পাটকলে অব্যাহত সংকটের কারণ অনুসন্ধান

এস এম চন্দন :

সোনালী আঁশের দেশ বাংলাদেশ। সেই সোনালী আঁশ পাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রাষ্টায়ত্ত পাটকলগুলো বছরের পর বছর চরম লোকসান আর অস্থিরতার মধ্যে কেন দিন পার করছে- তা নিঃসন্দেহে মোটা দাগের প্রশ্ন। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্র্রীয় মালিকানাধীন পাটকল ছিলো ৭৭টি, সময়ের বিবর্তনে আজ সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৬টিতে। সেই পাটকলগুলিও চলছে ধুঁকে ধুঁকে। কেন এই অচলাবস্থা, আর কী-ই বা তার সমাধান- সেটা জানা দরকার।

বাংলাদেশের সাড়ে ৫৫ হাজার বর্গমাইল এলাকাজুড়ে মোট পাটকলের সংখ্যা ২৯৮টি। তার মধ্যে বেসরকারি খাতে রয়েছে ২৭২টি, বাকি ২৬টি রাষ্ট্র্রীয় বা সরকারি। এই সরকারি পাটকলগুলির যাত্রা শুরু হয়েছিলো পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকে। খুলনার খালিশপুরে অবস্থিত প্লাটিনাম জুবিলি জুটমিলে উৎপাদন শুরু হয় ১৯৫৬ সালে। বাকি মিলগুলি চালু হয়েছে আরও আগে। খুব স্বাভাবিকভাবেই মিলগুলির যন্ত্রাংশ এখন পুরনো হয়ে গেছে। এগুলোর আধুনিকায়ন (BMRI) জরুরি। তা না হলে উৎপাদন খরচ আর বিক্রয়মূল্য সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা কঠিন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়; ভারতের পাটকলে এক টন চট তৈরিতে প্রয়োজন হয় ৪০ জন শ্রমিক, সেখানে বাংলাদেশে সমপরিমাণ চট তৈরিতে লাগে ৮২ জন। এর বিপরীতে পর্যাপ্ত সংখ্যক শ্রমিক নিয়োগের পরিবর্তে বছর বছর ছাঁটাই করা হয়েছে। প্লাটিনাম জুবিলি জুটমিলে আশির দশকে সিবিএ নির্বাচনে ভোটার ছিলো ৭ হাজার, যা এখন মাত্র ২৮০০।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো সময়মত পাট কেনার টাকা না পাওয়া। যখন চাষি পাট কেটে জাগ দিচ্ছেন, দাম কম- তখন পাট কেনার টাকা বরাদ্দ হয় না। এই একই পাট চাষির হাত থেকে ফড়িয়াদের হাতে চলে গেলে দামটা বেড়ে যায়, তখন শুরু হয় পাট কেনা। আবার পাট কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ পেতে পাঁচ বছর লেগেছে, এমন নজিরও আছে। বাকীতে কেনা পাটের দাম শোধ করা হচ্ছে পাঁচ বছর পর। এর ফলে যে সমস্যাটা হয়েছে সেটা হলো; টাকা পেতে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক ছোট পাট ব্যবসায়ী মিল গেটে পাট বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। এর ফলে মিলকে কেন্দ্র করে বড় ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারা ইচ্ছামত পাট বিক্রি করে থাকেন বলেও অভিযোগ আছে। তাছাড়া যেহেতু বাকীতে পাট বিক্রি করছেন, ভবিষ্যতে কত দাম উঠবে তা অনিশ্চিত, তাই বরাদ্দকৃত দামের সাথে যোগ করে অতিরিক্তি টাকা দিতে হয় তাদেরকে। এটা পাটকলের জন্য ক্ষতিকর। এসব তথ্য দিয়েছেন বিভিন্ন পাটকলের হিসাব বিভাগে কর্মরত ব্যক্তিগণ।

পাট কেনার ক্ষেত্রে সরকারের একটি নীতিমালা আছে। পাটের তিনটি গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে। সবচেয়ে ভালো মানের পাট সি বটম, মধ্যম মানের ক্রস বটম, এবং নিম্ন মানেরটি এসএমআর। পাটকলের কয়েকজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করলেন, সি বটম বা ক্রস বটমের টাকা খরচ করে এসএমআর গ্রেডের পাট কেনা হয়। পাটকলের উৎপাদনে কাঁচামাল (পাট) থেকে পরিত্যক্ত (Wastage) হওয়ার গ্রহণযোগ্য পরিমাণ (Tolerable level) হলো; সি বটম ৫ শতাংশ, আর বাকি দুটি ৭ থেকে ৮ শতাংশ। কিন্তু গ্রেডের কম বা বেশি কেনার সাথে একদিকে টাকা অপচয় বা লুট, আরেকদিকে উৎপাদন কম হওয়ার বিষয়টি জড়িত।

