ফুলবাড়ির সংগ্রাম, প্রতিরোধের ১৫ বছর: ‘জাতীয় সম্পদ রক্ষায় আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে’

রুহিন হোসেন প্রিন্স 

২০০৫ সালের কোনো একদিন সকালে সিপিবি’র কেন্দ্রীয় অফিসে বসে আছি। দিনাজপুরের ফুলবাড়ির কয়েকজন এলেন। কথা বলতে চান। কথা শুনে জানা গেল দিনাজপুরের ফুলবাড়িতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের তোড়জোড় চলছে। স্থানীয় সচেতন মানুষেরা হিসেব করে বের করেছেন, এই কয়লা উত্তোলনে দেশের লাভ, না ক্ষতি? স্থানীয় প্রেসে ছাপা প্রচারপত্র দেখালেন। জানালেন, দলমত নির্বিশেষে ঐ এলাকার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করছেন, নিজেদের ভিটেমাটি, বাপ-দাদা-দাদি’র কবর, জমি-জলা-প্রকৃতি রক্ষার জন্য। নিজেদের বাঁচার জন্য। গড়ে ওঠা সমাজে বসবাস অব্যহত রাখার জন্য।

স্থানীয় নেতৃবৃন্দ তেল-গ্যাস সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাথে মতবিনিময় করতে চান। তারা চান জাতীয় কমিটি এই আন্দোলনে অংশ নিক। নেতৃত্ব দিক। দ্রুত মতবিনিময়ের সভার তারিখ ঠিক হলো। সিপিবি অফিসের নিচ তলায় (তখন মুক্তি ভবনের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়নি) মতবিনিময় হলো। এরপর ফুলবাড়ি যাওয়া ও ফুলবাড়ি আন্দোলনের সাথে যুক্ত হওয়া। অংশগ্রহণ করা ও জাতীয় কমিটির নেতৃত্ব দেওয়া।

আন্দোলনের শুরুতে স্থানীয়ভাবে দলমত নির্বিশেষে সকলে এই আন্দোলনে থাকলেও অনেক রাজনৈতিক দলের নেৃতবৃন্দ শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনের সাথে থাকেননি। শ্রেণিস্বার্থ ও দলীয় স্বার্থের কারণে তারা এই আন্দোলন পরিত্যাগ করে অনেকেই দালালের খাতায় নাম লেখায়। তবে ঐক্যবদ্ধ ছিল স্থানীয় জনগণ। শিশু-কিশোর-যুব-নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-আদিবাসী সবার ঐক্যবদ্ধ থাকা ও লড়াই ছিল চলামন। লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট, ‘নিজেদের জমি, দেশের সম্পদ রক্ষা করবই’।

এই আন্দোলনে ফুলবাড়ি ছাড়াও আশপাশে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, ঢাকাসহ সারা দেশ ও বিদেশের যুক্তিপূর্ণ সমর্থনও ছিল অন্যতম শক্তি। এই সামগ্রিক আন্দোলনের এক পর্যয়ে ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ির হাজার হাজার মানুষের মিছিলে গুলিবর্ষণে আল আমীন, সালেকিন, তরিকুল শহীদের মৃত্যুবরণ করেন। তৎকালীন বিডিআর-পুলিশের গুলিতে অন্ততঃ ৫০ জন আহত হন। লাঠিচার্জ ও হামলায় অন্তত তিন শতাধিক মানুষকে আহত করা হয়। কিন্তু মানুষের প্রতিরোধ থেমে থাকেনি। হত্যাকাণ্ডের পরও পুরো ফুলবাড়ি চলে যায় স্থানীয় মানুষের দখলে। এক পর্যায় তৎকালীন বিএনপি-জামাতদের সরকার ৩০ আগস্ট দাবি মেনে নিয়ে জাতীয় কমিটির সাথে চুক্তি করতে বাধ্য হয়। শহীদের রক্তে ভেজা ফুলবাড়িতে মানুষের সংগ্রামের বিজয় সূচিত হয়।

