পুরুষতন্ত্রে পেশাজীবী নারী ও ধর্ষণ একটি পিতৃতান্ত্রিক হিংস্রতা

লুৎফর রহমান

আমরা শুরুতে কৃষক নারীর কথা বলতে চাই। আমি আমার এক কৃষক নাতবৌকে জিজ্ঞেস করলাম, সংসারে কেমন আছো? উত্তরে সে বললো, ‘আছি একরকম! একটা পেশায় আছি, কাগজপত্রে লেখা হয় গৃহিণী। তবে পেশাজীবীরা অল্পবিস্তর বেতন পেলেও আমি পাই না। আপনার নাতি বলেন, তোমার ছেলেমেয়েরাই তোমার বেতন। তিনি আমাকে বছরে দু-বার কাপড় দেন, দিনে তিন বার খেতে দেন, রাতে তেনার সাথে ঘুমুতে দিয়ে আমার মানসম্মানের সাথী হন।

সুতরাং এতোকিছুর পরে আমাকেতো আর বসে থাকলে চলে না। আমি সবার আগে জেগে অতি ভোরে পাক বসাই, বাচ্চাদের পড়ার টেবিল সাজিয়ে দিই, ঘরদোর পরিষ্কার করি, আপনার নাতিকে খাইয়ে মাঠে পাঠাই। তারপর ভাত, তরকারি, ডাল একসাথে মেখে বড় গামলায় নিয়ে গোগ্রাসে গিলে ফেলি। গোয়ালঘর, হাঁস-মুরগির খোঁয়াড় সাফ করি। ছেলেপুলেদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে পুকুরে মাছের খাবার দেই। ধান কাটার সময় কামলা মিলে না। ধানের দাম আর কামলার রোজ মিলে না। বাধ্য হয়ে আপনার নাতির সাথে ধান কাটতে যাই, ধানের আঁটি মাথায় নিয়ে বাড়ি আসি, মাড়াই করি, সিদ্ধ দিই, শুকাই এবং গোলায় ভরি। আবার দুপুরে একফাঁকে রান্নাও করে ফেলি, গরম ভাত ছাড়া বাচ্চার বাপ খেতে চায় না। কাজ করতে করতে বিকেল গড়িয়ে যায়। গরু-বাছুর গোয়ালে এবং হাঁস-মুরগি খোঁয়াড়ে আনি। জিনিসপত্র গোছাই। এই করতে করতে রাতের রান্নার সময় হয়ে যায়। রান্নাটা সেরেই গোসল করি। পরিবারের সবাইকে খাইয়ে নিজে খাই। পরিপাটি করে বিছানা পেতে দিই, আপনার নাতি শোয় কিন্তু ঘুমায় না। আমি গিয়ে দু চারটা রসের গপ্প করলে সে শান্ত হয়ে ঘুমুতে যায়। না-থাক বেতন, আপনিই বলুন আমি কি ভালো নেই? ইদানিং আবার কোমরটা ব্যথা করে। আপনার নাতি বলেন, মালিশ এনে দেবো নে, সেরে যাবে। আসলে উনার কি আর এই সময় হয়?’

এই হচ্ছে কৃষি পেশায় নিয়োজিত নারীর জীবন। তার আর্থিক কর্তৃত্ব পুরুষের হাতে। প্রচলিত ব্যবস্থায় কৃষক নারীর সম্পত্তি অর্জনের সুযোগ নেই। পারিশ্রমিক নেই যদিও সে পুরুষের চেয়ে বেশি কাজ করে। পরিবারের আর্থিক ব্যাপারে তার কোনো অংশ গ্রহনও নেই। প্রয়োজনে পুরুষটির নিকট থেকে তার অর্থ চেয়ে নিতে হয় হাত পেতে। কৃষক নারী মূলত পরাশ্রিত।

এই অবস্থাটির বদল প্রয়োজন। তার জন্য বদলাতে হবে সমাজ। বর্তমানে বাংলাদেশে নারীশিক্ষার কিছুটা প্রসার হয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক পুঁজিবাদই সেটা করেছে। কারণ তারা যে কলকারখানা করছে সেখানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে; সে প্রযুক্তি না বোঝলে দেশের মানুষের অর্ধেক নারী সেখানে কাজ করতে পারবে না। অর্থাৎ নারীশ্রম আত্মসাৎ করার মানসেই নারীশিক্ষার এই উদ্যোগ।

