নব্য উদার-পুঁজিবাদ সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার করছে

মোহাম্মদ শাহ আলম  

দেশে সাম্প্রদায়িকতা নতুন মাত্রা নিয়েছে। সাম্প্রদায়িক শক্তি নতুন নতুন রূপ কৌশলে তাদের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করেছে। সাম্প্রদায়িক চেতনা, মনস্তত্ব, ভাবাদর্শের সামাজিকীকরণ হয়েছে। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ বিপজ্জনক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলা আবহমানকালের মানবিক সংস্কৃতি সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তির দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। রাষ্ট্রক্ষমতা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের হাতে, সমাজটা সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে প্রায় দখলে চলে গেছে। বর্তমান সরকারের গণবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের ফলে এবং ধর্মীয় রাজনীতি ও ভাবাদর্শের সাথে আপস এটাকে আরও সহজ করে তুলেছে।

ষাটের দশক ছিল এর বিপরীত, রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল মুসলিম লীগ, রাজপথ ও সমাজমানসে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল শক্তি। ১৯৫২ সালে ভাষাভিত্তিক যে জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল সে চেতনা ১৯৭১ সালে সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বকে পরাজিত করে। অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনায় বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করে।

বর্তমানে দেশে একের পর এক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটে চলেছে। নড়াইল, কুমিল্লা, সুনামগঞ্জ, নাসিরনগর, হলি আর্টিজান, রামুর ঘটনা সবার জানা। এ সমস্ত ঘটনার প্রকৃত তদন্ত হয়নি, তার উৎসমূল খোঁজা হয়নি, দোষীদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। প্রকৃত তদন্ত হলে এ সমস্ত ঘটনা ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উৎস ও যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যেতো। এ সকল ঘটনার সাথে কোন কায়েমি স্বার্থ, দেশি-বিদেশি রাজনীতি সম্পর্কিত তা বোঝা যেতো। ছোট ছোট খণ্ডিত ঘটনার মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠী তাদের সাধারণ লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়।

সাম্প্রদায়িক রাজনীতির এ খেলা ব্রিটিশ ভারতের সময় থেকে পরিকল্পিতভাবে চলছে। ভাগ কর-শাসন কর, এই সাম্প্রদায়িক বিভেদ হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে প্রায় দুইশত বছর ভারতবর্ষ শাসন করেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। ব্রিটিশবিরোধী দীর্ঘ ভারতীয় জাতীয় মুক্তি আন্দোলন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কাছে পরাজিত হয়। ব্রিটিশের সাথে আপস করে ভারত ভাগ করে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ। এই সাম্প্রদায়িক অপরাজনীতি থেকে ৭৫ বছর পরও মুক্ত হতে পারছে না উপমহাদেশের রাজনীতি। শুধু মুক্ত হতে পারছে না তা নয়, নতুন মাত্রায়, নবরূপে এর উত্থান ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে আজ কংগ্রেসের এককালীন সভাপতি মৌলানা আবুল কালাম আজাদের বক্তব্য ও ভবিষ্যদ্বাণীর দিকে আমরা তাকাতে পারি।

“ভাগ্য যখন ভারতের মুঠোয় আসবে, তখন সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস আর বিসংবাদের অধ্যায় ভুলে গিয়ে আসবে আধুনিক দৃষ্টিতে জীবনের হালফিল সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার নতুন পালা। বিভেদ তখনও নিঃসন্দেহে থেকে যাবে, কিন্তু তা অর্থনৈতিক–সাম্প্রদায়িক নয়। রাজনৈতিক বিরোধিতা তখনও থাকবে, কিন্তু তার ভিত্তি ধর্মীয় হবে না–হবে অর্থনৈতিক আর রাজনৈতিক প্রশ্ন নিয়ে। ভবিষ্যতের বিন্যাস হবে শ্রেণিগত–সম্প্রদায় ভিত্তিতে নয়; নীতিও গড়ে উঠবে সেই ধারায়।” (ব্রিটিশ ক্যাবিনেট মিশন অধ্যায় থেকে, ভারত স্বাধীন হল বই, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ)

