বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের কি কোনো ভবিষ্যৎ আছে?

এস এ রশীদ  

বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের কি কোন ভবিষ্যৎ আছে? এ প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে পাটের সাথে সংশ্লিষ্ট হাজারো মানুষের। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ, কৃষক, কর্মচারীসহ অধিকাংশ মানুষ বলছেন- রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের ভবিষ্যৎ সুপ্রসন্ন। আর পাটপণ্য উৎপাদনের কারিগর শ্রমিক বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের স্থায়ী ও প্রাচীন উৎস।

পাটকল বন্ধের সাথে সংশ্লিষ্টরাও এটি জানেন, কিন্তু জেনেশুনে এ কাজ কেন করছেন, প্রশ্ন এখানেই। বিভিন্ন সময় দেশের বাম গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের নেতারা বলে থাকেন জনগণের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের কথা। এখানে পাটকল বন্ধ করে দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ করা হয়েছে। তাহলে স্বার্থ কার রক্ষা হয়েছে? ব্যক্তি মালিকানাধীন পাটকল মালিকদের স্বার্থরক্ষা হয়েছে, যে লুটেরা মালিকদের কেউ কেউ সরকারের সাথে আছেন আবার কেউ আছেন সরকারের ছত্রছায়ায়।

মহান মুক্তিযুদ্ধের পরে জাতীয়করণের মধ্যদিয়ে এই বৃহত্তর শিল্প দেশে প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সেক্টর হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল। কালের পরিক্রমায় এই শিল্পকে পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংসের দারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। লোকসানের অজুহাতে ৭৭ টি পাটকল একে একে বন্ধ করা হয়েছে, বাকী ২৬ টি ২০১৯ সালের ২ জুলাই একযোগে বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। বন্ধের সময় বলা হয়েছিল ক্রমাগত লোকসানের জন্য শুধু উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে। ৩ মাসের মধ্যে বর্তমান শ্রমিকদের সমুদয় বকেয়া পাওনা পরিশোধ করে নতুন করে কারখানা চালু করা হবে।

ইতোমধ্যে ১৮ মাস পার হয়ে গেছে মিল চালুর ফলপ্রসূ কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। নানা অজুহাতে এখনও ২০ শতাংশ শ্রমিক কোন বকেয়া পায়নি। দৈনিক ভিত্তিক শ্রমিক কর্মচারীদের দিয়ে পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত ৫টি পাটকলের শ্রমিকরা এখনও কোন পাওনা পায়নি। স্থায়ী শ্রমিকরা যারা টাকা পেয়েছেন তাদের মধ্যে প্রায় ৮০ ভাগই খুবই কম টাকা পেয়েছেন। সেই টাকা দেনা পরিশোধ করে এখন সর্বশান্ত হয়েছেন। ভিন্ন পেশায় না যেতে পেরে অনেকেই মানবতার জীবনযাপন করছেন। ব্যক্তি খাতের পাটকলে আনেকেই সামান্য মজুরি ১৫০/২০০ টাকায় কাজ করতে বধ্য হচ্ছেন। সারা পৃথিবীতে পাটপণ্যের বহুমুখী করণ হয়েছে এবং চাহিদাও বেড়েছে। অথচ ব্যক্তিখাতের পাট কলের সুবিধা দেওয়ার জন্য রাষ্টায়ত্ত পাটকলকে বন্ধ করা হয়েছে।

পাটমন্ত্রী বলেছেন ৫০ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। শ্রমিকরা এই লোকসানের জন্য দায়ী। ১০ হাজার কোটি টাকা যদি সত্যি সত্যি পাটকল লোকসান দিয়ে থাকে, তবে এই সেক্টর থেকে এযাবৎ কাল কত টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে। কত শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। পাট চাষি- পাট ব্যবসায়ী, শিল্পাঞ্চলে নানা ব্যবসা সব মিলিয়ে এই খাতের দেশের অর্জনের কথা কোন ভাবে ভুলে গেলে চলবে না। আর লোকসানের জন্য শ্রমিক দায়ী এ প্রশ্নের জবাবে শ্রমিক নিজেই বলেছেন, আমাদের মিল পরিচালনার দ্বায়িত্ব নয়। আমরা যথা সময় পাট ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি না। পাটপণ্য রপ্তানিতে ভূমিকা রাখি না। আমরা আমাদের দ্বায়িত্ব যথাযত ভাবে পালন করে থাকি। পাটকলের লোকসানের জন্য পাট মন্ত্রনালয়- বিজেএমসির মাথা ভারি প্রশাসন দায়ী। মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পাটকল বন্ধ ষোষনা মুক্তিযুদ্ধের ধারা ও রাষ্ট্র বিরোধী কর্মকান্ড। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি পাট অর্থনীতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল চালুর কোন বিকল্প নেই। পাটের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের ভাবনা একই।

শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ এক গবেষণা করে বলেছিল মাত্র ১২শ কোটি টাকা খরচ করলে সকল পাটকল আধুনিকায়ন করা সম্ভব। তাতে বর্তমান উৎপাদন দ্বিগুণ করা যাবে। প্রায় একই ধরণের একটি প্রস্তাব চীন দিয়েছিল। কিন্তু সরকার সেদিকে যেতে চায় না। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ভারী শিল্পকে রাষ্ট্রায়ত্ব করার দাবি উঠেছিল। ‘৭৯ সালের ১১ দফায় পাটকল জাতীয়করণের দাবি ছিল। ১৯৭০ এর নির্বাচনের ইস্তহারে পাটকল রাষ্ট্রায়ত্তের কথা বলা হয়েছিল। পাটকলের হাজার হাজার শ্রমিক সেদিন মুক্তি যুদ্ধে অংগ্রহণ করেছিলেন। এখন বন্ধকৃত পাটকলগুলিতে মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ড আছে। দেশবাসীর দাবির কারণেই ১৯৭২ সালে পাটশিল্পকে জাতীয়করণ করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে জাতির জনকের কন্যা করোনা অতিমারির মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি পাটকল বন্ধ করে দিয়েছেন। বন্ধকৃত পাটকল রাষ্ট্রীয়ভাবে চালু ও আধুনিকায়ন এবং শ্রমিকদের সমুদয় বকেয়া পাওনা পরিশোধের দাবিতে গত ২০২১ সালের ১ নভেম্বর ঢাকা প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ২৬টি পাটকলের শ্রমিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। দৈনিক ভিত্তিক শ্রমিক কর্মচারী দিয়ে পরিচালিত ৫ টি পাটকলের শ্রমিকরা গত ছয় মাস ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছে ।

ইতিমধ্যে মিল গেটে সমাবেশ, শ্রম পরিচালকের অবস্থান, বিজেএমসি-এর কার্যালয় ঘেরাও, লাঠি মিছিল, ভুখা মিছিল, রাজপথ অবরোধ, ডিসি অফিস ঘেরাও সহ লাগাতার কর্মসূচি পালন করে হচ্ছে। ২০০৬ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত এই ৫ টি পাটকল বন্ধ করা হয়েছিল। ২০০৮ সালে সরকার পরিবর্তন হলে এই ৫ টি পাটকল সব ধরনের শ্রম আইনকে বৃদ্ধা আংগুল দেখিয়ে দৈনিক ভিত্তিক শ্রমিক কর্মচারীদের দিয়ে মিল চালু করা হয়। ২০১৫ সালের মজুরি কমিশন অনুযায়ী এই সকল মিলের বকেয়া ২০১৯ সালে আন্দোলনের মুখে পরিশোধ করে করেছিল। অতচ স্থায়ী শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ করা হলেও দৈনিক ভিত্তিক শ্রমিকদের এখন পর্যন্ত কোন টাকা দেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিতে কর্মসূচি আরও জোরদার হচ্ছে। যদিও সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট বলছেন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। বেসরকারিভাবে পাটকল চালু করতে হবে। পাটকলের শ্রমিকরা ও দেশের সচেতন মহল বলছেন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলেরই ভবিষ্যৎ আছে।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির নেতৃবৃন্দ বলছেন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল রাষ্ট্রীয়ভাবে চালু করতে হবে। এ বিষয় সমিতি পাটকলের লোকসানের কারণ চিহ্নিত করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার জন্য সুপারিশপত্র তৈরি করেছিলেন ২০০৮ সালে। সেই গবেষণা আরও সমসাময়িককরণের কাজ করছে অর্থনীতি সমিতি। সাথে সহায়তা করছে পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদ। সবমিলিয়ে রাষ্ট্রের এই বৃহত্তর সম্পদ রক্ষার কোন বিকল্প নেই। প্রয়োজন অবিলম্বে রাষ্টায়ত্ত পাটকল রাষ্ট্রীয়ভাবে চালু ও আধুনিকায়ন করা। সময় বলছে সে জন্য বড় ধরনের লড়াই সংগ্রাম ছাড়া সম্ভব হবে না। সেই লড়াইয়ে শ্রমিক কৃষক জনতাকে আরও বেশি সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।

আসুন আগামীর পাট আন্দোলন হোক শেষ আন্দোলন। যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘ ঐতিহ্যের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল চালু হোক। মিলের সাইরেন শুনে শ্রমিকদের পদচারণায় মুখরিত হোক মিল চত্বর। শ্রমিকের নিপুণ হাতে তৈরি পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হোক- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: সদস্য, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.