আমরা জানি পুরুষতন্ত্রে সবকিছু ঠিক করে দেয় পুরুষ এবং তারা নারীকে ততোটুকুই দেয় যতটুকুতে লাভ আসে। কর্মপদ্ধতি, মর্যাদা, বেতন ইত্যাদি ঠিক করে পুরুষ। নারী তুমি যদি কর্মক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে বেশি কাজ করো তবু বেতন তার চেয়ে কম পাবে। প্রায়ই দেখা যায় অধিক যোগ্য নারী কম যোগ্য পুরুষের চেয়ে বেতন কম পাচ্ছে। একেই বলে পুরুষতন্ত্রের প্রাধান্য।

এছাড়া চাকরিতে নারীদের খুব একটা উন্নতি চোখে পড়ে না। চাকরিতে নারীরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক এবং তারা যৌন নির্যাতনেরও শিকার। আধুনিক পুরুষতন্ত্র দরকষাকষির মানসে নারী কর্মীদের পাইপ লাইনে রেখে দেয়। তারপরও শিক্ষা নারীদের চোখ খুলে দিচ্ছে মুক্তির পথে এগুতে। উগ্র পুরুষতন্ত্র নারীদের ঘরে বন্দি রাখার পক্ষে। তবে অনেক সময় নিজেদের স্বার্থে নারীকে বাইরেও নিয়ে আসে।

যেমন ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সৌদি আরব তার দেশের সৈন্যদের সেবায়, মনোরঞ্জনের জন্য নারীদের বাইরে আসতে দেয়। বর্তমানে তারা অনুধাবন করতে পারছে রাজতন্ত্রের দিন শেষ, অন্যদিকে তেলও ফুরিয়ে আসছে। তাই নামকাওয়াস্তে হলেও পুঁজিবাদী গণতন্ত্রে যেতে হবে। আর সেটা দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারীদের বাদ দিয়ে সম্ভব না। এরই স্টেজ-রিহার্সাল স্বরূপ তারা নারীদের গাড়ি চালাতে, সিনেমা-ক্লাবে যেতে এবং মাঠে খেলতে অনুমতি দিয়েছে। তবে পুরুষতন্ত্রের ক্ষেত্রে তারা কোনো ছাড় দিতে রাজি না। বাংলাদেশের পুরুষতন্ত্র নারীদের আর্থিক স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না। তাদের অবস্থান নারীর পেশাগ্রহনের বিপক্ষে, সচ্ছল পরিবারগুলো একদম বিরুদ্ধে। ভাবটা এমন, কী নেই আমাদের, তুমি নারী চাকরি করবে কেনো? পড়াশোনা করেছো, ভালোই করেছো বাচ্চাদের কাজে লাগবে। আমাকে আধুনিকা হিসেবে প্রেম দেবে, আমি তোমাকে সাজিয়ে আনন্দ পাবো। এটাই হবে তোমার মানসিক তৃপ্তি।

তবে পুরুষতন্ত্র নিম্নবিত্ত নারীদের বেলায় অন্যরকম চিন্তা করে। তাদের শস্তা শ্রম পুরুষতন্ত্রের প্রয়োজন। মধ্যবিত্ত নারীদের নিয়ে পিতৃতন্ত্রের ভয়, সেটা মনস্তাত্ত্বিক। ওরা যদি ডাক্তার হয়, বিচারক হয়, প্রফেসার হয়, সেনা কর্মকর্তা হয়, আমলা-মন্ত্রী হয় তবেতো পুরুষতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়। কিন্তু আটকানো যাচ্ছে না আমাদের নারীদের, একটু একটু করে এগুচ্ছে তারা, যা আশার দিক। তাদের এই ক্রমাগ্রগতি একদিন মুক্তির বিপ্লব ঘটাবে।

