প্রয়োগই সত্যের মাপকাঠি

মোহাম্মদ শাহ আলম

কমরেড পূর্ণেন্দু কানুনগো বিশ্বাস করতেন “প্রয়োগই সত্যের মাপকাঠি” (Practice is the sole criterion of truth)। দর্শনের বিমূর্ত তর্কের ছিলেন ঘোর বিরোধী। তিনি বলতেন তত্ত্ব ও তর্কের সমাধান তর্কে নয়, বাস্তব কর্মের মধ্যে নিহিত। ছিলেন বাস্তববাদী। কিন্তু আবার বাস্তবের অন্ধ অনুসারীও ছিলেন না।

কমরেড পূর্ণেন্দু কানুনগোর সাথে আমার পরিচয় ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে। তিনি তখন পাকিস্তানি ‘স্বৈরশাসকের’ হুলিয়া মাথায় নিয়ে গোপন পলাতক জীবনযাপন করছেন। তাঁর সাথে ছিলেন আরেক গোপন রাজনৈতিক নেতা চৌধুরী হারুনর রশিদ। কয়েকজন ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীর সাথে ছাত্র ইউনিয়নের প্রাক্তন নেতা বখতেয়ার নূর সিদ্দিকী ওনাদের সাথে বৈঠকের ব্যবস্থা করেছিলেন। বৈঠকটি হয়েছিল আশকার দিঘির পূর্ব-দক্ষিণ কোণে আব্দুল মা’বুদ তালুকদারের ভাড়া বাসায়। বৈঠকে সেদিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ব্যাপক আলোচনার এক পর্যায়ে কমরেড পূর্ণেন্দু কানুনগো বললেন–পরিবেশ চিন্তার জন্ম দেয়, চিন্তা পরিবেশকে পাল্টায়। ফলে নতুন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নতুন পরিবেশ আবার নতুন চিন্তার জন্ম দেয়। এভাবে পরিবেশ আর চিন্তার দ্বান্দ্বিকতায় জগৎ-দুনিয়া, চিন্তা-চেতনা এগুতে থাকে। একটার থেকে আরেকটাকে বিচ্ছিন্ন করে অগ্রগতি কল্পনা করা যায় না। আজকে তোমরা আন্দোলনের যে পরিবেশের মধ্যে আছ, কালকে সে পরিবেশ না-ও থাকতে পারে। আজকের পরিবেশে তোমরা আন্দোলন সম্পর্কে যে চিন্তা করছ, যে কৌশলের কথা বলছ–কাল পরিবর্তিত পরিবেশে কি একই চিন্তা ও একই কৌশলের কথা বলবে–না বলতে পারবে? নিশ্চয়ই নয়। সেটা হলে তা বাস্তবসম্মত হবে না। হবে মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তা, আত্মগত ভাবনা, জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি মার্কসবাদী দ্বান্দ্বিকতার এ বোধ, বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতি অনুসরণ করে চলতেন।

তাঁর এই বোধ এবং দৃষ্টিভঙ্গি আমার কাছে বারবার ধরা পড়েছে তাঁর সাথে একান্ত ঘনিষ্ঠ আলাপ-আলোচনায়। তিনি ’৯০ সাল থেকে অসুস্থ ছিলেন। পার্টির কেন্দ্রীয় দায়-দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। আমি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর থেকে পার্টির কাজকর্ম ও ভাবনা সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য তিনি প্রায়ই আমার বাসায় আসতেন। বিদ্যমান সমাজতন্ত্রের অবস্থা তখন টালমাটাল, একের পর এক পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর বিপর্যয়ের শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনা যখন ঘটছে, সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের ফলে দেশি-বিদেশি পুঁজিবাদী মহল যখন ধেই ধেই করে উদ্বাহু নৃত্য করছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অনেক পোড় খাওয়া কমরেড আদর্শিক বৃন্ত থেকে ছিটকে পড়ে ছিন্নপত্রের ন্যায় দিগ্বিদিক ছুটোছুটি করছে, তখনও তাঁকে দেখেছি শান্ত, সমাহিত, আদর্শের প্রতি দৃঢ়নিষ্ঠ। একান্ত আলোচনায় বলতেন–আমাদের সবসময় Up to date থাকতে হবে। তাই তিনি Dogmatic ছিলেন না। ছিলেন দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী। মার্কসবাদের বর্তমান সংকটের সময় বারবার বলতেন, স্বর্গ থেকে মার্কসবাদ আসেনি, সভ্যতার রাজপথেই মার্কসবাদের জন্ম, সভ্যতার রাজপথেই মার্কসবাদের বর্তমান সংকটের সমাধান রয়েছে। ঘটনা যতই দমবন্ধকারী হোক না কেন, কমিউনিস্টদের অস্থির হলে বা উদ্যম হারালে চলবে না। পারস্পারিক আলাপ আলোচনার সময় পুঁজিবাদের বর্তমান বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশলগত বিপ্লবের প্রসঙ্গ টেনে আনতেন। তিনি বলতেন, কমরেড দেখো, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের কাঠামো ও আঙ্গিকের যতই রূপবদল ঘটুক না কেন, তার মানবতাবিরোধী শোষণধর্মী profit motive-এর কোনো হেরফের হয়নি। কমিউনিস্টদের উচিত সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ বর্তমানে যে রূপ, মাধ্যম, পথ, পদ্ধতিতে সমাজকে শোষণ করছে এবং তার ফলে যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও বহুমুখী দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হচ্ছে তা গভীরভাবে উপলব্ধি করার মনমানসিকতা তৈরি করে পথ চলা। গোঁড়ামি ও আত্মসমর্পণ কমিউনিস্টদের পথ হতে পারে না। এটা মার্কসবাদসম্মত বলে আমার মনে হয় না।

