নেপালের কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস ও চলমান রাজনীতি

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন  

নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট) সংক্ষেপে নেকপা (ইউএমএল)’র গত ২৬-২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত দশম কংগ্রেসে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র প্রতিনিধিত্ব করি আমি ও কমরেড হাসান তারিক চৌধুরী সোহেল।

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে ৯৮ কিলোমিটার দূরে বাগমাতি প্রদেশের চিতওয়ান জেলায় কংগ্রেসের আয়োজন করা হয়েছিল। দশম কংগ্রেসের আগে ১-৩ অক্টোবর, ২০২১ তারিখে নেকপা (ইউএমএল)’র প্রথম স্ট্যাটিউট কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় ললিতপুরে। সেখানে রাজনৈতিক রিপোর্ট, সাংগঠনিক প্রস্তাব, স্ট্যাটিউট সংশোধনী প্রস্তাব আলোচনা হয় ও তা গৃহিত হয়। এতে পার্টি সংগঠন, গণসংগঠন ও প্রবাসী কমিটিসমূহের ছয় হাজার প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করে। দশম কংগ্রেসের মুখ্য এজেন্ডা ছিল পাঁচ বছরের জন্য নেতৃত্ব নির্বাচন।

কংগ্রেসের প্রথম দিন ২৬ নভেম্বর চিতওয়ান জেলার ভরতপুরে ঐতিহাসিক নারায়নী নদীর তীরে কংগ্রেসের উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিবিসির ভাষ্যমতে, দশ লাখ লোক সমবেত হয়েছিল সমাবেশে।

ইউএমএল কমরেডরা জানিয়েছেন, মঞ্চ থেকে পূর্ব দিকে সমাবেশের শেষ প্রান্তের দূরত্ব ছিল আট কিলোমিটার। মূল জমায়েত চিতওয়ানের আশেপাশের জেলা থেকে হলেও নেপালের সাতটি প্রদেশ ও সাতাত্তরটি জেলার সবগুলো থেকেই লোক সমাগম হয়েছিল। সেদিন ভরতপুরে কাস্তে হাতুড়ি খচিত লাল পতকা বা ইউএমএল’র নির্বাচনী প্রতীক সূর্য খচিত সাদা পতাকা হাতে মানুষ ছাড়া আর কিছুই দেখা যায়নি।

নেপালের তিন কোটি মানুষের মধ্যে থেকে আগত দশ লাখ মানুষ সকল জাতি, জনজাতি, আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব করে। যেন ছোট একটা নেপাল সেদিন উঠে এসেছিল নারায়নী নদীর তীরে। মাঠে যেমন ছিল রংধনু সমাবেশ তেমনই মঞ্চে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলো বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দিউবাসহ বর্তমান ক্ষমতাসীন জোটের দলীয় প্রধানগণ ও অন্যান্য দলের প্রধানগণ। শুধুমাত্র নেকপা (ইউএমএল) থেকে বেরিয়ে যাওয়া কমরেড মধাব কুমার নেপালের নেতৃত্বাধীন নেকপা (ইউনিফায়েড সোশ্যালিস্ট) পার্টিকে কংগ্রেসে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি অথবা তারা আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি। তারা ছাড়া নেপালের মূল দলগুলোর নেতৃবৃন্দ মঞ্চ থেকে সমাবেশকে সম্বোধন করেন। নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে দশ লাখ লোকের এ সমাবেশ মাইলফলক হয়ে থাকবে।

দেশটির চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এ জমায়েতের ভিন্ন একটা রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে বলে মনে করেন নেপালের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ভরতপুর হচ্ছে নেকপা (মাওয়িস্ট-সেন্টার)’র এর প্রধান কমরেড পুষ্পকমল দহল প্রচন্ডের নিজ শহর। তাঁর কন্যা রেনু দহল হচ্ছে ভরতপুর মেট্রোপলিটন সিটির মেয়র। ফলে অনেকে এই বিশাল জমায়েতকে নেকপা (ইউএমএল)’র শক্তি প্রদর্শন হিসেবে দেখছে।

দ্বিতীয় দিন ভরতপুর থেকে বিশ কিলোমিটার দূরে রত্নগিরি মেট্রোপলিটন সিটির হোটেল সেভেন স্টারের উন্মুক্ত চত্বরে প্যান্ডেলের ভেতর বসে কংগ্রেস অধিবেশন। ৮ লাখ ৫৬ হাজার সদস্যের ২, ১৫৩ জন প্রতিনিধি কংগ্রেসে অংশগ্রহণ করে।

