পরিবারতন্ত্রের নিষ্ঠুর শোষণের শিকার শ্রীলঙ্কা জ্বলছে

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন   

দক্ষিণ এশিয়ায় দেশে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। বিরোধীদলের অনাস্থা প্রস্তাবের মুখে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান রাষ্ট্রপতিকে ব্যবহার করে নির্বাচিত সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন ঘোষণার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। নানা রকম আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সংখ্যালগিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়, দলিত জনগোষ্ঠীসহ ভারতের প্রান্তিক আদিবাসী জনগোষ্ঠী, কৃষক, শ্রমিক মেহনতি মানুষের ভারতের হিন্দুত্ববাদী মোদী সরকারের নিপীড়নমূলক আচরণের ফলে ভারতজুড়ে বিক্ষোভ বিরাজ করছে।

সাধারণ নির্বাচনে ৬৭ শতাংশ ভোট পাওয়া নেপালের কমিউনিস্ট পার্টির ত্রিধা বিভক্তির কারণে নেপালের রাজনীতিতেও অস্থিরতার জন্ম হয়েছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি সবার জানা। দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতি, শাসকগোষ্ঠীর নির্বিচার লুটপাট, মানুষের ভোটাধিকারহীনতার ফলে ফুঁসছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে অগ্রসর দেশ শ্রীলঙ্কাও জ¦লছে। অপরিণামদর্শী নীতি, বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধি, বিচার বিবেচনাহীন মেগা প্রজেক্ট, ক্ষমতাসীন রাজাপাকসে পরিবারের নেতৃত্বে ব্যাপক লুটপাট, আর সেইসাথে প্রতিকূল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিয়ে জনগণকে রাজপথে নামিয়ে এনেছে।

শ্রীলঙ্কার কেন এই ভঙ্গুরতা

জাহাজ চলাচলে ভৌগোলিকভাবে শ্রীলঙ্কা পৃথিবীর অন্যতম সুবিধাজনক একটা রাষ্ট্র। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধন যে সমুদ্রপথ তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তার অবস্থান। সুয়েজখাল থেকে বের হয়ে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া কিংবা অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পথে কলম্বো বন্দর থেকে রসদ সংগ্রহ করে জাহাজসমূহ। এ সুবিধার জন্যই ঐতিহাসিক ‘সিল্ক রোড’ আর বর্তমান ‘মেরিটাইম সিল্ক রোড’ এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে শ্রীলঙ্কা। শ্রীলঙ্কার আয়ের একটা বড় উৎস হচ্ছে তার সমুদ্রবন্দর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও চা এই দেশটির আরো বড়ো দুটি সম্পদ। শ্রীলঙ্কা দ্বীপরাষ্ট্র নিরঙ্কুশভাবে সিংহলিজদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৮১৫ সালে ব্রিটিশরা শ্রীলঙ্কা দখল করে নিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা করে। ব্রিটিশরা শ্রীলঙ্কায় চা চাষ শুরু করলে প্রচুর শ্রমিক ভারতের তামিলনাড়ু থেকে নিয়ে আসে। তামিলরা দেড়-দুইশ বছর ধরে শ্রীলঙ্কায় আছে। আত্মীকৃত শ্রীলঙ্কান তামিলদের কিছু সিংহলিজ কোনোভাবেই নাগরিক মর্যাদা দিতে রাজি নয়। বিশেষ করে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তামিলদের কট্টর বিরোধী। ১৯৪৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শ্রীলঙ্কা স্বাধীনতা লাভ করে। প্রথম প্রধানমন্ত্রী সিংহলি ডি এস সেনানায়েক ক্যান্ডিয়ান সিংহলিদের সমর্থন প্রত্যাশায় ১৯৪৯ সালে তামিল চা বাগান কর্মীদের ভোটাধিকার বঞ্চিত করেন, যা থেকে শ্রীলঙ্কায় তামিল সংকটের জন্ম নেয়। ১৯৫৮ সালে ভাষা প্রশ্নে কলম্বোতে প্রথম তামিল-সিংহলি দাঙ্গা সংঘটিত হয়। দ্বন্দ্ব সংঘাতের ফলশ্রুতিতে হাজার হাজার তামিল-সিংহলি নিহত হয়। ২০০৫ সালে মাহিন্দা রাজাপাকসে রাষ্ট্রপতি হয়ে তামিল টাইগার্স ও তামিল জনগণের ওপর তীব্র সামরিক অভিযান পরিচালনা করে তামিল নেতৃবৃন্দকে হত্যার মধ্য দিয়ে ২০০৬ সালে তামিল বিদ্রোহের অবসান ঘটান।

