প্লাস্টিক বিপর্যয়ে বাংলাদেশ

মনির তালুকদার  

বিশ্বের প্লাস্টিক দূষণকারী দেশগুলোর মধ্যে সপ্তম অবস্থান রয়েছে বাংলাদেশ।

“এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট আগানাইজেশন” (এস ডো) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলছে, বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৮৯ হাজার টন সিঙ্গেল ইউজ বা একবার ব্যবহার করা হয় এমন প্লাস্টিক পণ্য বর্জ্য হিসেবে জমা হচ্ছে। সংস্থাটি বাংলাদেশের শহর ও গ্রাম মিলিয়ে মোট ১০০০ জনেরও বেশি মানুষের ওপর সমীকরণটি চালিয়েছে। শহরে ৭৮ শতাংশ এবং গ্রামে ২২ শতাংশ প্লাস্টিক বজ্য জমা হয়। ওই সমীক্ষায় প্রশ্নসমূহের মধ্যে ছিল, তারা কী ধরনের প্লাস্টিক ব্যবহার করে, ওই সব প্লাস্টিক কোথা থেকে আসে এবং কীভাবে এর নিষ্পত্তি হয়। ওই সমীক্ষা থেকে উঠে এসেছে- এসব প্লাস্টিক বাজের প্রায় ৯৬ শতাংশ খাদ্য ও প্রসাধনী সামগ্রীর মোড়ক থেকে আসে। বাংলাদেশে বেশিরভাগ একবার ব্যবহার উপযোগী প্লাস্টিকের সঠিকভাবে নিষ্কাশন হয় না। এর ফলে ওই সব প্লাস্টিক বজ্য নদী, হ্রদ বা সমুদ্রে পতিত হয়। জাতিসংঘের পরিবেশ অধিদফতর অনুমান করছে, বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলো যেমন, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা এবং গঙ্গা ওইসব নদীর মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৭৫ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে পতিত হয়। একবার ব্যবহার উপযোগী প্লাস্টিকের মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিকের ব্যাগ, পানীয়ের স্ট্র, বোতল, কটন বাড, স্যাশে, খাদ্যপণ্যের মোড়ক, কফি স্ট্রেসার ইত্যাদি। প্লাস্টিক ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- এগুলো পরিবেশের সহজে বিনষ্ট হয় না এবং খাদ্য জলসহ পরিবেশের অন্যান্য উপাদানের সাথে রাসায়নিক ক্রিয়ার মাধ্যমে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় ওঠে এসেছে এটি মানবদেহের রক্তের সাথে মিশে ক্যান্সার, বিকলাঙ্গতা, বন্ধ্যাত্ব, অকালে গর্ভপাতসহ নানা মরণব্যাধির কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্লাস্টিক দূষণের কারণে পর্যটন, বিনোদন ব্যবসা, মানুষ, মাছ, পানিয়, অন্যান্য পশু প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ধারাবাহিক এসব অর্থিক ক্ষয়ক্ষতি বর্ণনাতীতে। একবার ব্যবহার উপযোগী প্লাস্টিকের থেকে নির্গত বিষাক্ত পর্দাথগুলো বায়ু, পানি এবং মাটি দূষিত করে পরিবেশে জমা হয় এবং এই সব বিষাক্ত পদার্থ মানবদেহে শ্বাস গ্রহণের মাধ্যমে প্রবেশ করে যা পরবর্তীতে মানুষকে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত করে।

যুক্তরাষ্ট্রের “ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন” এক গবেষণায় বলেছে, মুদি দোকান থেকে কেনা পণ্য বহন করার জন্যে যেসব ব্যাগ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো প্রকৃতিতে মিশে যেতে ২০ বছর সময় লাগে। চা, কফি, জুস কিংবা কোমল পাণীয়ের জন্যে যেসব প্লাস্টিকের কাপ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো ৫০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে। আর ডায়াপার এবং প্লাস্টিক বোতল ৪৫০ বছর পর্যন্ত পচে না। রেস্টুরেন্ট, আবাসিক হোটেল, এয়ারলাইস এবং সুপারশপ থেকে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক সব চেয়ে বেশি আসছে। আবাসিক হোটেল থেকে যেসব প্লাস্টিক বর্জ্য আসে, সেগুলো হচ্ছে, শ্যাস্পুর বোতল ও মিনি-প্যাক, টুথব্রাশ, টি ব্যাগ, টুথপেস্ট টিউব, প্লাস্টিক টুথব্যাশ, টি ব্যাগ এবং বিভিন্ন খাবারের প্যাকেট। এয়ারলাইন্স থেকে আসে প্লাস্টিকের চামচ, স্ট্র, প্লেট, কাপ, গ্লাস এবং আরো নানা ধরনের প্লাস্টিকের মোড়ক।

এসডোর গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রতি বছর বাংলাদেশের রেস্তোরাঁতে প্রায় ২০০০ টনের ও বেশি এ ধরণের প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়। বিমান সংস্থায় প্রায় ৭০০ টন এবং আবাসিক হোটেলে প্রায় ৬০০ টন একবার ব্যবহৃত উপযোগী প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া কাঁচাবাজারসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হয় আরো শত শত টন পলিথিন এবং প্লাস্টিক ব্যাগ। গবেষণা বলছে, শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই প্রতিদিন দুই কোটি পলিথিন ময়লার ভাগাড়ে জমা হচ্ছে। পরিবেশের জল ক্ষতিকর এই পলিথিনকে ঢাকার জলাবদ্ধতার জন্যেও দায়ী করা হচ্ছে।

