নেই ভাষানীতি প্রাথমিক শিক্ষা ও গণমাধ্যমে মাতৃভাষা অবহেলিত

গোলাম কিবরিয়া পিনু :

বাংলা ভাষা আজ অনেক পর্যায়ে অবহেলার শিকার হয়ে যেন কাতরাচ্ছে! এই ভাষার সহযোগী না হয়ে আগের চেয়ে রাষ্ট্র, সরকার, প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বিচারালয় ও ব্যক্তি দূরবর্তী অবস্থানে চলে যাচ্ছে। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে আমাদের ভাষার যে মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, বাঙালির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তা এখন আর মিলছে না। বাস্তবে বাংলা ভাষার জন্য সুখবর কমে যাচ্ছে, কখনো কখনো খানিকটা আশার ঝলকানি দেখা দেওয়ার পরও তা বেশি সময় ধরে আলো ছড়ায়নি!

বাংলাদেশের সংবিধানের মোট চারটি স্থানে ভাষা প্রসঙ্গটি উল্লেখিত হলেও ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। আর ২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলাসমূহের এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং যাহাতে সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারেন।’ সংবিধানে বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার দিক-নির্দেশনা থাকলেও চার দশক পার হওয়ার পরও বাংলা দাপ্তরিকসহ রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে আবশ্যিক ভাষা হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে না! এই সময়ে এসেও দেখা যায় সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, নামফলক দেওয়াল লিখন হচ্ছে ইংরেজিতে, সরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন বিলের ভাষা বাংলা নয়, ইংরেজিতে। শিক্ষার বিভিন্ন স্তর, আদালত ও গণমাধ্যমের বিভিন্ন পর্যায়েও বাংলা ভাষার করুণ পরিস্থিতি। ঘরে ও বাইরে অন্ধকার ঘনীভূত হচ্ছে–বাংলা ভাষার আলোটুকু গ্রাস করার জন্য।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে গিয়ে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে গ্রহণ করার জন্য বলেছেন অথচ তাঁর সরকারের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলা এখন কতটুকু গুরুত্ব পাচ্ছে, তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। শুধু দাপ্তরিক কাজে নয়, আইন-আদালতসহ প্রায় সর্বস্তরে আজ বাংলা ভাষার ব্যবহার কমছে, ইংরেজির ব্যবহার বাড়ছে। আমরা ভাষা আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরবে নিজেদের অহং প্রকাশে আনুষ্ঠানিকভাবে তৎপর হলেও–বাংলা ভাষার বিকাশে তৎপর কতটুকু, তা বিবেচনায় টেনে আনা উচিত। ভাষা ব্যবহারের জন্য হঠাৎ হঠাৎ করা কিছু পদক্ষেপ ও ঘোষণা এসেছে কিন্তু একটি জাতীয় ভাষা নীতি আমরা ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছর পার হওয়ার পরও প্রণয়ন করতে পারেনি! এরফলে বাংলা ভাষা নিয়ে বেদনা-বিহ্বল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অরাজক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমাদের দেশে শিক্ষানীতি, কৃষিনীতি, খাদ্যনীতি, ক্রীড়ানীতি, বাল্যবিবাহনীতি এবং আরও কত নীতি আছে! কিন্তু ভাষানীতি নেই! একটি ভাষানীতি থাকলে–শিক্ষার মাধ্যম কী হবে, প্রশাসনের ভাষা কী হবে, বানানরীতি কী হবে, আদিবাসীদের ভাষা কী পর্যায়ে থাকবে, ইংরেজিসহ বিদেশি ভাষার অবস্থান কী হবে, কম্পিউটারে ভাষার পরিস্থিতি কী হবে, পরিভাষা কী হবে, রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা কী হবে–এগুলো নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা ও দিক-নির্দেশনা থাকত। কিন্তু সে দিকে খেয়াল নেই সংশ্লিষ্ট কারোরই! ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, রাশিয়া, চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্রগুলোর ভাষানীতি আমারা বিবেচনায় নিতে পারি। তারা তো জাতীয় ভাষা ত্যাগ করে ইংরেজি গ্রহণ করছে না। আমরা উল্লিখিত দেশের কথা বাদই দিলাম, পাশের দেশ নেপালের কথাই বলি, সে দেশেও একটি ভাষানীতি আছে, তাঁরা উচ্চ আদালতে মাতৃভাষা ব্যবহারে সক্ষম হয়েছে অথচ আমরা এখনো আমাদের উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহার করছি না!

