ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে লেখকের ভূমিকা

মীর মোশাররফ হোসেন

বেনিতো মুসোলিনি যখন ইতালিতে ফ্যাসিজম নামের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন নিয়ে হাজির হয়েছিলেন, তখন সমগ্র ইউরোপ এমনকি বাইরেও এর প্রবল ধাক্কা লেগেছিল। জাতীয়তাবাদী, কট্টর ডানপন্থিরা যেন এমন একটা কিছুর জন্যই অপেক্ষা করছিল। সামন্ততন্ত্রের ভূতও এই মতবাদের ঘাড়ে সওয়ার হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। গণতন্ত্রের দরকার নেই, ভিন্নমতের দরকার নেই, এক তত্ত্ব, এক দর্শন, এক জাতি, এক রাষ্ট্র- শ্রেণিবিভক্তি বাড়ুক, ধনীরা আরও সম্পদশালী হোক; এর সঙ্গে থাকে লাঠিয়াল বাহিনী, যারা দেশের ভেতরে এবং প্রয়োজনে বাইরে বিরোধী আর ফ্যাসিজমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে তাদের শক্ত হাতে দমন করতে পারবে।

অবশ্য শুধু এতেও হয় না। ফ্যাসিজম নিজেকে টিকিয়ে রাখতে একটা বুদ্ধিবৃত্তিক আবেশ তৈরি করে এবং বশংবদ বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে তা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। জনগণের চোখে ঠুলি পরানোর চেষ্টার অংশ হিসেবে ফ্যাসিজম তার বিরোধী যাবতীয় মত ও পথকে ‘রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক’ হিসেবে হাজির করতে চায়। নিজে বিপদে পড়লে সে ‘রাষ্ট্র বিপদে’, ‘রাষ্ট্র বিপন্ন’ এসব কথা বলতে শুরু করে, এবং আরও বেশি কর্তৃত্ববাদী চরিত্র ধারণ করে।

অন্য সব স্বৈরাচারী ব্যবস্থার সঙ্গে ফ্যাসিজমের একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। আর সেটি হল, ফ্যাসিজমে এই মতবাদকে ধারণ ও অনুশীলনে রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের দরকার হয়।

ওয়াল্টার ল্যাকুয়ার তার ‘ফ্যাসিজম: পাস্ট, প্রেজেন্ট, ফিউচার’ বইয়ে লিখেছেন, “ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় একটি বিশাল রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি থাকে। এই দলটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে ক্ষমতার একচেটিয়াকরণে সমর্থ হয়। এটা করতে গিয়ে তারা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সহিংসতার প্রয়োগ করে থাকে। এভাবে তারা সব বিরোধী পক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। এই ধরনের দলের নেতৃত্বে এমন একজন নেতা/নেত্রী থাকেন, যিনি দৃশ্যত সীমাহীন ক্ষমতাশালী। তাকে তার অনুসারীরা দেব-দেবীর মতই পূজা-অর্চনায় সিক্ত রাখে। তাদের এই আনুগত্য প্রায় ধর্মীয়ভক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এই রাজনৈতিক দলটি শুধু তাদের নিজেদের জন্যই নয় বরং তাদের নিজস্ব মতাদর্শিক বিশ্বাসকে বাকি সব নাগরিকদের জন্যই বাধ্যতামূলক করে তোলে। একটি শক্তিশালী প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে তারা এই মতাদর্শিক বিশ্বাসকে প্রতিনিয়ত প্রচার করে থাকে।”

