প্রসঙ্গ: বৈশ্বিক মহামারি করোনা

মোহাম্মদ আলতাফ হোসাইন

চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে যখন প্রথম করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ সনাক্ত হলো এবং চীন যখন এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে মরিয়া হয়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল তখনও বিশ্বের বাকি দেশগুলো এই ভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে কোনও ধারণা নিতে চেষ্টা করেনি। খোদ সাম্ররাজ্যবাদের মোড়ল মার্কিন মুলুকের রাষ্ট্রপতি ডোনান্ড ট্রাম পর্যন্ত এই ভাইরাস সম্পর্কে নানা রকম তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে যাচ্ছিল। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটি হাঁটি পা পা করতে করতে করোনা যখন উন্নত প্রযুক্তি সমৃদ্ধ এই দেশটাকে আক্রমণ করে বসলো তখন তার টনক নড়ে। এরপর করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ তান্ডবলীলায় যখন দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি থেকে শুরু করে সামাজিক জীবনাচারকে লন্ডভন্ড করে দিল ঠিক তখন থেকে ডোনান্ড ট্রাম্প সেই যে আবল তাবল কথাবার্তা বলা শুরু করলো তা আজও সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছেন। অতি সম্প্রতি আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ও তিনি এই করোনা ভাইরাসকে পুঁজি করে নানা ধরনের রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার কসরত চালিয়ে যাচ্ছেন।

যাহোক, আমাদের দেশটা সেই প্রবাহমান ঘটনা প্রবাহের বাইরে নয়। গোড়ার দিকে এখানেও এই ভাইরাস সম্পর্কে এক ধরনের উন্নাসিকতা দেখিয়ে চলার ভাব ছিল। করোনা ভাইরাস আমাদের দেশে সংক্রমণ ঘটালে আমাদের কি ধরনের প্রস্তুতি নেয়া দরকার এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এই মহাদুর্যোগ মোকাবিলা করার জন্য কি ধরনের সাজ সজ্জায় সাজিয়ে প্রস্তুত রাখা দরকার সে ব্যাপারে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত চলমান সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায় নাই। অবহেলা আর উদাসিনতার মধ্যে দিয়ে সময় নষ্ট করা হয়েছে প্রায় দুই মাসাধিক কাল। তারপর গত ৮ মার্চ ২০২০ যখন এই ভাইরাসের সংক্রমণ প্রথম ধরা পড়লো তখন সরকারের মাথায় যেন তা বজ্রাঘাতের মত আঘাত করলো। শুরু হলো প্রশাসনিক দৌড়ঝাঁপ। প্রথম প্রথম প্রশাসনের বড়বড় হর্তাকর্তাদের মধ্যে থেকে বিশেষ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু কিছু কর্তাব্যক্তি হাকডাক দিয়ে মিডিয়ার সামনে হাজির হয়ে এমন একটা হামবড়াই ভাব দেখাতে শুরু করলেন যে, করোনা সম্পর্কে আমরা শুরু থেকেই অনেক বেশি সজাগ ও সচেতন। সুতরাং করোনা মোকাবিলায় প্রস্তুতির কোনো ঘাটতি নেই। সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রীও এমন একটা ভাব দেখাতে শুরু করলেন যেন কিছুই হয়নি। করোনা আমাদের কিছুই করতে পারবে না। আমরা করোনার থেকেও অনেক শক্তিশালী।

সরকারের হর্তাকর্তাদের এহেন আচরণে জনমনে এমন একটা ভাব তৈরি হলো- না না করোনা এমন কিছু না, হয়ত ৪/৫ মাস একটু ভোগাবে, তারপর সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, দেশে করোনা সনাক্তকরণের পর ৬ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে এখনও করোনা বিদায় নিয়েছে এমন কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। জনগণের পক্ষ থেকে করোনা পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারের সংখ্যা যেখানে সমস্ত জেলা উপজেলা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার দাবি ছিল সেই সংখ্যা নানা অজুহাতে ক্রমাগতভাবে কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে সংক্রমণের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে কমিয়ে আনতে আনতে তা দেড় হাজার থেকে দুই হাজারের ঘরে দেখানো হচ্ছে। এসব করে জনগণ কে কি বার্তা দিতে চাচ্ছেন তা সরকারই জানে। তবে আমরা সাধারণ জনগণ দিব্যচক্ষু দিয়ে যা দেখতে পাচ্ছি তা হলো করোনা এখনও দেশে এক ভয়াবহ রূপ নিয়েই তার তান্ডবলীলা চালিয়ে যাচ্ছে।

অভিযোগ করা হয়, জনগণ আর করোনা পরীক্ষা করার জন্য আসছেন না। সুতরাং করোনার ভয়াবহতা কমে গেছে। কিন্তু একথা কি ঠিক? মানুষ কেন করোনা পরীক্ষা করতে যাচ্ছেন না সেই কারণগুলো কি অনুসন্ধানের চেষ্টা হয়েছে, তার জন্য কি সঠিক তথ্য জানার জন্য কোনও তদন্ত চালানো হয়েছে। হয় নাই। তাহলে করোনার ভয়াবহতা কমে গেছে- সরকারের তরফ থেকে এই বার্তায় আমরা ভরসা রাখি কী করে?