প্রাথমিক স্তরে একমাত্র মাতৃভাষার মাধ্যমেই শিক্ষা দেয়া উচিত। এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত থাকা উচিত নয়। প্রায় সব দেশে প্রাথমিক শিক্ষা মাতৃভাষায় বা একমাত্র ভাষার মাধ্যমে দেয়া হয়ে থাকে। উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত দেশসমূহ–বিশেষত ইংল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, জাপান, ফ্রান্স, জার্মানীতে প্রাথমিক স্তরে প্রথম ভাষা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ভাষায় শিক্ষা দেয়া হয় না। অথচ আমাদের দেশে ভাষা বিষয়ে বিভিন্নমুখী বিভ্রান্তি ছড়িয়ে বাংলাভাষাকে সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত না করার মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য করছি।

প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষাকে গুরুত্বহীন করে কোথাও কোথাও ইংরেজি ও আরবি ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বেশি। নানা রকমের প্রাথমিক শিক্ষাকে বাণিজ্য ভেবে বাজারজাত করা হচ্ছে। ‘ইংরেজি মাধ্যম’, ‘কিন্ডারগার্টেন’, ‘প্রি-ক্যাডেট মাদ্রাসা’ নামের তথাকথিত প্রাথমিক শিক্ষালয় নগর-শহর ও বন্দরে ব্যবসায়ী মনোবৃত্তিতে গড়ে উঠেছে। যার বেশির ভাগই প্রাথমিক শিক্ষার মূল দর্শন থেকে বহু দূরবর্তী অবস্থানে রয়েছে। এসব শিক্ষালয়ের পাঠ্যসূচির কোনো সামঞ্জস্য নেই, নেই শিশু মনস্তত্বের প্রতি লক্ষ্য রেখে শিক্ষা। এসব তথাকথিত শিক্ষালয়ে বাংলাভাষাকে অনেকাংশে অবজ্ঞা আর অবহেলায় টেনে নিয়ে এক কোণায় রাখা হচ্ছে। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে বাংলা ও ইংরেজির মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে এক উদ্ভট পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এর জন্য দায়ী আমাদের অবৈজ্ঞানিক এবং অযুক্তিপূর্ণ মন-মানসিকতা।

ভাষাবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও শরীর-বিজ্ঞানীরা বহু পরীক্ষা করে অভিমত দিয়েছেন যে–প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষাই শিক্ষার একমাত্র বাহন হওয়া উচিত। জাতিসংঘের ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে প্রাথমিক শিক্ষার ওপর অনেক গবেষণা ও সমীক্ষা করা হয়েছে। এসব গবেষণা ও সমীক্ষায় প্রাথমিক স্তরে একটি মাত্র ভাষায় শিক্ষাদানের নির্দেশনা রয়েছে। প্রাথমিক স্তরে দু’টি ভাষায় শিক্ষা শিশুকে নিম্নমানের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়, শিশুর স্মৃতিশক্তি হ্রাস করে, উপলব্ধির ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, শব্দ ভাণ্ডারের ওপর দখল বাড়ায় না, শিশুর বিকাশের পথ বাধাগ্রস্ত করে। প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য কোনো ভাষা শেখালে শিশুর অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষার ক্ষমতা ও দক্ষতা হ্রাস পায়।

