বর্ণবাদ ইস্যুতে ডি ককের ক্ষমা প্রার্থনা

হাঁটু গেড়ে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশে অস্বীকৃতি জানিয়ে ম্যাচের আগ মুহূর্তে কুইন্টন ডি ককের নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার এই কিপার-ব্যাটসম্যান।

সকলের কাছে ক্ষমা চেয়ে পরিস্কার করলেন নিজের অবস্থান।

বৃহস্পতিবার বিশাল এক বিবৃতি দিয়ে ডি কক তুলে ধরেন তার এমন সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ। সামনে এই নিয়ম মানতে আপত্তি নেই বলেও জানান তিনি।

“সতীর্থ ও দেশে থাকা সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে শুরু করতে চাই। আমি কখনোই এটাকে কুইন্টন ইস্যু বানাতে চাইনি। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গুরুত্ব আমি জানি এবং খেলোয়াড় হিসেবে উদাহরণ সৃষ্টি করা আমাদের দায়িত্ব, সে সম্পর্কেও আমি অবগত।”

“আমার হাঁটু গেড়ে বসা যদি অন্যদের শিক্ষিত করে, অন্যদের জীবনকে ভালো করে, আমি এমনটা খুশি মনেই করব। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে না খেলে আমি কাউকে, বিশেষ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকে অসম্মান করতে চাইনি। সম্ভবত কিছু মানুষ বুঝতে পারছে না যে মঙ্গলবার সকালে ম্যাচ খেলতে যাওয়ার সময় আচমকা আমাদের এটা (হাঁটু গেড়ে বসা) করতে বলা হয়।”

ঘটনা তুলে ধরতে বিশদ বিবৃতির মাঝে বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন ২৮ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার।

“আমার কাজে ও সিদ্ধান্তে সবাই যে কষ্ট পেয়েছেন, ক্ষুব্ধ হয়েছেন, বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে-সবকিছুর জন্য আমি সত্যিই অন্তর থেকে দুঃখিত। এখন পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আমি চুপ ছিলাম। তবে আমার মনে হয়েছে, কিছুটা হলেও নিজেকে ব্যাখ্যা করা দরকার।”

“যারা জানে না, তাদের জন্য বলছি, আমি নিজেই মিশ্র জাতির পরিবার থেকে এসেছি। আমার সৎ-বোনেরা (মিশ্র বর্ণের) আর আমার সৎ-মা কৃষ্ণাঙ্গ। জন্মের পর থেকেই ‘ব্ল্যাক লাইভস’ আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্রেফ এই কারণে নয় যে, এটা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে আন্দোলন হচ্ছে।”

কোনো একক ব্যক্তির চেয়ে সবার অধিকার ও সমতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্বাস করেন ডি কক। বলেন, ছোট থেকেই তিনি এই শিক্ষা পেয়েছেন।

“আমাদের যেভাবে বলা হয়েছে, সেভাবেই করতে হবে; যখন আমাকে এটা বলা হলো, মনে হলো যেন আমার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।”

“গত রাতে বোর্ডের সঙ্গে খুবই আবেগপূর্ণ আলোচনা হয়েছে এবং আমার মনে হয় আমরা তাদের উদ্দেশ্য বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছি। এটা আরও আগে হলে ভালো হতো, তাহলে ম্যাচের দিন যা হয়েছে তা এড়ানো যেত।”

বোর্ডের পক্ষ থেকে হঠাৎ করে আসা নির্দেশিকা তার কাছে শুরুতে অযৌক্তিক লেগেছিল। কারণটাও ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।

“আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম না, প্রতিদিনই যখন সব ধরনের মানুষের সঙ্গে থাকছি, শিখছি অনেক কিছু এবং তাদের ভালোবাসছি, তাহলে কেন একটি অঙ্গভঙ্গি দিয়ে এটা প্রমাণ করতে হবে। যখন কোনো আলোচনা ছাড়াই কিছু করতে বলা হলো, আমার কাছে মনে হলো পুরো বিষয়টিই অর্থহীন। আমি যদি বর্ণবাদী হতাম, খুব সহজেই হাঁটু গেড়ে বসতাম এবং মিথ্যা বলতাম, যেটা হতো ভুল এবং এর মাধ্যমে ভালো সমাজ তৈরি হতো না।”

“যারা আমার সঙ্গে বড় হয়েছে এবং আমার সঙ্গে খেলেছে, তারা জানে আমি কী ধরনের মানুষ। ক্রিকেটার হিসেবে আমাকে অনেক নামেই ডাকা হয়েছে। বোকা, স্বার্থপর, অপরিণত। কিন্তু সেগুলো আমাকে কষ্ট দেয়নি। ভুল বোঝাবুঝির কারণে বর্ণবাদী বলা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।”

