প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার –অগ্নিযুগের অগ্নিজিতা

শেখ রফিক

প্রীতিলতার জন্ম ১৯১১ সালের ৫ মে। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে। এখানে জন্ম হয়েছে অসংখ্য বিপ্লবীর। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে এই গ্রাম ছিল বিপ্লবীদের প্রধান ঘাঁটি। প্রীতিলতার পড়াশুনার হাতেখড়ি বাবা, মা’য়ের কাছে। তার স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। যে কারণে জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার মেয়েকে (১ম ও ২য় শ্রেণিতে ভর্তি না করে) সরসরি তৃতীয় শ্রেণিতে স্কুলে ভর্তি করে দেন। ডা. খাস্তগীর উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয় ওই সময়ের অন্যতম নারী শিক্ষালয়। এই নামকরা স্কুলে প্রতিটি শ্রেণিতে তিনি প্রথম কিংবা দ্বিতীয় ছিলেন। ৮ম শ্রেণিতে প্রীতিলতা বৃত্তি পান।

১৯২৯ সাল। তখন সূর্যসেন চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক। পূর্ণেন্দু দস্তিদার পরের দিন বিকেল বেলা বিপ্লবীদের গোপন বৈঠকে উপস্থিত হল। বৈঠক শেষে জেলা কংগ্রেসের কার্যলয়ে তিনি মাষ্টার দা সূর্যসেনকে ওই ফর্মটি দেখালেন এবং প্রীতিলতার মনের কথাগুলো বললেন। মাষ্টার দা সূর্যসেন সবকিছু শুনে পূর্ণেন্দু দস্তিদারকে বললেন, আজ থেকে আমরা প্রীতিলতাকে আমাদের দলের সদস্য করে নিলাম। কিন্তু এই কথা আপাতত আমরা তিনজন ছাড়া অন্য কাউকে জানানো যাবে না। প্রীতিলতাকে একদিন আমার কাছে নিয়ে এসো।

ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীকে ভারত উপমহাদেশ থেকে উৎখাত করার জন্য বিপ্লবীরা একেকটি অঞ্চলের দায়িত্ব নেন। সূর্যসেন চট্টগ্রামের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তার নেতৃত্বে একটি বিপ্লবী দল গঠন হয়। যার মধ্যে ছিলেন নির্মল সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, ধীরেন চক্রবর্তী, উপেন চক্রবর্তী, নগেন সেন, গণেশ ঘোষ, অনন্তু সিংহ, বিনয় সেন, মধু দত্ত, রাজেন দে, লোকনাথ বল প্রমুখ। ওই সময় পর্যন্ত দলে কোনো মেয়ে সদস্য ছিল না। সচ্চরিত্র, স্বাস্থ্যবান, সাহসী যুবক ও স্কুল-কলেজের ছাত্রদেরই নেয়া হতো এই বিপ্লবী দলে।

একদিন পত্রিকায় খবর হয়, ‘চাঁদপুর স্টেশনের ইন্সপেক্টরের’ হত্যাকারী দুই বাঙালি যুবক গ্রেফতার। তাদের নাম রামকৃষ্ণ বিশ্বাস ও কালিপদ চক্রবর্তী। প্রীতিলতার সঙ্গে রামকৃষ্ণের পরিচয় ছিল না। নিজেকে বোন পরিচয় দিয়ে জেলের ভেতর অসংখ্যবার রামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করেন প্রীতিলতা। তার মুখেই শোনেন সূর্যসেনের দৃঢ়চরিত্র ও বীরত্বের কথা। দাদা রামকৃষ্ণের কাছেও প্রীতির একই প্রশ্ন, ‘আমরা মেয়েরা কি তোমাদের মতো হতে পারি না, দাদা?’

প্রীতিলতা আই. এ পরীক্ষা শেষ করে প্রীতিলতা চট্টগ্রামে চলে আসেন। ওই সময়ও মাষ্টারদা সূর্যসেন চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক। সূর্যসেনের সাথে প্রীতিলতার ভবিষৎ কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় প্রীতিলতার আই. এ পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। মাসিক ২০ টাকা বৃত্তিও পাবেন তিনি। ঠিক হল কলকাতার বেথুন কলেজে পড়াশুনা করবেন। ইংরেজি সাহিত্যে নিয়ে বি. এ ভর্তি হলেন প্রীতিলতা। থাকেন ছাত্রীনিবাসে। এখানে মাষ্টারদার নির্দেশে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড শুরু করলেন প্রীতিলতা। গড়ে তুললেন এক বিপ্লবী চক্র। এই বিপ্লবী চক্রে অনেক মেয়ে সদস্য যোগ দিলেন। তাদের মূল কাজই হল অর্থ সংগ্রহ। অর্থ সংগ্রহ করে প্রীতিলতা চট্টগ্রামে পাঠাতে লাগলেন।

