বাংলাদেশ তুমি কার?

কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন   

৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও পাকিস্তানি উপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে এদেশের মানুষ ধারাবাহিক লড়াই সংগ্রাম করে এসেছে, তার পরিপূর্ণ রূপ পায় ১৯৭১ এর ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে। স্বাধীন দেশে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত হবে এই স্বপ্নই দেখেছিল বাংলার মানুষ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পূর্ণ হতে চললো সাধারণ মানুষের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল।

গত ৫০ বছর যারা দেশ শাসন করেছে তাদের সীমাহীন লুটপাট- দুর্নীতি, লুটেরা ধনিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষা, সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করা, মানুষের বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা খর্ব করা, গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থাগুলো ধ্বংস করা, বিরাজনীতিকরণ, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন ও বাণিজ্যিকীকরণ ধনী ও গরিবদের বৈষম্য সৃষ্টি- দেশের সম্পদ ৯৯ ভাগ মানুষকে বঞ্চিত করে ১ ভাগ মানুষের কুক্ষিগত করা ছাড়া কিছুই দিতে পারে নাই। বরং রাষ্ট্রকে ক্রমান্বয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের দিকে নিয়ে গিয়েছে এই শাসকগোষ্ঠী। এর প্রতিফলনই দেখা যাচ্ছে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর দেশ শাসনে। রাতের আঁধারে ভোট করে জোর করে ক্ষমতায় এসেছে তারা। তাই জনগণের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। একের পর এক জনস্বার্থ বিরোধী নীতি গ্রহণ করে চলছে লুটেরা ধনীক শ্রেণির স্বার্থে। গণতন্ত্রহীনতা তাদের শাসনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে কোনো কথা বললেই হত্যা, গুম, নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন, দুদক, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করা হয়েছে। বর্তমান সরকার দেশ চালাচ্ছে মূলত লুটরা ধনীক শ্রেণি, দুর্নীতিবাজ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতের উপর নির্ভর করে। এটা বাংলাদেশের মানুষ মনে করে। এবং এটাই বাস্তবতা। বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে। হ্যাঁ, উন্নয়ন হয়েছে লুটপাটর দুর্নীতির। প্রতি বছর ৭০ হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশে কোটিপতির সংখ্যা ৯৪ হাজারের বেশি। এই করোনা মহামারির সময়ও ১১ হাজার ৬০০ জন নতুন কোটিপতি সৃষ্টি হয়েছে। লুটপাট দুর্নীতি চলছে প্রতিটি ক্ষেত্রে। শোষণ-বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। আড়াই কোটি মানুষ এই করোনা মহামারির সময় বেকার হয়েছে। ৬ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গিয়েছে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। একটি জরিপে বলা হয়েছে দেশের ৭৭ ভাগ মানুষ প্রোটিনযুক্ত খাবার খেতে পারছে না।

দেশে তথাকথিত একটি জাতীয় সংসদ রয়েছে। যারা সংসদ সদস্য হয়েছেন তাদের মধ্যে ২১৪ জন ব্যবসায়ী ৪৮ জন আইনজীবী। অপরদিকে রাজনীতিবিদ মাত্র ২২ জন। গত নির্বাচনের পূর্বে সংসদ সদস্যদের সম্পত্তির পরিমাণ যা ছিল এখন তা প্রায় ৩-১০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের বাইরে এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ আমলা, লুটেরা ব্যবসায়ী এবং রাজনীতির নামে যারা ব্যবসা করে সেসব রাজনীতিবিদরা ঘর বাড়ি বানিয়ে বিলাসী জীবন যাপন করছে।

