নীতিনিষ্ঠ অবস্থানে থেকে দ্বি-দলীয় ধারার বাইরে ‘বিকল্প’ গড়তে হবে

রুহিন হোসেন প্রিন্স

‘অস্থিরতা’ শব্দটা যেন স্থির হয়ে আছে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক জীবন, মানুষের দৈনন্দিন চলাফেরা, সর্বত্রই অস্থিরতা। এ অবস্থা চলছে দিনের পর দিন ধরে। স্বস্তির খবর খুব কমই পাওয়া যায়। এই ভাবেই তো চলছে। একে কি চলা বলে? অস্থিরতাই এখন যেন নিশ্চয়তা।

এই ধারা বহাল থাকলে প্রতি মুহূর্তে হোঁচট খেতে খেতে চলতে হবে। এটাই তো স্বাভাবিক।

ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতার দম্ভ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কাউকে পদ্মা সেতু থেকে ‘টুস করে ফেলে দেওয়া’ এবং ‘নদীতে চুবানি দিয়ে ওঠানো’র মতো অসাংবিধানিক কথা বলেও বিব্রত বোধ করছেন না। নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে নাকাল সাধারণ মানুষদের নিয়ে উপহাস করে চলেছে বিরামহীনভাবে। বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির তৎপরতা চলছে।

করোনাকালে দরিদ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া ও অধিকাংশ মানুষের আয় কমে যাওয়া মানুষকে স্বস্তি দিতে বিশেষ কোনো কার্যক্রম নেই। অথচ ‘মাথাপিছু আয় বেড়ে যাওয়া’, ‘প্রবৃদ্ধি বাড়া’র গল্প চলছে। সাধারণ মানুষের কাছে টাকা কমে যেতে থাকলেও মূল্যবৃদ্ধির হিড়িক পড়ে গেছে। আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে গার্মেন্ট শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ৮,৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি আর মুদ্রাস্ফীতিতে ওই টাকার মান ৫ হাজার বা সাড়ে ৫ হাজারে পৌঁছেছে। তাই এসব মানুষকে কম খেয়ে বেঁচে থাকার পথ বের করতে হয়েছে। চা-শ্রমিকেরা দৈনিক ১২০ টাকা মজুরি আর সামান্য রেশন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে চলেছে। এই অবস্থা চলছে অধিকাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। যেখানে ন্যূনতম মজুরি নেই। উন্নয়ন নামক সোনার হরিণের দেখা মিলছে মুষ্টিমেয় পাঁচ ভাগ মানুষের হাতে। বাকি ৯৫ ভাগ মানুষ চলছে খুঁড়িয়ে।

দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি বন্দি হয়ে আছে দুর্বৃত্তায়িত ধারার কাছে। অসৎ ব্যবসায়ী, অসৎ আমলা আর অসৎ রাজনীতিকরা মিলে তৈরি করেছে এই দুর্বৃত্তায়িত ধারা। শাসকেরা ‘মুক্তবাজার’ আর ‘নয়া-উদারনীতিবাদী’ অর্থনীতির ধারার দেশ পরিচালনা করে এই লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছে।

সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা সর্বত্র এদের নষ্ট প্রভাব মানুষকে ভোগবাদী করেছে আর অদৃষ্টবাদের ছোবল বাড়িয়ে তুলেছে। এই ধারা অব্যাহত রাখতে সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব বাড়ানো হচ্ছে। গণতন্ত্র হরণ করা হচ্ছে। মানুষের মধ্যে ভয়ের ধারা তৈরি করে, ‘রাস্তায় নেমে আন্দোলন করে কী হবে?’ ‘যেমন আছি ভালো আছি’– এমন মনস্তত্ত্ব তৈরি করা হচ্ছে।

এ অবস্থা বহাল রেখে দেশ চালাতে চাইলেও চলছে না। বিশ্ব পরিস্থিতি, ভূ-রাজনীতি, আঞ্চলিক রাজনীতি, দেশের সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ইত্যাদি সামনে আসছে। মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জোরদার হচ্ছে। দেশের এমন সংকট হঠাৎ করে হয়নি। বিগত প্রায় পাঁচ দশক ধরে পুঁজিবাদী বিশ্বায়নমুখী যে বাজারি ব্যবস্থা দেশে চলছে, তা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারার বিপরীতমুখী। তাই এ অবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে বিদ্যমান আর্থসামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা তথা রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি– ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এর ধারায় দেশকে ফিরিয়ে আনতে হবে। এ জন্য দেশের মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করতে হবে। গণআন্দোলন ও গণসংগ্রামের ধারাকে অগ্রসর করতে হবে।

অনেকদিন ধরে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও অনেক বামপন্থি প্রগতিশীল দল, শক্তি, ব্যক্তি এ কাজ করছেন। দেশের অনেক সচেতন মানুষ এই আকাঙ্ক্ষা লালন করে চলেছেন।