মুসোলিনি, এরপর হিটলার নিজেদের ফ্যাসিস্ট আচরণ সগর্বে স্বীকার করলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তেমনটা আর হয়নি। কিন্তু, তাতে কি? দুনিয়া থেকে ফ্যাসিজম কি উঠে গেছে? মোটেও না। উল্টো রাষ্ট্রগুলো এখন নিজেদের শাসনব্যবস্থায় নানান কায়দাকানুনের মাধ্যমে ফ্যাসিজমের উপাদানগুলো (যেমন- ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী বা চিরস্থায়ী করার চেষ্টা, ভিন্নমত ও বিরোধীদের দমনপীড়ন, নিরাপত্তা বাহিনীর অধিক ক্ষমতায়ন, মানবাধিকার ও শ্রমিক অধিকার কমাতে কমাতে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা ইত্যাদি) আত্মীকরণ করেছে। বলা হয়, আধুনিক বিশ্বে ফ্যাসিবাদ হচ্ছে রাষ্ট্রের গোপন ব্যাধি। যার উপসর্গ বোঝা যায় কিন্তু ব্যাধির কথা প্রকাশ করা যায় না। ফ্যাসিবাদের এই উপসর্গ সম্পর্কে বলতে গিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. লরেন্স ব্রিট তার Fascism Aûone লেখায় ফ্যাসিবাদের ১৪টি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছিলেন, এগুলো হচ্ছে- উগ্র জাতীয়তাবাদ; মানবাধিকারের প্রতি অবজ্ঞা; কাউকে না কাউকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে যুদ্ধ জারি বা জারি রাখার ভান করা; সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সুবিধা দেয়া; মারাত্মক লিঙ্গবৈষম্য; গণমাধ্যমকে কৌশলে কিংবা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ; জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠা দেখানো; রাষ্ট্রে ধর্মের ব্যবহার; বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে তোষণ; শ্রমিকদের অধিকার হরণ; শিক্ষাব্যবস্থা ও বুদ্ধিভিত্তিক কর্মকাণ্ডকে পঙ্গু করে দেয়ার ব্যবস্থা করা; অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা আবার কখনো কখনো আকস্মিক কঠোর হয়ে ওঠা; ব্যাপক স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ ও দুর্নীতি এবং নির্বাচনে কারচুপি।

খেয়াল করলে দেখবেন, এর ভেতর দমনপীড়ন অব্যাহত রেখে নিজেদের ক্ষমতাকে সুসংহত রাখার একটা কমপ্লিট সাইকেল আছে। সুবিধাভোগী মুষ্টিমেয় অংশ যেন বাকিদের ওপর কর্তৃত্ব করতে পারে, সেই সুযোগ আছে। জনগণ যেন এই শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলতে না পারে, আওয়াজ তুলতে না পারে, সেজন্য দুটো খুব কার্যকর অস্ত্রও আছে তাদের। একটি হচ্ছে, বশংবদ বুদ্ধিজীবী আর নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম দিয়ে মানুষের মনোজগতে বিভ্রান্তি তৈরি করা, আর তাতেও কাজ না হলে লাঠি-গুলি-টিয়ারগ্যাস-হামলা-মামলা-গুম কিংবা নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। আবার একেবারে শুরুতেই ভিন্নমত বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিরোধিতাকে ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করে দেয়ার নজিরও কম নেই।

স্বৈরাচারী এবং এই ফ্যাসিস্ট মতবাদের ভয় হচ্ছে গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের মতবাদ। এসব মতবাদে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাবনা প্রাধান্য পাওয়ায় মুষ্টিমেয়র কর্তৃত্ব করার আকাঙ্ক্ষা ধুলিস্মাৎ হয়ে যায়। সে কারণেই ফ্যাসিজম অপর মতের ওপর শুরুতেই খড়গহস্ত হয়ে ওঠে। তাদের ভয় শিল্প, সাহিত্যকে। ভয় কবিতাকে, লেখাকে। ভাবনাকে। কাউকে বলতে, ভাবতে দিতে চায় না তারা। চায় স্তব। তবে চিন্তা বা ভাবনার ফল্গুধারাকে আর কত রূদ্ধ করে রাখা যায়? কোনো না কোনো পথ ধরে, চিন্তা আর মাঠের আন্দোলনের পথ ধরে ঠিকই তা বেরিয়ে আসে। বেরিয়ে এসে ফ্যাসিজমকে কুঠারাঘাত করে; মানুষ দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে নতুন বিনির্মাণের পথে হাঁটতে শুরু করে।

এখানে লিও ট্রটস্কির একটি ছোট রাজনৈতিক উপলব্ধি যোগ করতে চাই। ট্রটস্কি বলছেন, ফ্যাসিজম ভিত্তি খুঁজে পায় পেটি-বুর্জোয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে। সমাজতন্ত্রীরা যদি কোনো দেশে একেবারেই ক্ষয়িষ্ণু হয় বা না থাকে তাহলে সাম্রাজ্যবাদের যুগে পেটি বুর্জোয়ারা ফ্যাসিস্টদের সমর্থন করে।

