বস্তিতে আগুনের ভয়াবহতা

সম্প্রতি দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেড়েই চলেছে। বস্তির পাশাপাশি বিভিন্ন কারখানা থেকে শুরু করে অনেক স্থানেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার তদন্তে প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তরিকতা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, এই আগুনগুলো কি নিছক দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা? বস্তির বাসিন্দাদের অভিযোগ, উদ্দেশ্যমূলকভাবে কেউ বস্তিতে আগুন দিয়ে তাদের স্বপ্ন পুড়ে ছাই করে দিয়েছে। বস্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের মদদপুষ্টরা ষড়যন্ত্র করে এসব আগুন লাগিয়েছে বলে ভুক্তভোগী বস্তিবাসীদের ধারণা।

গত কয়েক বছরে আগুনে পুড়েছে অনেকের ঘর-সংসার, নিভেছে অনেক জীবনপ্রদীপ। গৃহহীন হয়ে পড়ছেন খেটে খাওয়া বহু মানুষ। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফসল নিমিষেই ছাই হচ্ছে। সহায়-সম্বল হারা এসব মানুষের আর্তনাদ ছাড়া কিছুই করার থাকে না। একেকটি বস্তিতে একাধিকবার আগুনের ঘটনা ঘটছে। রাত গভীর হলে বস্তিতে আগুন লাগছে। সকালের আলো ফুটতেই সর্বনাশা আগুন অসহায় মানুষের জীবনের শেষ উপার্জনটুকুও কেড়ে নিচ্ছে। সব পুড়ে ছাই হলে সর্বস্বান্ত এসব মানুষের মাথায় হাত দেয়া ছাড়া কিছুই করার থাকে না। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আসে। আগুন নিয়ন্ত্রণে নেয়। তদন্ত কমিটি হয়। কিন্তু এসব তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন কখনো আলোর মুখ দেখে না। আগুন রহস্যের নেপথ্য অজানাই থেকে যায়।

রাজধানীর বস্তিগুলোতে বিভিন্ন সময় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়ে একদিকে ভূমিদস্যুরা প্রচুর অর্থ-বিত্তের মালিক বনে যাচ্ছেন, অন্যদিকে নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া অসহায় মানুষ অগ্নিকাণ্ডের কারণে এক বস্তি থেকে অন্য বস্তিতে ছুটে বেড়াচ্ছেন একটু মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্য। তবু সরকার, প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই বিষয়গুলো ন্যূনতম ভ্রুক্ষেপ না করে নির্বিকার থাকছে।

গত সোমবার মহাখালীর সাততলার বটতলা মসজিদ রোডের বস্তিতে আগুন লেগে পুড়ে যায় আড়াই শতাধিক ঘর। তাতে সর্বস্ব হারান বস্তির বাসিন্দারা। পরদিন মঙ্গলবার বিকালে মোহাম্মদপুরের জহুরী মহল্লায় বিজলী বস্তিতে আগুন লেগে শতাধিক ঘর পুড়ে যায়। এর কয়েক ঘণ্টার মাথায় মঙ্গলবার রাত আনুমানিক সোয়া ২টার দিকে কালশী বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন বাউনিয়া বাঁধ বি ব্লকের বস্তিতে আগুনে অন্তত ৪৩টি বস্তি ঘর এবং ১২টি দোকান পুড়ে যায়। গত ১৭ নভেম্বর সকালে সিলেটের কুমারগাঁও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে আগুন লাগে। অন্ধকারে থাকে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা। এর আগে গত আট মাসে দেশে অন্তত চারটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এর ফলে বহুমুখী ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় জনগণ। এর আগে গত ৮ ও ১০ সেপ্টেম্বর দুই দফায় ময়মনসিংহ শহরের কেওয়াটখালী বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে আগুন লাগে।

এভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে আগুন লাগার বা লাগানোর যে ঘটনা ঘটছে- যা অত্যন্ত উদ্বেগের। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালে ১৭৪টি বস্তিতে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৭ কোটি ৩৩ লাখ ১১ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। বস্তিতে নিয়মিত বিরতিতে এভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মামলা হয় না। হতাহত হলেই কেবল মামলা হয়, তা-ও আবার অপমৃত্যর। এরপরও আবার তদন্ত হয় না। এখন পর্যন্ত যত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, তাতে দফায় দফায় তদন্ত কমিটি হয়েছে, ভারি হয়েছে সুপারিশের তালিকা। তবে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এসব সুপারিশ রয়ে গেছে কাগজপত্রেই। গত পাঁচ বছরে দেশের বস্তিগুলোয় ১ হাজার ২০০টির বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও একটিরও অভিযোগপত্র দাখিল করেনি পুলিশ। স্বাভাবিকভাবেই এসব অগ্নিকাণ্ডে কাউকে দায়ীও করা যায়নি। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সর্বোচ্চ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে রাজধানী ঢাকায়। এছাড়া সারা দেশে ছোটবড় ১৬ হাজার অগ্নিদুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১ হাজার ৫৯০ জন। এতে ৪ হাজার কোটি টাকার ওপর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুধু গত বছরই রাজধানীসহ সারা দেশে অন্তত ৩২টি বস্তিতে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব আগুনে নারী-শিশুসহ মারা গেছেন অন্তত ২০ জন।

একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে থাকবে এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো আমলে নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের স্থায়ী পুনর্বাসন, পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণ ও আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।