পুনর্জাগরণ ঘটাতে হবে মুক্তিযুদ্ধের

অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন

৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে আমাদের শ্রেষ্ঠ ও গৌরবোজ্জ্বল অর্জন। অসামান্য আত্মত্যাগ ও বীরত্বের গৌরবগাঁথা মুক্তিযুদ্ধ কেবল নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ছিল না, মুক্তিযুদ্ধ ছিল মুক্তিকামী জনতার দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি।

সিপাহি বিদ্রোহ, আদিবাসী বিদ্রোহ, ধর্মীয় ঝান্ডার সশস্ত্র সংগ্রাম, অগ্নিযুগের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন ব্রিটিশ রাজত্বের ভিতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ভাষা আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন, টঙ্ক-নানকার প্রভৃতি প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, নাচোল বিদ্রোহ, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানসহ নানা আন্দোলন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে পর্যুদস্ত করে ফেলেছিল। দ্বিজাতিতত্ত্বের অসারতা প্রমাণ করে জনগণ ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল।

মুক্তিযুদ্ধ জনগণের সামনে বিশাল সম্ভাবনা উন্মোচিত করেছিল। জনগণ চেয়েছিল ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বৈষম্য, নিপীড়নমুক্ত দেশ। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান-এ পাঁচটি মৌলিক চাহিদা রাষ্ট্র পূরণ করবে-এটাই ছিল জনগণের প্রত্যাশা। জনগণ চেয়েছিল সব ধরনের শোষণ-বঞ্চনা থেকে সামগ্রিক মুক্তি।

সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্রের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছিল। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাই বায়বীয় কোনো বিষয় নয়। এটা হচ্ছে রাজনৈতিক, মতাদর্শিক, অর্থনৈতিক নীতি-বৈশিষ্ট্যের সম্মিলিত সুস্পষ্ট রূপ, যেখানে প্রতিফলিত হয় জনগণের দীর্ঘদিনের লড়াই-সংগ্রাম আর আশা-আকাঙ্ক্ষার।

৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় নীতি পরিবর্তিত হয়, গণতন্ত্র পায় নির্বাসনদণ্ড। জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে সামরিক শাসন। উল্টে যায় রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য, দর্শন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর আঘাত নেমে আসে। আক্রান্ত হয় ৭২-এর সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধের চার মূূলনীতি। সংবিধানকে পাল্টে দেওয়া হয়। স্বাধীনতাবিরোধীরা সমাজ ও রাষ্ট্রে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে ফেলে। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি পাকিস্তান রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে থাকে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে সাম্প্রদায়িক করার প্রথম কাজটি করেন মেজর জিয়া। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের নামে পাকিস্তানি ভাবাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া হয়। জিয়ার পথ ধরেই এরশাদ সামরিক ফরমান জারি করে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম প্রবর্তন করেন। এরশাদের করা রাষ্ট্রধর্মের বিধানকে ‘বৈধতা’ দিয়ে পাকাপোক্ত করেন শেখ হাসিনা। ৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগকে অগ্রাহ্য করে, আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্ম পুনর্বহাল করে।

রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র এখন বদলে গেছে। রাষ্ট্রের ভিত্তি হয়ে গেছে সাম্প্রদায়িকতা, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একেবারেই উল্টো। ধর্ম যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও চর্চার ব্যাপার, সেখানে রাষ্ট্রের ধর্ম থাকে কী করে? রাষ্ট্রধর্মের কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাবে রাষ্ট্র একটি বিশেষ ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে। ফলে অন্য ধর্মের মানুষ অর্থাৎ সংখ্যালঘুরা নানাভাবে আক্রান্ত-নির্যাতিত-বিপন্ন হন। রাষ্ট্রধর্মের কারণে সমাজে বিভেদ ও বৈষম্য সৃষ্টি হয়, ন্যায়বিচার রুদ্ধ হয়।

শুধু পৃথক রাষ্ট্রের জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ ছিল ‘মুক্তি’র জন্য যুদ্ধ। পাকিস্তান নামক কৃত্রিম রাষ্ট্রে মানুষের মুক্তি সম্ভব ছিল না। পাকিস্তান রাষ্ট্রে সব জাতির অংশীদারত্ব, মর্যাদা ছিল না। পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য যে আলাদা হবে, সেটাই স্বাভাবিক। ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল। আর সেই বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ পাকিস্তানি ভাবাদর্শকে নাকচ করে, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কায়েম হয়েছিল। সংগত কারণেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা এসেছিল। ধর্মের ভিত্তিতে সৃষ্টি হওয়া পাকিস্তান রাষ্ট্রকে নাকচ করে দিয়ে অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি হলো, সেই রাষ্ট্রে কেন রাষ্ট্রধর্ম থাকবে? বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানের ভাবাদর্শই গ্রহণ করে, তবে মুক্তিযুদ্ধের মানে কী দাঁড়ায়?

