প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রাণবৈচিত্র্য বাঁচাতে হবে

অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন

করোনাভাইরাসের কারণে পৃথিবী বদলে গেছে। করোনাভাইরাস-উত্তর পৃথিবী আরো বদলে যাবে। প্রকৃতি-পরিবেশের ওপর পুঁজিবাদের হামলার বিষয়টি করোনাভাইরাস আগের চেয়ে আরো স্পষ্ট করেছে। পুঁজিবাদী উন্নয়ন ধারায় মুনাফার তাড়নায় প্রকৃতি-পরিবেশ-মানুষের অস্তিত্ব হুমকির মুখে ফেলে দেয়া হয়েছে। গণবিরোধী সরকারের ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নের নামে প্রকৃতি-জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের উৎসব চলছে। বলি হচ্ছে নদী, পাহাড়, বনাঞ্চল। পাহাড়-বনভূমি রক্ষার বদলে, স্থাপনা নির্মাণের জন্য পাহাড়, বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে। এভাবে গণবিরোধী সরকারের তত্ত্বাবধানে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে।

‘চট্টগ্রামের ফুসফুস’ বলে খ্যাত সিআরবি এলাকায় ৫০০ শয্যার হাসপাতাল, ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ ও ৫০ আসনের নার্সিং ইনস্টিটিউট নির্মাণ করবে সরকার। ২০২০ সালের ১৮ মার্চ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) ভিত্তিতে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট তো অবশ্যই দরকার। এই উদ্যোগের বিরোধিতা করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু পরিবেশ ধ্বংস করে সিআরবিতেই কেন এসব করতে হবে? দুইশ বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত বৃক্ষরাজিবেষ্টিত সিআরবি এলাকার সবুজ উপড়ে ফেলতে হবে কেন? চট্টগ্রামের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক-সামাজিক-পরিবেশবাদী সংগঠন, বুদ্ধিজীবীসহ নানা স্তরের মানুষ আন্দোলনে নেমেছেন।

শতবর্ষী বৃক্ষে ঘেরা সিআরবিকে ‘অক্সিজেন প্ল্যান্ট’ বলা হয়ে থাকে। গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সিআরবি এলাকাটি যেন একটি ‘প্রাকৃতিক হাসপাতাল’। সবুজে ঘেরা সারি সারি সুবিশাল বৃক্ষের কোনোটির বয়স একশ বছর, কোনোটির বয়স দুইশ বছর। এক গবেষণা থেকে জানা গেছে যে, সবুজ পাহাড়ি এলাকা সিআরবিতে ২২৩ প্রজাতির উদ্ভিদ আছে। ঔষধি গাছ রয়েছে ১৮৩টি। এগুলো ক্যানসার, হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, জন্ডিস, অর্শসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

শুধু প্রাকৃতিক কারণেই নয়, ঐতিহাসিক কারণেও সিআরবি এলাকাটি গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের প্রথম নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক শহীদ আবদুর রবসহ সাতজনের কবর রয়েছে সিআরবি এলাকায়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সিআরবি তথা পাহাড়তলী ছিল বিপ্লবের সূতিকাগার। ১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহের সৈনিকরা অর্থসংগ্রহের জন্য এখানে অভিযান চালিয়েছিলেন।

এমনিতেই চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ এখন চরম হুমকির মধ্যে। বর্ষায় চট্টগ্রাম শহরে এখন পানির ঢল বয়ে যায়। সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণ করা হলে, শতবর্ষী অনেক গাছ, ঔষধি গাছের বেশির ভাগ কাটা পড়বে। এখানকার প্রাকৃতিক নিসর্গ ধ্বংস হয়ে যাবে। হাসপাতালকে কেন্দ্র করে আরও স্থাপনা নির্মিত হবে। সব মিলিয়ে এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক বলয় হুমকির মুখে পড়বে।