করোনা পরীক্ষার সূচনালগ্নে মানুষের মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল এখন তা নেই কেন? করোনা পরীক্ষার ফি বিহীন ব্যবস্থা বাতিল করে ফি ধার্য করার যে ফরমান জারি করা হলো এ সিদ্ধান্ত আসলো কীভাবে? করোনা কোনো সাধারণ অসুখ নয়- এটা একটা বৈশ্বিক মহামারি। এই বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলায় সরকারের পবিত্র দায়িত্ব এ ভাইরাসে আক্রান্ত সব মানুষের জন্য সমস্ত রকমের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চত করা এবং তা সরকারকে করতে হবে সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রীয় খরচে। কিন্তু তা না করে করোনা সনাক্তকরণের সূচনালগ্নেই জনগণের ঘাড়ে টাকার অংক চাপিয়ে সরকার এই প্রক্রিয়াকে আঁতুড় ঘরেই গলা টিপে ধরলো।

করোনার ভয়াবহতা কমে গেছে বলে সরকার বাহাদুর যতই বগল বাজিয়ে বাহাবা কুড়ানোর চেষ্টা করুক না কেন, যতই সংক্রমণের হার কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করুক না কেন – মৃত্যুর হার তো কমছে না। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৫০ সংখ্যার মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা তো সরকারিভাবেই ঘোষণা করা হচ্ছে। বে-সরকারি হিসাব তো তার থেকেও অনেক বেশি। সর্দি, কাশি, জ্বর, মাথা ব্যথা, গলা ব্যথা নিয়ে মানুষ ঘরে ঘরে অসুস্থ হয়ে নীরবে নিভৃতে কাতরাচ্ছেন। তার হিসাব দেবেন কে?

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই যুগে এভাবে সমস্ত ঘটনা প্রবাহকে সম্পূর্ণ রূপে নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়ে হাজার হাজার মানুষ কে যে বলির পাঠা বানানো হচ্ছে এর দায়ভার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারকে নিতে হবে।

করোনার ভয়াবহতা মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি সূচনা থেকেই অত্যন্ত অপরিকল্পিত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নানা অব্যবস্থাপনা, হটকারী পরিকল্পনা, মনের মাধুরী মিশানো লোক দেখানো কতগুলি অপরিকল্পিত উদ্যোগ এবং সর্বোপরি এ খাতে সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট আর ভন্ডামির জন্য খেসারত দিতে হচ্ছে জনগণকে। আজকে বের হচ্ছে বেসরকারি খাতে অননুমোদিত স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানের কথা। তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই জনমনে প্রশ্ন জাগে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে লালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত হর্তাকর্তারা এতদিন বসে বসে কি এই সব অনিয়ম আর দুর্নীতিকে সচেতন ভাবেই লালন পালন করেছেন। কেন তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে না। কেন তাদের কে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। এখনও কেন তারা এহেন ন্যাক্কারজনক কর্ম কান্ড কে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েও বাইরের আলো বাতাসে স্বাভাবিক ভাবেই বিচরণ করার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রশ্ন রাখলে কি জনগণ অন্যায় করবে।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে আর এক জনের ও মৃত্যু আমরা দেখতে চাই না। আমি আমার আগের এক লেখায় বলে ছিলাম- জীবন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, জীবন বাঁচাতে জীবিকা ও তেমন গুরুত্বপূর্ণ। তবে একথাও ঠিক যে জীবনই যদি না থাকে তবে কার জন্য জীবিকা। সুতরাং উভয়ের মধ্যে সমন্বয় ও যেমন করতে হবে কাজের অগ্রগন্যতা (চৎরড়ৎরঃু) এর উপরে ও তেমনই গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু সরকার সেই জায়গায় যথেষ্ট দক্ষতা, যোগ্যতা, পারঙ্গমতা দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে।

অনেক বিশেষজ্ঞই মন্তব্য করেছেন এই ভাইরাসের তান্ডব থেকে আমরা কতদিনে মুক্তি পাব বলা যাবে না। তবে আশার আলো জ্ঞান, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিতে অগ্রসর দুনিয়ার অনেক দেশেই এই ভয়াবহ ভাইরাসটিকে নির্মূল করার জন্য তাদের ল্যাবগুলিতে এ নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা গলদঘর্ম হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এই রোগের একটা উপযুক্ত দাওয়াই তথা ভ্যাকসিন আবিষ্কার করার জন্য। জানিনা কতদিনে তারা সফল হবেন। অক্সফোর্ড-এর বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে গিয়ে ইতোমধ্যে একটা হোচট খেয়েছেন। তবে খুব শিগগিরই তারা হোচট সমাল দিয়ে আবার তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শুরু করে দিয়েছেন। আমরা তাদের সফলতা কামনা করি। ভ্যাকসিন নিয়ে রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি হচ্ছে বলে বাজারে নানা গুজব শোনা যাচ্ছে। মানুষের জীবন নিয়ে এ ধরনের রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি একটি গুরুতর অপরাধ। তবে যারা এসব স্ট্যান্ডবাজি করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করছেন তারা অচিরেই তা বাতিল করে সবার ঊর্ধ্বে মানবিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন, আমরা এমনটাই আশা করি।

শীতকাল আসতে আর বেশি দেরি নেই। বিশেষজ্ঞদের অনেকের ধারণা, যেকোনো ভাইরাসের জন্য শীতকাল খুব পছন্দের। শীতে করোনা ভাইরাসের চেহারা আরো বেশি আক্রমণাত্মক হতে পারে। সুতরাং সময় থাকতে শীত মৌসুমের সেই ভয়াবহ দুর্যোগ যদি সত্যি সত্যি বাড়বাড়ন্ত রূপ নেয় তা মোকাবিলা করার জন্য আমাদের এখন থেকেই পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করা একটা গুরুত্বপূর্ণ দ্বায়িত্ব। জানিনা সরকার সেই দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে কী প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে সরকারের হাবভাব আর চলনে বলনে সেই প্রস্তুতির বিন্দুমাত্র লক্ষণ আছে বলে জনগণ মনে করে না। নিয়তির ওপরে নির্ভরশীলতা কমিয়ে সরকার বাস্তবমুখী আচরণ করুক, এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)