অসাধু ব্যবসায়ী এবং অসৎ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ভেজা পাট কেনার অভিযোগটিও করেছেন কেউ কেউ। পাটকলে চাকরি করেছেন, এখন অবসরে আছেন, এবং দীর্ঘদিন পাটকল শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত থেকেছেন দেলোয়ার হোসেন- তিনি বললেন- বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর, এই তিন মাস পাট মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যখন পাটের স্বাভাবিক আর্দ্রতা (Normal moisturi“er) ২২ শতাংশকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু এর পরের বাকি সময়ে এই আর্দ্রতার স্বাভাবিক গ্রহণযোগ্য মাত্রা নেমে আসে ১৮ শতাংশে। কিন্তু কখনো কখনো পাটে পানি দিয়ে সেই পাট বিক্রি করা হয়। পানির কারণে পাটের ওজন বেড়ে যায়। ব্যবসায়ী বেশি দাম পায়, অথচ বিক্রি করা পাটের ওজন দামের তুলনায় কম থাকে। ব্যবসায়ী আর কর্মকর্তাদের অসৎ অংশের যোগসাজশে এই অপকর্ম করা হয়। এর ফলে একদিকে মিলগুলো আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়, আরেকদিকে ভেজা পাটের ব্যবহারে যন্ত্রাংশের সমস্যা তৈরি হয়।

বাংলাদেশ পাটকল সংস্থা বা বিজেএমসি (Bangladesh Jute Mills Corporation- BJMC)-র একটি নীতিমালা রয়েছে। সেই নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি মিলের পাট অর্ধেক কিনতে হবে পাটচাষিদের কাছ থেকে, আর বাকি অর্ধেক পাট মিল গেটে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাট ক্রয়কেন্দ্রও আছে। কিন্তু খোদ উৎপাদক পাটচাষিরা এসব কেন্দ্রে পাট বিক্রি করতে পারেন না বলে অভিযোগ করেছিলেন কুড়িগ্রামের কয়েকজন চাষি। তাছাড়া পাট বিক্রির টাকা পেতে দীর্ঘসূত্রিতায় কৃষকও সরকারি মিলে পাট বিক্রির আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। দিনাজপুরের কয়েকজন আখচাষি অভিযোগ করেছিলেন, সরকারি চিনিকলে আখ সরবরাহ করার পর পুঁজি পেতে, অর্থাৎ টাকা পেতে অনেক সময় লেগে যায়। এ বছরের টাকা কখনো কখনো পরের বছর পাওয়া যায়। পাটকলের অবস্থাও সেই পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে।

এসব সমস্যার অন্তরালে ‘দুর্নীতি’ আর ‘ভুল নীতি’র ভূমিকাটাই সবচেয়ে বেশি। প্রথমেই বলা হয়েছিলো যে, ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে চটের উৎপাদন খরচ বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ যখন তার পাটজাত পণ্য বিক্রির জন্য টেন্ডারে অংশ নিতে যায়, তখন উৎপাদন খরচের সাথে সামঞ্জস্য রেখে দাম চাওয়ায় ভারত বা অন্য দেশের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনা। তারপরও বাংলাদেশ পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে এখনো ভালো আয় করছে। নানাবিধ চক্রান্ত আর চাপের মুখেও এখনো বাংলাদেশে সারা বিশ্বের মোট পাটের ২৬ শতাংশের বেশি উৎপাদন হয়। দৈনিক কালের কণ্ঠে ১২ অক্টোবর ২০১৯ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাবে জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে সামগ্রিকভাবে রপ্তানি খাতে নেতিবাচক ধারা চললেও পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। এই আয় এ সময়ের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও এক কোটি ২৪ লাখ ডলার বেশি। এই তিন মাসে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২২ কোটি ডলার। তাহলে পাটখাতের সমস্যাসমূহের সমাধান করতে পারলে পাটের হারানো সুদিন ফিরে পাওয়া কোনো ব্যাপারই হয়তো হবে না।

দেলোয়ার হোসেন বলছিলেন, পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান প্রথম আদমজীকে ডেকে এনে পাটকল স্থাপনের উদ্যোগ নেন। সরকারি প্রণোদনায় সেই পাটকল চালু হলেও প্রথম থেকেই নানা কারণে সেটি লাভের মুখ দেখতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে বোনাস ভাউচার (ভর্তুকি) দিয়ে মিলটি চালানো হয়। এরপর ধীরে ধীরে আরও অনেকগুলি পাটকল গড়ে ওঠে। বিভিন্ন সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতার মুখেও মিলগুলি লাভও করতে থাকে। কিন্তু ১৯৯১ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপি সরকার পাটকলের এই ভর্তুকি কমিয়ে দেয়। এর পেছনে বিশ্ব ব্যাংকের নির্দেশ ছিলো বলে জানালেন দেলোয়ার হোসেন। ভর্তুকির হিসেবটা ছিলো এরকম; চিকন বা হেসিয়ান চটের জন্য ৩০ ও মোটা বা স্যাকিং চটের জন্য ২০ শতাংশ। ’৯০ এর শুরুতেই ভর্তুকি তুলে নেওয়ায় রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলো একটা বড় ধরনের হোঁচট খায়। এরপর একে একে আদমজী, পিপলস, দৌলতপুর, কওমী প্রভৃতি মিল বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশের পাটখাত আরও সংকুচিত হয়ে যায়। অথচ পাট এমন একটি পণ্য, যা কৃষি এবং শিল্প- উভয় খাতেই জড়িত। এটা অনেকটা আখের মত। সেটিও এই দুই খাতের সাথে জড়িত। একটি পাটকল বন্ধ হলে পাটচাষে জড়িত কৃষকও ক্ষতির সম্মুখীন হয়। জাতীয় অর্থনীতিতে দ্বিমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

