বন্যার্তদের ঘরে ফেরাতে হবে

এবারের ঈদটা ভালো যায়নি দেশের উত্তর-পূর্বাংশের মানুষের। বন্যার ধকল তারা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। অনেকেই এখনও অসহায়ভাবে আশ্রয়কেন্দ্রে পড়ে আছেন। কারণ, তাদের বাড়িঘর ভেঙে গেছে। তারা কোথায় গিয়ে উঠবেন। এখন সময় এসেছে এসব মানুষকে নিয়ে ভাববার। যারা ঘর হারিয়েছেন অনেকের নিজের সামর্থ্য নেই সেই ঘর করার। কেউ হাত না বাড়ালে তাদের জন্য সামনের দিনগুলো অনেক কষ্টকর হবে।

সরকারের উচিত, এসব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর, তাদের ঘর মেরামতের জন্য উদ্যোগ নেওয়ার। শুধু উন্নয়নের বুলি আউরে যে এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না এটা এখন সরকারের বোঝা উচিত। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনায় হাজার হাজার মানুষ এখনও আশ্রয়কেন্দ্রে আছে, তাদের বসতবাড়িতে ফেরানোর উদ্যোগ এখনই নেওয়া উচিত।

এবারের বন্যায় সুনামগঞ্জের সবকটি উপজেলাই ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় হাজার হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছেন। দিনের পর দিন পানি নিচে থাকা ঘরের আসবাবপত্র, ধান, কৃষিকাজের যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু এটাই নয়, ভাবতে হবে বন্যার পরিণতি নিয়েও। কারণ, যত দিন যাচ্ছে, উন্নয়নের নামে, দখলের নামে হাওরের প্রকৃতিকে, জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। আর এ কারণেই বন্যার ব্যাপকতা বাড়ছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

প্রাথমিকভাবে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিসংখ্যানের বাইরে রয়ে গেছে আরও অনেক বসতি। এতে শুধু ছিন্নমূল বা গরিব মানুষই নয়; নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্তরাও বড় ধরনের বিপদে পড়েছেন।

সুনামগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, ৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় সাত হাজার মানুষ আছেন। তারা ঈদ করছেন আশ্রয়কেন্দ্রেই। এদিকে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ঈদুল আজহা উপলক্ষে জেলার ৩৩৩টি আশ্রয়কেন্দ্রের ১৫ হাজার ৩৯৯ জন বন্যা দুর্গতের মধ্যে খাবার পরিবেশন করা হয়েছে।

শতাব্দির এ ভয়াবহ বন্যার মধ্যেই বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হাওর এলাকায় গত তিন দশকে ৮৭ শতাংশ জলাভূমি কমে ৪০০ বর্গকিলোমিটারে নেমেছে; যে কারণে বন্যার ব্যাপকতা বাড়ছে, তা ভয়াবহও হচ্ছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩৭৩ হাওরে শুষ্ক মৌসুমে জলাভূমির পরিমাণ ১৯৮৮ সালে ছিল ৩০ হাজার ৩৫০ বর্গকিলোমিটার। ৩২ বছরে তা কমে ২০২০ সালে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০৭ বর্গকিলোমিটারে। এসময়ে হাওরাঞ্চলে সড়কসহ বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো প্রায় পৌনে চারগুণ বেড়ে ১০৩২ থেকে ৩৮৭২ বর্গকিলোমিটার হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, হাওর এলাকায় নির্মিত এলাকা (বিল্ট আপ এরিয়া) ২০০৬ সালে ২ দশমিক ২ গুণ ও ২০২০ সালে ৩ দশমিক ৮ গুণ বেড়েছে। পাশাপাশি পতিত জমি, কৃষিজমি ও বনজ এলাকাও কমেছে আশঙ্কাজনকভাবে। হাওরের বিভিন্ন জেলার মধ্যে ১৯৮৮ সালের তুলনায় ২০২০ সালে শুষ্ক মৌসুমের জলাভূমির পরিমাণ সিলেটে ৭৫ ভাগ, সুনামগঞ্জে প্রায় ৮০ ভাগ, নেত্রকোনায় প্রায় ৯০ ভাগ, কিশোরগঞ্জে প্রায় ৮৫ ভাগ, ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় প্রায় ৭০ ভাগ, হবিগঞ্জে প্রায় ৯০ ভাগ এবং মৌলভীবাজারে প্রায় ৭০ ভাগ হ্রাস পেয়েছে বলে গবেষণার তথ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published.