শরীর-বিজ্ঞানীরাও তাঁদের গবেষণালব্ধ আরও অভিমত দিয়ে বলেছেন যে, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার বাহন একমাত্র মাতৃভাষা হওয়া উচিত। তাঁরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, শিক্ষার ওপর স্নায়ুতন্ত্রের সম্পূর্ণ আধিপত্য থাকে। স্নায়ুজগৎ ছাড়া ভাষা শিক্ষা অসম্ভব। স্নায়ুতন্ত্রের এলাকাগুলো খুব প্রণালীবদ্ধ, একের সঙ্গে অন্য পরস্পরভাবে জড়িত। মানব শিশুর শিক্ষায় যদি এ প্রণালী নষ্ট হয়, তবে তাতে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শিশু ভাষা শেখে পরিবেশ-প্রতিবেশ থেকে। শিশুর পরিবেশে থাকে স্বাভাবিকভাবে তার মাতৃভাষা। মা ও পরিবারের অন্যান্যরা শিশুদের আদর করে, কথা বলে, ঘুম পাড়ায়, এটা-ওটা চিনিয়ে দেয় মাতৃভাষায়। মানব শিশুর কান দিয়ে শোনার এলাকা ও কথা বলার এলাকা খুবই কাছাকাছি। মাতৃভাষায় পরিচিত ধ্বনিরাশি সংজ্ঞাবহতন্ত্র দিয়ে শ্রবণনিয়ন্ত্রণ এলাকা হয়ে কথা বলার এলাকায় অনায়াসে মুদ্রিত হয়। শিশু শুনে, বোঝে ও বলে ভাব প্রকাশের দক্ষতা অর্জন করে। এভাবে স্নায়ুতন্ত্রের সাথে মাতৃভাষাগত পরিবেশের সম্পর্ক রয়েছে। ভিন্ন ভাষা চাপিয়ে দিলে প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুর শিক্ষা শুধু বাধাপ্রাপÍ হয় না, শিশুর বুদ্ধিমত্তার বিকাশও বিলম্বিত হতে পারে।

সীমিত সংখ্যক উচ্চাভিলাষী পরিবার বা লোকদের স্বার্থে সমগ্র দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর অপ্রয়োজনীয় ও যুক্তিহীন চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা মেটানোর জন্য প্রাথমিক শিক্ষাস্তরের সকল শিশুদের ওপর ইংরেজি বা আরবি চাপিয়ে দেয়া সমর্থনযোগ্য নয়। মাধ্যমিক স্তরের আগ পর্যন্ত মাতৃভাষা ছাড়া ভিন্ন ভাষা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ভিন্ন ভাষা অন্যস্তরে বা অন্যভাবে শেখা যেতে পারে। মাতৃভাষার শিক্ষা সাবলীল হলে অন্য ভাষা ভালো করে আয়ত্বে আনা সম্ভব। অন্য ভাষা শিখবার আগে মাতৃভাষায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের পথ প্রশস্ত করার বিকল্প নেই।

ইংরেজি শিক্ষার মান নিচু হয়ে গেছে বলে অনেকে কাতরান! কিন্তু তারা কি জানেন না যে, শুধু ইংরেজি কেন, মাতৃভাষার মান কি শিক্ষা ক্ষেত্রে বেড়েছে? অথবা শিক্ষার সামগ্রিক মান কি আমরা এখনো উন্নত পর্যায়ে কাক্সিক্ষতভাবে নিয়ে আসতে পেরেছি? শিক্ষাসংক্রান্ত বহু সমস্যা এখনো অনেকক্ষেত্রে আমরা দূর করতে পারিনি। ইংরেজি ভাষায় অজ্ঞ থেকেও চীন ও জাপান আজ জ্ঞান-বিজ্ঞানসহ শিল্প-বাণিজ্যে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে। সর্বাধুনিক কম্পিউটার, জৈবপ্রযুক্তি থেকে শুরু করে জ্ঞান বিজ্ঞানের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে চীনা ও জাপানিরা বিদেশি ভাষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে থেকেছে। সেখানে প্রয়োজনে অনুবাদ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আমাদের শিশুদের শিক্ষিত করার লক্ষ্যে শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে একমাত্র মাতৃভাষা অর্থাৎ বাংলার মাধ্যমেই শিক্ষার সুযোগ অবারিত করা প্রয়োজন।

বাংলা ভাষা আজ গণমাধ্যমেও দিন দিন অনেক অবহেলার শিকার হচ্ছে! ভাষা তো একে অপরের সাথে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। আর গণমাধ্যম পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশের মত বাংলাদেশেও শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে বিকশিত হচ্ছে। আনন্দের কথা। আমাদের দেশে এখন অনেক সংবাদপত্র, বেতার ও টিভি। অনলাইনেও অনেক সংবাদপত্র ও সাময়িকী প্রকাশিত হচ্ছে। আর এসব আমাদের কাছে প্রতিনিয়ত পৌঁছে দিচ্ছে তথ্য, সংবাদ, বক্তব্য, ছবি এবং আরও কত কিছু। আমাদের সকল স্তরের মানুষের ওপর গণ-মাধ্যম বিভিন্নমুখী প্রভাব বিস্তার করছে, আমাদের মনন নির্মাণে সূক্ষ্মভাবে ভূমিকা রাখছে। আচরণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখছে। বিশেষত শিশু-কিশোরদের ওপর এসবের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি।