প্রথম অধিবেশনে বিদেশি অতিথিরা বক্তব্য রাখেন। সিপিবি’র পক্ষে আমি বক্তব্য রাখি। আমার বক্তব্যে কমিউনিস্ট ঐক্যের প্রশ্নটিকে প্রাধান্য দিই। আমি বলি, আমরা পার্টির অভ্যন্তরে দৃঢ় ঐক্য চাই। একটা নির্দিষ্ট দেশের কমিউনিস্ট পার্টিসমূহের মধ্যে ঐক্য চাই। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল ও সারা দুনিয়ার কমিউনিস্টদের মধ্যে দৃঢ় মৈত্রী বন্ধন চাই।

আমি আরো বলি, নেপালের কমিউনিস্টদের ভাঙনে আমরা দুঃখিত। নেপালের কমিউনিস্টদের মধ্যে ঐক্য সারা দুনিয়ার কমিউনিস্ট বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার কমিউনিস্টদের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে।

আমার বক্তব্যে আরেকটি বিষয় আমি উল্লেখ করি তা হচ্ছে- দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের নিজস্ব সংকট ও সমস্যার পাশাপাশি কতগুলো সাধারণ সমস্যা রয়েছে- যেমন দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, সাম্প্রদায়িকতা, পুঁজিবাদী শোষণ, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদী শোষণ। দক্ষিণ এশিয়ার কমিউনিস্টদের দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, সাম্প্রদায়িকতা, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদী “দাদাগিরির” বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে হবে।

আমি ইউএমএল’র ‘সমৃদ্ধ নেপাল-সুখী নেপালী’ স্লোগান ধারণ করে বলি ‘সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া-সুখী দক্ষিণ এশিয়াবাসী’ বাস্তবায়ন করার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে দক্ষিণ এশিয়ার কমিউনিস্টদের লড়তে হবে। সিপিবি ছাড়া সিপিআই, সিপিআইএম, সিপিআই (এম-এল)-লিবারেশন, কম্বোডিয়ান পিপলস পার্টি, শ্রীলংকার জনমুক্তি পেরামুনা-জেভিপি’র নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। ভারতের বিজেপি ও জাতীয় কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ অংশ নিলেও বক্তব্য রাখেননি।

কংগ্রেসে কমরেড খড়গা প্রসাদ শর্মা অলি সভাপতি পদে সরাসরি ভোটে কমরেড ভীম রাওয়ালের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কমরেড অলি প্রদত্ত ২, ০৯৬ ভোটের মধ্যে ১, ৮৪০ ভোট পেয়ে পাঁচ বছরের জন্য পুনরায় সভাপতি নির্বাচিত হন। কমরেড ভীম রাওয়াল পান ২২৩ ভোট। সাধারণ সম্পাদক কমরেড ঈশ্বর পোখরেল সিনিয়র সহ-সভাপতি ও কমরেড শংকর পোখরেল সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

কংগ্রেস ৩০৪ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত করে, যার মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রয়েছেন। এটাই বোধ হয় প্রথম দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দলে ৩৩ শতাংশ নারী কেন্দ্রীয় কমিটিতে নির্বাচিত হলেন। বয়স বিবেচনায় ৩৫ বছরের নীচে ৩৩ শতাংশ সদস্য কেন্দ্রীয় কমিটিতে নির্বাচিত হয়েছেন।

নেকপা (ইউএমএল)’র কংগ্রেস বিশাল সাফল্য অর্জন করলেও এ মুহূর্তে নেপালের কমিউনিস্ট আন্দোলন একটা সন্ধিক্ষণে রয়েছে। ২০১৮ সালের ১৭ মে দুটি ভিন্ন ধারা সিপিএন (ইউএমএল) ও সিপিএন (মাওবাদী-সেন্টার) ঐক্যবদ্ধ হয়ে নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (এনসিপি) গঠন করেছিল। একটি ধারায় ছিল ঝাপা গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে এসে কোঅর্ডিনেশন সেন্টার, সিপিএন (এমএল) হয়ে সিপিএন (ইউএমএল)। অন্য ধারাটি গড়ে উঠেছে কয়েকটি স্তর পেরিয়ে- সেন্ট্রাল নিউক্লিয়াস, চতুর্থ কনভেনশন, মশাল, মশহাল, ইউনিটি সেন্টার, সিপিএন (মাওবাদী), সিপিএন (মাওবাদী-সেন্টার)। ২০১৮ সালের নির্বাচনে কমরেড কে পি শর্মার নেতৃত্বে ইউএমএল মোট ৩২ লাখ এবং কমরেড পুষ্পকমল দহল প্রচন্ডের নেতৃত্বে নেকপা (মাওবাদী-সেন্টার) ১৩ লাখ ভোট পায়।