গৃহযুদ্ধের অবসানের পর শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি অতি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এমনিতেই শ্রীলঙ্কা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি ছিল। যেসব দেশ গার্মেন্ট শিল্পকে ‘সূর্যাস্ত শিল্প’ ঘোষণা করেছিল সে দেশগুলো যখন তাদের গার্মেন্ট শিল্পকে স্থানান্তর করে তখন দক্ষিণ এশিয়ায় গার্মেন্ট শিল্প প্রথম এসছিল শ্রীলঙ্কায়। ১৯৯০ সালের পর থেকে ২০০১ সাল বাদে প্রতিবছর মাথাপিছু আয় বেড়েছে শ্রীলঙ্কার। বর্তমানে শ্রীলঙ্কার জনসংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ এবং মাথাপিছু আয় ৩, ৮৩০ মার্কিন ডলার, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। শ্রীলঙ্কা ১৯৯৭ সালে স্বল্পোন্নত রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসে। দেশটি ২০১৯ সালে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছিল। শ্রীলঙ্কার রপ্তানি পণ্য মূলত তিনটি তৈরি পোশাক, চা ও রাবার। বর্তমানে এই তিন পণ্যের আয় ক্রমহ্রাসমান। রপ্তানি কমে যাওয়ায় চলতি আয়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা। কিন্তু শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে বড় ধস নেমেছে মূলত গত দুই বছরে, অতিমারির সময়ে। সবশেষে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আরও বিপদে পড়ে তারা।

শ্রীলঙ্কার বাৎসরিক রপ্তানি আয় ১০ বিলিয়ন ডলার। তাদের জ্বালানিসহ অন্যান্য সামগ্রীর বাৎসরিক আমদানি ব্যয় ২০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ তাদের বাৎসরিক বাণিজ্য ঘাটতি ১০ বিলিয়ন ডলার। এই ১০ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি মূলত পূরণ হয় পর্যটন আয় ও প্রবাসী শ্রমিক ও অনান্য শ্রীলঙ্কানের পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে। পর্যটন থেকে আসে ৩ বিলিয়ন ডলার এবং রেমিট্যান্স থেকে আসে ৬ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার। অতিমারিকালে অনেকে প্রবাসী শ্রীলঙ্কানরা কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে, ফলে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ মারাত্মক হ্রাস পেয়েছে। শ্রীলঙ্কায় পর্যটনের জন্য বছরে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন মানুষ যেতো সেখানে গত বছর পর্যটকের সংখ্যা ছিল মাত্র ৮০ হাজার। পর্যটন আয়ও ব্যাপকহারে হ্রাস পেয়েছে। এর প্রথম কারণ করোনা, দ্বিতীয় কারণ ২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল কলম্বোর তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলে একযোগে বোমা হামলা হয়। বিস্ফোরণে ১৮৯ জন মৃত্যুবরণ করে। এতে শ্রীলঙ্কার মূল চালিকাশক্তি পর্যটন শিল্প বিশাল ধাক্কা খায়।

শ্রীলঙ্কা প্রতিবছর ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রাসায়নিক সার কেনে। ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে শ্রীলঙ্কা সরকার ঘোষণা দেয় তারা আর সার ও কীটনাশক আমদানী করবে না। সম্পূর্ণ অর্গানিক বা জৈব উপায়ে কৃষিকাজ হবে শ্রীলঙ্কায়। এই হটকারী সিদ্ধান্তের ফলে শ্রীলঙ্কার কৃষি অর্থনীতিবিদদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ি চালের উৎপাদন ২৫ শতাংশ কমে গেছে। কৃষকের আয় কমেছে ৩৩ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার প্রধান খাদ্যশস্য চালের দাম বেড়ে গেছে ৩০ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার জিডিপিতে কৃষির অবদান ৭ শতাংশ হলেও এতে ২৭ শতাংশ জনশক্তি নিযুক্ত আছে। ফলে এতে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখন কলম্বোর বাজারে চালের কেজি ২২০ টাকা। এক কেজি গুঁড়ো দুধের দাম ১, ৯০০ টাকা। অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বাজারে নাই। কাগজের অভাবে স্কুল পরীক্ষা নেয়া যাচ্ছে না। খাদ্য সংকট ক্রমান্বয়ে তীব্রতর হচ্ছে।

রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য এক ধাক্কায় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশ ধার্য করেন। একইসঙ্গে ২ শতাংশ হারের নেশন বিল্ডিং ট্যাক্স ও যত আয় তত কর ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেন। এর প্রভাব পড়ে রাজস্ব আয়ে। এক বছরেই দেশটির ভ্যাট আদায় কমে যায় ৫০ শতাংশ।

২০০৫ সালে মাহিন্দা রাজাপাকসে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে প্রথম আক্রমণ চালান তামিলদের ওপর এবং সর্বগ্রাসী আক্রমণের মাধ্যমে তামিলদের পরাজিত করেন। এ গৃহযুদ্ধকালে ভারতের সাথে শ্রীলঙ্কার সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে। মাহিন্দার রাজাপাকসে চীনের দিকে হাত বাড়ান। চীনের ‘ড্রিম প্রজেক্ট’ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) বা ‘মেরিটাইম সিল্ক রোড’ এর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হচ্ছে শ্রীলঙ্কা বা কলম্বো সমুদ্রবন্দর। চীন এ প্রস্তাব লুফে নেয় বিআরআই এর আওতায় হামবানটোটায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে দেয়। চীনের ঋণে এর পর শ্রীলঙ্কা কতগুলো চটকদার, অথনৈতিকভাবে অলাভজনক, অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্প নেয় এবং বাস্তবায়ন করে। এর মধ্যে রয়েছে হামবানটোটায় মাত্তালা রাজাপাকসে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কলম্বোয় সমুদ্রবন্দরের কাছে চায়নিজ সিটি, লোটাস টাওয়ার, বিশালকায় স্টেডিয়ামসহ ‘আয়হীন’ নানা প্রকল্প। সহজ শর্তে চীন থেকে পাওয়া ঋণ দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে দেখা যায় এসব বন্দরে জাহাজ কিংবা উড়োজাহাজ তেমন একটা আসে না। এক্সপ্রেস রোডে যে পরিমাণ টোল ওঠে তা দিয়ে ঋণ শোধ তো দূর, রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মেটে না। আয় হচ্ছে না বলে ঋণ পরিশোধ করা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে চীন হামবানটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর ৯৯ বছরের জন্য লিজ নিয়ে নেয়। কিন্তু অন্য প্রকল্পগুলো আয়হীন পরে থাকে। ইতোমধ্যে ঋণের ‘মোরাটারিয়াম বা গ্রেস পিরিয়ড’ শেষ হয়ে গেছে। গৃহিত ঋণের সুদসহ আসল পরিশোধের সময় হয়ে গেছে। কিন্তু শ্রীলঙ্কা রাজকোষ বা রিজার্ভ যাই বলি তা শূণ্য। কিস্তি পরিশোধ করার সামর্থ্য তার নাই। শ্রীলঙ্কা এখন আর্থিকভাবে কপর্দকশূন্য, দেউলিয়া। শ্রীলঙ্কার ঋণের হার এখন জিডিপির ১১৯ শতাংশ। অর্থাৎ দেশটি সব মিলিয়ে এক বছরে যে পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে, তার তুলনায় ঋণ বেশি। শ্রীলঙ্কার ঋণের ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ হচ্ছে আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ডে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে ঋণ ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ, জাপানের কাছে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং চীনের কাছে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)’র তথ্য বলছে, ঋণের কিস্তি হিসেবে চলতি বছর শ্রীলঙ্কাকে সব মিলিয়ে ৫০০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে। অথচ এখন শ্রীলঙ্কার হাতেই আছে মাত্র ২৩১ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার মজুত। সুতরাং ঋণ পরিশোধ তো দূরের কথা, দৈনন্দিন কাজ চালাতেই নতুন করে আরও ঋণ নিতে শ্রীলঙ্কা বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা দরজায় কড়া নাড়ছে।

