বাংলাদেশ কি শ্রীলঙ্কার পথে হাঁটছে

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন

উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ শ্রীলঙ্কা আজ দেউলিয়া। যে শ্রীলঙ্কায় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে মাথাপিছু আয় সর্বোচ্চ, ৩,৮৩০ মার্কিন ডলার সেখানে কেনার মত পণ্য বাজারে মজুদ নাই। মূল্যস্ফীতি ১৭ শতাংশের বেশি।

শ্রীলঙ্কার ঘটনা কি একদিনে ঘটেছে, না। এর লক্ষণ অনেকদিন ধরেই দেখা দিচ্ছিল। ২০১৯ সালে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পরের বছরই আবার তাকে অবনমিত করা হয়। ২০১৯ সালে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) একটি ওয়ার্কিং পেপারে বলা হয় ‘শ্রীলঙ্কা ইজ এ ক্লাসিক টুইন ডেফিসিট ইকোনমি’। টুইন ডেফিসিট বা ‘জোড়া ঘাটতি’ সংকেত দেয়- একটি দেশের জাতীয় ব্যয় তার জাতীয় আয়ের চেয়ে বেশি এবং দেশটির বাণিজ্যিক পণ্য ও পরিষেবার উৎপাদন অপর্যাপ্ত।

আজকের শ্রীলঙ্কার আর্থিক পতনের পিছনে ক্ষমতাসীন পরিবার ও দল ফ্রীডম পার্টির কতগুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যে মূলতঃ দায়ী এটা এখন নানা বৈশ্বিক আর্থিক সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

চলমান অতিমারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন ফ্রীডম পার্টি, বিশেষ করে রাজাপাকসে পরিবার কর্তৃক দল ও পরিবারের স্বার্থে গৃহিত যে সিদ্ধান্তসমূহ শ্রীলঙ্কাকে আজ দেউলিয়া বানানোর জন্য দায়ী সেগুলো হচ্ছে-

১) প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্স প্রবাহ হ্রাস। শ্রীলঙ্কা প্রতিবছর রেমিট্যান্স থেকে ৬ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার আয় পেত। অতিমারিকালে অনেকে প্রবাসী শ্রীলঙ্কানরা কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে, ফলে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ মারাত্মক হ্রাস পেয়েছে। এক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কান সরকারকে বিশেষ কোন উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি।

২) পর্যটন থেকে শ্রীলঙ্কার ৩ বিলিয়ন ডলার আয় আসতো। শ্রীলঙ্কায় পর্যটনের জন্য বছরে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন মানুষ যেতো সেখানে গত বছর ২০২১ সালে পর্যটকের সংখ্যা ছিল মাত্র ৮০ হাজার। পর্যটন আয় ব্যাপকহারে হ্রাস পেয়েছে। এর প্রথম কারণ করোনা, দ্বিতীয় কারণ ২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল কলম্বোর তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলে একযোগে বোমা হামলা হয়। বিস্ফোরণে ১৮৯ জন মৃত্যুবরণ করে। এতে শ্রীলঙ্কার পর্যটন শিল্প বিশাল ধাক্কা খায়।

৩) শ্রীলঙ্কা প্রতিবছর ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রাসায়নিক সার আমদানি করতো। ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে শ্রীলঙ্কা সরকার ঘোষণা দেয় তারা আর সার ও কীটনাশক আমদানি করবে না। তারা সম্পূর্ণ অর্গানিক বা জৈব উপায়ে কৃষিকাজ করবে এবং সার, কীটনাশক আমদানির জন্য ব্যয় সম্পূর্ণ হ্রাস করে রিজার্ভের উপর চাপ কমাবে। এই হটকারী সিদ্ধান্তের ফলে শ্রীলঙ্কার কৃষি অর্থনীতিবিদদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ি চালের উৎপাদন ২৫ শতাংশ কমে গেছে। প্রধান রপ্তানী কৃষিপণ্য চা-এর উৎপাদন কমেছে। কৃষকের আয় কমেছে ৩৩ শতাংশ।