এজন্যই পিতৃতন্ত্র সবসময় নারীশিক্ষার পক্ষে থাকতে চায় না। কিন্তু নারীরা শিক্ষার ক্ষেত্রেও অগ্রসর হচ্ছে। এবার তারা চায় নারী প্রকৃত শিক্ষা না পাক। চিরকাল বন্দি থাকার, পিছিয়ে থাকার শিক্ষা পাক। ধর্ষণ একটি পিতৃতান্ত্রিক হিংস্রতা পিতৃতন্ত্র আদিতে, নারীকে সম্পত্তি ও কর্তৃত্ব থেকে ছিটকে ফেলে দিয়ে যাত্রা শুরু করে। পুরুষ প্রথম পরিবারে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে, তারপর রাষ্ট্র ও সমাজে। পুরুষতন্ত্রের এই আধিপত্যই হিংস্রতার মূলে। সমাজে সে ধীরে ধীরে তার হিংস্রতাকে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এখন এই প্রতিষ্ঠিত আদর্শই তার স্বার্থের পক্ষে ভূমিকা রাখছে।

পুরুষতন্ত্র তার আদর্শ বাস্তবায়নে দুটো পদ্ধতির আশ্রয় নেয়- ১.সামাজিকীকরণ ২. বলপ্রয়োগ।

১.

সামাজিকীকরণ: পুরুষতন্ত্র তার সবকিছুকে নানা কৌশলে সমাজে সহনীয় করে তোলে এটাই সামাজিকীকরণ। সে জোর প্রচার চালায় পুরুষের ব্যভিচার কোনো দোষের না, কিন্তু নারীর বেলায় সেটা অপরাধ। নারী পুরুষ থেকে পৃথক ও নিকৃষ্ট জীব, মানুষ না। পুরুষ নারীর মালিক। মালিক তার মালিকানাধীন বস্তুর ওপর যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। নারীর ওপরও পুরুষ সেরকম পারে। নিম্নবিত্তের পুরুষ সাধারণত নারীকে পীড়ন করে সামাজিকভাবে আর উচ্চবিত্তরা মনস্তাত্ত্বিকভাবে, এটাই পার্থক্য।

নারীর ঋতুস্রাব অস্পৃশ্য বিষয় এটা পুরুষতন্ত্রের প্রচার। এই সময়টাতে নারীকে পুরুষ ঘেন্নার দৃষ্টিতে দেখে এবং দূরে সরিয়ে রাখার ব্যবস্থা করে। সে যোনিকে অপূর্ণ অঙ্গ এবং পুংলিঙ্গকে গৌরবের অঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, এটা সোনা, ধন-এর মতো মূল্যবান। সমাজে পুরুষ শ্রেষ্ঠ এবং এটা তার অধিকার। তাই আচার-অনুষ্ঠানে তার প্রাধান্য, তার খাবারটা আগে পরিবেশন করতে হয় যা নারী মেনে নেয় বিনা বাক্যব্যয়ে। শেষকৃত্যানুষ্ঠানে (জানাজা) নারীর উপস্থিতি অনুমোদন করা হয় না। বিশ্ব এজতেমার আখেরি মুনাজাতে নারী রাষ্ট্রনায়ক কোনো স্থাপনার ছাদে বসে অংশ নেন। যৌনপ্রাণী হিসেবেই নারীর জায়গা পুরুষের কাছে, এটাই সামাজিক ধারণা। নারীর যোনি ও জঠরের মালিক পুরুষ। এসব বিষয় সমাজের মানুষ যাতে সহজে মেনে নেয় এ ব্যাপারেই নিরবচ্ছিন্ন প্রচার চালায় পুরুষতন্ত্র।

২.

বলপ্রয়োগ: পুরুষতন্ত্রের অত্যাচারি আদর্শ সমাজে প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় পদ্ধতি হচ্ছে বলপ্রয়োগ। সমাজের ক্ষমতা পুরুষের হাতে। যদিও কোনো কোনো দেশে নারী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তবু সমাজের ক্ষমতা পুরুষের হাতেই থেকে যায়। পুরুষ সরাসরি শক্তি প্রয়োগ করে তার আদর্শ বাস্তবায়ন করে। কখনো সে ধর্মীয় বিধান কাজে লাগিয়ে বল প্রয়োগ করে। ব্যভিচারের শাস্তিস্বরূপ নারীকে সে পাথর মেরে হত্যা করে, নারীর জীবনের মালিকও পুরুষতন্ত্র।

