পৌরসভা নির্বাচন: কাছ থেকে, দূর থেকে দেখা

দিবালোক সিংহ

সম্প্রতি দেশে পৌরসভা নির্বাচন শুরু হয়েছে। প্রগতিশীল শক্তি বিভিন্ন স্থানে সাধ্যমত নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করছেন। সারা দেশে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনে কয়েকজন প্রগতিশীল বাম প্রার্থীর নির্বাচনে অবতীর্ণ হওয়ার সংবাদ আমাদের কাছে এসেছে। তবে বরাবরের মত এসব নির্বাচনে, বুর্জোয়া দলগুলির প্রার্থীরা এবারও নিজেদের মধ্যে তীব্র হানাহানি ও সহিংসতা, টাকা, পেশী শক্তি ও প্রশাসনের প্রভাব ইত্যাদির আশ্রয় নিয়ে ভোটারদের অবাধ ভোটাধিকার প্রয়োগে নানা প্রতিব›ধকতা সৃষ্টি করছে। এমনকি নির্বাচনের আগেই প্রার্থী ও প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে হত্যা পর্যন্ত করা হয়েছে।

প্রগতিশীলরা বহু আগে একটি জনপ্রিয় শ্লোগান দিতেন ‘আমার ভোট আমি দিব যাকে খুশি তাকে দিব’। এই ন্যূনতম গণতান্ত্রিক ভোটের নীতিটুকুও এদেশে ঠিকমত কার্যকরী হচ্ছে না। আবার একথাও সত্য যে ইচ্ছামত নির্ভয়ে ভোট দেয়ার জন্য যে আর্থ-সামাজিক পরিবেশ দরকার, জনগণের যতটুকু অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তা থাকা দরকার, তা সমাজে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয় নি। তাই এখন পর্যন্ত এদেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্র উভয়ই অনুপস্থিত। উভয়ের জন্যই প্রগতিশীলদের যুগপৎ সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে।

গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ: পৌরসভা পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা বিকেন্দ্রীকরণ করার দাবি দীর্ঘদিনের। বর্তমানে শাসক দলের সরকারের বিরাগভাজন হলে পৌরসভার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বরখাস্ত করার অধিকার মন্ত্রণালয়ের বা আমলাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাছাড়া স্থানীয় পৌরসভার নিজস্ব আদায়কৃত রাজস্ব সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। এর ফলে সকল স্থানীয় সরকার তথা পৌরসভাসমূহ তাদের উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন অধিদপ্তরের মুখাপেক্ষী। ফলে কোথাও নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হলে তাকে আগে ও পরে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এ ধরনের স্থানীয় সরকার পরিচালনা ব্যবস্থা অগণতান্ত্রিক এবং বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে পৌরসভা পরিচালনা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধি তথা জনগণের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তাহলে কেন্দ্রের যথেচ্ছাচার কিছুটা বন্ধ হবে।

জনগণের স্থানীয় সরকার: বাংলাদেশে লুটপাট ও দুর্নীতির ভেতর দিয়ে অবৈধ পুঁজি সঞ্চয় করে পঞ্চাশ বছরে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নকে নগ্নভাবে পদদলিত করে একটি লুটপাট নির্ভর পুঁজিবাদী ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় বিগত ২০১৮ সালের তিরিশে ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারে ভোট বাক্স ভর্তির জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে জনগণের লড়াই সংগঠিত ও বেগবান করতে হবে। পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে জনগণের ভোটের অধিকার। অবৈধ কালো টাকার মালিকদের বর্জন করতে হবে। বাংলাদেশে স্থানীয় নির্বাচিত সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও দরিদ্র মানুষের নির্বাচিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বন্ধ করতে হবে লাগামহীন দুর্নীতি। লুটপাটকারীদের হাত থেকে স্থানীয় সরকারকে মুক্ত করতে হবে। এসবই হওয়া উচিৎ প্রগতিশীল প্রার্থীদের শ্লোগান।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো ধরনের ভোট কেন্দ্র দখল, জাল সীল মারা, কেন্দ্রে অবৈধ অনুপ্রবেশ, সরকারি দলের মাস্তানদের দৌরাত্ম রুখে জনগণের ভোটের আন্দোলনও পাশাপাশি অগ্রসর করতে হবে। পৌরসভা উন্নয়নে মানুষের জন্য চাই সৎ, যোগ্য, নিবেদিত প্রাণ রাজনীতিবিদ। এই লক্ষ্যে, বামপন্থি, সৎ, নিবেদিত প্রাণ প্রার্থীদের জয়ী করতে হবে।