আগে আমাদের গণমাধ্যমে, বিশেষত সংবাদপত্রে সাধু-চলিত ভাষা ব্যবহার ও বানান নিয়ে বির্তক হয়েছে। সেসব বিতর্ক ছাপিয়ে সংবাদপত্রে আরও বিভিন্নভাবে বাংলা ভাষা ব্যবহারে জটিলতা ও সমস্যা তৈরি হচ্ছে! তবে, কিছু সংবাদপত্র আবার বাংলা ভাষা ব্যবহারে সংহত ও দায়িত্বশীল ভূমিকাও পালন করছে। সংবাদপত্রের বাইরে গণমাধ্যমের আর একটি অংশ, এফএম রেডিও, যা বেশ জনপ্রিয় নতুন প্রজন্মের কাছে, কিন্তু সেই এফএম রেডিওতে বাংলা ভাষার ব্যবহার ভয়াবহ ও দুঃখজনক। ইংরেজি-বাংলা মিশ্রিত ভাষা যেন বাংলা ভাষার বিপরীতে আর এক ভাষার জন্ম দিচ্ছে! এই ভয়াবহ-প্রবণতা সংশ্লিষ্ট এফএম রেডিও-এর ব্যবস্থাপনা পর্ষদ একবারে দেখছেন না! তারা একচক্ষুবিশিষ্ট হরিণ হয়ে পক্ষান্তরে বাংলা ভাষার শত্রুতে পরিণত হচ্ছেন!

আজকাল টিভিতেও এফএম রেডিও-এর মত ইংরেজি-বাংলা মিশ্রিত ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা অনেক বেড়েছে। টিভির অনেক অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা এই ধরনের ইংরেজি-বাংলা মিশ্রিত ভাষায় হচ্ছে। পাশাপাশি অনেক অনুষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইংরেজি-বাংলা মিশ্রিত ভাষায় প্রশ্নোত্তর ও খণ্ডিতভাবে বাংলা ভাষা বাবহার হচ্ছে। অনেক টকশোতে এই হজুকে প্রবণতা উন্নাসিকভাবে উসকে দেওয়া হচ্ছে! টিভিগুলোতে নিজেদেরই নীতিমালা ও দিকনির্দেশনা থাকা জরুরি। বেতার এবং টিভি যদি এসব না দেখেন–না বোঝেন, তবে সরকার বা রাষ্ট্রকে তা প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু সরকার ও রাষ্ট্র যে এগিয়ে আসবে, সেই রাষ্ট্রের তো আজ পর্যন্ত একটি ভাষানীতি হলো না! আছে সরকারের অনেক প্রতিষ্ঠান, আছে তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, তাদেরও বাংলা ভাষা ব্যবহারে বিশেষত গণমাধ্যমে বাংলাভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কোনো ভূমিকা নেই। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা না থাকলে, এই ভাষার সংকট আরও বাড়বে। ফ্রান্স, জাপানসহ উন্নত দেশসহ অনেক দেশে তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহারে রাষ্ট্র ও সরকারের নীতি-আইন রয়েছে এবং তা বাস্তবায়নে কঠোর ভূমিকাও রয়েছে। এজন্য তদারকি সেল আছে, এমনকি এক্ষেত্রে আইন-শৃংখলা বাহিনীকেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ভাষাবিরোধী কোনোকিছু হলেই তারা সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে! আর আমরা? ভাষা আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরবে নিজেদের অহং প্রকাশে আনুষ্ঠানিকভাবে তৎপর হলেও–বাংলা ভাষার বিকাশে তৎপর কতটুকু, তা বিবেকতাড়িত বিবেচনায় টেনে আনা উচিত।

আমরা শুধু আমাদের অতীত গৌরবের স্মৃতি কাতরতায় চঞ্চল না হয়ে বর্তমান সময়ের নিরিখে বাংলা ভাষার কী অবস্থা–তা বিবেচনা করা উচিত। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ কী–তাও ভাবা উচিত। আমাদের একটি ভাষানীতি এবং বাংলা ভাষা সর্বস্তরে প্রচলন করার জন্য আরও একটি জোরালো আন্দোলন কি জরুরি হয়ে উঠেনি?

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published.