২০১৯ সালের উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ, মাথাপিছু ৩, ৮৩০ মার্কিন ডলার আয়ের শ্রীলঙ্কা ২০২২ সালের শুরুতে রিজার্ভশূন্য। অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, মূল্যস্ফীতি ৫৫ শতাংশ। এটা কি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা? এই আর্থিক সংকট হচ্ছে ক্ষমতাসীন রাজাপাকসে পরিবার কর্তৃক দেশের সমস্ত ক্ষমতা ও ব্যবসা-বাণিজ্য কুক্ষিগত করে পরিবারতন্ত্রের মাধ্যমে পরিচালিত সীমাহীন দুর্নীতির ফসল। গত ৩ এপ্রিল মন্ত্রিসভা পদত্যাগের আগে রাজাপাকসে পরিবারের আটজন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সেই ২০০৫ সাল থেকে। গোতাবায়া রাজাপাকসে রাষ্ট্রপতি কিন্তু এ পরিবারের বর্তমান কর্তা প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে, যিনি আগে দুইবার দেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। অর্থমন্ত্রী বাসিল রাজাপাকসে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চামাল রাজাপাকসে, যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী নামাল রাজাপাকসে, শাশীন্দ্রা রাজাপাকসে কৃষি প্রতিমন্ত্রী, ইওসিথা রাজাপাকসে প্রধানমন্ত্রীর চীফ অব স্টাফ, সামিন্দ্রা রাজাপাকসে মহা পরিচালক শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনস। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী একটি পরিবারের। এক পরিবার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শ্রীলঙ্কা। পত্রিকায় খবর বেরিছে পরিবারের এক সদস্য নিরপোমা রাজাপাকসে দেশ ছেড়েছেন। এই অতি শক্তিশালী রাজাপাকসে পরিবারের উত্থানটা জানা গেলে বর্তমান শ্রীলঙ্কার দুর্দশাটা কিছুটা বোঝা যাবে।

রাজাপাকসে পরিবার

শ্রীলংকার স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি)’র সিংহলি ডন স্টিফেন সেনানায়েক, সিংহল মহাসভা পার্টির সিংহলি সলোমন বন্দরনায়েকে। তাদের সাথে ছিলেন তামিলদের নেতা জি জি পোন্নাম্বালাম। সলোমান বন্দরনায়েক বিপ্লববিহীন সাম্যবাদ বা ‘ফেবিয়ান সোশ্যালিজম’ ধারণা নিয়ে ১৯৫১ সালে নতুন দল শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি গঠন করেন। ১৯৫৬ সালে সাধারণ নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। ভাষার প্রশ্নে ১৯৫৮ সালে কলম্বোয় সিংহলী-তামিল জাতিগত দঙ্গা হয়। সলোমন বন্দরনায়েকের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ এক কট্টর তামিলবিরোধী সিংহলী বৌদ্ধ ভিক্ষু ১৯৫৯ সালে তাঁকে হত্যা করে।

মাহিন্দা রাজাপাকসের পিতা ডি এ রাজাপাকসে স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন সেনানী ছিলেন। তিনি সিংহল মহাসভা পার্টি আমল থেকেই সলোমন বন্দরনায়েকের সাথে ছিলেন। প্রথমে মহাসভা পার্টি ও পরে ফ্রিডম পার্টির টিকেটে ডি এ রাজাপাকসে ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত হাম্বানটোটার এমপি ছিলেন। তাঁর চার পুত্র মাহিন্দা, গোতাবায়া, চামাল, বাসিল।