সাম্প্রদায়িকতা মানুষের বোধ-বিবেক-মনুষ্যত্বকে ধ্বংস করে দেয়। সাম্প্রদায়িকতার কারণে শ্রেণিচেতনা হারিয়ে যায়। বিপ্লবী আন্দোলনে সাম্প্রদায়িকতা এক বড় বাধা। এ ভূখণ্ডের মানুষের ওপর কখনো কখনো সাম্প্রদায়িকতা চেপে বসতে চেয়েছে। এ ভূখণ্ডের ঐতিহ্য হচ্ছে সম্প্রীতির। বিভেদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে পরাজিত করেই মানুষ সম্প্রীতির বাঁশি বাজিয়েছে।

সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে সঙ্গে জাতিগত ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-নির্যাতন-নিপীড়ন বেড়েই চলেছে। ৭২-এর সংবিধানে সব জাতিসত্তার স্বীকৃতি মেলেনি। রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনায় এখন জাতিগত নিপীড়ন চলছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালি জাতিগত নিপীড়নের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রে এখন সেই বাঙালি যদি অন্য জাতির ওপর জুলুম করে, তবে মুক্তিযুদ্ধ কি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে না? ভাষার মর্যাদার জন্য যে বাঙালি রক্তক্ষয়ী লড়াই করেছিল, সেই বাঙালির জন্যই যদি অন্য ভাষার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, তবে ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?

৪৭-এর স্বাধীনতার সঙ্গে ৭১-এর স্বাধীনতার মৌলিক গুণগত পার্থক্য রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে, একইসঙ্গে ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেও। কিন্তু স্বাধীনতার পর, অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ হয়ে পড়ে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক! মুক্তিযুদ্ধ কেবল অসম্পূর্ণ থেকে যায় তা-ই নয়, বাংলাদেশ চলতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের উল্টো স্রোতে। যে মার্কিনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধ জয়ী হয়েছিল, ধীরে ধীরে সেই মার্কিনেরই অনুগত হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর সরকারের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন এবং দৃঢ়ভাবেই মার্কিন সাহায্য প্রত্যাখ্যান করার কথা বলেছিলেন। ‘স্পর্ধা’র মূল্য দিতে হয়েছিল স্বাধীনতার অন্যতম কারিগর তাজউদ্দীনকে। মন্ত্রিসভা থেকে তাজউদ্দীনের অপসারণ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ছিল না। এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে বাংলাদেশের নির্লজ্জ আত্মসমর্পণের একটা পর্ব, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

আমাদের জাতীয় চেতনার বিকাশ রুদ্ধ করা হয়েছে। সমাজতন্ত্রের বদলে দেশকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে লুটেরা পুঁজিবাদের পথে। পাকিস্তান রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল। অধিকাংশ মানুষকে শোষণ করে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ সম্পদশালী হয়েছে। বাংলাদেশেও সেই ধারা অব্যাহত আছে। জাতীয় সংসদ এখন লুটেরাদের ক্লাবে পরিণত হয়েছে। দারিদ্র্য, বৈষম্য, দুর্নীতি, লুটপাট ব্যাপক হারে বেড়েই চলেছে। সংবিধানে স্পষ্ট করে লেখা হয়েছিল, জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রের মালিক জনগণের স্বার্থ কীভাবে রক্ষিত হচ্ছে? স্বাধীন দেশে লাগামহীন লুটপাট, সন্ত্রাস, বিনা বিচারে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড, সাম্রাজ্যবাদমুখীনতা, সরকারের ব্যর্থতা, স্বৈরশাসন, সেনাবাহিনীর অন্তর্দ্বন্দ্ব ও তার ফলে ক্যু, পাল্টা ক্যু ইত্যাদি মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষাকে ম্লান করে দেয়।