শ্রীলঙ্কার প্রধান খাদ্য শস্য চালের দাম বেড়ে গেছে ৩০ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার জিডিপিতে কৃষির অবদান ৭ শতাংশ হলেও এতে ২৭ শতাংশ জনশক্তি নিযুক্ত আছে। ফলে এতে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখন কলম্বোর বাজারে চালের কেজি ২২০ টাকা। এক কেজি গুঁড়োদুধের দাম ১,৯০০ টাকা। অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বাজারে নাই। কাগজের অভাবে স্কুল পরীক্ষা নেয়া যাচ্ছে না। খাদ্য সংকট ক্রমান্বয়ে তীব্রতর হচ্ছে।

৪) রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসে নির্বাচনী অঙ্গিকার হিসেবে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশ ধার্য্য করেন, করপোরেট ট্যাক্স ৪ শতাংশ কমান, ২ শতাংশ হারের নেশন বিল্ডিং ট্যাক্স কমান ও যত আয় তত কর ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেন। এতে জিডিপির ২ শতাংশ পরিমাণ রাজস্ব আয় কমে যায়। ভ্যাট আদায় কমে যায় ৫০ শতাংশ।

৫) বিচার বিবেচনাহীন মেগা প্রজেক্ট গ্রহণ। ২০০৫ সালে মাহিন্দা রাজাপাকসে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে প্রথম আক্রমণ চালান তামিলদের ওপর এবং সর্বগ্রাসী আক্রমণের মাধ্যমে তামিলদের পরাজিত করেন। এ গৃহযুদ্ধকালে ভারতের সাথে শ্রীলঙ্কার সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে। 

মাহিন্দার রাজাপাকসে চীনের দিকে হাত বাড়ান। চীনের ‘ড্রীম প্রজেক্ট’ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) বা ‘মেরিটাইম সিল্ক রোড’ এর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হচ্ছে শ্রীলঙ্কা বা কলম্বো সমুদ্রবন্দর।

চীন এ প্রস্তাব লুফে নেয় বিআরআই এর আওতায় হামবানটোটায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে দেয়। চীনের ঋণে এর পর শ্রীলঙ্কা কতগুলো চটকদার, অথনৈতিকভাবে অলাভজনক, অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্প নেয় এবং বাস্তবায়ন করে। এর মধ্যে রয়েছে হামবানটোটায় মাত্তালা রাজাপাকসে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কলম্বোয় সমুদ্রবন্দরের কাছে চায়নিজ সিটি, লোটাস টাওয়ার, বিশালকায় স্টেডিয়ামসহ ‘আয়হীন’ নানা প্রকল্প। সহজ শর্তে চীন থেকে পাওয়া ঋণ দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে দেখা যায় এসব বন্দরে জাহাজ কিংবা উড়োজাহাজ তেমন একটা আসে না।

এক্সপ্রেস রোডে যে পরিমাণ টোল ওঠে তা দিয়ে ঋণ শোধ তো দূর, রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মেটে না। আয় হচ্ছে না বলে ঋণ পরিশোধ করা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে চীন হামবানটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর ৯৯ বছরের জন্য লিজ নিয়ে নেয়। কিন্তু অন্য প্রকল্পগুলো আয়হীন পরে থাকে।

ইতোমধ্যে ঋণের ‘মোরাটারিয়াম বা গ্রেস পিরিয়ড’ শেষ হয়ে গেছে। গৃহিত ঋণের সুদসহ আসল পরিশোধের সময় হয়ে গেছে। শ্রীলঙ্কার মোট ঋণের পরিমান ৫.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। শ্রীলঙ্কার ঋণের ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ হচ্ছে আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ডে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে ঋণ ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ, জাপানের কাছে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং চীনের কাছে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কাকে কিস্তি পরিশোধ করতে হবে ৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির হিসাব অনুযায়ি বৈদেশিক রিজার্ভ রয়েছে ২.৩১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ কিস্তি পরিশোধ করার সামর্থ্য শ্রীলঙ্কার নেই। শ্রীলঙ্কা এখন আর্থিকভাবে কপর্দকশূন্য, দেউলিয়া। শ্রীলঙ্কার ঋণের হার এখন জিডিপির ১১৯ শতাংশ। অর্থাৎ দেশটি সব মিলিয়ে এক বছরে যে পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে, তার তুলনায় ঋণ বেশি।