সিআরবির ওপর হামলার বিষয়টি বিচ্ছিন্ন নয়। কিছুদিন আগে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছ কাটতে শুরু করেছিল সরকার। উপলক্ষ উদ্যানের ভেতর ৭টা হোটেল ও গাড়ি পার্কিংসহ নানা স্থাপনা নির্মাণ করা। কিন্তু প্রতিবাদ-আন্দোলনের এক পর্যায়ে হাইকোর্টের আদেশে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ যাত্রায় রক্ষা পায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।

সরকারের একের পর এক আগ্রাসী তৎপরতায় বনভূমি উজাড় হয়ে যাচ্ছে। এবার সরকারের দৃষ্টি পড়েছে কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে ঝিলংজা বনভূমির ওপর। এই বনভূমির ৭০০ একর জমিতে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ একাডেমি করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ঝিংলজা বনভূমি বন বিভাগের আওতাধীন হলেও, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে ভূমি মন্ত্রণালয় বেআইনিভাবে ইজারা দিয়েছে। বরাদ্দ দেয়া জমির বাজারমূল্য ৪ হাজার ৮০০ কোটি হলেও, দাম ধরা হয়েছে মাত্র ১ লাখ টাকা। ইজারা দেয়ার উদ্দেশ্যে দেশের অন্যতম জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ এই বনভূমিকে অকৃষি খাসজমি হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ বরাদ্দ দেয়া জমির ৪০০ একর পাহাড় ও ৩০০ একর ছড়া বা ঝরনা।

১৯৩৫ সালে ব্রিটিশ সরকার ঝিলংজা বনভূমিকে ‘রক্ষিত বনভূমি’ বলে ঘোষণা করে। বন বিভাগ এটি রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে। ২০০১ সালে দেশের বনভূমির যে তালিকা করা হয়, তাতেও ঝিলংজা মৌজা বনভূমি হিসেবে চিহ্নিত। বিপন্ন এশীয় বন্য হাতি, বানর, বন্য শূকর, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ও পাখিসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্য প্রাণীর নিরাপদ বসতি কক্সবাজারের এই বনভূমি। এখানে অনেক দুর্লভ প্রজাতিসহ ৫৮ প্রজাতির বৃক্ষ আছে।

বরাদ্দ দেয়া এলাকা প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন। রক্ষিত বন ও প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন বনভূমিতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ কিংবা নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেয়া অবৈধ ও বেআইনি। ‘এই ভূমি বন্দোবস্তযোগ্য নয়’ উল্লেখ করে বন বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেয়া হয়েছিল। বন বিভাগ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির আপত্তি উপেক্ষা করেই এ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ বলে বিবেচিত সরকারের এই উদ্যোগের বিরুদ্ধেও কক্সবাজারের মানুষ আন্দোলনে নেমেছেন।

জাতিসংঘের বেঁধে দেয়া লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রতিটি দেশে মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে বনভূমি এখন ১৭ শতাংশের কাছাকাছি; অবশ্য এই হিসাব সরকারের বন অধিদপ্তরের। বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার মতে, বনভূমির পরিমাণ ৬ থেকে ৭ শতাংশ, যার এক-তৃতীয়াংশ আবার দখল হয়ে গেছে। এর সঙ্গে নানা উপায়ে বন উজাড় অব্যাহত রয়েছে।

২০২০ সালের ১৯ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় জানায়, দেশের ২ লাখ ৮৭ হাজার ৪৫২ একর বনভূমি অবৈধ দখলদারদের হাতে চলে গেছে। এই অবৈধ দখলদারের সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ফরেস্ট ওয়াচের দেয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ৩ লাখ ৭৮ হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়ে গেছে। গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, বনভূমি উজাড় করার এই প্রবণতা কয়েক বছর ধরে ভীষণভাবে বেড়েছে। ফরেস্ট ওয়াচ বলছে, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরেই উজাড় হয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার একর বনভূমি। অর্থাৎ ২০১৪ সালের আগের ১৩ বছরে যে পরিমাণ বনভূমি উজাড় হয়েছে, তার প্রায় দ্বিগুণ উজাড় হয়েছে তার পরের পাঁচ বছরে।

