দ্বাদশ কংগ্রেস: সিপিবির রাজনৈতিক রণকৌশলগত ভাবনা-৭

[বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বাদশ কংগ্রেস সম্মিলিত প্রজ্ঞা ও মতামতের ভিত্তিত পার্টির রণকৌশলগত রাজনৈতিক লাইন নির্ধারণ করবে। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি সে বিষয়ে সদস্যদের মতামত ও পরামর্শের জন্য ‘রাজনৈতিক প্রস্তাবের’ খসড়া প্রণয়ন করে তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। এই ‘খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাবে’ দেশের বিরাজমান অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রবণতাসমূহ, এবং একইসাথে আন্তর্জাতিক-আঞ্চলিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে পার্টির রাজনৈতিক কর্মকৌশলের প্রস্তাবনা নির্ণয় করা হয়েছে। এই খসড়া দলিলের বিশেষ-বিশেষ কিছু অংশ ‘একতার’ পাতায় পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হচ্ছে। আজ তার ৭ম অংশ মুদ্রিত হলো।]

অধ্যায়-(৫) এখনকার রাজনৈতিক কর্তব্য

সিপিবি-র ‘খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাবের’ শেষ, তথা ৫ম অধ্যায়ে পার্টির কর্মকৌশলের সুনির্দিষ্ট উপাদানগুলো তুলে ধরার আগে, এই কর্মকৌশলের ক্ষেত্রে সব সময়ের কেন্দ্রীয় কর্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে-

“…গণতন্ত্রহীনতা, পুঁজিবাদী শোষণ-শাসন, লুটপাটতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদের বিপদ আমাদের দেশ এবং দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে। শাসক শ্রেণি পুঁজিবাদের নয়া-উদারবাদী অর্থনৈতিক দর্শনকে অবলম্বন করে যে ‘চুইয়ে পড়া’ উন্নয়ন মডেল অনুসরণ করে চলেছে, এতে চোখ ধাঁধানো কিছু চমক দেখাতে পারলেও, ব্যাপক  চতুর্থ পৃষ্ঠার পর

জনগণের জীবন-যন্ত্রণা লাঘব করতে পারা তো দূরের কথা, তা আরও গভীর ও অসহনীয় হয়ে উঠছে। ধন-বৈষম্য, শ্রেণি-বৈষম্য, জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এসবকে ‘উন্নয়নের প্রসব বেদনা’ বলে আখ্যায়িত করে মুষ্টিমেয় লুটেরা গোষ্ঠীকে অকল্পনীয় পরিমাণ সহায়-সম্পদ কুক্ষিগত করার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। শাসকশ্রেণি অনুসৃত মুক্তবাজার ব্যবস্থা, পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন, নির্বিচার বিরাষ্ট্রীয়করণ-বিনিয়ন্ত্রণ-উদারীকরণ ইত্যাদি নীতি-ধারা আমাদের অর্থনীতিতে লুটপাট, দুর্বৃত্তায়ন, পরনির্ভরতা ও অবক্ষয়ের জন্ম দিয়ে চলেছে। উৎপাদনবিমুখ, কমিশনভোগী, পরগাছা ও লুম্পেন চরিত্রের শাসকগোষ্ঠী দেশীয় লুটেরাদের পাশাপাশি, সাম্রাজ্যবাদ ও বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থরক্ষা করে চলেছে। অর্থনীতিতে শাসকগোষ্ঠীর এসব নীতি-দর্শন-ব্যবস্থার কারণে দেশে আজ সংকটাপন্ন আবর্ত রচনা হয়েছে।”