বহুজাতিক দেশ ভারত। ভারত যদি ভাগ না হয়ে জাতিগতভাবে ফেডারেল রাষ্ট্র হতো তাহলে হিন্দু-মুসলিমের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রাবাল্য থাকতো কি? চলতো কি কাশ্মীর নিয়ে বিরোধ? হিন্দু হোক–মুসলিম হোক জাতিগতভাবে পাঞ্জাবী, বাঙালি নামেই পরিচিত হতো, ভাষাগত জাতীয়তার পরিচয় হতো প্রধান। সাম্প্রদায়িকতার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিজের মাতৃভূমি, জন্মভূমি, ভিটেমাটি ত্যাগ করে শরণার্থী ও উদ্বাস্তু হতে হতো না। যা এখনও অব্যাহত আছে। পুরো পাকিস্তান পর্বে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছে–গণতন্ত্র ও প্রগতি বিরোধিতায়, আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাঙালি জাতীয় চেতনাকে বিভক্ত করার জন্য ধর্মের ব্যবহার চরম ও বর্বররূপ ধারণ করে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়ে গেলেও ৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে সাংবিধানিকভাবে আবারও পুনর্বাসিত করা হয়। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার শুরু হয়, যা মানুষের আচার-আচরণ, চালচলন ও পোশাক-আশা এবং কথাবার্তায় প্রবলভাবে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়।

আগেই উল্লেখ করেছি, ভারতে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় মুক্তি আন্দোলন দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সাম্রাজ্যবাদের সাথে আপস করে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশভাগ করলো। জাতীয় মুক্তি আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়লো। মধ্যযুগীয় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের রাজনীতির ঘেড়াটোপে উপমহাদেশের রাজনীতি আবদ্ধ হয়ে গেলো। এ হাতিয়ার উপমহাদেশের গণতন্ত্র, গণবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তি মানুষের গণআন্দোলন, গণতন্ত্র ও প্রগতি আন্দোলনের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ব্যবহার করছে।

বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে আমরা দেখতে পাই সারাবিশ্বের নব্যউদারবাদী অর্থনীতি বাস্তবায়ন করার জন্য নব্যউদারবাদী রাজনৈতিক শক্তি রাজনীতিতে ধর্ম-বর্ণ-উগ্র জাতীয়তাকে ব্যবহার করছে। উপমহাদেশের রাজনীতিতে নব্যউদারবাদী শক্তি প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে সাম্প্রদায়িকতাকে। যা আমরা ভারতে হিন্দুত্ববাদের নব্যউত্থানের মধ্যে দেখছি। ‘ফ্যাসিবাদী আরএসএস-এর হিন্দুত্ব অ্যাজেন্ডাকে সরকার আক্রমণাত্মক উপায়ে প্রয়োগ করে চলেছে। উগ্র নয়াউদারবাদী সংস্কারের বিরুদ্ধে বহুমুখী আন্দোলন-আক্রমণের ফলে সাম্প্রদায়িক কর্পোরেট মিতালী শক্তিশালী হচ্ছে, জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠিত হচ্ছে, লুটেরা পুঁজিবাদ সম্প্রসারিত হচ্ছে, রাজনৈতিক দুর্নীতি বৈধতা পাচ্ছে ও সর্বতোমুখী স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।’ (ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) থেকে, ২৩তম কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রস্তাব, কান্নুর, ৬-১০ এপ্রিল ২০২২ থেকে গৃহীত)

তাই বর্তমান বিশ্ব ও উপমহাদেশীয় বাস্তবতায় ধর্মীয় রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতাকে পরাজিত করতে হলে পথ ও পদ্ধতি কী হওয়া প্রয়োজন এবং উচিত তা ভাবনার বিষয়।

উপমহাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুর সামাজিক নিরাপত্তা ও আর্থসামাজিক মুক্তি ছাড়া সাম্প্রদায়িকতামুক্ত উপমহাদেশ গড়ে উঠবে না। আর এর জন্য প্রয়োজন ও কর্তব্য হলো- সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের মুসলিম মেহনতি মানুষ ও ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু মেহনতি মানুষের আর্থসামাজিক মুক্তি। একটার সাথে আরেকটা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটার মুক্তি ছাড়া আরেকটার মুক্তি সম্ভব নয়। আর এটা করতে হলে আরএসএস ও জামাত-হেফাজতির ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক শক্তির ভাবাদর্শ থেকে হিন্দু-মুসলিম মেহনতি মানুষকে মুক্ত করতে হবে। এদের ভাবাদর্শ থেকে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানের সাধারণ মেহনতি মানুষকে মুক্ত করতে না পারলে স্থায়ী ও কার্যকর সাম্প্রদায়িকতামুক্ত গণতান্ত্রিক উপমহাদেশ গড়ে উঠবে না। এটা করতে পারে মেহনতি মানুষের গণআন্দোলন। মুক্ত করার জন্য প্রয়োজন মেহনতি মানুষের শ্রেণিসংগ্রামকে জোরদার ও শক্তিশালী করা। সাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও শোষণমুক্ত সমাজের শক্তি সমাবেশের শক্তি এখানে নিহিত। এখানে রয়েছে গণমানুষের মুক্তির বিকল্প উৎস। শুধু প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এ কাজে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের সর্বশক্তি দিয়ে নামা হবে এ সময়ের ঐতিহাসিক কর্তব্য।

লেখক: সভাপতি, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.