দ্বাদশ কংগ্রেস: সিপিবির রাজনৈতিক রণকৌশলগত ভাবনা-৩

[বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি তার দ্বাদশ কংগ্রেসে সম্মিলিত প্রজ্ঞা ও মতামতের ভিত্তিতে পার্টির রণকৌশলগত রাজনৈতিক লাইন নির্ধারণ করবে। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি সে বিষয়ে সদস্যদের মতামত ও পরামর্শের জন্য ‘রাজনৈতিক প্রস্তাবের’ খসড়া প্রণয়ন করে তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। এই খসড়া ‘রাজনৈতিক প্রস্তাবে’ দেশের বিরাজমান অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রবণতাসমূহ এবং একইসাথে আন্তর্জাতিক-আঞ্চলিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে পার্টির রাজনৈতিক কর্মকৌশলের প্রস্তাবনা নির্ণয় করা হয়েছে। এই খসড়া দলিলের বিশেষ-বিশেষ কিছু অংশ ‘একতার’ পাতায় পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হচ্ছে। আজ তার ৩য় অংশ মুদ্রিত হলো।]

অধ্যায়-২

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি

সিপিবি-র দ্বাদশ কংগ্রেসের ‘খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাবে’ বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে বলা হয়েছে- “… করোনাভাইরাস মহামারিতে গোটা দুনিয়া আজ বিপর্যস্ত…

জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির এ যুগেও একটি ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার ব্যর্থতা, স্বাস্থ্যখাতে অনিয়ন্ত্রিত নৈরাজ্য ও বৈষম্য, টিকাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে কেন্দ্রস্থিত ও প্রান্তস্থিত দেশগুলোর মধ্যে বৈষম্যমূলক অবস্থান ইত্যাদি আরও একবার প্রমাণ করেছে যে, বর্তমানের আধিপত্যশীল পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা মানবজাতির সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম নয়। …স্বাস্থ্যখাতকেও ব্যবসা ও পুঁজির অধীনে নিয়ে আসা, স্বাস্থ্যসেবা বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া ইত্যাদি যে মানবজাতিকে কত বড় বিপর্যয়ের মুখে ফেলতে পারে, কোভিড মহামারি তা আবারও প্রমাণ করল। এ মহামারি মোকাবিলায় গোটা মানবজাতির ঐক্যবদ্ধ থাকার যখন প্রয়োজন ছিল, তখন কোভিডের টিকা নিয়ে… মানুষের জীবনের চেয়ে পুঁজির স্বার্থ বড় করে দেখা হয়েছে। …করোনা ভাইরাসের প্রভাব অবশ্যম্ভাবীভাবে মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির ওপরে পড়েছে। সারা বিশ্বে বেড়েছে বৈষম্য ও বেকারত্ব। ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার পর এ সময়েই পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট মোকাবিলা করছে, …বৈশ্বিক রাজনীতিতেও কোভিডের প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে …। ”

পরিবেশ বিপর্যয় সম্পর্কে ‘দলিলে’ বলা হয়েছে – “… উৎপাদনের সামাজিক চরিত্র ও ব্যক্তিগত ভোগ-দখল তথা পুঁজিবাদের মৌলিক দ্বন্দ্বের প্রতিফলন ঘটছে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকা পরিবেশের গুরুতর অবনতি ঘটানোর প্রক্রিয়ায়। এই দ্বন্দ্ব পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মারাত্মক ভারসাম্যহীনতার বিপদ সৃষ্টি করেছে। মানবসৃষ্ট এই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য পুঁজিবাদী বিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থানকারী দেশগুলো দায়ী হলেও এর ভুক্তভোগী হচ্ছে প্রান্তস্থিত দেশগুলো। … পুঁজির স্বার্থ ও মুনাফার প্রতিযোগিতা, ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা, খনিজ সম্পদ দখলের প্রতিযোগিতা ইত্যাদি বিশ্বকে সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতা, মানববিধ্বংসী রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্র তৈরি গোটা বিশ্বসভ্যতাকেই বিপন্ন করার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। ”