স্থানীয় সরকার পরিবর্তনে আওয়াজ তুলতে হবে: তৃণমূলে জনগণের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ, স্থানীয় সরকারের প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পৌরসভায় দুর্নীতিমুক্ত পৌর প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। দুর্নীতিরোধে দুর্নীতিবিরোধী পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করুন।

নগর এলাকায় সামাজিক নিরাপত্তা বলয় (স্বল্প মূল্যে রেশন, ভিজিডি, ভিজিএফ কার্ড) সেবা প্রবর্তন ও সম্প্রসারণ করতে হবে। প্রাথমিক চিকিৎসা সেবার গুণগত মান বৃদ্ধি করতে হবে। কোভিড ১৯ অতিমারি থেকে জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বিনামূল্যে দরিদ্রদের ভেতর মাস্ক, স্যানিটাইজার বিতরণ, দরিদ্র জনগোষ্ঠিীকে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য ও এ্যাম্বুলেন্স সেবাসহ সবার জন্য চিকিৎসার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

পৌরসভায় সকল দরিদ্র ছেলে-মেয়েদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে (বাধ্যতামূলক শিক্ষা সংক্রান্ত বিধি ১৯৯০)।

রাস্তা সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ, ফুটপাত, ড্রেনেজ ব্যবস্থা করা, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, রাস্তায় পর্যাপ্ত সড়কবাতির ব্যবস্থা এবং ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কমিউনিটি সেন্টারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

পৌরসভার বাজেট প্রণয়ন ও পরিকল্পনা গ্রহণে নারীসহ সকলের মতামত গ্রহণ ও জবাবদিহীতা নিশ্চিত করতে হবে। পৌরসভার বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বিগত সময়ের বাজেট পর্যালোচনা করে কত টাকার বাজেট, কিভাবে খরচ হবে, কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ তা জনসম্মুখে উন্মুক্ত সভার মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে।

একই সংগে সরকারের পদলেহী নির্বাচন কমিশন বাতিল ও সকল দলের পরামর্শে সকল ধরনের প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। অবাধ, নিরপেক্ষ, অর্থবহ সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। নির্বাচনে টাকার খেলা বন্ধ, দুর্নীতিবাজ, কালো টাকার মালিক, ঋণ খেলাপীদের নির্বাচনে বয়কট করতে হবে। সবার ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নীচে বাংলাদেশের পৌরসভা সংক্রান্ত বাস্তব সমস্যাগুলি নিয়ে আরো কিছু তথ্য-পরিসংখ্যান-বিবরণ পেশ করে এই লেখার সমাপ্তি টানছি।

পৌরসভার সংক্ষিপ্ত সালতামামি: দেশে বর্তমানে প্রায় ৩৩১টি পৌরসভা রয়েছে। দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ নাগরিক নগর এলাকায় বসবাস করেন। এসব পৌরসভা মহানগর, জেলা ও স্থানীয় হিসাবে শ্রেণিভুক্ত (ক, খ, গ) করা হয়েছে। এগুলো করা হয়েছে জনসংখ্যা ও রাজস্ব আদায়ের ভিত্তিতে। ধারণা করা হয় আগামী তিরিশ বছরে বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নগর এলাকায় বসবাস করবেন।

সাধারণ জনগণের জন্য বিভিন্ন পৌরসভায় (পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, গণপরিবহন, ড্রেনেজ, স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা, আবাসন) কর্মসংস্থান ইত্যাদি নিশ্চিত করা বর্তমান বাজার অর্থনীতি নির্ভর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় দুরুহ। পৌরসভার আইন ২০০৯ অনুযায়ী, মেয়রের হাতেই সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। নির্বাচিত ওয়ার্ড কমিশনারদের কোনো আর্থিক ক্ষমতা দেয়া হয়নি।

নগর বা পৌরসভার পরিকল্পনা প্রণয়নে স্থানীয় পৌরসভার ও জনসাধারণের অংশগ্রহণ সীমিত, সাধারণভাবে পৌরসভার পরিকল্পনা কেন্দ্রীয় সরকার তথা নগর পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বা স্থানীয় প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত, পৌরসভায় নগর পরিকল্পনা সংক্রান্ত কোনো দপ্তর নেই। শুধু মহানগরে এ ধরনের দপ্তর রয়েছে।

