে দাবী করেছেন এবং সেই সাফল‍্যের তিনটি ক্ষেত্রকে সুনির্দিষ্ট করেছেন। প্রথমত, দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এবং সারা পৃথিবীর স্বার্থে করণীয় কাজের ক্ষেত্রগুলোকে চিহ্নিতকরণ; দ্বিতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন সব বিষয়ে সরাসরি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ ও সে সব বিষয়ে মুখোমুখি আলাপ-আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুতকরণ এবং তৃতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রসমূহ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল‍্যবোধকে নিজের মুখে উপস্থাপন করার পরিবেশ সৃষ্টিকরণ।

তবে এই তিনটি বিষয়ের বাইরেও অনেক কিছুই করার রয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি যুক্ত করেন, তার মানে এই নয় যে এর সব কিছুই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।

সর্বোপরি তার এই সফর থেকে তারা উভয়েই অনেক কিছুই অর্জন করেছেন বলে মন্তব‍্য করেছেন। বাইডেন বলেছেন, তিনি পুতিনকে জানিয়েছেন যে, এই বৈঠকের আলোচ‍্যসূচি রাশিয়া বা অন‍্য কারো বিরুদ্ধে নয় বরং আমেরিকার জনগণের জন‍্য।

বৈঠকপূর্ব সময়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকার অভিযোগের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত ছিলো আমেরিকার উপর পরিচালিত সাইবার অ্যাটাক, পূর্ববর্তী দুইটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপ বা অনধিকার চর্চা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ইউক্রেন ও আরো কিছু ইউরোপীয় দেশে আগ্রাসনসহ আরো অনেক কিছু। যাহোক, পুতিন এই বৈঠকে যোগ দিতে সম্মত হয়েছেন শুধু ইত‍্যাকার অভিযোগসমূহের বিপরীতে রাশিয়ার অবস্থান তুলে ধরে, একটি বহুমুখী বিশ্ব ব‍্যবস্থার পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে। সত‍্যি কথা বলতে, এই বৈঠক কোন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত না করলেও উভয় পক্ষই আশাবাদ ব‍্যক্ত করেছে যে, এই বৈঠকের ভেতর দিয়ে হয়তো অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল এবং অনুমেয় সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব হবে। বৈঠকের আগেই একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এই বৈঠক থেকে বড় কোন ঘোষণা আসবে বলে আশা করছি না।’ ঠিক একই সুরে পুতিনের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উষাকভ বলেন, এই বৈঠকে কোন চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে কিনা সে ব‍্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেখতে চায় ‘কোন কোন ক্ষেত্রে একসাথে কাজ করা যায়, যা আমাদের জাতীয় স্বার্থকে এগিয়ে নিবে ও বিশ্বকে নিরাপদ রাখবে।’ আর ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘এই বৈঠক থেকে দুই দেশের রাষ্টপ্রধানের উভয় দেশের মধ‍্যে কুটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার উপায় খুঁজতে হবে।’

সংবাদ মাধ‍্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, আমেরিকার প্রচার মাধ‍্যম বছরের পর বছর ধরে তার ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এসবের মধ‍্যেই তিনি টিকে আছেন। আমেরিকায় রাশিয়ার দুটি সংবাদ সংস্থা আরটি ও স্পুটনিক, আমেরিকার সকল আইন-কানুন, নিয়মনীতি মেনে কাজ করতে গেলেও তাদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ এনে তাদের কাজে বাধা প্রদান করা হয়। অথচ রাশিয়ায় কর্মরত আমেরিকার কোন প্রচার মাধ‍্যম রাশিয়ার আইন-কানুনের পরোয়াই করে না।

মানবাধিকার প্রশ্নে কথা বলতে গিয়ে পুতিন তার দেশে নাভনলির অপতৎপরতাগুলো স্পষ্ট করে তুলে ধরে বিষয়টিকে রাশিয়ার অভ‍্যন্তরীণ বিষয় বলে অভিহিত করেন। আর এর পরেই পুতিন অত‍্যন্ত প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় যেমন, একজন কৃষ্ণাঙ্গকে আমেরিকার খোলা রাস্তায় জনসমক্ষে হত‍্যা করা, আফগানিস্তানে ড্রোন হামলা এবং নিরস্ত্র মানুষকে হত‍্যার মতো সমান্তরাল প্রসঙ্গসমূহ তুলে ধরে এসব কর্মকাণ্ডের জবাব চান। এই প্রসঙ্গ ধরে তিনি একটি বিষয় স্পষ্ট করেন যে, কোন দেশের অভ‍্যন্তরীণ বিষয়ে কারো হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।

আমেরিকার পক্ষ থেকে রাশিয়ার প্রতি ‘অর্থনৈতিক সংরক্ষণ’ ‘বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে পুতিন বলেন, দুইদেশের তো মুখোমুখি হওয়া, হুমকি প্রদান বা বাকযুদ্ধের প্রশ্নই উঠে না। আমরা জানি না আমেরিকার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কি ফন্দি আটা হচ্ছে। কারা টিকে থাকবে? তবে এই বৈঠকের পর থেকে গঠনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা করছি।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ।

ইমেইলঃ bipi1963@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published.