সেখানে আরো বলা হয়েছে “…লুটপাটের অর্থনীতি’ রাজনীতিতেও জন্ম দিয়েছে চরম অবক্ষয়ের। রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব রাখতে পারা এখন লুটপাটের প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠায়, যেনতেন উপায়ে ক্ষমতার মসনদ দখলে রাখার জন্য লুটেরা ধনিক শ্রেণির মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে, দেশ থেকে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো, এমনকি জনগণের ভোটের অধিকারও আজ প্রায় সম্পূর্ণভাবে লোপাট হয়ে গেছে। জনসমর্থন অথবা জনসম্মতির ওপর নির্ভর করে চলার পরিবর্তে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা এবং সরকার পরিচালনার কাজকে একধরনের স্থায়ী কাঠামোগত রূপ দেয়া হয়েছে। এভাবে রাষ্ট্রের ও সরকারের ফ্যাসিস্ট প্রবণতার বিপদ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। একইসঙ্গে, ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে থাকার জন্য শক্তির বিন্যাস ও সমীকরণ নিজের পক্ষে রাখার জন্য সাম্প্রদায়িকতাকে, এমনকি উগ্র ধর্মান্ধ ফ্যাসিস্ট শক্তিকেও মদদ দেয়া হচ্ছে।

“…লুটেরা বুর্জোয়াদের স্বার্থরক্ষাকারী রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন সরকার গঠন করলেও, তারা কেউ এই সাধারণ অবক্ষয় ও সংকট দূর করে দেশবাসীর অবস্থার কোনো গুণগত মৌলিক উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হয়নি। বর্তমান সরকার এখন অগণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা দখল করে রেখেছে। এর আগে শাসকশ্রেণির অন্য আরেকটি দল ক্ষমতায় থাকলেও তারাও জনগণের স্বার্থকে তোয়াক্কা না করে লুটেরা ধনিকদের স্বার্থই রক্ষা করেছে। এই দলগুলোর নিজেদের মধ্যে গলাকাটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও, তাদের শ্রেণিগত চরিত্র মূলগতভাবে একই। লুটেরা শাসকশ্রেণি এই দুই দলের মাধ্যমেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করেছে। লুটেরা শাসকশ্রেণিকে পরাভূত করে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তসহ ব্যাপক জনগণের অনুকূলে রাষ্ট্রক্ষমতার বদল না হলে, এবং অর্থনৈতিক-সামাজিক নীতি-দর্শনের প্রগতিমুখীন মৌলিক পরিবর্তন না ঘটলে, সংকটের চেহারা, রূপ ও পরিমাণের ক্ষেত্রে কিছু হেরফের ঘটলেও, সংকটের মূলগত উৎস স্থায়ীভাবে নিরসন হবে না। দেশের বুর্জোয়া রাজনৈতিক শক্তিগুলো লাখো শহীদের আত্মদানের মাধ্যমে পাওয়া ‘মুক্তিযুদ্ধের অর্জন’কে আজ ভূলুণ্ঠিত করেছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ধারায় দেশকে এগিয়ে নেওয়ার কর্তব্য সম্পাদনে দেশের কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদেরই এখন অগ্রসর ভূমিকা পালন করতে হবে।

“…রাষ্ট্রীয় ও সমাজজীবনের সর্বক্ষেত্রে যে পচন ও অবক্ষয় দেখা দিয়েছে, সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে সেই সংকট নিরসন করা যাবে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠা লুটপাটতন্ত্র ও শক্তি ভারসাম্যের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি লুটেরা শোষকচক্রের আধিপত্য এবং বুর্জোয়া রাজনীতির বিদ্যমান ‘দ্বি-দলীয় মেরুকরণ কাঠামোর’ বেড়াজাল ভেঙে বামপন্থিদের নেতৃত্বে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি এবং গণশক্তির সচেতন ও সংগঠিত উত্থান ছাড়া বর্তমান দুঃসহ অবস্থার মৌলিক ও স্থায়ী কোনো পরির্বতন সম্ভব হবে না। তাছাড়া বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সুস্পষ্টভাবে একথাও প্রমাণ করছে যে, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন আজ সকল জাতির ও মানবসমাজের দুর্দশার প্রধান উৎস এবং একমাত্র সমাজতন্ত্রের পথ ধরেই এই সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সাধনের কঠিন দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে এ দেশের কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের সেই লক্ষ্যের পথে এগিয়ে যেতে হবে।”