জলবায়ুজনিত ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। বনভূমি বেদখল হয়ে রাষ্ট্রীয় থেকে ব্যক্তিগত দখলে চলে যাওয়া, বনভূমি উজাড় হয়ে যাওয়ার ফলে পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। এটা স্পষ্ট যে, বিপুল পরিমাণ বনভূমি রাতারাতি বেদখল হয়ে যায়নি। বনভূমি রক্ষার ব্যাপারে সরকার যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করেনি বলেই এসব ভূমি বেদখল হয়েছে।

বনভূমি উজাড়ের পাশাপাশি চলছে আদিবাসীদের উচ্ছেদও। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ (বাগদা) ফার্মের জমিতে ইপিজেড করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাগদা বাজার সংলগ্ন সাঁওতালদের মালিকানাধীন ১৮৪২ একর জমি চিনিকলের আখচাষের জন্য সরকার ১৯৫৪-৫৫ সালে অধিগ্রহণ করে। ১৯৬২ সালে এক চুক্তিপত্রের মাধ্যমে তৎকালীন সরকার পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশনকে উল্লেখিত জমি হস্তান্তর করে। চুক্তিতে বলা হয়েছিল, এ জমিতে আখচাষ ছাড়া অন্য কিছু করা যাবে না। শর্ত লংঘিত হলে এসব জমি পূর্বতন মালিকদের ফেরত দেয়া হবে। অধিগ্রহণের পর মহিমাগঞ্জে অবস্থিত রংপুর সুগার মিলস লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে এসব জমিতে গড়ে ওঠে সাহেবগঞ্জ ইক্ষু ফার্ম। ১৭ বছর আগে রংপুর সুগার মিলে আখমাড়াই বন্ধ হয়ে গেছে।

আখচাষ না হওয়ায় মিল কর্তৃপক্ষ জমি লিজ দেয়া শুরু করে। কিন্তু চুক্তি শর্ত মেনে (যেহেতু আখচাষ হচ্ছে না) পূর্বতন মালিকদের এসব জমি ফেরত দেয়া হয়নি। এসব জমিতে ধান, গম, সব্জিচাষ এমনকি পুকুর খনন করে মাছচাষও করা হয়। অধিগ্রহণ করা ১৮৪২ একর জমির সঙ্গে সাঁওতালদের আরো প্রায় ৬০০ একর জমি ফার্মের নামে অবৈধভাবে কুক্ষিগত করে রেখেছে মিল কর্তৃপক্ষ। এখন সরকার সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে রক্তেভেজা বাগদা ফার্মে ইপিজেড করতে চাইছে।

সাঁওতালদের উচ্ছেদ করতে ২০১৬ সালে সন্ত্রাসী অভিযান চলেছিল। পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা বাগদা ফার্ম এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালায়। সাঁওতাল পল্লিতে হামলা, অগ্নিসংযোগ করা হয়। পুলিশের গুলিতে শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুটু নিহত হন। পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের দেয়া আগুনে সাঁওতালদের সহস্রাধিক বাড়িঘর ভস্মীভূত হয়। সাঁওতাল নারীদের ওপর নির্মম নির্যাতন করা হয়। ২০১৬ সালের লড়াইয়ের ধারায় কমিউনিস্ট পার্টিসহ প্রগতিশীলদের সঙ্গে নিয়ে জোর লড়াই অব্যাহত রেখেছেন সাঁওতালরা।

বনভূমি ধ্বংস আর আদিবাসী উচ্ছেদ একই সূত্রে গাথা। আদিবাসীদের ‘ঐতিহ্যগত ও চিরায়ত’ ভূমির মালিকানাকে ক্রমাগত অস্বীকার করা হচ্ছে। আদিবাসীদের জীবন-জীবিকা, প্রাকৃতিক সম্পদে প্রথাগত অভিগম্যতা, ঐতিহ্য, সংস্কৃৃতি ও নিরাপত্তা সব সরকারই উপেক্ষা করেছে। টাঙ্গাইলের মধুপুরে সামাজিক বনায়নের নামে গারোদের উচ্ছেদে নেমেছে সরকার। ন্যাশনাল পার্ক করে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে পাঁচ তারকা হোটেল ও বিনোদন পার্ক নির্মাণের নামে ম্রো আদিবাসীদের উচ্ছেদ করতে চায় সরকার। উন্নয়নের নামে পাহাড়ে একের পর এক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে, যা পরিবেশ-প্রতিবেশের প্রতি হুমকিস্বরূপ। হর্টিকালচার ট্যুরিজম, পর্যটনের নামে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। আদিবাসী উচ্ছেদের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