একটা দেশের নিজের ভিত্তির ওপর দাঁড়ানোর জন্য ৫০ বছর কম সময় নয়। কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের অসম্পূর্ণতা দূর হবে এবং রাষ্ট্রের হারানো বৈশিষ্ট্যগুলো ফিরে আসবে, তা নির্ধারণ করা জরুরি। আমরা নিশ্চয়ই ৭২-এর সংবিধানে আটকে থাকব না। মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে চার নীতির কোনো নীতিকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় দেশকে অগ্রসর করা সম্ভব নয়।

মুক্তিযুদ্ধের শক্তি ব্যাপক, অক্ষয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বায়বীয় কোনো বিষয় নয়। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে না, বলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কথা-যার চূড়ান্ত গতিমুখ সাম্প্রদায়িকতা। আওয়ামী লীগ মৌখিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে, কিন্তু সেই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ আসলে কী সেটা তারা স্পষ্ট করতে পারে না। কিন্তু জনগণের কাছে এটা স্পষ্ট যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে আওয়ামী লীগ আসলে মুক্তিযুদ্ধের ভাবাবেগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তো বায়বীয় কোনো বিষয় নয়। পাকিস্তানি ভাবাদর্শের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ না করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। যুদ্ধাপরাধের ভাবাদর্শকে আঘাত না করে, কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর বিচার করলেই লক্ষ্য পূরণ হবে না। যুদ্ধাপরাধের পেছনে একটা রাজনীতি আছে। জামাত-শিবিরসহ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রধর্ম অবশ্যই বাতিল করতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র-এই চার মূল ভিত্তির বিপরীতে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।

আওয়ামী লীগের ওপর ভর করে যাঁরা ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ’ গড়তে চান, তাঁরা নিঃসন্দেহে ‘মূর্খের স্বর্গে’ বাস করছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিএনপি তো বটেই, আওয়ামী লীগও বাধা। ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে’র বিপরীতেই আওয়ামী লীগের অবস্থান। রাজনৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এখন চরমভাবে আক্রান্ত। সামাজিক শক্তি বলে আর কিছুই নেই। আওয়ামী লীগ সরকার গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে, অনেক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছে। জনগণের ভোটাধিকারসহ গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে আওয়ামী লীগ তার বশংবদ করে তুলেছে। নিবর্তনমূলক নানা আইন জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। গুমসহ বিচার বহির্ভূত হত্যা চলছে। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ দেশে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েম করেছে।

গত ১২ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িকতার নিবিড় চাষ হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা এখন ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছে এবং তার শেকড় অনেক গভীরে। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম পুনর্বহাল করে, অনেক ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হচ্ছে।

আওয়ামী সরকারের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। হেফাজতসহ সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সঙ্গে আওয়ামী লীগের বন্ধুত্ব দেশকে চরম বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। হেফাজতের ১৩ দফা দাবি মেনে পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তনসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। খেলাফত মজলিস ও আওয়ামী লীগের মধ্যে স্বাক্ষরিত ৫ দফা চুক্তির সঙ্গে হেফাজতের ১৩ দফা দাবির মৌলিক কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। সাম্প্রদায়িক শক্তির সাম্প্রদায়িক আস্ফালন সাধারণ মানুষকে চরম আতঙ্কিত করে তুলেছে।

জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিপন্নতাকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগ তার রাজনীতিকে পুষ্ট করে থাকে। ‘ভোটব্যাংক’ সংখ্যালঘুদের রক্ষায় আওয়ামী লীগ কেবল উদাসীনই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক হামলার মদতদাতা ও ব্যবস্থাপক। আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক স্বার্থে সংখ্যালঘুদের বারে বারে ‘বলির পাঁঠা’ বানায়। সাম্প্রদায়িক হামলার মধ্যে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক লাভের হিসাব কষে।

মুক্তিযুদ্ধ বিস্মৃত অতীত নয়। মুক্তিযুদ্ধ চলমান এবং ভবিষ্যতের দিশা। মুক্তিযুদ্ধ যে স্বপ্ন, যে আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করেছিল এবং যে চেতনার জন্ম দিয়েছিল, তাকে বাস্তবায়িত করতে হলে নীতিহীন রাজনীতির বৃত্ত ভাঙতে হবে। নীতিহীন রাজনীতির বিপরীতে আদর্শিক রাজনীতির উত্থান ঘটিয়ে কর্তৃত্ববাদী সরকার হটাতে হবে। পুনর্জাগরণ ঘটাতে হবে মুক্তিযুদ্ধের।

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.