ফ্যাসিজমের উপসর্গ, বৈশিষ্ট্য, উপাদান এবং সে কোথায় কিভাবে বিরাজ করে, তা আমাদের কাছে মোটেও অপরিচিত নয়। আমাদের অভিজ্ঞতার ভেতরই আমরা একে চিহ্নিত করতে পারছি। এখন সবকিছু যেন থমকে আছে। কেউ লিখতে সাহস করেন না, কেউ কার্টুন করতে পারেন না, কারও কণ্ঠে নতুন গান নেই, কেউ ঝাঁঝালো কবিতা বলতে পারছেন না, পত্রিকার কলামে নতুন কিছু নেই, যেন সবার ছন্দপতন ঘটেছে।

এমন পরিস্থিতিতে লেখকের ভূমিকা কেমন হয়? লেখক কি চাপে মাথা নত করে থাকবেন? নাকি, সমাজের চিকিৎসক হিসেবে রোগ নির্ণয় এবং একই সঙ্গে তার দাওয়াই বাতলে দেবেন।

আমরা এমন এক সময়ে এসব বলছি, যখন আমাদের মাথার ওপর অত্যাচারীর খড়গহস্ত দৃশ্যমান। বাকস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, ভিন্নমত প্রকাশে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নানান বাধায় শাসকের কোনো রাখঢাক নেই। আছে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, যেখানে রাষ্ট্র-সরকার তো দূর, এমনকী প্রভাবশালী যে কারও অপরাধ বা ‘সম্ভাব্য অপরাধ’ নিয়ে লিখলেও টুঁটি চেপে ধরা হচ্ছে। মাসের পর মাস জামিন দেয়া হচ্ছে না, অকথ্য নির্যাতন চলছে। প্রাণ কেড়ে নিতেও দ্বিধা করছে না। অবশ্য এই ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টই তো আর সব নয়। এটা না থাকলে আরেকটা থাকবে। আরেক উপায়ে মুখ বন্ধের চেষ্টা চলবে।

এসব ভাবনার সঙ্গে চলুন আমরা সোমেন চন্দকে জড়াই। ইতালি-ইউরোপে ফ্যাসিস্টরা চোখ রাঙাচ্ছে, এর বিরুদ্ধে ১৯৩৫ সালেই প্যারিসে একত্রিত হয়ে গেছেন পৃথিবী বিখ্যাত সব শিল্পী, সাহিত্যিক, লেখক, বুদ্ধিজীবীরা। পরের বছর হল নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ। যার ধারাবাহিকতায় তিন বছর পর ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘের একটি সাংগঠনিক কমিটি হয়। এখানে সোমেন চন্দ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

বিশ্ব এরপর যুদ্ধে ঢুকে গেছে, ফ্যাসিস্ট অক্ষের সঙ্গে অন্যদের লড়াই চলছে। সেই লড়াইয়ের অগ্রভাগে আবার সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন। এর মধ্যেই বিশ্বব্যাপী শিল্পী-সাহিত্যিকরা উগ্র জাতীয়তবাদী মতাদর্শকে খারিজ করে দিয়ে আন্তর্জাতিক দর্শনকে প্রমোট করছেন; শ্রেণিবিভক্ত সমাজ ভেঙে শ্রেণিহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। দারিদ্র্যের মূল কোথায় তার স্বরূপ খুঁজে বের করে এর পেছনে কারা, কেন, কোন অর্থনীতি দায়ী তা তুলে ধরে মানুষকে বলছেন- এ পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।

সোমেন চন্দ এবং তার সঙ্গে সেসময় যারা লেখক সংঘ করেছেন, তাদের সেসময়ের লেখা এমনকি পরের লেখাগুলোতেও আমরা মোটাদাগে এই উপাদানগুলো দেখতে পাবো। তারা নিজেদের রাজনৈতিক দায়িত্বকে উপেক্ষা করেননি। লেখকরা এটা পারেন না। লেখকদের বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকাতে হয়। অবশ্য কেবল চিন্তার বহিঃপ্রকাশেই তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সঙ্কট সমাধানে রাজনৈতিক কর্তব্য পালনেও তাকে অগ্রণী হতে হয়। মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে হয়, সাহসী করতে হয়। তবেই না অত্যাচারের মূল উৎপাটন সম্ভব।

লেখক: সাংবাদিক।

শেয়ার করুন

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

Leave a Reply