দৈনিক বণিক বার্তায় ২২ ডিসেম্বর অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের লেখা ‘পরিবেশবান্ধব শিল্প ও শ্রমিকদের মরণদশা’ প্রবন্ধে উল্লেখ আছে, ’৯০ দশকের শুরুতে বিশ্ব ব্যাংক বাংলাদেশের পাটখাতে দুটি সমীক্ষা চালিয়েছিলো। একটি হলো The Jute Manufacturing Study,আরেকটি হলো Bangladesh Restructuring Options for the Jute Manufacturing Industry. এইসব সমীক্ষার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিএনপি সরকারের সাথে বিশ্ব ব্যাংকের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি Jute Sector Adjustment Credit এর আওতায় ছিলো। এই চুক্তিতে উল্লিখিত ঋণ প্রতিশ্রুতি ছিলো ২৪৭ ইউএস ডলার। তবে মনে রাখা দরকার যে, এই ঋণ অবশ্যই রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের পাটকলগুলোর আধুনিকায়ন বা পাটশিল্পের বিকাশের জন্য ছিলো না। এই ডলার দেওয়ার শর্ত ছিলো রাষ্ট্রায়ত্ত পাটখাত সংকুচিত করে আনা, শ্রমিক কমানো, বেসরকারিকরণ বাড়ানো, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি না করা ইত্যাদি।

সারা বাংলাদেশে যে ২৬টি সরকারি পাটকল, তার মধ্যে যশোরের নওয়াপাড়ায় রাজঘাটে অবস্থিত কার্পেটিং জুটমিলে কার্পেটের উপযোগী পাটজাত পণ্য সিবিসি (Carpet Backing Cloth- CBC) তৈরি হয়। এছাড়া চট্টগ্রামের গুল আহমেদ পাটকলেও সিবিসি উৎপাদন করা হয়। বাকী ২৪টি মিলে শুধু চট বা ছালা তৈরি হয়, যা বস্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অথচ বেসরকারি খাতে অনেকগুলো স্পিনিং ও টোয়াইন মিল রয়েছে। এগুলো হলো পাট থেকে তৈরি সুতা। দেশিয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে এসব সুতার যথেষ্ট চাহিদা আছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় খাতে স্পিনিং ও টোয়াইন তৈরির কোনো ব্যবস্থা নেই। চলমান পাটকলগুলোতে এজন্য আলাদা সেকশন স্থাপন করা হলে মিলগুলোর উৎপাদন, বিক্রি ও লাভ বাড়ানো সম্ভব।

আওয়ামী লীগ সরকার মুখে সকাল-বিকেল বিএনপির বিরুদ্ধে কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেললেও পাটখাত ধ্বংসের ব্যাপারে বিএনপির নীতিই অনুসরণ করছে। বিশ্ব ব্যাংকের দেয়া শর্ত মানতে গিয়ে যেভাবে বিএনপি সরকার একের পর এক কয়েকটি রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধ করে দিয়েছিলো, আওয়ামী লীগ অন্য কায়দায় এখন সরকারি মিলগুলো বেসরকারি খাতে দেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ মালিকানায় মিল চালানোর পিপিপি (Public Private Partnership- PPP) বাস্তবায়নে মরিয়া তারা। কিন্তু বাংলাদেশে জাতীয়করণকৃত পাটকল, যেগুলো পরে ব্যক্তি মালিকানা বা বিরাষ্ট্রীকরণ হয়েছে, সেগুলোর অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়। খুলনাতে আফিল, সোনালী, মহসীন, অ্যাজাক্স জুটমিল এবং দাদা ম্যাচ কারখানা বহু বছর ধরে বন্ধ। পাওনা রয়েছে শ্রমিক-কর্মচারিদের কোটি কোটি টাকা। এগুলো একসময় রাষ্ট্রীয় মালিকানায় পরিচালিত হতো। তাই রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল পিপিপি-র আওতায় দেয়া কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয় বলেই মনে করেন রাষ্ট্রীয় পাটকলের শ্রমিকরা।

লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, খুলনা জেলা কমিটি

Leave a Reply

Your email address will not be published.