১৯৯৫ সালের বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৬(ক) ধারা অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন জারি করে ২০০২ সালে জানুয়ারি থেকে দেশে পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন, পরিবহন, মজুদ ও ব্যবহারকে নিষিদ্ধ করা হয়। বেশ ঘটা করে অভিযানও শুরু হয়। এতে মোটামুটি সফলতাও আসছিল। তবে পরের পর্যায়ে অভিযান থেমে যায়। ক্রমান্বয়ে সব কিছু আগের মতোই চলতে থাকে। সেই সময় থেকে এখন পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। তবে প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত পণ্যের দূষণে ভয়াবহ এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ২০২০ সালের ৬ জানুয়ারি দেশের হোটেল, মোটেল, রেস্তোরা ও উপকূলীয় অঞ্চলে একবার ব্যবহার যোগ্য প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার এক বছরের মধ্যে নিষিদ্ধের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। সেইসঙ্গে পলিথিন ও পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার বন্ধে বিদ্যমান আইনি নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকর করার জন্যে সরকারকে বাজার তদারকি পলিথিন উৎপাদনকারী যন্ত্রপাতি জব্দ ও কারখানা বন্ধেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত এক রিট আবেদনের শুনানি করে হাইকোর্ট রুলসহ ওই আদেশ দেয়। সারাদেশে একবার ব্যবহার যোগ্য প্লাস্টিক পণ্যের নিরাপদ বিকল্প কী হতে পারে সে বিষয়ে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে একটি কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।

বিশ্বের মোট ১২৭টি দেশে নানাভাবে পলিথিন ব্যাগ এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রীর উৎপাদন বিপণন, বিতরনে নিয়ন্ত্রণ আনা হয়েছে। ভারতে ছয়টি প্লাস্টিকজাত পণ্যের উৎপাদন, ব্যবহার ও আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা পণ্যগুলো হচ্ছে- প্লাস্টিকের ব্যাগ, স্ট্র, প্লেট, বোতল, কাপ ও শ্যাসম্পুর মতো পণ্যের ছোট প্যাকেট। ভারতের কেরালার সমুদ্র সৈকতে ব্যবহার যোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একবারের বেশি ব্যবহারযোগ্য নয়, এমন প্লাস্টিক ব্যাগ ও অন্যান্য পণ্যের ব্যবহার দেশজুড়ে কমানোর বড় ধরনের পরিকল্পনা করেছে চীন। এর আওতার ২০২০ সালের মধ্যে অপচনশীল একবার ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ দেশটির প্রধান প্রধান শহরে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। আর ২০২২ সাল নাগাদ এব ব্যাগ নিষিদ্ধ হবে বাদবাকি সব শহর ও নগরে। ২০২৫ সালের মধ্যে বিনামূল্যের একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য দেওয়া বন্ধ করতে বলা হয়েছে।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক ব্যবহারকারী দেশগুলোর মধ্যে চীন একটি। দেশের ১৪০ কোটি মানুষের ব্যবহার করে ফেলে দেয়া বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য সামলাতে বছরের পর বছর ধরে হিমশিম খাচ্ছে চীন সরকার। চীনের সবচেয়ে বড় ময়লা ভাগারটি প্রায় ১০০ ফুটবল মাঠের সমান। সেটিও ২০২০ সারের মধ্যে ভরে গেছে যদিও এটি ভরার কথা ছিল আরো ২৫ বছর পর। শুধু ২০১৭ সালেই চীন শহরে এলাকাগুলো থেকে ফেলে দেওয়া সাড়ে ২১ কোটি টন আবর্জনা সংগ্রহ করেছে। সেগুলোর কতটুকু পূর্ণ ব্যবস্থারযোগ্য করা সম্ভব হয়েছে তা জানা যায়নি।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন প্রকাশনা “আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডেটা”র গবেষণা অনুসারে, ২০১০ সালে চীনের বর্জ্যরে পরিমাণ ছিল ৬ কোটি টন। যেখানে বর্জ্যরে পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ৮০ লাখ টন। ২০১৮ সালে ওই গবেষণা ফল প্রকাশ হয় এবং এতে ২০২৫ সাল নাগাদও প্লাস্টিক ব্যবহারের তুলনামূলক বৈশ্বিক চিত্র একইরকম থাকার ধারণা প্রকাশ করা হয়। চলতি বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সবধরণের প্লাস্টিকজাত স্ট্র, ফর্ক, ছুরি ও কটন বাডের মতো পণ্য নিষিদ্ধ করয়েছে।

২০১৭ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস একটি গবেষণার প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় বলেছিলেন, প্রতি বছর ৮ মিলিয়ন প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে পড়ছে। এতে করে ৮ কোটি বিলিয়ন ডলারের সামুদ্রিক ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্লাস্টিক ব্যাগ ও প্লাস্টিকজাত পণ্যকে সমুদ্র ও সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্রের জন্যে সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর কারণ বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক উন্নয়নশীল দেশেই প্লাস্টিকের ব্যাগ নর্দমা আটকে দিয়ে বন্যার কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়। মারাত্মক ক্ষতিকর এসব প্লাস্টিক পণ্য একদিকে যেমন ফসল জমির উর্বরতা নষ্ট করছে, তেমনই নদী এবং সামুদ্রিক প্রাণীকেও হুমকিতে ফেলছে। তবে পাট, কলাগাছ, বাঁশ থেকে তৈরি পণ্য হতে পারে প্লাস্টিক পণ্যের বিকল্প। সহজে পচনশীল হওয়ার এসব পণ্য পরিবেশবান্ধবও।

লেখক: কলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published.