বাজেট: পৌরসভার বাজেট সাধারণভাবে কেন্দ্রীয় সরকারি অধিদপ্তর কর্তৃক প্রস্তাবিত ফরম্যাট অনুয়ায়ী প্রস্তুত করা হয়। এগুলো পৌরসভার হিসাব বিভাগ প্রস্তুত করে থাকে পরবর্তীতে মেয়র এবং তার পরিষদে অনুমোদনের জন্য উত্থাপিত হয়ে থাকে, সাধারণভাবে কেন্দ্র নির্ধারিত ফরম্যাট’র কিছু সাধারণ পরিমার্জন, পরিবর্ধন করে বাজেট তৈরি করা হয়। স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বা জনসাধারণের কোনো দৃশ্যমান অংশগ্রহণের কোনো প্রক্রিয়া এখানে অনুসরণ করা হয় না। তাছাড়া পৌরসভাগুলোর নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতার মারাত্নক ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। তারা তাদের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের উপর সর্ম্পূণ নির্ভরশীল। তাই পৌরসভাসমূহের উন্নয়ন প্রকল্পসমূহে জনগণের মতামত প্রদান ও অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। যদিও বর্তমান কাঠামোর ভেতরেও জনঅংশগ্রহণ আরো উৎসাহিত ও বৃদ্ধি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রয়োজন মেহনতি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ জোরদার ও শক্তিশালী করার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি।

পৌরসভাসমূহে অবকাঠামো নির্ধারণ পরিকল্পনা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন সাধারণভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে বা কোনো কোনো সময় পৌরসভার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয় সেখানে পৌরসভার নাগরিকদের মতামত গ্রহণ ও অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। এর ফলে এসব প্রকল্প কেন্দ্রীয় সরকার বা বৈদেশিক অর্থায়নে হয়ে থাকলেও তাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতার অভাব চরমভাবে পরিলক্ষিত।

পৌরসভা আইন ২০০৯, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা নিশ্চিত করার বিষয়টি আইনগতভাবে অবশ্য করনীয় করেছে। পৌরসভা সমূহে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা নিশ্চিত করা, জনগণের স্বার্থ সংরক্ষিত রাখার একটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। কিন্তু এ ধরনের লিখিত বিধান চালু থাকার পরও পৌরসভাসমূহে নিয়োগ সংক্রান্ত বাণিজ্য, প্রকল্পে দুর্নীতি, সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতির অভিযোগ ও সততার চরম অভাব সর্বজনবিদিত।

পৌরসভার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা: বাংলাদেশে নগর এলাকায় দরিদ্র জনসাধারণের জন্য কোনো রেশন, ভিজিডি বা ভিজিএফ কার্ডের বরাদ্দ দেয়া হয় না। শুধু চালের দাম বৃদ্ধি পেলে খোলা বাজারে সরকারি দামে চাল বিক্রি করা হয়। এ ধরনের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।

পৌরসভায় দরিদ্র মেহনতি জনসাধারণের পরিবারভুক্ত ছেলে মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। অথচ ১৯৯০ সালে সরকার বাধ্যতামূলক শিক্ষা বিধি গ্রহণ করার পরও এ অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। এ অবস্থা বৈষম্যমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থার আর একটি নিদর্শন।

পৌরসভাসমূহে কমিউনিটি ক্লিনিক বা স্ট্যাটিক ক্লিনিক পরিচালনা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল বা অকার্যকর। এ অবস্থা পরিবর্তন জরুরি। কোভিড ১৯ অতিমারির পটভূমিতে এ ধরনের ক্লিনিকের সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য কর্মী ও ঔষধসহ অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ ও এগুলো নিয়মিত পরিচালনা করা অতীব জরুরি।

পৌরসভার নিজস্ব তহবিল: স্থানীয় নির্বাচিত সংস্থাগুলোকে টেকসই ও তাদের নিজস্ব তহবিল গড়ে তোলার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। স্থানীয় জনসাধারণের বিভিন্ন সেবা ও স্থানীয় অবকাঠামো উন্নতির লক্ষ্যে সংগৃহীত (প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে কর, ব্যবসা থেকে কর অন্যান্য স্থানীয় কর) স্থানীয় রাজস্ব আয়ে স্থানীয় নির্বাচিত সংস্থাসমূহের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পৌরসভার প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা, প্রাথমিক শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে (দেখুন, বাধ্যতামূলক শিক্ষা বিধি ১৯৯০, স্থানীয় সরকার বিধি ২০০৯, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭)।

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।