বড় পুত্র মাহিন্দা ১৯৭০ সালের ২৭ মে প্রথমবারের মত সাংসদ নির্বাচিত হন। প্রথমবার শ্রমমন্ত্রী হন। তারপর যথাক্রমে মৎসমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, সড়ক-বন্দর-জাহাজ চলাচল মন্ত্রী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, নগরোন্নয়ন মন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী হন। তিনি সংসদের দ্বাদশ বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন। ২০০৫ সালের ১৯ নভেম্বর দেশের ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ৯ জানুযারি ২০১৫ পর্যন্ত টানা দশ বছর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। মাহিন্দা রাজাপাকসে তিনবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন, প্রথমবার রাষ্ট্রপতি চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গার অধীনে ২০০৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০ মাস, দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি মাইথ্রিপলা সিরিসেনার অধীনে ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ১ মাস ২০ দিন, তৃতীয়বার রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসের অধীনে ২০১৯ সালের ২১ নভেম্বর থেকে অদ্যাবধি। অর্থাৎ মাহিন্দা রাজাপাকসে ১৯৭০ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে ক্ষমতার যে পথে প্রবেশ করেছিলেন আজ ৭৬ বছর বয়সে সব পথ হেঁটেও এখনো তিনি ক্লান্ত হননি। হাঁটতে হাঁটতে সব ভাই-বোন, পুত্র-ভাতিজা, আত্মীয়স্বজনকে সহযাত্রী করেছেন। সবাই মিলে আখ নিংড়ানোর মত শ্রীলংকাকে নিংড়ে ছোবড়া করে ছেড়েছে। বিমান থেকে শুরু করে হেন কোন ব্যবসা নেই যে ব্যবসায় ‘রাজাপাকসে পরিবার’ নেই। শ্রীলঙ্কার মোট সম্পদের কত শতাংশ রাজাপাকসে পরিবারের দখলে রয়েছে তা এখন শ্রীলঙ্কার জনগণের মত সারা দুনিয়ার মানুষের প্রশ্ন।

জেগে উঠেছে শোষিত শ্রীলঙ্কানরা: জ্বলছে সারা দেশ

রিজার্ভশূন্য, ডলার নেই- তাই আমদানি বন্ধ। ডিজেল নেই বলে বিদ্যুৎ নেই। ঘরে-বাজারে খাদ্য নেই। দেশে জ্বালানির হাহাকার। পরিবহন প্রায় বন্ধ। দেশজুড়ে ১০ থেকে ১৩ ঘণ্টা লোডশেডিং। বিদ্যুতের অভাবে মোবাইল ফোন চার্জ করতে পারেছে না মানুষ। পারস্পরিক যোগাযোগ বন্ধ। ডিজেল, বিদ্যুৎ, খাদ্যের দাবিতে মানুষ রাজপথ দখলে নিয়েছে। দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করেও কোনো কাজ হচ্ছে না। বিক্ষোভকারীরা রাষ্ট্রপতির ভবনে আগুন দিয়েছে। ২৬ জনের মন্ত্রিপরিষদের সব মন্ত্রী পদত্যাগ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর পদত্যাগ করেছে। জনগণ এসব শুনতে চায় না। তারা চায় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ এবং ক্ষমতা থেকে রাজাপাকসে পরিবারের বিদায়।

রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনের মানুষ জড়ো হচ্ছে। আরেকটা ‘আরব স্প্রিং’ বা ‘আরব বসন্ত’ অপেক্ষা করছে পৃথিবীর মানুষের জন্য। পরিবারতন্ত্র, গোষ্ঠীতন্ত্র লুটপাট করে কীভাবে একট উচ্চমধ্যম আয়ের দেশকে ফকির বানায় তা চোখের সামনে দেখে শ্রীলঙ্কার তরুণরা মেনে নিতে পারছে না। তারা লুটপাটতন্ত্র ও লুটেরা শাসনের অবসান চায়। গত ৫ এপ্রিল ৪২ জন এমপি সরকারি জোট ছেড়ে দেওয়ায় গোতাবায়ার সরকার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। সংকট নিরসনে গোতাবায়া সর্বদলীয় সরকার গড়তে চাচ্ছেন। গত সোমবার সরকারে এসে মন্ত্রিত্ব নেওয়ার জন্য সব দলের সদস্যদের প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। তবে গোতাবায়া ও তাঁর ভাই মাহিন্দা রাজাপকসেকে স্বপদে রেখে সর্বদলীয় সরকার গঠনের আমন্ত্রণে সাড়া দেয়নি বিরোধীদলসমূহ। টেলিফোনে জানতে চাইলে শ্রীলঙ্কার মার্কসবাদী রাজনৈতিক দল জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি)’র পলিটব্যুরোর সদস্য কমরেড বিমল রত্নায়েক একই কথা বলেন।

শ্রীলঙ্কার রাজপথ এখন স্লোগান মুখরিত ‘গো রাজাপাকসে, গো’। জনতার উত্তাল আন্দোলনে রাজাপাকসে গোষ্ঠী’র পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.