শ্রীলঙ্কা এখন একটা টেস্ট কেস। যে লক্ষণগুলো পরিলক্ষিত হয়ে অবশেষে শ্রীলঙ্কা দেউলিয়ায় পরিণত হয়েছে সে লক্ষণগুলো অনেক দেশেই দেখা যায়। লক্ষণওয়ালা দেশগুলো কি শ্রীলঙ্কার পরিণতি বরণ করবে? বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শরীরে শ্রীলঙ্কার লক্ষণগুলো ক্রমান্বয়ে পরিস্ফূটিত হচ্ছে। সেই আঙ্গিকেই বর্তমান আলোচনা এবং যাচাই করে দেখা হচ্ছে বাংলাদেশ কি শ্রীলঙ্কার পথে হাঁটছে।

রেমিট্যোন্স বা প্রবাসী আয় প্রবাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো ভাল অবস্থানে রয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে করোনা মহামারির মধ্যেও ২৪.৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে বাংলাদেশে। সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী সোয়া কোটির মতো প্রবাসী ২১.৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রবাসী আয় পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। ২০১৯ সালে পাঠিয়েছিলেন ১৮.৩৩ বিলিয়ন ডলার। অতিমারীর জন্য অন্য দেশের প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স কমে গেলেও গত বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বাংলাদেশে এসেছে। তবে চলতি বছর টানা কয়েক মাস দেশে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কমেছে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের শুরু থেকেই প্রবাসী আয়ে ভাটার টান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১.১৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

রেমিট্যান্সের এই অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৯৬ কোটি ডলার বা প্রায় ২০ শতাংশ কম। গত অর্থবছর একই সময় এসেছিল ১.৪৯০ বিলিয়ন ডলার।

এর কারণ বিদেশে কর্মিদের কর্মক্ষেত্রের সংকোচন। ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিকে সৌদি আরব ১২ শতাংশ কম কর্মভিসা দিয়েছে। সেই একই সময়ে ওমানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভিসা প্রাপ্তি কমেছে ১৫ শতাংশ। করোনার শুরুতে যে মালয়েশিয়া প্রবাসী শ্রমিকেরা দেশে ফিরে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক এখনো কর্মস্থলে ফিরে যেতে পারেননি। প্রবাসী আয় প্রবাহ কমার প্রবণতা থাকলেও তা এখনো বিপজ্জনক হয়ে ওঠেনি। বাংলাদেশ প্রবাসী আয় অর্জনে পৃথিবীতে সপ্তম স্থানে রয়েছে।

দেশে ঋণের বোঝা বাড়ছে। আজ যে শিশুটি জন্ম নেবে, তার মাথায় ৮৪ হাজার ৭৭০ টাকা ঋণের দায় চাপবে। কারণ বর্তমানে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মাথাপিছু এই অঙ্কের ঋণ রয়েছে। যা গত এক বছরে বেড়েছে প্রায় ৯ হাজার ৬৬৩ টাকা। আগামী এক বছরে তা আরও কমপক্ষে ১৩ হাজার ৬০ টাকা বাড়বে। ফলে ওই সময়ে মাথাপিছু ঋণের স্থিতি দাঁড়াবে প্রায় ৯৮ হাজার টাকা। এ কারণে আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটেও ব্যয়ের দিক থেকে চার নম্বরে রয়েছে ঋণের সুদ পরিশোধের খাত।

অন্যদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে মানুষের মাথাপিছু ব্যয় বরাদ্দ ৩৭ হাজার ৩৩৩ টাকা। এ হিসাবে ঋণ মাথাপিছু বরাদ্দের দ্বিগুণেরও বেশি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কর আদায় করতে না পারায় সরকারকে বেশি ঋণের আশ্রয় নিতে হচ্ছে।

বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম। ভ্যাটের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের ওপর চাপ তৈরি করলেও আয়কর ও কর্পোরেট কর কমিয়ে দিয়ে ধনীদের ছাড় দেয়া হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মত এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী ৪ থেকে ৫ বছরের মধ্যে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বা পরিমাণ ৪৯.৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)র হিসাব অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি এ সময়ে বেড়েছে। গত ২২ মার্চ মোতাবেক চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ গড় মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৬ দশমিক ১৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা জানুয়ারিতে ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

