নারায়ণগঞ্জে কমরেড হেনা দাসের স্মরণানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত

কমরেড হেনা দাসের ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এক স্মরণানুষ্ঠান পালন করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটি।

আজ (২০ জুলাই) মঙ্গলবার সকাল ৮.৩০ টায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জ মাসদার মহাশ্মশানে কমরেড হেনা দাসের স্মৃতিসৌধে এই স্মরণানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনা অনুষ্ঠানের পূর্বে অনুষ্ঠানের শুরুতেই কমরেড হেনা দাসের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটি, নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটি, নারায়ণগঞ্জ শহর কমিটি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ, সমমনা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।

স্মরণ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি কমরেড হাফিজুল ইসলাম। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড মন্টু ঘোষ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড শিবনাথ চক্রবর্তী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ এর নারায়ণগঞ্জ জেলা সমন্বয়ক কমরেড নিখিল দাস, সিপিবি নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সদস্য কমরেড দুলাল সাহা ও জেলা কমিটির সদস্য কমরেড বিমল কান্তি দাস। এ সময়ে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেত্রী রাশিদা বেগম ও বিবর্তনের পক্ষ থেকে নির্মল সাহা আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনায় নেতৃবৃন্দ বলেন, কমরেড হেনা দাস ১৯২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী সিলেট শহরে জন্ম গ্রহন করেন। পৈতৃক নিবাস হবিগঞ্জ জেলার লাখাই থানার স্বজনগ্রামের টাউনশীপে। লাখাই ঐতিহাসিক দত্ত বংশের মেয়ে ছিলেন তিনি। তাঁর পিতা রায় বাহাদুর এডভোকেট সতীশ চন্দ্র দত্ত এবং মাতা মনোরমা দত্ত। মনোরমা দত্ত ছিলেন চুনারুঘাট থানার নরপতি গ্রামের জমিদার জগৎ চন্দ্র বিশ্বাসের মেয়ে। হেনা দত্তের পিতা রায় বাহাদুর এডভোকেট সতীশ চন্দ্র দত্ত ১৯৩০ সালে হবিগঞ্জ সদর-লাখাই-বানিয়াচং- আজমিরীগঞ্জ আসন থেকে ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। রায়বাহাদুর এডভোকেট সতীশ চন্দ্র দত্ত কিছুদিন ভারতবর্ষের স্পীকারের দায়িত্ব পালন করেন। হেনা দাস সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে সিলেটে বৃটিশ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ছোটবেলা হতেই হেনা দাস বিপ্লবী ছিলেন। তিনি এতই বিপ্লবী ছিলেন যে চলন্ত ট্রেনে উঠতে পারতেন এবং নামতে পারতেন। ১৯৩৮ সালে নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশনের সদস্য পদ লাভ করেন। ১৯৪০ সালে সিলেট অগ্রগামী সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৪২ সালে সিলেট মহিলা কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আই এ পাশ করেন। ঐ বছর তিনি কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন। ১৯৪২ -৪৩ সালে ম্যালেরিয়ার আক্রান্ত হয়ে শত শত মানুষ মৃত্যুবরণ করে। হেমাঙ্গ বিশ্বাস, কমরেড আদম আলী, হেনা দাস ম্যালেরিয়া রোগীদের সাহাযর্থে গান গেয়ে চাঁদা তুলেন। সেই চাঁদার টাকা অসহায় ম্যালেরিয়া রোগীদের মাঝে বিতরন করেন।

১৯৪৮ সালে পুর্ব পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হলে মুনীর চৌধুরী সভাপতি, শহীদুল্লাহ কায়সার সাধারন সম্পাদক, হেনা দাসকে যুগ্ম সাধারন সম্পাদক করা হয়। ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট কমরেড অজয় ভট্রাচার্য, কমরেড বরুন রায়, অর্পনা পাল চৌধুরী ও নারীনেত্রী হেনা দাসের নেতৃত্বে সংঘটিত নানকার কৃষক বিদ্রোহের ফলে জমিদারী ব্রিটিশ আমলের ঘৃণ্য নানকার প্রথার অবসান হয়েছিল।

১৯৫২ সালে হেনা দাস ভাষা আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।

১৯৫৮ সালে হেনা দাস সিলেট থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পাশ করেন। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারী করন নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে পরামর্শ করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারী করনে তিনি অনেক ভুমিকা পালন করেন। ১৯৭৭ সালে জিয়ার আমলে শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারন সম্পাদক থাকাকালে হেনা দাসকে গ্রেপ্তার করে কোর্টে চালান দেয়া হয়। পরে কোর্ট থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারগারে পাঠানো হয়। ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শিক্ষক সমাজের আন্দোলন করতে গিয়ে শিক্ষক নেত্রী হেনা দাস ও কামরুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়। শিক্ষক নেত্রী হেনা দাসকে গ্রেফতার করার প্রতিবাদে সমগ্র বাংলাদেশের হাইস্কুলের শিক্ষকগন আন্দোলনে নেমে পড়েন। সমগ্র বাংলাদেশের শিক্ষকগন এসএসসি পরীক্ষার ডিউটি বর্জন করেন।

কমরেড হেনা দাস মাঠের লড়াইয়ে ছিলেন, একই সাথে কলম চালিয়েছেন। লিখেছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রিকায়। কোন উচ্চাকাংখা ছিল না, শিক্ষক পেশায় কমিউনিস্ট পার্টির সাথে থেকে সারা জীবন কাটিয়ে গেছেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির এক সময়কার কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড বারিন দত্তের ছোট বোন। তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন, প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির কন্ট্রোল কমিশনের সদস্য ছিলেন। ২০০৯ সালের ২০ জুলাই হেনা দাস যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.