প্রসঙ্গক্রমে একটি ঐতিহাসিক চিঠির বিষয় তুলে ধরছি। ১৮৫৪ সালে ওয়াশিংটন থেকে আমেরিকার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফ্যাঙ্কলিন পিয়ার্স (১৮০৪-১৮৬৯) সিয়াটল আদিবাসীদের নির্দেশ দেন তাঁদের বসতি এলাকা ছেড়ে চলে যেতে। কেননা সেখানে তৈরি হবে আধুনিক ‘সভ্য’ শহর। এই নির্দেশের জবাবে সিয়াটল আদিবাসীদের প্রধান একটি চিঠি দেন তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতিকে, আদিবাসীদের ভাষায় যিনি (মার্কিন রাষ্ট্রপতি) ‘সাদাদের বড় সর্দার’। অসাধারণ সৌন্দর্যময় এই চিঠিতে পৃথিবী, প্রকৃতি ও মানুষের আন্তঃসম্পর্ক ফুটে উঠেছে অত্যন্ত সাবলীল ও সরলভাবে। জাতিসংঘ এই চিঠিকে গ্রহণ করে জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতীক হিসেবে। চিঠিটি ঐতিহাসিক পরিবেশবাদী দলিল হিসেবে বিবেচিত।

চিঠিটির প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চিঠিটি পরিবেশবাদী দর্শনে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। অসাধারণ সৌন্দর্যময় চিঠিটার কয়েকটা বয়ান এমন-‘পৃথিবী মানুষের সম্পত্তি নয়, বরং মানুষই পৃথিবীর’; ‘(পৃথিবীময়) জীবনের এই ছড়ানো জাল মানুষ একা বোনেনি, সে কেবল এর একটি সুতোমাত্র। এই জালটিকে সে যা করবে তাঁর নিজেরও হবে তাই’; ‘এই ধরিত্রী আমাদের মা। যা মায়ের হবে, তাঁর সন্তানদেরও তাই হবে’।

‘বড় সাদা সর্দার’দের (তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি) প্রকৃতিবিরোধী আগ্রাসনের পরিণতির কথা ফুটে উঠেছে আজ থেকে ১৬৮ বছর আগে লেখা লাল মানুষের (আদিবাসী) সর্দারের লেখা এই চিঠিতে-‘লোভ এই পৃথিবীকে খেয়ে ফেলবে, পড়ে থাকবে এক মরুভূমি।’ চিঠিটার শেষ বাক্যে খুবই তাৎপর্যপূর্ণভাবে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যে ইঙ্গিত করা হয়েছিল, তা বর্তমানের সঙ্গে দারুণভাবে মিলে যাচ্ছে-‘বেঁচে থাকা শেষ, কোনো রকম টিকে থাকার শুরু।’

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা সম্প্রতি বিপদসঙ্কেত জারি করে বলেছেন, যে পথে ‘সভ্যতা’ ধাবিত হচ্ছে সে রকম চলতে থাকলে এই পৃথিবী মানুষের বসবাসের জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়বে এবং মানুষের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। পারমাণবিক যুদ্ধ ছাড়াও ‘বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনে’র ক্রম অবনতি ধরিত্রীকে ধ্বংস করে দেবে। সমুদ্রের পানির স্তর উপরে ওঠার কারণে সমুদ্রে তলিয়ে যাবে জনপদ ও বনাঞ্চল। বাংলাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্রে তলিয়ে যাবে বলে গবেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে। প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর দমনমূলক হস্তক্ষেপ ও আগ্রাসনের মাধ্যমে পুঁজিবাদ প্রজাতি, বাস্তুসংস্থান ও পরিবেশে নৃতাত্ত্বিক (Anthropogenic) ভাঙন ডেকে আনছে। পুঁজির শাসন সামাজিক অসমতাকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে গরিব আর প্রান্তস্থিত মানুষকে পরিবেশগত মারাত্মক বিপদে ঠেলে দিচ্ছে, অথচ ধনীরা থাকছে অপেক্ষাকৃত নিরাপদে। পুঁজিবাদসৃষ্ট এই অবস্থা এঙ্গেলসের ‘সামাজিক হত্যাকাণ্ডে’র দাবিকে নতুন করে তুলে ধরেছে।