এই কমরেড ছিলেন মানব প্রেমিক ও প্রকৃত মানবতাবাদী। কমিউনিস্ট ও মার্কসবাদী বলেই তিনি প্রকৃত মানবতাবাদী হতে পেরেছিলেন এবং তিনি গর্বের সাথেই বলতেন–কেউ যদি নিজেকে প্রকৃত মানবতাবাদী বলে দাবি করে তাহলে তার কমিউনিস্ট ও মার্কসবাদী না হয়ে উপায় নেই। কারণ মার্কসবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে (centre point) রয়েছে মানুষের মুক্তি নিয়ে ভাবনা। আপেক্ষিকভাবে শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্বের কথা বললেও মার্কসবাদের লক্ষ্য হলো শ্রেণিহীন, রাষ্ট্রহীন, মানুষের ওপর মানুষের শোষণমুক্ত স্ব-সমাজ কায়েম করা। ইদানীং সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সমাজের কিছু গণবিরোধী চরিত্র বৈশিষ্ট্যের ও ঘটনার উদাহরণ শত্রু-মিত্র বিভিন্ন জন যখন দিতেন, তখন তিনি বলতেন–এটা সমাজতন্ত্রের মর্মগত বৈশিষ্ট্যের কোনো ত্রুটি নয়। তা সমাজতান্ত্রিক বলশেভিক বিপ্লবের গণতান্ত্রিক ও মানবিক সারসত্তাকে গণবিরোধী রাষ্ট্রীয় ও পার্টির আমলাতন্ত্র আত্মসাৎ করেছে বলেই এ ঘটনা ও লক্ষণগুলো আমরা দেখছি।

আজকে সমগ্র দুনিয়া যখন কায়েমি স্বার্থবাদীদের করতলগ্রস্ত, বিশ্ব যখন পুঁজিবাদী এককেন্দ্রিক বিশ্ব, সমাজ ভাঙনের চেতনা ও বোধে যে বিরাট বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্তদের শক্তি দেশে দেশে গড়ে উঠেছিল, anti-stublishment-এর শক্তিকে যখন pro-stublishment এর শক্তি আত্মসাৎ করেছে-করছে, ভোগবাদ ও পণ্যপূজার মূল্যবোধ যখন গোটা দুনিয়ায় দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজত্ব করছে, প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা, আদর্শ-নীতি-নৈতিকতা অর্থবিত্তের কাছে যখন নতজানু, মেধা-বুদ্ধিবৃত্তি, শিল্পসাহিত্য সবকিছু যখন পুঁজির সম্রাটদের হাতে বন্দি থেকে পণ্যে পরিণত হয়েছে, জগৎ দুনিয়া যখন এদের সঙ্গ পেতে সদা উন্মুখ, এদের পায়রবিতে সদা ব্যস্ত তখন গোটা সমাজকে এদের হাত থেকে মুক্ত করতে হাজার হাজার নিবেদিত প্রাণ প্রকৃত মানবতাবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবী পূর্ণেন্দু কানুনগোর প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে অতি জরুরি। এ অকৃতদার বিপ্লবী তাঁর জীবনীশক্তির প্রতিটি শ্বেত-কণিকা খরচ করেছেন দেশ, দেশমাতৃকা, মানবমুক্তি ও মানবসমাজের অগ্রগতির জন্য। তিনি মার্কসবাদের কোনো মহাপণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন না। কিন্তু কাজে-কর্মে, মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনাচারে ছিলেন একজন প্রকৃত কমিউনিস্ট, যা অনেক মার্কসবাদী পণ্ডিতের মধ্যে দেখা যায় না।

এই কমিউনিস্ট বিপ্লবী গত ৭ জুন ’৯৫ এ দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। সমাজের অগ্রগতির জন্য, মানবমুক্তির জন্য, তিনি তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দিয়েছেন। সমাজের অগ্রগতির ভাবনা থেকে মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বিরত ছিলেন না। আজকে দুনিয়ার নিপীড়িত মানুষের মহা দুর্দিনে আমাদের উচিত আমাদের যার যা সামর্থ্য আছে বিশ্বস্ততার সাথে, আন্তরিকতার সাথে তা দেওয়ার জন্য ব্রতী হওয়া। তাহলে আমরা তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী হওয়ার দাবি করতে পারি।

পুর্ণেন্দু কানুনগো (১৯১৭-১৯৯৫ এর ৭ জুন)

সাবেক কন্ট্রোল কমিশনের সদস্য; প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক, বৃহত্তর চট্টগ্রাম।

(প্রবন্ধটি ১৯৯৫ সালে লিখিত)

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.