‘খসড়াতে’ বিভিন্ন ঘটনাবলী তুলে ধরে বিশ্বে বিরাজমান শক্তি ভারসাম্য সম্পর্কে বলা হয়েছে – “… সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র কর্তৃত্বে যেভাবে একটি ‘এককেন্দ্রিক বিশ্বের উদ্ভব ঘটেছিল এবং ‘সমাজতন্ত্রের কবর রচনা হয়ে গেছে’ বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, আজ সে পরিস্থিতির পরিবর্তন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। … খোদ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ট্রাম্পের ‘সাদা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বে’-র রাজনীতিকে পরাস্ত করেছে। … ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন এ ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছে। যে যুক্তরাষ্ট্রে সমাজতন্ত্র একটি নিষিদ্ধ শব্দ ছিল, সেই যুক্তরাষ্ট্রে সমাজতন্ত্রী পরিচয়ে রাজনীতি জনপ্রিয় হচ্ছে। … কর্পোরেট বিলিওনিয়ারদের বিরুদ্ধে … শ্রমজীবী জনগণের মজুরির দাবি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে সার্বজনীন করার দাবি, … শ্রমজীবী জনগণের মৌলিক জীবনযাপনের ইস্যুগুলো ইত্যাদি রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসছে। রিপাবলিকান দলকে … পরাজিত করে এবার ডেমোক্র্যাট দলের বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় এসেছেন, যিনি বহুলাংশে তার পূর্বসূরিদের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক নীতির মূল ধারাকেই অনুসরণ করে চলেছেন। … নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্প সমর্থকদের পার্লামেন্ট ভবন আক্রমণের নজিরবিহীন ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে উগ্র ডানপন্থিদের শক্ত অবস্থানের বিপদকে আরো স্পষ্ট করেছে।

“মার্কিন আর্থিক ও সামরিক শক্তির … একক আধিপত্য আজ বিভিন্ন দিক থেকে শক্তিশালী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। চীন এখন অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন শক্তি-সামর্থ্যের সমতুল্য হওয়ার পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। … মার্কিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে নতুন নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও জোট তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাশিয়াও স্বাধীন পদক্ষেপ নিচ্ছে। … চীন ও রাশিয়ার মধ্যে একধরনের স্ট্র্যাটেজিক মৈত্রী গড়ে উঠছে। …

“লাতিন আমেরিকায় বামপন্থিদের উত্থানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ষড়যন্ত্র অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে। কিউবায় মার্কিন সংবাদমাধ্যমের মিডিয়া ক্যু করার প্রচেষ্টা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে … যুক্তরাষ্ট্র যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল, তা-ও সফল হয়নি। বলিভিয়ায় ক্যু-এর মাধ্যমে মোরালেসের সরকারের পতন ঘটালেও, নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও মোরালেসের বামপন্থি দল ক্ষমতায় এসেছে। পেরুতেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বামপন্থি প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে। ব্রাজিলে দক্ষিণপন্থি বোলসানেরোর বিরুদ্ধে বামপন্থিদের নেতৃত্বে গণ-আন্দোলন গড়ে উঠেছে।

“মার্কিন মদদ ও সমর্থনে প্যালেস্টাইনের ওপর ইসরায়েলের দখলদারিত্ব ও হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত আছে। … আফগানিস্তানে মার্কিন নীতি শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। … আফগানিস্তানে ফের তালেবানকে ক্ষমতায় বসিয়ে সে দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার দখলদার সেনাবাহিনীকে ফিরিয়ে এনেছে এবং সে অঞ্চলের জনগণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে নতুন করে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। অব্যাহত সামরিক অভিযানে ইরাক-সিরিয়ার কিছু অংশ আইএস-এর দখল থেকে মুক্ত করা সম্ভব হলেও, আইএস, আল-কায়েদার মতো সংগঠনকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হয়নি। … এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, একসময় এ অঞ্চলে গড়ে ওঠা প্রগতিশীল আন্দোলনকে দমন করতে মার্কিনিরাই জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও সামরিক সাহায্য দিয়েছিল। অন্যদিকে আরব বসন্তকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যে গণতান্ত্রিক জাগরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, মার্কিন প্রভাবে তার সুফলও অনেকটাই ছিনতাই হয়ে গেছে।

সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে খসড়া দলিলে বলা হয়েছে- “… আন্তর্জাতিকভাবে মার্কিন লগ্নিপুঁজির একাধিপত্য যেন অব্যাহত রাখা যায়, সেজন্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ … আগ্রাসী পেশিশক্তির প্রদর্শন বাড়িয়ে তার সেই পিছিয়ে পড়ার প্রবণতাকে সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে। … আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজি … আগের মতো আর তার লোকদেখানো ‘গণতান্ত্রিক চরিত্র’ বজায় রেখে শোষণকে নিরঙ্কুশ করতে পারছে না। … জনগণের মতপ্রকাশের সুযোগ সংকুচিত করে সে কর্তৃত্ববাদী কায়দায় নিরঙ্কুশ শোষণ ও লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করতে চাইছে। সেজন্য দেশে দেশে বিভাজনের রাজনীতিকে উসকে দিচ্ছে। প্রতিক্রিয়াশীল ‘পরিচয়বাদী রাজনীতি’, উগ্র জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, অভিবাসীভীতি, দক্ষিণপন্থি উন্মাদনা, জনতুষ্টিবাদ ইত্যাদির মাধ্যমে শোষণ ও লুটপাটের চরিত্রকে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় জনগণের সংগ্রামও জোরদার হয়ে উঠছে। সামগ্রিকভাবে দেশে দেশে সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তির ক্রমবর্ধমান মেরুকরণ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পরিস্থিতি বিস্তৃত হচ্ছে এবং তা বিশ্বের বিশৃঙ্খল ও টালটামাল অবস্থাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

“বর্তমানের বিশ্বপুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সম্পদ ও পুঁজির কেন্দ্রীভবন বিপজ্জনক মাত্রায় উপনীত হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৭০০ কোটি মানুষের মোট সম্পদের দ্বিগুণ পরিমাণ সম্পদ আজ জমা হয়েছে বিশ্বের মাত্র ১ শতাংশ সবচেয়ে ধনবান মানুষের কাছে। যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়ে আছে তাতে ঘটছে মানবিক বিপর্যয়। চিকিৎসার অভাবে বিশ্বে প্রতিদিন দশ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে, এখনও বিশ্বের প্রতি ৫ জনের একজন শিশু স্কুলে যেতে পারছে না। ”

সিপিবি-র এই ‘খসড়া দলিলে’ বলা হয়েছে- “উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর শাসকগোষ্ঠী … নিজ দেশেও তাদের শ্রমজীবী জনগণের ওপর নানা ধরনের বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ চাপিয়ে দিচ্ছে। একদিকে চলছে শিক্ষা-স্বাস্থ্য বাজেটের কাটছাঁট, মজুরি হ্রাস, পেনশন-ফান্ডের সংকোচন, শ্রমিক ছাঁটাই। অন্যদিকে কর্পোরেট পুঁজিপতি শ্রেণিকে দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা ও আর্থিক ছাড়। প্রান্তস্থিত দেশগুলোর সস্তা শ্রমকাজে লাগিয়ে অধিক মুনাফা করার অভিপ্রায়ে পুঁজিবাদী দেশগুলোতে কর্মসংস্থানের অভাব তৈরি হচ্ছে। এসব সংকটের বিরুদ্ধে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গণ-আন্দোলন গড়ে উঠেছে, গণ-অসন্তোষ পরিলক্ষিত হচ্ছে। যুক্তরাজ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে আসার ফলে সেখানে সৃষ্ট নানা সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। …মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে যে সামাজিক ও মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে, তার ফলে ইউরোপে অভিবাসন সংকট সৃষ্টি হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সংকট বৃদ্ধির মুখে পড়ে অভিবাসন ইস্যুটিকে সামনে এনে দক্ষিণপন্থি শক্তির জাতিবাদী, বর্ণবাদী’ নব্য ফ্যাসিবাদী রাজনীতি গতি পেয়েছে। অন্যদিকে বামপন্থি ও নয়া-বাম ঘরানার দলগুলোও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শক্তি সঞ্চয় করছে। বিশ্বজনমত এখন কিছুটা হলেও বামপন্থার দিকে ঝুঁকছে।