অন্যদিকে শুধুমাত্র ক্ষমতাশ্রয়ী শাসকশ্রেণি ও তাদের রাজনৈতিক দল বর্তমান সংকটের কথা বললেও তার সমাধানে শুধুমাত্র ‘পালাবদল’ কে সামনে আনছেন। এর জন্য নানা মেরুকরণ ও মানুষের সামনে নানা ‘চমক’ এনে মৌলিক সংকটকে আড়াল করে চলতে চাইছেন।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতা স্থায়ী করার জন্য দেশবাসীর ওপর গণতন্ত্রহীনতা, ফ্যাসিবাদী প্রবণতা, লুটপাটতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতার বিপদ, ভয়ের ধারা চাপিয়ে দিয়েছে। নানা ধরনের কালাকানুন চাপিয়ে মানুষের কণ্ঠ রোধ করা হচ্ছে। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধেও কালাকানুন চাপানো হচ্ছে। অবাধ পুঁজিবাদী পথে দেশ পরিচালনার এটি অনিবার্য পরিণতি। এর ফলে রাজনীতিতে বাড়ছে বাণিজ্যিকীকরণ, গোষ্ঠীতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, দুর্বৃত্তায়ন, আদর্শহীনতা। আগের দিনের ন্যূনতম রাজনৈতিক সংস্কৃতি আর থাকছে না। লুটের ভাণ্ডার ভাগাভাগিতে অন্তর্দ¦ন্দ্ব বাড়ছে। বাড়ছে নৈরাজ্য। ভোটবিহীন ক্ষমতায় থাকার প্রবণতা, দলীয় পদ ব্যবহার করে আধিপত্য বিস্তার বেড়েই চলেছে। এই চলতি অবস্থার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেশ-বিদেশে কোথাও এই ধারা গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। এ অবস্থায় একটা ‘নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া ও দৃশ্যত (!) মানুষের অংশগ্রহণ দেখানো জরুরি হয়ে পড়েছে। এজন্য চলছে নানা অংশের পারস্পারিক খেলা। একদিকে শক্তির ভারসাম্য গড়ে তোলা, শক্তি দেখানো চলছে। মানুষের মাঝে অনুকূল শক্তি ভারসাম্যের চিত্র তুলে ধরা আর কারসাজির নানারকম পদ্ধতি বের করা, যাতে মানুষের চোখে ধুলা দেওয়া যায়।

শাসক শ্রেণির অপর অংশ বিএনপি’র দক্ষিণপন্থী, প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি। পুঁজিবাদ, লুটপাটতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতার, স্বার্থরক্ষায় এই গোষ্ঠী যে ক্ষমতাসীনদের চেয়ে আরও দক্ষ, তা প্রমাণের জন্য দেশি-বিদেশি শাসকশ্রেণির সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে। বর্তমান সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বিকল্প নীতিনিষ্ঠ শক্তি এখনও দৃশ্যমান না হওয়ায় সাধারণ মানুষদের একটি বড়ো অংশ এখনও এদের নীরব সমর্থক হয়ে আছে।

এই অবস্থা থেকে দেশ ও দেশের মানুষ বাঁচাতে নীতিনিষ্ঠ বামপন্থি দল, বিশেষভাবে সিপিবি’র ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতির নানা ডামাডোলে অনেকের অস্থিরতা বাড়ে। নানা ধরনের শর্টকাট পথে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। এসব প্রচেষ্টা সচেতন বা অবচেতনভাবেও হতে পারে।

কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতায় ও রাজনীতির বিজ্ঞান বলে, রাজনৈতিক সংকট দৃশ্যমান হয়েছে ও হচ্ছে তা হলো দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক পরিণতি। এজন্য দুঃশাসনের অবসান ঘটাতে হলে, ব্যবস্থা বদল করতে হবে। গোটা অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। শাসক শ্রেণির দুটি দল ও দুটি ধারার হাতে সরকার ও রাজনীতি যে বন্দি হয়ে আছে তার থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। এ জন্য জনগণের আস্থাভাজন ‘বিকল্প’ গড়তে হবে। এটি শুধু কথার কথা নয়, বা শব্দচয়ন নয়। এজন্য প্রতিনিয়ত মানুষের মাঝে যেয়ে লেগে-পড়ে থেকে উপযুক্ত কর্মসূচি নিয়ে মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করতে হবে। জনগণই পারে জনগণের ভাগ্য বদল করতে।

এটি না করতে পারলে পরিস্থিতি এক জায়গায় থাকবে না। চলমান দুঃশাসন নানাভাবে পুনঃস্থাপিত হবে। শাসক শ্রেণির দ্বি-দলীয় ধারার বাইরে শাসক শ্রেণির অন্য ধারা নানা ভাবে সামনে আসতে চাইবে। ক্ষমতা পরিচালনায় দেশ-বিদেশের খেলোয়াড়েরা তাদের স্বার্থকে সামনে রেখেই অগ্রসর হবে।

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, সম্পদ, দেশীয় বাজার আর বিনিয়োগের লোভনীয় অবস্থান কেউ ছাড়তে চাইবে না। তাদের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে চাইবে। এর জন্য শাসকশ্রেণির নানা অংশের ওপর ভর করে, তারা তাদের বিকল্প ধরেই অগ্রসর হবে। নতুন নতুন বিকল্প গড়তে চাইবে।

এই পরিস্থিতিতে দেশের বামপন্থি, প্রগতিশীল দল, সংগঠন, ব্যক্তিদের গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালনের পথে এগুতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে তলায় জনগণের যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল ওই ঐক্যের ও চেতনার ধারায় দেশকে অগ্রসর করতে হবে।

সিপিবি অপরাপর নিষ্ঠাবান, বাম প্রগতিশীল দল, সংগঠন, ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে এই কাজ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। দ্বি-দলীয় ধারার বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে দেশকে এগিয়ে নিতে দায়িত্ব পালন করবে।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published.