পারিবারিক রীতি ও রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমেও নারীর ওপর বল প্রয়োগ হয়। নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও পরিবার প্রধানের নির্দেশে নারীর বিয়ে করতে হয়। প্রবল ইচ্ছা থাকলেও পুরুষ প্রধানের নির্দেশে নারীর শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। প্রচুর যোগ্যতা থাকলেও নারী স্বামীর অনিচ্ছার কারণে চাকরি করতে পারে না বা তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। কোনো কোনো দেশে রাষ্ট্র আইন করে দেয় নারী কোথায় যেতে পারবে বা পারবে না, এবং কী পোশাকে যাবে, কী করতে পারবে বা করতে পারবে না। এখানে নারীর ইচ্ছা এবং যোগ্যতার কোনো মূল্য নেই। নারীর মর্যাদাও আইন করে ঠিক করে দেয়া হয়, যেমন- সৌদি আরব ও পাকিস্তানে একজন পুরুষ সমান দুজন নারী।

এভাবে সামাজিকীকরণ ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পুরুষতন্ত্র নারীকে প্রতিনিয়ত বলাৎকার করে চলেছে। এ বলাৎকার হয় দু-ধারায়। মানসিকভাবে ও শারীরিকভাবে। মেয়েটিকে যখন তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে দেয়া হলো তখন তাকে মানসিকভাবে বলাৎকার করা হলো। বিয়ের পর স্বামী পুরুষটি যখন সময়ে-অসময়ে ইচ্ছের বিরুদ্ধে তার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হলো তখন সে শারীরিকভাবে ধর্ষিত হলো। যেমন ধরুন অফিসের বস সুন্দর নারী কর্মচারীকে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে কাছে ডাকছে, রূপের প্রশংসা করছে, বাসায় পৌঁছে দিতে চাইছে, সফরসঙ্গী হতে প্রস্তাব দিচ্ছে আর নারীটিকে তা বিষের মতো গিলতে হচ্ছে পরিবারের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে। এটা পুরুষতন্ত্রের মানসিক বলাৎকার। তারপর আরেকদিন দেখা গেলো বস বীর পুরুষটি তার স্টাফদের সহযোগিতায় রুমের দরজা বন্ধ করে নারীটির সর্বনাশ করেই ফেললো।

মসজিদের ইমাম তার মক্তবের ছাত্রীটিকে প্রতিদিন বলছে ওস্তাদের কথা না মানলে বেহেস্ত হারাম হয়ে যায়। তারপর একটু একটু করে কু-ইঙ্গিত করছে- এটা মানসিক বলাৎকার তারপর শারীরিকভাবে ধর্ষণ। দেখা গেলো মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট তার ছাত্রীটিকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেবে ভয় দেখিয়ে গরিব মেধাবী ছাত্রীটির শ্লিলতাহানি ঘটালো। অথবা কোনো সেনাশাসক দেশের বিখ্যাত সংগীত শিল্পীকে সাক্ষাৎকারে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করলো। সারকারি দলের ছাত্রনেতা প্রকাশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের সেন্সুরি-উৎসব করলো। একদল দস্যু প্রকৃতির যুবক কোনো নারীকে রাস্তায় একলা পেয়ে তার সর্বনাশ করলো। বাসে-ট্রেনে-স্টিমারে-রেলে নারী ধর্ষিত হলো। বাসে ভিড়ে নারীর পাছায় বা বুকে খুঁচা দেয়া হলো। মেয়েটিকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে ধর্ষণ করা হলো। পুলিশ হেফাজতে নারী ধর্ষিত হলো। রাজনৈতিক নেতা তার নারী কর্মীকে ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ করলো। মাতবর-খালু-চাচা-সৎবাবার বলাৎকারের উদাহরণ বিরল নয়।

এসবের পেছনে পুরুষতান্ত্রিক হিংস্রতা, আধিপত্য, ক্ষমতা দায়ি। সমাজ যতো উন্নতই হোক পুরুষতন্ত্রকে ধ্বংস করে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা ছাড়া নারীর পক্ষে এখান থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব না। সেজন্য নারী-পুরুষের সম্মিলিত লড়াই প্রয়োজন, কারণ উভয়ই মানুষ। তাই নারীমুক্তির জন্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে মানুষের সমাজ, শ্রেণিহীন-শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.