“নানারূপ রাজনৈতিক-সামরিক-অর্থনৈতিক অপকৌশল গ্রহণ করা স্বত্ত্বেও, ইউরোপ ও আমেরিকায় পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক সংকট নিরসন বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। …এমন অবস্থায় … আমেরিকার অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামনে প্রধান উপায় হয়ে থাকছে তার সামরিক শিল্প কমপ্লেক্সকে শক্তিশালী করা ও অস্ত্র-ব্যবসার পরিধি বিস্তৃত করা। এজন্য সাম্রাজ্যবাদ সারা দুনিয়ায় উত্তেজনা ও যুদ্ধের উসকানি দিচ্ছে এবং তার কুকর্মের সহযোগী সাগরেদদের সন্ধানে হন্যে হয়ে উঠেপড়ে লেগেছে। … আজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম রণকৌশল হলো ইউরোপে রুশবিরোধী ও এশিয়ায় চীনবিরোধী অক্ষজোট গড়ে তোলা। আমেরিকা চীনকে প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে, তাকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য চীন-ভিয়েতনাম, চীন-রাশিয়া, চীন-জাপান, চীন-পাকিস্তান, চীন-ভারত, চীন-বাংলাদেশ ইত্যাদি সম্পর্কের মধ্যে বিরোধ উসকে দেয়ার চেষ্টা করছে। চীনের উদীয়মান ও ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা খর্ব করার লক্ষ্যে আমেরিকা বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক ও সামরিক বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে তার ‘চীন-ঘেরাও’ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

“যেসব রাষ্ট্রে সমাজতন্ত্রী দল ক্ষমতায় আছে, সেসব রাষ্ট্রে নানামুখী সংস্কার অব্যাহত আছে। এসব সংস্কারের অন্যতম একটি লক্ষ্য হলো উৎপাদন শক্তির বিকাশ। এসব দেশে অর্থনীতির মূল নির্ধারক ভিত্তিগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা বহাল রেখেই শাসনক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, ব্যক্তিখাতকে নিয়ন্ত্রিতভাবে ছাড় দেয়া, ‘সমাজতন্ত্র অভিমুখী বাজার অর্থনীতি’-র বিস্তার, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি হ্রাস ইত্যাদি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে চীন ও ভিয়েতনাম তাদের উৎপাদন শক্তির লক্ষ্যণীয় বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হলেও সেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্যও বেড়েছে। তবে বৈষম্য কমাতে এ রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত কর্মসূচির মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিউবা মার্কিন অবরোধের মুখেও টিকে আছে এবং সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে চেষ্টা করছে। উত্তর কোরিয়া প্রচণ্ড চাপের মুখে থাকলেও, অভ্যন্তরীণ নানা সীমাবদ্ধতা ও সংকটাবস্থা নিয়েই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যাচ্ছে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত এসব দেশ নানা আঁকাবাঁকা পথে সমাজতন্ত্র অভিমুখে যাত্রা অব্যাহত রেখেছে।

“মোটাদাগে বলা যেতে পারে যে, পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বে সংকট নিরসন হওয়ার বদলে বহুক্ষেত্রে সংকট আরও প্রসারিত হয়েছে। … প্রান্তস্থিত দেশগুলোতে তো বটেই, উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতেও শ্রমিকশ্রেণি ও মধ্যস্তরের জনগণের মধ্যে গণ-অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এর ফলে দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নয়া উদারবাদী পুঁজিবাদের নীতিতে পরিচালিত ‘পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের’ বর্তমান দুনিয়ায় পুঁজিবাদের অতি আধুনিক ‘নয়া উদারবাদী ব্যবস্থায়’ বিশ্বব্যাপী লগ্নিপুঁজির শাসনের বিরুদ্ধে সচেতনতার মাত্রাও নানাভাবে বাড়ছে। … সামগ্রিকভাবে বলা যেতে পারে, পুঁজিবাদের একচেটিয়া শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের সচেতন সংগ্রামের মাত্রাগত বৃদ্ধি ঘটেছে। সারাবিশ্বে প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, শান্তিকামী মানুষের সংগ্রাম ও অগ্রযাত্রা অব্যাহত আছে। পুঁজিবাদের বিকল্প সন্ধানে মানুষের উৎসাহী কর্মতৎপরতা প্রসারিত হওয়ায় আগামী দিনের বিশ্বকে নতুন করে সাজানোর সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ”

[পরবর্তী অংশ আগামী সপ্তাহের ‘একতায়’ প্রকাশিত হবে]

Leave a Reply

Your email address will not be published.