এ কথা বলার পর বিশেষভাবে ‘সব সময়ের জন্য কেন্দ্রীয় কর্তব্য হিসেবে’ যেটিকে গণ্য করতে বলা হয়েছে তা হলো-

“…বর্তমান সংকট থেকে পরিত্রাণের জন্য সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সাধন করতে হবে। অন্য কাজ আগে সম্পন্ন করার জন্য এই মূল কর্তব্যকে স্থগিত বা পেন্ডিং রাখা যাবে না। এটিকে সব সময়ের মূল কাজ হিসেবে গণ্য করতে হবে। অপরাপর সব আশু ও জরুরি কাজের সময়েও এই বিষয়টিকেই কেন্দ্রীয় কর্তব্য বলে বিবেচনা করে সেই মোতাবেক পদক্ষেপ নিতে হবে।”

এক্ষেত্রে নিম্নলিখিত পাঁচটি কাজকে গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নিতে বলা হয়েছে-

গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি কাজ

“(১) লুটেরা বুর্জোয়া ধারার বর্তমান দ্বি-দলীয় মেরুকরণভিত্তিক শক্তি-সমাবেশের বাইরে রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের মতো সামর্থ্য ও যোগ্যতাসম্পন্ন এবং জনগণের আস্থাভাজন, বাম-প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি-সমাবেশ গড়ে তোলা।”

“(২) রাজনীতি ও সমাজে বর্তমান শাসক-শোষক শ্রেণির অধিপত্য খর্ব করে, শ্রমজীবী মানুষসহ ব্যাপক জনগণের শ্রেণিগত ও অন্যান্য ন্যায্য দাবির ভিত্তিতে পরিচালিত শ্রেণিসংগ্রাম ও গণসংগ্রামের ধারায় তাদের সচেতন ও সংগঠিত করে এই বিকল্প শ্রেণিশক্তির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা।”

“(৩) দেশবাসীর সামনে গণমুখী, প্রগতিশীল, জাতীয় স্বার্থ অনুকূল, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও বিপ্লবী ধারার বিকল্প কর্মসূচি উত্থাপন করা এবং তা জনপ্রিয় করে তোলা।”

“(৪) সাম্প্রদায়িকতা, সশস্ত্র সাম্প্রদায়িক শক্তির বিপদ, রাষ্ট্রের ফ্যাসিস্ট প্রবণতা, গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত করার চেষ্টা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা প্রভৃতিকে গুরুতর বিপদ বলে বিবেচনা করে এসব বিপদের বিরুদ্ধে সমান গুরুত্ব সহকারে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামে আপসহীন, দায়িত্বপূর্ণ ও অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করা।”

“(৫) গোটা বিশ্ব এবং এশিয়া-দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে, বিশেষভাবে আমাদের দেশে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে বহুমাত্রিক ধারায় সংগ্রাম গড়ে তোলা।”

এসব কর্তব্য সম্পাদন করতে হলে প্রথমেই যে কাজটির প্রতি সবিশেষ নজর দিতে হবে বলে ‘খসড়া দলিলে’ বলা হয়েছে তা হলো- ‘পার্টির নিজস্ব শক্তি সামগ্রিকভাবে বৃদ্ধি করা’।

[পার্টির নিজস্ব শক্তি বৃদ্ধিসহ এসব কর্তব্য সম্পাদন করার ক্ষেত্রে অনুসরণীয় কর্মধারা সম্পর্কে দলিলে কী বলা হয়েছে, তা ‘একতার’ পরবর্তী সংখ্যায়, সিরিজের ৮ম তথা শেষ কিস্তিতে তুলে ধরা হবে।]

Leave a Reply

Your email address will not be published.