আজ ২০২১ এ এই প্রতিরোধের ১৫ বছরে দাঁড়িয়ে একটু পেছন ফিরে দেখা যাক। কয়লা ‘ময়লা’ প্রকল্প হলেও এক সময় প্রয়োজনীয় ও অনিবার্য জ্বালানি ছিল। ১৯৯৪ সালে Broken Hill Properties নামে একটি অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানিকে কয়লা অনুসন্ধানের কাজ দেওয়া হয়। কিছুদিনের মধ্যে তারা এ অঞ্চলের বাস্তব তথ্যে বুঝতে পারে ১৫০ মিটারের বেশি গভীরতায় ফুলরাড়ীতে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষত যে পরিমাণ পানি পাম্প করে বের করতে হবে তা এ অঞ্চলে নতুন সংকট তৈরি করবে। তাই তারা ১৯৯৮ সালে এই প্রকল্প হস্তান্তর করে অখ্যাত কোম্পানি এশিয়া এনার্জির কাছে। যাদের প্রতিষ্ঠা মাত্র এক বছর আগে, ১৯৯৭ সালে।

কয়লা উত্তোলন করলে বাংলাদেশ রয়্যালিটি পাবে মাত্র ৬ শতাংশ। বাকিটা বিদেশি কোম্পানির। তখনকার হিসেব মতে এই খনির গভীরতা ২৪০ মিটার (সর্বশেষ অনুসন্ধানে এই গভীরতা আরও বেশি বলে তথ্য বেরিয়েছে)। এই গভীরতা থেকে পানি পাম্প করে শুষ্ক করে কয়লা তুলতে যে পানি নিষ্কাশন করতে হবে যা মধ্যম ধরনের নদীর প্রবাহের সমান হবে। এলাকা তলিয়ে যাবে। তাছাড়া খনির কাছ থেকে ১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে মুরুভূমি হয়ে যাবে। এই সহজ অংক জেনেও সরকার, দেশি-বিদেশি কমিশন ভোগীরা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনে মরিয়া হয়ে ওঠে।

দেশের সম্পদ রক্ষায় আন্দোলন অগ্রসর করতে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফুলবাড়িতে জাতীয় কমিটির শাখা গঠন করা হয়। এই কমিটির মাধ্যমে প্রধানত তখন থেকে সব আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালিত হয়। আন্দোলনের শুরু থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনির লাভ-ক্ষতি উল্লেখ করে অসংখ্য প্রচারপত্র, পুস্তিকা ছাপা ও বিতরণ করা হয়। অসংখ্য বৈঠক, সভা সমাবেশ অনুস্ঠিত হয়। মানুষের কাছে যুক্তি দিয়ে তথ্য তুলে ধরায় মানুষের মধ্য থাকা কিছু বিভ্রান্তি কেটে যায়। কোম্পানির মিথ্যা প্রচার মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

জাতীয় পর্যয়েও নানা ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে এই প্রকল্পের লাভ-ক্ষতি দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা হয়। জাতীয় কমিটি তার প্রচারণায় স্থানীয় ধ্বংসযজ্ঞের কথা বলার পাশাপাশি কোম্পানির সাথে চুক্তির অসংগতি, কোম্পানির প্রতারণার তথ্য, জাতীয় সম্পদের উপর জনগণের মালিকানার প্রশ্ন তুলে ধরে। এ বিষয়ে জনমতও গড়ে ওঠে।

সব মিলিয়ে মানুষের মুখের স্লোগান হয়ে দাঁড়ায় : ‘উন্মুক্ত না’, ‘বিদেশি না’, ‘রপ্তানি না’। ‘জাতীয় সম্পদের ওপর শতভাগ মালিকানা ও স্থানীয় জনগণের সম্মতি নিয়েই প্রকল্প গ্রহণ ও স্বচ্ছতার সাথে বাস্তবায়নের’ স্লোগান সামনে আসে। তাই ঐ সময় ফুলবাড়ি আন্দোলনের বিজয় শুধু ফুলবাড়ির স্থানীয় মানুষের জমি-জলা-প্ররিবেশ-প্রতিবেশ বাঁচায়নি, সারা দেশে জাতীয় সম্পদ রক্ষায় আন্দোলনের নজির স্থাপন করেছিল ।