কার্ল মার্কস বলেছেন, ‘পুঁজিবাদ মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যকার বিপাকীয় সম্পর্কে বিশৃঙ্খলা নিয়ে এসেছে। একইসঙ্গে শ্রম ও মৃত্তিকাকে শোষণ করছে।’ প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে কাব্যিক সম্পর্ক, তাকে ধ্বংস করেছে পুঁজিবাদ। ‘প্রকৃতিকে জয় করা’র নামে এক আত্মঘাতী পথে মানুষকে উসকে দিয়েছে পুঁজিবাদ। প্রকৃতি কেবল আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। মার্কস বলেছেন, ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পুঁজির আধিপত্য প্রকৃতিকে কলুষিত করছে। প্রকৃতির প্রতি এই আচরণ অত্যন্ত ঘৃণ্য। জলের মাছ, আকাশের পাখি, মৃত্তিকার উপরের উদ্ভিদ-সব কিছুকেই পরিণত করা হচ্ছে সম্পত্তিতে। সমস্ত জীবকে এই বন্ধন থেকে মুক্ত করা চাই।’

প্রতিবেশগত (Ecological) বা বিপাকীয় সম্পর্ক এবং বিশেষভাবে বললে সমাজ ও প্রকৃতির পরস্পর নির্ভরশীলতার জটিল আন্তঃসম্পর্ককে কার্ল মার্কস তুলে ধরেছেন তাঁর ‘মেটাবলিক রিফট তত্ত্বে’। এই তত্ত্বে মার্কস দেখিয়েছেন, সরলরৈখিক পুঞ্জীভবনের মাধ্যমে পুঁজিবাদী উৎপাদন কীভাবে বিচ্ছিন্নতার জন্ম দিচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতা বা বিচ্ছেদকেই মার্কস বলেছেন, ‘প্রকৃতির বৈশ্বিক বিপাক।’ পুঁজিবাদ মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির, মানুষের সঙ্গে মানুষের, এমনকি নিজের সঙ্গে নিজের বিচ্ছিন্নতা তৈরি করছে। গ্রাম থেকে শহরে, উৎপাদনের স্থান থেকে হাজার মাইল দূরে খাদ্য ও তুলা চালান হওয়ার ফলস্বরূপ মাটি হারায় তার প্রয়োজনীয় উপাদান-নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম। এগুলো আর মাটিতে ফিরে আসে না, কিন্তু শহরকে দূষিত করে।

১৮৪৪ সালে কার্ল মার্কস ‘অর্থনৈতিক ও দার্শনিক পান্ডুলিপি’তে লিখেছেন, ‘মানুষ বেঁচে থাকে প্রকৃতির জন্যই। প্রকৃতিই তার দেহ এবং সে যদি জীবিত থাকতে ইচ্ছুক হয়, তবে প্রকৃতির সঙ্গে ক্রমাগত কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে বাধ্যতামূলক।’ একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আমরা স্লোগান তুলেছিলাম-‘নতুন শতাব্দী হবে মানুষ ও প্রকৃতির মুক্তির’। পুঁজিবাদকে ধ্বংস না করে ধ্বংসের হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করা যাবে না। মুনাফার বিরুদ্ধে চলমান লড়াইকে তীব্র করতে হবে। প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রাণবৈচিত্র্য বাঁচানোর লড়াইকে বেগবান করতে হবে।

লেখক: প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.