কলকাতার এক গোপন কারখানায় তখন তৈরি হয় বোমার খোল। মাষ্টারদার নির্দেশ অনুযায়ী সে বোমার খোল সংগ্রহ করে প্রীতিলতা। ১৯২৯ সালে পূজার ছুটিতে প্রীতিলতা-কল্পনা দত্ত, সরোজিনী পাল, নলিনী পাল, কুমুদিনী রক্ষিতকে নিয়ে চট্টগ্রাম আসেন। বোমার খোলগুলো পৌঁছে দেন বিপ্লবীদের হাতে। মাষ্টারদার নির্দেশ অনুযায়ী প্রীতিলতা এরপর থেকে প্রকাশ্য বিপ্লবী কাজেও যুক্ত হয়ে পড়েন। অনেক দায়িত্বপূর্ণ কাজের ভারও তাকে তখন নিতে হয়। কলকাতায় যে বিপ্লবী চক্র গঠন করা হয়েছে, তাদের সকল প্রকার প্রশিক্ষণও প্রীতিলতাকে দিতে হতো।

বি.এ. শেষ বর্ষে চট্টগ্রামের অস্ত্রগার দখল, জালালাবাদ সংঘর্ষ ও সেই যুদ্ধে তার আত্মীয় শহীদ হওয়ায় লেখাপড়ায় সে অমনোযোগী হয়ে ওঠে এবং রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসির পর থেকে সে বি. এ পরীক্ষা না দেয়ার জন্য মন স্থির করেন। কিন্তু তার শুভাকাক্সক্ষীদের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত বি. এ পরীক্ষা দিয়ে ডিসটিংশনে পাস করলেন।

সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের লৌহকঠিন দুঃশাসনের পাজর গুঁড়িয়ে দিয়েছে চট্টগ্রামের স্বাধীনতাকামীরা। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মহানায়ক সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে দখল হল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রামে ইংরেজ শাসন অচল হয়ে গেলো। টেলিগ্রাফ-টেলিফোন বিকল। সরকারি অস্ত্রাগার লুণ্ঠন। রিজার্ভ পুলিশ ছত্রভঙ্গ। রেললাইন উপড়ে ফেলা হল। স্বদেশি বিপ্লবীরা চট্টগ্রাম শহর দখল করে ফেলেছে। এ সময় প্রীতিলতা কলকাতায়। চট্টগ্রামে আসার জন্য ব্যাকুল। সশস্ত্র বিপ্লবে অংশগ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু তখনো পর্যন্ত মাষ্টারদার অনুমতি মেলেনি।

বি. এ পরীক্ষা শেষে মাষ্টারদার নির্দেশে স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে চলে আসেন। ১৯৩২ সালের শুরুতে বি. এ পাস করার পর কর্মজীবনের শুরুতে চট্টগ্রাম অপর্ণাচরণ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। এসময় বিপ্লবী কাজে আরো বেশি সক্রিয় হওয়ার তাগিদ দিলেন সর্বাধিনায়ক মাষ্টারদা সূর্যসেন।

১৯৩২ সালের মে মাসে প্রীতিলতার জন্মস্থান ধলঘাটে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে মাষ্টারদাসহ সহযোদ্ধাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক শুরু হয়। এই বৈঠক চলাকালীন সময়ে ব্রিটিশ সৈন্যদের সাথে বিপ্লবীদের বন্দুক যুদ্ধ শুরু হয়। সে যুদ্ধে প্রাণ দেন বিপ্লবী নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন। সূর্যসেন প্রীতিলতাকে নিয়ে বাড়ির পাশে ডোবার পানিতে ও গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন। সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর মাষ্টারদা বলেন, ‘প্রীতি, তুমি বাড়ি ফিরে গিয়ে স্কুলের কাজে যোগ দেবে, তাহলে গত রাতের ঘটনায় কেউ তোমাকে সন্দেহ করবে না।’ সাবিত্রী দেবীর বাড়িটি পুলিশ পুড়িয়ে দেয়।

এই ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকার প্রীতিলতাকে সন্দেহ করা শুরু করে। মাষ্টারদার নির্দেশে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। অন্য একটি বিপ্লবী গ্রুপ ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে ব্যর্থ হয়। যার কারণে মাষ্টারদা প্রীতিলতাকে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে বলেন। এই জন্য কাট্টলি সমুদ্র সৈকতে বিপ্লবী দলকে মাষ্টারদা সামরিক প্রশিক্ষণ দেন।

১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ১৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কাট্টলী গ্রামে এক গোপন বৈঠকে মাষ্টারদার নির্দেশে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত দেখা করতে রওনা হন পুরুষের বেশে। কিন্তু পথে পাহাড়তলীতে কল্পনা দত্ত ধরা পড়েন। প্রীতিলতা নিরাপদে নির্দিষ্ট গ্রামে এসে পৌঁছেন। এখানেই পরিকল্পনা নেয়া হয় প্রীতিলতার নেতৃত্বে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করার।