৩০ আগস্ট ২০০৬ এ তৎকালীন সরকারের সাথে যে চুক্তি হয়েছিল তার অন্যতম ছিল; ‘এশিয়া এনার্জির সাথে সকল চুক্তি বাতিল করে এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়িসহ চার থানা ও বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহার করা হবে। ফুলবাড়িসহ চার থানা ও বাংলাদেশের কোনো জায়গায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি হবে না। অন্য কোনো পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করতে হলে জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে করতে হবে।’

চুক্তি সম্পাদনের মাত্র কয়েকদিন পর তৎকালনি বিরোধীদলীয় নেত্রী, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ফুলবাড়ি সফরে যান এবং জনসভায় বক্তব্য রাখেন। তিনি এই চুক্তির প্রতিও পূর্ণ সমর্থন জানান।

তৎকালীন বিএনপি-জামাতের জোট সরকার এই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করেনি। আর বর্তমান সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলেও ঐ চুক্তি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয় নি। এখনও ঐ চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। বরং দেখা যাচ্ছে এশিয়া এনার্জি এখন ‘জিসিএম’ নামে বাংলাদেশ কার্যালয় রেখে কাজ পরিচালনা করছে। চীনা কোম্পানির সাথে বড়পুকুরিয়ার উত্তরাংশের উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার চুক্তি করছে। ফুলবাড়িতে কয়লা তোলা হবে দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনের শেয়ার বাজারে যে ব্যবস্যা করে আসছিল, জিসিএম লন্ডনের শেয়ার বাজারে ঐ ব্যবসা অব্যাহত রেখেছে। ফুলবাড়ি নেতৃবৃন্দেরনামে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। আরো মামলা দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে তাদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই।

বর্তমান সরকার তার উন্নয়ন দর্শনের পরিবর্তন না করায় রামপাল-মহেশখালীসহ উপকূলীয় অঞ্চলে কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের কাজ অব্যাহত রেখেছে। বিদ্যুৎ এর জন্য এ ধরনের প্রকল্প প্রয়োজন না হলেও দেশি-বিদেশি লুটেরাদের স্বার্থে জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে এসব প্রকল্পের কাজ চলমান রাখা হয়েছে।

দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে জাতীয় কমিটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে সুলভে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে খসড়া পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, তা নিয়ে সরকারের কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে উত্তরবঙ্গের সারাদেশে সব মানুষকে কম মূল্যে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ গ্যাস সরবরাহ করা যাবে।

এ অবস্থায় ফুলবাড়ি আন্দোলনের শিক্ষা নিয়ে সারা দেশের জাতীয় সম্পদ রক্ষায় বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে সর্বত্র উদ্যোগী হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। ফুলবাড়ির দাবির পাশাপাশি অন্যান্য দাবিতে আন্দোলনে স্থানীয় মানুষদের সম্পৃক্ত করতে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে আমাদের।

বিশ্ব জুড়ে আমরা মহামারি অতিক্রম করছি। প্রাণ-প্রকৃতি, জীব-বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব না দিয়ে তথাকথিত উন্নয়ন যে মানুষের নিরাপদ বাসযোগ্য বিশ্ব গড়ে তুলতে পারে না, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। এই উপলব্ধি লুটেরা মুনাফাখোরদের নেই। এই সংকটে দুর্নীতি, সম্পদ লুট থেমে নেই। নানা কায়দায় প্রকল্প অব্যাহত রেখে লুটপাট চলছে। আমাদেরও এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিকল্পের পথনির্দেশ করে জনগণকে সাথে নিয়ে রুখে দাঁড়ানোর কাজটি করতে হবে।

দেশ, মানুষ, প্রকৃতি পরিবেশ রক্ষায় এ কাজে আমাদেরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এর মধ্য দিয়ে আমরা ফুলবাড়ির শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবো।

লেখক: সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.