ফিরে ফিরে আসে ২০ জানুয়ারি

২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি। রাজধানীর ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মহাসমাবেশ। সারা দেশ থেকে কৃষক-শ্রমিক-ক্ষেতমজুর-শ্রমজীবী-পেশাজীবী লাখো মানুষ সেদিন সমবেত হয়েছিল শোষণমুক্তির সংগ্রাম শক্তিশালী করার প্রত্যয়ে। লাখো মানুষের সমবেত স্লোগান জানান দিয়েছিল জনতার ঐক্যবদ্ধ শক্তির। আর তাতেই ভীত হয়ে উঠেছিল প্রগতিবিরোধী অন্ধকারের শক্তি।

মহাসমাবেশের লক্ষ্যও ছিল সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এবং লুটপাটতন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে বিকল্প শক্তি গড়ে তোলা। সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন নিয়ে মিছিলে-স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করে একের পর এক জনতার আগমনে পল্টন ময়দান যখন উপচে পড়ছিল, তখন অপশক্তিও প্রস্তুতি নিচ্ছিল মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়ার। বিপুল জনসমাবেশে শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটানো হয়। এতে তাৎক্ষণিক কমরেড হিমাংশু-মজিদ-হাশেম-মোক্তার-বিপ্রদাশ নিহত হন। শহীদদের তালিকায় যুক্ত হলো কমরেড হিমাংশু-মজিদ-হাশেম-মোক্তার-বিপ্রদাসের নাম। ঘাতক বোমার আঘাতে জীবন দিলেও সেদিন কাস্তে-হাতুড়িখচিত মুক্তির লাল পতাকা হাতছাড়া করেননি কমরেড হিমাংশু মণ্ডল। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দীর্ঘসূত্রিতায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। দায়সারাভাবে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এই বোমা হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের পাশাপাশি এর নেপথ্যের হোতাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। হামলা করে, নির্যাতন করে কমিউনিস্টদের থামানো যায়নি এবং ভবিষ্যতেও যাবে না।

বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে সংঘটিত এ ভয়াবহ বোমা হামলাই প্রমাণ দিয়েছিল দেশে ইসলামী জঙ্গিবাদের উত্থান কতটা মারাত্মক শক্তি অর্জন করেছিল। প্রমাণিত হয়েছিল দ্বিজাতিতত্ত্বকে খারিজ করে দিয়ে যে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, স্বাধীনতা পরবর্তী সবগুলো সরকারের নমনীয়তা-ভীরুতা, আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মহীরুহ হয়ে সেই ধর্মীয় রাজনীতির বিষদাঁত আবারো ছোবল মারা শুরু করে বাংলাদেশে।

এর আগে উদীচীর সমাবেশে বোমা হামলা এবং পরবর্তীতে রমনায় বোমা হামলা, বাংলা ভাইয়ের উত্থানসহ নানান ঘটনায় রাজনীতিসহ সমাজের সর্বক্ষেত্রে এই সমাজবিরোধী শক্তির শক্তিশালী অবস্থান পরিষ্কার হয়ে যায়। সিপিবি অনেক আগেই এ বিপদ সম্বন্ধে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিল, কিন্তু বুর্জোয়া রাজনীতির সুবিধাভোগী, লুটপাটকারীরা নিজেদের আখের গোছানোর জন্য জামাতসহ উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী রাজনীতির পথ পরিষ্কার করে দিয়েছিল। ক্ষমতাভোগী শীর্ষদলগুলোর কেউই এই দায়ভার এড়াতে পারবে না। আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টি সবাই নিজেদের ক্ষমতা আকাঙ্ক্ষাকে চরিতার্থ করার জন্য জামাতসহ বিষধর মৌলবাদী রাজনীতিকে সকাশে প্রশ্রয় দিয়েছিল। তারই প্রথম দিককার নিশানা ছিল সিপিবি’র সমাবেশে বোমা হামলা। পরবর্তীতে এই বিষাক্ত হিংস্র ছোবলে প্রাণ দিতে হয়েছিল অনেককে। ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন জঙ্গিবাদের বিপদ সম্বন্ধে সবাই অবগত, তারপরও তা উৎপাটনে রাষ্ট্রের কোনও কর্ণপাত নেই।

লুটপাট-দুর্নীতি, সন্ত্রাস, স্বেচ্ছাচার সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এই অবস্থায় দেশবিরোধী বিভিন্ন দেশি-বিদেশি চক্র ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে তৎপর। মার্কিনীরা তৎপর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তাদের লাভের অংশ আরো বাড়াতে, ভারত তৎপর বাংলাদেশকে গ্রাস করে দক্ষিণ এশিয়া এবং সমগ্র বিশ্বে নিজেদের আধিপত্য আরো জোরদার করতে। তাইতো দুই জোটের লক্ষ্য এখন বিদেশি প্রভুদের খুশি রাখা, যে যত বিলিয়ে দিতে পারবে, বিভিন্ন গোষ্ঠী সেই জোটের প্রতি তাদের সমর্থন উচ্চারণ করবে। এর ভেতর দিয়ে লুটপাট হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সম্মানবোধ। শুধুমাত্র তাঁবেদারি এবং লুটপাট-সন্ত্রাসের কারণে বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ লোককে এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করতে হচ্ছে। রাজনীতির চূড়ান্ত দুর্বৃত্তায়নের কারণে হিন্দু সম্প্রদায়কে শিকার হতে হচ্ছে হিংস্র নির্মমতার, এই আক্রমণেও আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামাতের পারস্পরিক সমর্থন রাজনীতির কুৎসিত রূপকে পরিস্ফূট করেছে। একই কারণে স্বাধীনতার চার দশক পরও খেটে খাওয়া নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত লোককে হতে হচ্ছে সহিংসতার শিকার।

২০ জানুয়ারি আমাদের চেতনার স্মারক। যে চেতনার জন্য কমরেড হিমাংশু মৃত্যুর সময়ও লাল পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিল। শহীদদের রক্তপতাকা নিয়েই কমিউনিস্ট পার্টি এগিয়ে যাবে। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে তাই আমাদের আরো জোর হাতে ধরতে হবে হিমাংশু, হাশেম, বিপ্রদাস, মোক্তার আর মজিদদের কাস্তে-হাতুড়িখচিত সেই রক্তপতাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.