১৯৪৯ সালে কমরেড পুষ্পলালকে সাধারণ সম্পাদক করে নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হওয়ার পর অসংখ্য ভাঙনের সম্মুখীন হয় পার্টি। আবার অসংখ্যবার নানা ঐক্য প্রত্যক্ষ করেছে নেপালের জনগণ। ২০১৮ সালের ঐক্য নেপালের মানুষের কাছে একটা বিশেষ বার্তা বয়ে এনেছিল। পঞ্চাশ বছর পর মূল দুটি দলের ঐক্য শুধু নেপাল নয় সারা দুনিয়ার কমিউনিস্টদের অনুপ্রাণিত করেছিল। নেপালের পপুলার ভোটের ৬৭ শতাংশ কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর পক্ষে ছিল।

নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে গাইডিং প্রিন্সিপাল হিসেবে গ্রহণের পাশাপাশি ‘পিপলস মাল্টি পার্টি ডেমোক্রেসি-পিএমডি’ তাদের নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু পার্টির প্রধান চার নেতা কমরেড কে পি শর্মা অলি, কমরেড পুষ্পকমল দহল প্রচন্ড, কমরেড মধাব কুমার নেপাল ও কমরেড ঝালনাথ খান্নাল এর মধ্যে পারষ্পরিক সমঝোতার অভাব ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে ২০২১ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রেক্ষিতে নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি অকার্যকর হয়ে যায় এবং নেকপা (ইউএমএল) ও নেকপা (মাওবাদী-সেন্টার) ঐক্যপূর্ব অবস্থায় ফিরে যায়। অর্থাৎ ঐক্যবদ্ধ পার্টি ভেঙে যায়।

পরবর্তীতে ১৮ আগস্ট ২০২১ তারিখে কমরেড মধাব কুমার নেপাল ও কমরেড ঝালনাথ খান্নালের নেতৃত্বে নেকপা (ইউএমএল) ভেঙে নতুন দল নেকপা (ইউনিফায়েড সোশ্যালিস্ট) গঠিত হয়। এসব ভাঙনের ফলশ্রুতিতে কমরেড কে পি শর্মা অলির নেতৃত্বাধীন সরকার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে ব্যর্থ হয় এবং ক্ষমতাচ্যুত হয়। বর্তমানে নেপালী কংগ্রেস সভাপতি শের বাহাদুর দিউবার নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতাসীন। চব্বিশ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভার নয় মন্ত্রী কংগ্রেসের, পাঁচ মন্ত্রী নেকপা (মাওবাদী), পাঁচ মন্ত্রী নেকপা (সোশ্যালিস্ট), পাঁচ মন্ত্রী জনতা সমাজবাদী দলের। নেকপা (মশাল) মন্ত্রিসভার বাইরে থেকে এ জোটকে সমর্থন করছে। অর্থাৎ পাঁচ দলীয় জোট এ মুহূর্তে দেশের ক্ষমতায় রয়েছে। নেকপা (ইউএমএল) সংসদে প্রধান বিরোধী দল এবং কে পি শর্মা অলি বিরোধী দলের প্রধান।

আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে নেপালে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১০ ডিসেম্বর থেকে নেপালী কংগ্রেসের জাতীয় সম্মেলন শুরু হয়েছে। সেখানে নির্ধারিত হবে আগামী নির্বাচন নেপালী কংগ্রেস একা লড়বে না বর্তমান জোটকে সাথে নিয়ে লড়বে।

কমরেড নেপালের সাথে আলোচনার সময় তিনি বলেন, কংগ্রেস জোটে না থাকলে তারা চার দল এবং সম্ভব হলে আরো দুই একটা দলকে যুক্ত করে জোট নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন। সেক্ষেত্রে নির্বাচন হবে ত্রিমুখী। নেকপা (ইউএমএল) তার কংগ্রেসে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে, আগামী নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তারা ক্ষমতায় ফিরে আসবে। কমরেড মধাব নেপাল আশা করছেন কংগ্রেস তাদের সাথে জোটে থাকুক আর না থাকুক তাদের জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় যাবে। নির্বাচনে ত্রিমুখী লড়াই হলে নেপাল অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে সমৃদ্ধ নেপাল গড়ার স্বপ্ন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। সুখী নেপালীদের হাসি অমলিন থাকবে কি না সেটাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।

আগামী এক বছর অনিশ্চয়তার মধ্যেই থাকবে নেপালের রাজনীতি। নেপালের রাজনীতি নিয়ে যারা ভাবেন তাদের একটাই প্রশ্ন- নেপালের রাজনীতি কোন পথে? সামনের কোনো এক সংখ্যায় দেশটির বর্তমান অনিশ্চয়তাপূর্ণ রাজনীতি নিয়ে লেখার আশা রাখি।

লেখক: সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.