বাংলাদেশের বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৪ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার, যা দিয়ে ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। এ করোনাকালে রিজার্ভের উপর যে কোন চাপ পরেনি এর কৃতিত্বের দাবিদার হচ্ছে কৃষক, গার্মেন্ট শ্রমিক আর প্রবাসী শ্রমিকরা।

২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ৩ হাজার ৮৭৬ কোটি ডলার। শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর রপ্তানি আয় কমলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর এই আয় এখন আরও বাড়ছে।

এসময়কালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বেড়ে হয়েছে ২,৫৫৪ মার্কিন ডলার। দেখা যাচ্ছে রিজার্ভ, রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়, কৃষি অর্থনীতি সব সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ভালো। তার পরেও অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থ বছওে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে দেশে কেবল বাণিজ্য ঘাটতিই হয়ে আছে ১ হাজার ৫৬২ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরেও যেখানে চলতি হিসাবের ভারসাম্য ছিল বাংলাদেশের অনুকূলে, এবার তা ঋণাত্মক। অন্যদিকে আগের অর্থবছরেও প্রথম সাত মাসে প্রবাসী আয়ে ছিল বড় প্রবৃদ্ধি, এবার সেটিও ঋণাত্মক। বাংলাদেশেও এখন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেয়ে ব্যয় অনেক বেশি। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে।

আমদানি ব্যয় আরও বাড়লে রিজার্ভেও টান পড়বে। এতে রিজার্ভের অর্থ অবকাঠামো প্রকল্পে খরচ করার সুযোগ কমে আসবে। সব মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর চাপ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এ কারণে বড় প্রকল্পে অর্থ ব্যয়, দায় পরিশোধ ও সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক নিয়ে সতর্কতা দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।

গত ১৭ বছর ধরে রাজাপাকসে পরিবার শ্রীলঙ্কায় ক্ষমতায় বসে আছে, আজকের পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য তাদের অপশাসনই দায়ী। তারা অর্থনৈতিকভাবে অফলপ্রসূ, আয়হীন চটকদার মেগা প্রজেক্ট গ্রহণ করে শ্রীলঙ্কাকে ঋণগ্রস্ত করেছে। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি, দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মইনুল ইসলাম শ্রীলঙ্কার আয়হীন মেগা প্রজেক্টসমূহের সাথে তুলনা করে সরকারকে সতর্ক করে লিখেছেন, ‘সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশেও অত্যন্ত ব্যয়বহুল চটকদার (গ্ল্যামারাস) প্রকল্প গ্রহণের প্রবণতায় ভবিষ্যতে শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশেরও ‘ঋণের ফাঁদে’ আটকা পড়ার আশঙ্কার কারণ সৃষ্টি হয়েছে।’ তিনি বর্তমান সরকারের গৃহিত নীচের প্রকল্পসমূহকে চটকদার বলে উল্লেখ করেছেন: ১) ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার বুলেট ট্রেন, ২) দ্বিতীয় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, ৩) দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, ৪) পূর্বাচলে ১১০ তলাবিশিষ্ট বঙ্গবন্ধু বহুতল ভবন কমপ্লেক্স, ৫) শরীয়তপুরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ৬) পাটুরিয়া- দৌলতদিয়া দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, ৭) নোয়াখালী বিমানবন্দর এবং ৮) ঢাকার বাইরে রাজধানী স্থানান্তর।

অধ্যাপক মইনুল ইসলাম প্রকল্প মূল্যায়ন সম্পর্কে তাঁর উচ্চতর ডিগ্রীর কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘এ প্রকল্পগুলোকে বর্তমান পর্যায়ে আমি গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করতে পারছি না।’ পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর ও ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের রুপপুর পারমানবিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পকে তিনি ‘সাদা হাতি’র সাথে তুলনা করেছেন।

দেশের অবকাঠামোর উন্নয়ন ও বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের নিশ্চয়ই প্রয়োজন আছে, কিন্তু সেটা অর্থনৈতিকভাবে কতটা ফলপ্রসূ তা নির্ণয় করা জরুরি। লোক দেখানো বা চটকদার মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করে আশানুরূপ ‘ইকোনমিক রিটার্ন’ না পেলে তা সাদা হাতিতে পরিণত হয়। শ্রীলঙ্কা তার জলজ্যান্ত উদহারণ। মেগা প্রকল্পগুলো যখন দীর্ঘ সময় নিয়ে করা হয় সেক্ষেত্রে প্রকল্প খরচ বৃদ্ধি পায় ফলশ্রুতিতে ঋণ ও সুদ উভয় বৃদ্ধি পায়।