আক্রমণে প্রস্তুতি নেয়ার জন্য কাট্টলীর সাগরতীরে প্রীতিলতা ও তার সাথীদের অস্ত্রশিক্ষা শুরু হয়। প্রীতিলতার নেতৃত্বে যেসব বিপ্লবীকে ওই আক্রমণ পরিচালনার জন্য নির্বাচিত করা হয় তারা হলেন, ১. শান্তি চক্রবর্তী–দক্ষিণ কাট্টলী, ডবলমুড়িং থানা, ২. কালী দে– গোসাইলডাঙ্গা, ডবলমুড়িং থানা, ৩. সুশীল দে– ধৈরলা, বোয়ালখালী থানা, ৪. প্রফুল্ল দাশ– কাট্টলী, ডবলমুড়িং থানা, ৫. মহেন্দ্র চৌধুরী– মোহরা, পাঁচলাইশ থানা।

১৯৩২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মাষ্টারদার প্রীতিলতাকে বললেন, পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের নেতৃত্ব তোমাকে নিতে হবে। প্রশিক্ষণ শেষে বীরকন্যা প্রীতিলতার নেতৃত্বে বিপ্লবীরা ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাত্রে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করে সফল হন। আক্রমণ শেষে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। এ অবস্থায় ধরা পড়ার আগে সঙ্গে রাখা সায়ানাইড বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। কারণ ধরা পড়লে বিপ্লবীদের অনেক গোপন তথ্য ব্রিটিশ পুলিশের মারের মুখে ফাঁস হয়ে যেতে পারে। প্রীতিলতা মারা যাওয়ার আগে মায়ের কাছে লিখেছিলেন, ‘মাগো, অমন করে কেঁদোনা! আমি যে সত্যের জন্য, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে এসেছি, তুমি কি তাতে আনন্দ পাও না? কী করব মা? দেশ যে পরাধীন! দেশবাসী বিদেশির অত্যাচারে জর্জরিত! দেশমাতৃকা যে শৃঙ্খলভারে অবনতা, লাঞ্ছিতা, অবমানিতা! তুমি কি সবই নীরবে সহ্য করবে মা? একটি সন্তানকেও কি তুমি মুক্তির জন্য উৎসর্গ করতে পারবে না? তুমি কি কেবলই কাঁদবে?’

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ব্রিটিশদের হাত থেকে দেশকে স্বাধীন করার জন্য নিজেকে গড়ে তোলার পাশাপাশি অসংখ্য বিপ্লবীদের প্রশিক্ষিত, অনুপ্রাণিত ও উজ্জীবিত করে গেছেন। নিজেদের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ধরা পড়ার পর যেন কেউ জানতে না পারে তাই স্বজ্ঞানে নিজেকে দেশমাতৃকার জন্য আকুণ্ঠভাবে উৎসর্গ করলেন। দেশের জন্য এই আত্মদান আজও মানুষকে উদ্বেলিত করে, শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার সাহস যোগায়।

ভারত উপমহাদেশের অগ্নিযুগের বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা থেকেই অনেক নারী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। অনুশীলন, যুগান্তর প্রভৃতি বিপ্লবী দলের সঙ্গে ঘরে ঘরে মা, বোন, মাসিমা, কাকিমা, দিদি, বৌদিরা যুক্ত ছিলেন। যেমন ছিলেন অগ্নিযুগের প্রথম পর্বে স্বর্ণকুমারী দেবী, সরলা দেবী, আশালতা সেন, সরোজিনী নাইডু, ননী বালা, দুকড়ি বালা, পরবর্তীকালে ইন্দুমতি দেবী, লীলা রায় (অনন্ত সিংহের দিদি), পটিয়া ধলঘাটের সাবিত্রী দেবী প্রমুখ দেশপ্রেমিক নারী। এরই ধারাবাহিকতায় সেই অগ্নিযুগের অগ্নিকন্যা বীরকন্যা প্রীতিলতার আবির্ভাব। (সংক্ষেপিত)

তথ্যসূত্র:

১. বীরকন্যা প্রীতিলতা পূর্ণেন্দু দস্তিদার, প্রকাশকাল ১৩৭৯ বাংলা।

২. স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম পূর্ণেন্দু দস্তিদার, চট্টগ্রাম বই ঘর, প্রকাশকাল ১৩৭৪ বাংলা।

৩. স্বাধীনতা সংগ্রামে সশস্ত্র বিপ্লবীদের ভূমিকা সুধাংশু দাশগুপ্ত, প্রকাশকাল ১৯৯০ সাল, কলকাতা।  

লেখক: সম্পাদক, বিপ্লবীদের কথা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.