বর্তমান সরকারের শাসন এমন অবস্থানে চলে গিয়েছে যে, এক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর দেশ পরিচালিত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাউকে তোয়াক্কা করছে না। সরকারের পক্ষ থেকে নানা ধরনের জনস্বার্থবিরোধী কালা-কানুন জারি করে দেশকে পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতিবাজ প্রশাসন। তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলছে। এমন কি শাসক দলের নেতা কর্মীরাও এদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। সম্প্রতি বরিশালে মেয়র এবং মন্ত্রীর দ্বন্দ্বে প্রশাসন নির্লজ্জভাবে হস্তক্ষেপ করলো। বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতি, আপস রক্ষাসহ নানাবিধ কর্মকাণ্ড আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল প্রশাসন কতটা শক্তিশালী। বর্তমান সরকারের আমলে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে, পক্ষান্তরে সাধারণ মানুষের আয় রুজি ক্রমাগতভাবে হ্রাস পেয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি আইনগত পদক্ষেপ নেয়া যাবে না- এই ধরনের আইনও দেশে প্রচলিত হয়েছে। এই করোনা মহামারি সময়েও আমরা দেখছি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যাপক দুর্নীতি হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। বরং কাউকে কাউকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। তথাকথিত জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতারা ক্ষোভ-উষ্মা প্রকাশ করেছেন প্রশাসনের এই ভূমিকার বিরুদ্ধে। কিন্তু তাদেরও কিছু করার নেই। কেননা এই প্রশাসনের উপর ভর করেই তারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। রাজনীতিতে নীতি আদর্শ বলে আর কিছুই থাকছে না। লুটেরা ধনীক শ্রেণির দেশের সম্পদ লুটপাটের মহোৎসব ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলছে। এরা বাজার সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছে। বর্তমান সরকারের কাছ থেকে এরা বহুবিধ সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে। এরা সরকারি ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে কিন্তু তা শোধ করছে না। সরকারের পক্ষ থেকেও এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতেই পারছে না। পারবেও না, কেননা বর্তমান সরকার এদের উপর নির্ভর করেই ক্ষমতায় টিকে আছে।

বিভিন্ন সময়ে এদেশ যারা শাসন করেছে তারা বরাবরই সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করে এসেছে। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান শাসকগোষ্ঠীও আজ ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে। ভারত-বাংলাদেশ, চীন-ভারত, আমেরিকা-ভারত, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের টানাপোড়নে বাংলাদেশ আজ দিশা পাচ্ছে না। ভারতের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাকেই কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই ভারতের প্রভাব বাংলাদেশের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতিতে পড়েছে।

সার্বিকভাবে বলা যায় যে, সরকারের জনগণের প্রতি দায়-দায়িত্ব নেই। জনগণকে ভয় পায় তাদের শাসন ব্যবস্থা। এর ফলে তা অবশ্যই ফ্যাসিবাদের রূপ নেবে। তাই নিয়েছে। বর্তমান সরকার নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্যই ফ্যাসিবাদী কায়দায় দেশ পরিচালনা করছে। তা হলে আমাদের কি কর্তব্য শুধু সরকারকে সমালোচনা করেই যাবো? না এর বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলবো? নিশ্চয়ই দ্বিতীয় পথটি আমাদের বেছে নিতে হবে।

বর্তমান সরকারের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যেমন তীব্র লড়াই সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে তেমনি শ্রেণি সংগ্রামের ধারাকেও শক্তিশালী করতে হবে। শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুর, ছাত্র, যুব এদের অধিকার নিয়ে লড়াইয়ের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। একটা বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, ১ ভাগ মানুষ দ্বারা দেশের ৯৯ ভাগ মানুষ আজ শোষিত, নিষ্পেষিত, নির্যাতিত হচ্ছে। এই মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের সংঘটিত করাই বামপন্থি কমিউনিস্টদের অন্যতম কতর্ব্য। এই ৯৯ ভাগ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে কমিউনিস্ট বামপন্থি নেতৃত্বে দুর্বার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বর্তমান লুটেরা ধনিক শ্রেণির স্বার্থের সরকারকে পরাভূত করার ভেতর দিয়েই এই ৯৯ ভাগ মানুষের মুক্তি আসবে এবং তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশ হবে কার? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, বাংলাদেশ হবে শোষিত, নির্যাতিত, নিষ্পেষিত ৯৯ ভাগ মানুষের, ১ ভাগের না।

লেখক: সহ-সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.