কেবল তাকেই নয়, দুদিনের মধ্যে তার প্রতি মানুষের এই আচরণ, সমালোচনা তার পরিবারকেও আঘাত করেছে, বললেন দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে ৫৩ টেস্ট, ১২৪ ওয়ানডে ও ৫৮টি টি-টোয়েন্টি খেলা ডি কক।

“এটা আমার পরিবারকে আঘাত করেছে। আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে আহত করেছে। আমি বর্ণবাদী নই। মনের গভীর থেকে সেটা আমি জানি। আর যারা আমাকে চেনে, তারাও এটা জানে।”

“আমি জানি, শব্দের ব্যবহারে আমি খুব ভালো নই। তবে আমাকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি নিয়ে আমি কতটা দুঃখিত সেটা ব্যাখ্যা করতে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।”

ম্যাচ খেলতে যাওয়ার পথে যখন তাদেরকে বোর্ডের নির্দেশিকার বিষয়ে জানানো হলো, ঠিক সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন ডি কক।

“না, মিথ্যা বলব না। গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচে খেলতে যাওয়ার পথে আমাদের বলা হলো যে একটি নির্দেশনা আছে, যেটা অনুসরণ করতেই হবে, ‘অন্যথায়’। এমনটা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মনে হয় না, কেবল আমি একাই হয়েছিলাম।”

“আমরা ক্যাম্প করেছিলাম। আমাদের (অনুশীলন) সেশন ছিল। আমরা জুম মিটিং করেছি। আমরা সবাই জানি, আমাদের কী ভাবনা।”

এই ম্যাচের আগে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটারদের জন্য হাঁটু গেড়ে সংহতি জানানো বাধ্যতামূলক ছিল না। ক্রিকেট বোর্ড থেকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল, যার যার ইচ্ছামতো হাঁটু গেড়ে বা হাত তুলে কিংবা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তারা প্রতিবাদে সামিল হতে পারে। ডি কক তিনটির কোনোটিই করেননি আগে। আর হয়তো সে কারণেই যখন এটি বাধ্যতামূলক করা হলো এবং প্রেক্ষিতে তিনি ম্যাচ থেকে সরে দাঁড়ালেন, সবকিছু মিলেই তাকে ঘিরে অন্যরকম এক আবহ তৈরি হয়েছিল, যা তুমুল সমালোচনার জন্ম দেয়।

“আমি আমার সব সতীর্থকে ভালোবাসি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে ক্রিকেট খেলার চেয়ে বেশি আর কিছুই ভালোবাসি না। আমি মনে করি, টুর্নামেন্ট শুরুর আগে যদি আমরা এটা ঠিক করে ফেলতাম তাহলে সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই ভালো হতো।”

“এরপর আমরা নিজেদের কাজে মনোযোগ দিতে পারতাম, দেশের জন্য ক্রিকেট ম্যাচ জেতার জন্য তৈরি থাকতাম। আমরা যখনই বিশ্বকাপে যাই, নাটকীয়তা দেখা যায়। এটা ঠিক নয়।”

শেষে কঠিন এই সময়ে দল ও সতীর্থদের পাশে থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান ডি কক।

“আমাকে সমর্থন করার জন্য সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাতে চাই, বিশেষ করে আমার অধিনায়ক, টেম্বা বাভুমাকে। মানুষ হয়তো জানে না, তবে সে অসাধারণ একজন নেতা।”

“সে, দল ও দক্ষিণ আফ্রিকা যদি আমাকে চায়, তাহলে দেশের হয়ে আবার ক্রিকেট খেলা ছাড়া আর বেশি কিছু চাইব না আমি।”

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার ঘটে এই ঘটনা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচ শুরুর ঘণ্টা পাঁচেক আগে দক্ষিণ আফ্রিকা বোর্ড থেকে নির্দেশনা আসে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সব ম্যাচের আগেই বাধ্যতামূলভাবে দলের সবাইকে হাঁটু গেড়ে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনে সংহতি জানাতে হবে। টিম বাসে ওঠার সময় সবাইকে সেটি জানানো হয়। ডি কক তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, তিনি এই প্রক্রিয়া আর এই ম্যাচে থাকবেন না।

টসের সময় সবাইকে অবাক করে দিয়ে অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা জানান, ব্যক্তিগত কারণে ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে খেলছেন না ডি কক। ক্রিকেট দুনিয়ায় যেন বিস্ফোরণ হয়। পরে দক্ষিণ আফ্রিকা বোর্ড জানায় পেছনের কারণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.