পদ্মাসেতুসহ সব প্রকল্পের ক্ষেত্রে এ ধরণের ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত পত্রিকায় সাক্ষাতকারে বলেছেন, বাংলাদেশের অবস্থা ভালো হবে না। দেশের মেগা প্রকল্পের কারণে বিদেশী ঋণ বেড়ে যাওয়াই এর মূল কারণ। দুই ধরনের ঋণ আছে।

একটি কনসেশনাল লোন, অপরটি কমার্শিয়াল লোন। এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ কনসেশনাল লোন (ঋণগ্রহীতার জন্য সুবিধাজনক শর্তে দেওয়া ঋণ) পেতো। এগুলো পরিশোধে অনেক সময় পাওয়া যায়। কিন্তু এখন বাংলাদেশ বাণিজ্যিক ঋণ নিচ্ছে, যেগুলো ৫, ৭, ১০ বছরের মধ্যে শোধ করতে হবে। এগুলোয় দরকষাকষিরও সুযোগ নেই। ফলে ঋণ পরিশোধের পরিমাণও এখন দ্রুত বাড়বে। ২৬ থেকে ২৮ সালের মধ্যে বাণিজ্যিক ঋণের সমস্যাটা বেশি দেখা দেবে। ঋণ যেহেতু ডলারে পরিশোধ করতে হবে। সেহেতু আশাব্যঞ্জক না। তিনি বলেন, আমি চাই বাংলাদেশের অবস্থান ভালো থাকুক। তবে বাংলাদেশের অবস্থা খুব ভালো হবে না। যদি বিপদ আসে উদ্ধার হওয়ার খুব বেশি কিছু নেই। বীজ, সার, যন্ত্রপাতি, সেচ সবই আমদানিনির্ভর। স্বনির্ভর না। সরকারের রাজস্ব তেমন বাড়ছে না। এটা দুশ্চিন্তার কারণ। তিনি সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, নতুন কোনো মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া উচিত হবে না।

যেসব মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো নিয়ে স্ট্যাডি করা। সোশ্যাল পর‌্যাবেক্ষণ করা দরকার। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন. ‘প্রয়োজন হলে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে তবে প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ কবে শেষ করতে হবে। দুর্নীতি রোধ করতে হবে যাতে করে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে না যায়। কারণ ব্যয় বেড়ে গেলে প্রকল্প থেকে প্রয়োজনীয় আয় উঠানো সম্ভব হয় না। আয় না এলে ঋণ পরিশোধে সংকট তৈরি হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্বে ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি করা, ইকোমিক রেট অব রিটার্ন, ফাইন্যান্সিয়াল রেট অব রিটার্ন যাচাই করে প্রকল্প বাছাই করতে হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) আরেকজন সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দেশের কর-জিডিপি অনুপাতের স্বল্পতার প্রতি দিকনির্দেশ করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে একটা ‘ফাঁদ বা বোটলনেকে’র মধ্যে পরে আছে। দীর্ঘদিন ধরে আয়, সরকারি ব্যয় কোনটাই বাড়ানো যাচ্ছে না।’

বাংলাদেশের অর্থনীতি করোনাকালে প্রতিবেশী দেশগুলোর মত সংকুচিত না হওয়ায়, উপরন্তু কৃষিখাত, প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন, গার্মেন্ট রপ্তানীর ক্ষেত্রে সংকট তৈরি না হওয়ায় সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও ক্রমান্বয়ে তার মধ্যে সংকটের লক্ষণ পরিস্ফূটিত হচ্ছে। দেশের অর্থনীতি যদি বিদ্যমান পরিবারতান্ত্রিক কাঠামোতে ঘুরপাক খায় এবং তাতে যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ লুকায়িত থাকে এবং সে স্বার্থজাত অফলপ্রসূ, অপ্রয়োজনীয়, চটকদার মেগা প্রজেক্ট বৈদেশিক ঋণ নিয়ে বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ক্রমশঃ শ্রীলঙ্কার মত হবে।

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.